img

ঈদ ভাবনা

প্রকাশিত :  ১৩:৫০, ০৭ জুলাই ২০২২

ঈদ ভাবনা

পৃথিবীর সকল মুসলমানরাই ঈদুল আযহা পালন করে থাকে। ইসলাম ধর্মাবলম্বিদের সবচেয়ে বড় দ’টো ধর্মীয় উৎসবের একট হল ঈদুল আযহা। বাংলাদেশে এই উৎসবটি কুরবানির ঈদ নামে পরিচিত। ঈদুল আযহা মূলত আরবী শব্দ। এর অর্থ হলো ত্যাগের উৎসব। আসলে এটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ত্যাগ করা। এই ঈদুল আযহা বা কোরবানির একটি ইতিহাস আছে যা আমরা সকলেই কম বেশি জানি।

ইসলামের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, মহান আল্লাহ তা’আলা হযরত ইব্রাহীম (আ.) কে স্বপ্নে তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটিকে কুরবানি করার নির্দেশ দিলে তিনি তার সবচেয়ে প্রিয় সন্তান ইসমাইল (আ.) কে কোরবানি দেন। এরপর হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর পর দেখেন যে, তার পুত্রের পরিবর্তে একটি প্রাণী কোরবানি হয়েছে এবং তার পুত্র একদম ঠিক আছে। অর্থাৎ মহান আল্লাহ তার বান্দাদের কঠিন পরীক্ষার মাধ্যমে পরীক্ষা করে থাকেন। হযরত ইব্রাহীম (আ.) আল্লাহর আদেশ পালন করার দ্বারা কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করেন। তারপর থেকে বিশ্বের সকল মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এই ঈদুল আযহা পালন করে থাকে। মহান আল্লাহ এই ঈদুল আযহাকে সেই সকল মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব বলেছেন যাদের কোরবানি দেয়ার সামর্থ আছে। এ দিনটিতে মুসলমানেরা তাদের সাধ্যমত ধর্মীয় নিয়মানুযায়ী উট, দুম্বা, গরু কিংবা ছাগল কোরবানি বা জবাই দিয়ে থাকেন। এরপর তা নিয়মানুযায়ী তিন ভাগে ভাগ করা হয়। এর একভাগ ফকির মিসকিনদের, আর একভাগ আত্নীয়—স্বজনদের এবং একভাগ নিজেদের জন্য রাখা হয়। 

প্রতিবছর এই ঈদুল আযহা আসলেই মনে পরে শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা। সকালে উঠেই রেডি হয়ে বাবার হাত ধরে গুটি গুটি পায়ে নামাজ পড়তে যাওয়া, নামাজ শেষে সকলের সাথে কোলাকুলি করে হাত মেলানো। এমন হাজারো শৈশব জেগে উঠে মনের মধ্যে। এক অজানা ব্যাথা অনুভূত হয়। আমরা যারা প্রবাসী তারাই কেবল জানি এই কষ্ট ঠিক কতটা। যারা বাংলাদেশে ঈদুল আযহা পালন করেন তাদের ঈদ আর আমরা যারা প্রবাসী ভাইবোনরা আছি তাদের ঈদের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। বিশেষ করে ব্রিটেনের প্রবাসীদের। কারণ আমাদের তো এই বিশেষ দিন অর্থাৎ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় দুই উৎসবের এই একটি উৎসবেও একটা দিন ছুটি থাকে না। অথচ “বড় দিনের” ছুটি থেকে অন্যান্য নানা ধরনের উৎসবের ছুটি ঠিকই থাকে। শুধু থাকে না আমাদের ঈদুল আযহার জন্য একটা দিনের ছুটি। সকালে নামাজ পড়ে যখন সবাই ঈদ উদযাপন করে তখন আমরা কাজে চলে যাই।

সেই শৈশবের মতো নামাজ পড়া, সকলের সাথে সাক্ষাৎ করা, কোরবানি দেয়ার মতো কেনো কাজেই অংশগ্রহণ করতে পারি না। আমরা যারা ব্রিটেনের প্রবাসী তারাও এই একটা দিন উদযাপন করতে চাই। আমাদেরও এই একটি দিন ছুটি দিলে খুব বেশি ক্ষতি হবে কি? আমার জানা নেই। আমাদের পরিবার বিশেষ করে বাবা মা কে ছেড়ে এই বিশেষ দিনটি পার করা কতটা বেদনাদায়ক তা কেবল তারাই জানেন যাদের বাবা মা কাছে থাকেন না বা এই পৃথিবীতে নেই। এই দিনটি আসলেই সবার প্রথমে যা মনে হয় তা হলো বাবা মায়ের কথা। ঘুম থেকে উঠেই মনে হয় আজ যদি বাবা থাকতো তবে নিশ্চয়ই তার সাথে নামাজে যেতে পারতাম। মায়ের সেই কপাল ভরে চুমু খাওয়া আদর গুলো ভীষণ মনে পরে। জেগে ওঠে সেই শৈশবের সকল কথা। ভেতর থেকে দুমড়ে মুচড়ে যায় সকল ভালো থাকাগুলো। ম্লান হয়ে যায় ঠোঁটের সেই হাসি। এই তো আমাদের প্রবাস জীবন। 

