img

উপন্যাসে বিভাজন, বৈষম্য ও মানবিক মূল্যবোধ

প্রকাশিত :  ১৯:০৫, ১৪ অক্টোবর ২০২২

উপন্যাসে বিভাজন, বৈষম্য ও মানবিক মূল্যবোধ

সাহিত্য সমাজের দর্পন। মানু্ষের জীবন বোধ, জীবন প্রণালী, চিন্তা, চেতনা, আর্থ সামাজিক  চিত্রেরই এক প্রতিচ্ছবি হচ্ছেসাহিত্য। কবি সাহিত্যিকরা তাদের সাহিত্য কর্মে সমাজের রূপ যেমন অংকন করেন পাশাপাশি সমাজ বিনির্মানে তাদের নিরন্তর প্রয়াশও পরিলক্ষিত হয় সাহিত্যে। মানুষের ভাবনা ও প্রাত্যহিক জীবনের মূর্ত প্রকাশ ঘটে সাহিত্যে। এই অর্থে সাহিত্য জীবনেরই প্রতিচ্ছব। কবিতা, ছোট গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাস সব মিলেই সাহিত্য। প্যারীচাঁদ মিত্রের প্রথম  উপন্যাস ‘আলালের ঘরের দুলাল’ এই উপন্যাসের  মাধ্যমেই উপন্যাসের যাত্রা। উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের একটি মডার্ন ফর্ম। উপন্যাসের পূর্বে বাংলা সাহিত্যের শুরুর দিকটি আলোচনা আবশ্যক। 

বাংলা ভাষার প্রথম বইটি হচ্ছে ‘চর্যাপদ’। বাঙলার পন্ডিতরা চর্যাপদকে দাবী করেন বাংলাবলে। চর্যাপদে আর্য ভাষার প্রভাব রয়েছে। ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত বই ‘বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ  গন্ত্রে চর্যাপদকে বাঙালির বলে উল্লেখ করেছেন। ২৪ জন বৌদ্ধ বাউল কবির ৪৬টি পূর্ণ কবিতা নিয়েই রচিত হয় চর্যাপদ।চর্যাপদরচিত হয়েছিল ৯৫০ থেকে ১২০০ অব্দের মধ্যে। মহা পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদকে নেপালের রাজ দরবার থেকে আবিষ্কার করেন। মধ্যযুগের রচিত হয়েছিল ‘শ্রী কৃষ্ণকীর্তন’ মহা কাব্য, যা রচনা করেন বড়ু চণ্ডীদাস। তিনিই হচ্ছেন বাংলা ভাষার প্রথমমহা কবি। ডক্টর হুমায়ূন আজাদ বড়ু চণ্ডীদাসকে আমাদের প্রথম রবীন্দ্রনাথ বলে দাবী করেন।

বাংলা সাহিত্যের এক অপরাজেয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপধ্যায়। অসংখ্য জনপ্রিয় উপন্যাস লিখে তিনি বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে সমাদৃত হয়ে আছেন। দেবদাস পড়েননি এমন কম সাহিত্যানুরাগী রয়েছেন। কৈশোর ও যৌবনের সন্ধিক্ষনে বইটি পড়ে নিরবে কেঁদেছেন অনেক তরুণ। দেবদাসের শেষ পৃষ্ঠায় তাঁর কথনটি —“মরনে ক্ষতি নাই কিন্তু এমন করিয়া কারো যেন মৃত্যু না হয়। একটি স্নেহার্দ কন্টস্বর যেন তার ললাটে পৌঁছে, একটি স্নেহময়ী মুখ দেখিয়া যেন জীবনের অন্ত শেষ হয়”। যা মানব হৃদয়কে সহজেই আহত করে। 

শরৎচন্দ্র তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস শ্রীকান্তে একটি পর্যায়ে লিখেন, “আগামীকাল বাঙালি ও মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে ফুটবল ম্যাচ” কথাটিতে স্পষ্টতই বিভাজন লক্ষনীয়, যেন মুসলমানরা বাঙালি নন। শুধু হিন্দু বাঙালিই বাঙালি এই চেতনাটি তাঁর সামন্ত চেতনারই বহিঃপ্রকাশ। হিন্দুরা বাঙালিত্বের একক দাবীদার এই উক্তিটি  তাঁর শ্রেনী চেতনার এক নগ্নপ্রকাশ বলেই আমি মনে করি।

