img

ধর্মের লেবাসে প্রতারণা: নিরীহ মানুষের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী!

প্রকাশিত :  ০৬:১৩, ১৬ আগষ্ট ২০২৫

ধর্মের লেবাসে প্রতারণা: নিরীহ মানুষের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী!

বাংলাদেশের সমাজ ধর্মপ্রাণ। এখানে ধর্মীয় অনুশাসন ও বিশ্বাস মানুষের জীবনের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু সেই বিশ্বাসকেই পুঁজি করে প্রতারণার নতুন কৌশল গড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, এক শ্রেণির মানুষ বাহ্যিক ধর্মীয় লেবাস পরে নিরীহ ও সহজ-সরল মানুষদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এরা নিজেদের ‘আল্লাহভীরু’ হিসেবে উপস্থাপন করে, অথচ অন্তরালে পরিকল্পনা সাজায়—কীভাবে বিশ্বাসকে ব্যবহার করে ব্যবসা চালানো যায়।

গালভরা দাড়ি, মাথায় টুপি, হাতে তসবিহ—এসব দেখে সাধারণ মানুষ সহজেই ধরে নেন তিনি একজন ধার্মিক ও সৎ ব্যক্তি। ধর্মীয় আবহে মোড়ানো এই লেবাস আসলে প্রতারণার ঢাল হয়ে উঠছে। একজন ধর্মপ্রাণ মানুষকে যেমন দেখানো হয়, তেমনই সাজসজ্জা করে তারা নিরীহ মানুষকে আস্থার ফাঁদে ফেলছে।

অভিযোগ রয়েছে, এরা কুরআন ও হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে মিষ্টি কথার জাল বোনে। অনেকেই ছোট ছোট দরবার বা ওয়াজ মাহফিলে বসে মানুষের আবেগ নাড়িয়ে দেন। আল্লাহর ভয়, আখেরাতের হিসাব, দান-খয়রাতের সওয়াব—এসব বিষয়ে সুন্দর বক্তৃতা সাজিয়ে মানুষকে বিশ্বাস করানো হয়। এরপর কেউ মসজিদ নির্মাণের অনুদান, কেউ এতিমখানার জন্য সাহায্য, কেউবা ‘বিশেষ দোয়া’র বিনিময়ে টাকা দাবি করে।

ঢাকার মিরপুরে সম্প্রতি এক প্রতারক চক্র ধরা পড়েছে, যারা \"কুরআন শেখার দোয়া\" নামে ভুয়া তসবিহ ও তাবিজ বিক্রি করে কয়েক মাসে প্রায় ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। একইভাবে চট্টগ্রামে এক ভণ্ড পীর ধরা পড়েন, যিনি দোয়া-পথ্য দিয়ে রোগ সারানোর দাবি করে প্রায় ৫০০ পরিবারকে সর্বস্বান্ত করেন।

এই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন মূলত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ধর্মপ্রাণ মানুষ। তাঁরা ধর্মীয় আবেগে সহজেই বিশ্বাস করে ফেলেন এবং ভেবে নেন—\"এ কাজ করলে সওয়াব হবে।\" অনেক সময় দেখা যায়, মাসিক অল্প আয়ের পরিবারও শেষ সম্বল থেকে টাকা দিয়ে দেয়। পরে যখন সত্য প্রকাশ পায়, তখন লজ্জা ও অপমানে অনেকে বিষয়টি প্রকাশ করতে চান না। বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ধর্মের নামে প্রতারণার অভিযোগে ৭০০টিরও বেশি মামলা হয়েছে।

এ ধরনের প্রতারণা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই করছে না, বরং ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপরও আঘাত হানছে। মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে—কে প্রকৃত ধার্মিক আর কে ভণ্ড? একদিকে প্রতারণায় ক্ষতিগ্রস্তরা ধর্মের প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন, অন্যদিকে প্রকৃত আলেম-ওলামাদেরও প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে ব্যবসা করার কারণে ধর্মের পবিত্র ভাবমূর্তি কলুষিত হচ্ছে।

ধর্মীয় শিক্ষার আলোকে প্রতারণার নিন্দা

ইসলামে প্রতারণাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হাদিসে এসেছে—

“যে ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” (সহিহ মুসলিম)

অন্য এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,

“সৎ ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।” (তিরমিজি)

অতএব, ধর্মকে ব্যবসা বা প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার পরিপন্থী। অথচ এই ভণ্ডরা সেই শিক্ষাকেই বিকৃত করে মানুষের সর্বনাশ করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফারুক আহমেদ বলেন, “ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে প্রতারণা সমাজে আস্থার সংকট তৈরি করছে। মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে—কারা প্রকৃত ধার্মিক আর কারা নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।”

ধর্মীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, সমাজে প্রকৃত ইসলামি শিক্ষার প্রচার বাড়াতে হবে। ইসলাম কখনো বাহ্যিক লেবাস নয়, বরং আচার-আচরণ ও সততার মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

করণীয়

১. সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি: মানুষকে বুঝতে হবে, বাহ্যিক সাজসজ্জা দেখে কারও প্রতি অন্ধ আস্থা রাখা উচিত নয়।