আর এবারের ঈদুল আযহা আমাদের কাছে আরও মর্মান্তিক। আমাদের সিলেটের কত মা—বাবা ভাই—বোন এখনও বন্যাগ্রস্থ হয়ে আছেন। যেখানে তাদের বেঁচে থাকায় কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের জন্যও কষ্ট হয়। তাই দূর থেকে যতটা সম্ভব আমরা সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনো কিছুই একার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই দেশের সকলের কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছি আপনারাও এগিয়ে আসুন সাহায্য করুন সেই সকল দুস্থদের। কোরবানি বা ঈদুল আযহাকে ওয়াজিব করে দিয়েছেন মহান আল্লাহ। কিন্তু যদি আপনি কারো প্রাণ বাঁচান তাহলে সেটার জন্য আল্লাহর কতটা সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব সেটাও একবার ভাবুন। 

তাই শুধু নিজে নিজেই নয় আশেপাশের সকলকে নিয়েই যেন সবার ঈদুল আযহা ভালো কাটে এই প্রার্থনা করি।

ফেরদৌস রহমান। সোয়ানসী


মতামত এর আরও খবর

img

বিভক্তির রাজনীতি নয়, এখন সময় এসেছে বাংলাদেশকে নিয়ে একসঙ্গে ভাবার

প্রকাশিত :  ১৩:৩৪, ২২ মে ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের রাজনীতি বহু বছর ধরেই যেন এক দীর্ঘ মেরুকরণের গল্প। এখানে মতের চেয়ে পরিচয় বড় হয়ে উঠেছে, যুক্তির চেয়ে উচ্চকণ্ঠের স্লোগান বেশি শোনা গেছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্টেছে ভাষা, বদলেছে প্রতিশ্রুতি, কিন্তু সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা একই থেকেছে—একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ।

এই দেশের মানুষ রাজনীতির কাছে খুব জটিল কিছু চায় না। তারা চায় এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে একজন তরুণ তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পাবে, একজন কৃষক ন্যায্য মূল্য পাবে, একজন মা তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন। মানুষ এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি চায়, যেখানে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করাই মূল লক্ষ্য নয়; বরং ভিন্নমতকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার মানসিকতা থাকবে।

সময়ের সঙ্গে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে। এখন মানুষ কেবল বক্তৃতা শোনে না, তারা আচরণও দেখে। নেতার ভাষা, সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি—এসবও আজ রাজনৈতিক মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সেই জায়গা থেকেই সাম্প্রতিক সময়ে অনেক মানুষের ভেতরে নতুন এক প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে তারেক রহমানকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং একটি তুলনামূলকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ভাষার প্রত্যাশাও কাজ করছে।

মানুষ আসলে এমন নেতৃত্ব খোঁজে, যা বিভক্তির দেয়ালকে আরও উঁচু না করে বরং সেতুবন্ধন তৈরি করতে চায়। কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার রাজনীতি প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে না দেখে তাকে গণতান্ত্রিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখতে শেখে। জাতীয় অগ্রগতি কখনো কোনো এক দলের একার অর্জন নয়; এটি সমষ্টিগত সহযোগিতা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধের ফল।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই—আমরা এখনও অনেক সময় দেশকে নয়, দলকে আগে ভাবি। রাজনৈতিক আনুগত্য এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে নাগরিক পরিচয় আড়ালে পড়ে যায়। অথচ রাষ্ট্র কোনো দলের সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্র মানে কোটি মানুষের শ্রম, স্বপ্ন, সংগ্রাম ও ভবিষ্যতের সম্মিলিত নাম। তাই মতভেদ থাকবে, সমালোচনাও থাকবে; কিন্তু সেই সমালোচনা যদি ধ্বংসের বদলে সংশোধনের পথ দেখায়, তবেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়।

বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। বিশ্ব অর্থনীতি বদলাচ্ছে, প্রযুক্তি নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে, তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক সংঘাতের পুরোনো ধারা ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন। এখন প্রয়োজন এমন এক জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানবসম্পদ, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে সমান গুরুত্ব দেবে।

তরুণদের কর্মসংস্থান, শিক্ষার আধুনিকায়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি এবং সহনশীল সমাজব্যবস্থা—এসব অর্জনের জন্য জাতীয় ঐক্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। কারণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রের অংশ হতে পারে, কিন্তু স্থায়ী বিভাজন কখনো উন্নয়নের ভিত্তি হতে পারে না।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যে জাতি সংকীর্ণতার দেয়াল ভেঙে বৃহত্তর স্বার্থে এক হতে পেরেছে, তারাই টেকসই অগ্রগতির পথে এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষ—তাদের পরিশ্রম, অভিযোজনক্ষমতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা।

এখন সময় এসেছে সেই শক্তিকে বিভক্তির রাজনীতিতে ক্ষয় না করে উন্নয়নের শক্তিতে রূপান্তর করার। কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস তাদেরই মনে রাখে, যারা মানুষকে ভাঙার নয়, এক করার কথা বলেছে; যারা ক্ষমতার নয়, দেশের ভবিষ্যতের কথা ভেবেছে।

মতামত এর আরও খবর