আবার শরৎচন্দ্র চট্টোপধ্যায় হিন্দু সমাজের রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে তাঁর গল্প উপন্যাসে প্রতিবাদ করেছেন। তাঁর ‘গৃহদাহ’ ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসের কারনে তিনি হিন্দু প্রতিক্রিয়াশীলদের কাছে বিরাগভাজন হয়েছেন। 

১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে শরৎচন্দ্র চট্টোপধ্যায়কে ডি লিট ডিগ্রী প্রদান করে। এই সময় হিন্দু রক্ষণশীলরা শরৎচন্দ্রকে ডি লিট ডিগ্রী প্রদান করার সমালোচনা করে।

অনেক কালজয়ী উপন্যাসের জনক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপধ্যায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্থম বি এ পরীক্ষা দিয়েছিলেন ১৩ জন, পাশ করেন দুই জন। সেই ভাগ্যবান দুজন হলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপধ্যায় ও যদুনাথ বসু। তাঁরা উপমহাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম স্নাতক। উপন্যাসে জীবনের বহু দিক স্থান পায়। উপন্যাসে অনেক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত লক্ষ করা য়ায়। প্রগতিশীলতার বদলে লালন করা হয় রক্ষনশীলতাকে। বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণকান্তের উইল—এর বিধবা রূপসী নারী রোহিনী। রোহীনী বাল্যবিধবা। তৎকালীন সমাজ রোহানীর কামনা বাসনা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র যেন সেই সমাজেরই প্রতিভূ। বঙ্কিমচন্দ্র রোহীনীকে শাস্তি দেন; বন্দুকের গুলিতে মরতে  হয় রোহীনীকে। বঙ্কিমচন্দ্র রোহীনীকে মেরে হিন্দু সমাজের প্রথা রক্ষা করেন।

আধুনিক কালের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাসে পাই ভিন্নচিত্র। রবীন্দ্রনাথের চোখের বালীর বিনোদিনীও বিধবা কিন্তু তাকে শাস্তি দেন নি। তার কামনা বাসনাক সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবিতা, ছোট গল্প ও প্রবন্ধে এক বিস্ময়কর প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোরা উপন্যাসের গৌরমোহন বাবু যখন হিন্দু সমাজের রীতি, নীতি প্রথা ও রক্ষনশীলতাকে আকরে ধরতে চায়। সমাজের বাস্তবতার সাথে কোনোভাবেই আপোষ করতে চায় না। ব্রম্মধর্মের মেয়ের সাথে তার বন্ধু বিনয়ের বিয়ে হোক — তা সে কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারে না। এক সময় গোরা জানতে পারে সে আইরিশ, হিন্দুর ঘরে বেড়ে উঠা। সে নিজকে আবিষ্কার করলো নতুন রূপে। সে বললো, “আমি আজ ভারতবর্ষীয়। আমার মধ্যে হিন্দু মুসলমান খৃষ্টান কোনো সমাজের কোনো বিরোধ নেই, ভারত বর্ষের সকল জাতই আমার জাত”। তার আরেকটি উক্তি হলো, “আজ আমি এমন শূচী হয়ে উঠেছি যে চন্ডালের ঘরে আমার আর অপবিত্রতার ভয় রইলো না”। রবীন্দ্রনাথগোরাকে সৃস্টি করলেন এক নতুন মানুষ রূপে, সে আজ সবার, তার কাছে আর জাতের বলাই নেই। গোরা যেন রবীন্দ্রনাথের এক বিষ্ময়কর সৃষ্টি। 

সমাজ প্রতিনিয়তই বিকাশমান। বিকাশমান সমাজব্যবস্থায় সাহিত্য কর্মের বিকাশও লক্ষনীয়। এই বিকাশ ও উম্মীলন সময়ের ধারাবাহিকতায়ই ঘটে। তাই প্রাচীন ও আধুনিককালের সাহিত্য কর্মে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। লেখক ও ঔপন্যাসিকদের  মধ্যে সমাজের রীতি নীতির প্রভাব যেমন পড়ে, আবার ঐ লেখক ও ঔপন্যাসিকরাই  সমাজের উর্ধ্বে উঠে সমাজকে নির্মান করেন নতুন নিয়মে। কেউ যেমন প্রথাগত নীতিতে ভেসে যান, আবার কেউ পরিত্যাগ করেন প্রতাগত নীতি বোধ। এই ভাবেই সৃষ্টিশীল সাহিত্য মনণশীলতাকে সম্বৃদ্ধ করে। সাহিত্য হয়ে উঠে জীবনসম্ভারে ও শিল্পনিপুনতায় অসাধারণ।

মোঃ চন্দন মিয়া: প্রাক্তন প্রভাষক, কলামিষ্ট ও কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব।


মতামত এর আরও খবর

img

বিভক্তির রাজনীতি নয়, এখন সময় এসেছে বাংলাদেশকে নিয়ে একসঙ্গে ভাবার

প্রকাশিত :  ১৩:৩৪, ২২ মে ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের রাজনীতি বহু বছর ধরেই যেন এক দীর্ঘ মেরুকরণের গল্প। এখানে মতের চেয়ে পরিচয় বড় হয়ে উঠেছে, যুক্তির চেয়ে উচ্চকণ্ঠের স্লোগান বেশি শোনা গেছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্টেছে ভাষা, বদলেছে প্রতিশ্রুতি, কিন্তু সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা একই থেকেছে—একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ।

এই দেশের মানুষ রাজনীতির কাছে খুব জটিল কিছু চায় না। তারা চায় এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে একজন তরুণ তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পাবে, একজন কৃষক ন্যায্য মূল্য পাবে, একজন মা তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন। মানুষ এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি চায়, যেখানে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করাই মূল লক্ষ্য নয়; বরং ভিন্নমতকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার মানসিকতা থাকবে।

সময়ের সঙ্গে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে। এখন মানুষ কেবল বক্তৃতা শোনে না, তারা আচরণও দেখে। নেতার ভাষা, সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি—এসবও আজ রাজনৈতিক মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সেই জায়গা থেকেই সাম্প্রতিক সময়ে অনেক মানুষের ভেতরে নতুন এক প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে তারেক রহমানকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং একটি তুলনামূলকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ভাষার প্রত্যাশাও কাজ করছে।

মানুষ আসলে এমন নেতৃত্ব খোঁজে, যা বিভক্তির দেয়ালকে আরও উঁচু না করে বরং সেতুবন্ধন তৈরি করতে চায়। কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার রাজনীতি প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে না দেখে তাকে গণতান্ত্রিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখতে শেখে। জাতীয় অগ্রগতি কখনো কোনো এক দলের একার অর্জন নয়; এটি সমষ্টিগত সহযোগিতা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধের ফল।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই—আমরা এখনও অনেক সময় দেশকে নয়, দলকে আগে ভাবি। রাজনৈতিক আনুগত্য এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে নাগরিক পরিচয় আড়ালে পড়ে যায়। অথচ রাষ্ট্র কোনো দলের সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্র মানে কোটি মানুষের শ্রম, স্বপ্ন, সংগ্রাম ও ভবিষ্যতের সম্মিলিত নাম। তাই মতভেদ থাকবে, সমালোচনাও থাকবে; কিন্তু সেই সমালোচনা যদি ধ্বংসের বদলে সংশোধনের পথ দেখায়, তবেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়।

বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। বিশ্ব অর্থনীতি বদলাচ্ছে, প্রযুক্তি নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে, তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক সংঘাতের পুরোনো ধারা ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন। এখন প্রয়োজন এমন এক জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানবসম্পদ, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে সমান গুরুত্ব দেবে।

তরুণদের কর্মসংস্থান, শিক্ষার আধুনিকায়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি এবং সহনশীল সমাজব্যবস্থা—এসব অর্জনের জন্য জাতীয় ঐক্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। কারণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রের অংশ হতে পারে, কিন্তু স্থায়ী বিভাজন কখনো উন্নয়নের ভিত্তি হতে পারে না।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যে জাতি সংকীর্ণতার দেয়াল ভেঙে বৃহত্তর স্বার্থে এক হতে পেরেছে, তারাই টেকসই অগ্রগতির পথে এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষ—তাদের পরিশ্রম, অভিযোজনক্ষমতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা।

এখন সময় এসেছে সেই শক্তিকে বিভক্তির রাজনীতিতে ক্ষয় না করে উন্নয়নের শক্তিতে রূপান্তর করার। কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস তাদেরই মনে রাখে, যারা মানুষকে ভাঙার নয়, এক করার কথা বলেছে; যারা ক্ষমতার নয়, দেশের ভবিষ্যতের কথা ভেবেছে।

মতামত এর আরও খবর