২. আইনের কঠোর প্রয়োগ: ধর্মের নামে প্রতারণাকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৩. প্রকৃত আলেমদের ভূমিকা: ভণ্ডদের মুখোশ উন্মোচন করে মানুষকে সচেতন করতে হবে।

৪. গণমাধ্যমের দায়িত্ব: প্রতারণার কৌশল ও ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরে মানুষকে সাবধান করতে হবে।

ধর্ম মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে জড়িত। এর পবিত্রতা ও সততার ওপর সমাজের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে। কিন্তু যখন অসাধু ব্যক্তিরা ধর্মকে পুঁজি করে প্রতারণার ব্যবসা চালায়, তখন তা শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, সমাজে আস্থার সংকটও তৈরি করে। তাই এ ধরনের অপকর্ম রোধে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। না হলে ভণ্ডদের প্রতারণায় নিরীহ মানুষ প্রতারিত হতে থাকবে, আর ধর্মের পবিত্রতা কলঙ্কিত হবে।

img

যুদ্ধের ময়দানে উজ্জীবিত ইরানের পরমাণু স্বপ্ন: ইউরোশিয়া রিভিউ

প্রকাশিত :  ০৬:২২, ২২ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:২৭, ২২ অক্টোবর ২০২৬

একসময় ইরানের রাজনীতিতে পারমাণবিক বোমা তৈরির আলোচনা ছিল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও গোপনীয়। তবে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সঙ্গে টানা আট মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলেছে। এখন দেশটির নীতিনির্ধারক ও আইনপ্রণেতারা প্রকাশ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দাবি তুলছেন।

অথচ এই দেশেই একদিন সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির একটি ধর্মীয় ফতোয়া ছিল আইন, যেখানে গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি বা সংরক্ষণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে তেহরান বিশ্ববাসীকে এটাই বোঝানোর চেষ্টা করেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক কাজের জন্য। কিন্তু যুদ্ধের কালো মেঘ সেই পুরোনো ধারণাকে এক নিমিষে উড়িয়ে দিয়েছে।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের প্রথম দফার আকস্মিক আঘাতেই কেঁপে উঠেছিল ইরান। সেই হামলায় শুধু সামরিক বা পারমাণবিক স্থাপনাই ধ্বংস হয়নি, প্রাণ হারিয়েছেন খেসারত দেওয়া বহু সাধারণ নাগরিক এবং খামেনিসহ শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব। যদিও পরবর্তী সময়ে সরাসরি বড় ধরনের সামরিক তৎপরতা কমিয়ে এনে নৌ-অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপের পথ বেছে নিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের সাত দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে উল্টো নতুন হামলার হুমকি দিয়েছেন। ওয়াশিংটনের সাফ কথা, চুক্তি করতে হলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে।

আর ঠিক এ অনিশ্চিত ও চরম অস্তিত্বের সংকটের মাঝেই তেহরানের অন্দরে শুরু হয়েছে তীব্র দন্তনখ লড়াই। একপক্ষ বলছে, পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য ইরান এরই মধ্যে অনেক চড়া মূল্য চুকিয়ে ফেলেছে। পার্লামেন্ট সদস্য আহমাদ বাখশায়্যাশ আরদেস্তানি কিংবা মহসেন রেজাইয়ের মতো শীর্ষ নিরাপত্তা কর্তারা মনে করেন, এখন আর পিছু হটার সময় নেই; বরং শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে পরমাণু অস্ত্র অর্জনের পথেই হাঁটা উচিত।

রক্ষণশীল বিশ্লেষক দাউদ মোদাররেসিয়ানের ভাষায়, একটি পরমাণু বোমা অর্জন করা আজকের দিনে রুটি-রুজির চেয়েও বড় ও জরুরি প্রয়োজন, যা দেশের টিকে থাকার একমাত্র নিশ্চয়তা। তারা ট্রাম্পের সেই পুরোনো কথারই প্রতিধ্বনি করেন, যেখানে উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের উদাহরণ টেনে ট্রাম্প বলেছিলেন, কারও হাতে ১১টি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকলে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠেও রয়েছে শক্ত যুক্তি। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবের এই চিন্তার তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে আছে, তাদের পরমাণু বোমার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, একটি বোমা বড়জোর ৫০ থেকে ১ লাখ মানুষের প্রাণ নিতে পারে, কিন্তু হরমুজ প্রণালি আটকে দিলে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও কোটি কোটি মানুষের জীবন জিম্মি করা সম্ভব। সাংবাদিক সিনা জাহানি কিংবা বিশ্লেষক আমির আলী আবুলফাতদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর এ উন্মাদনা সরাসরি ইসরায়েলের ফাঁদে পা দেওয়ার শামিল। বোমা তৈরির কাজ শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকান বোমায় দেশের বাকি অবকাঠটুকুও ধূলিসাৎ হয়ে যাবে, এমন আত্মঘাতী পথ কোনো সুরক্ষাই দিতে পারে না।

কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, ইরান কি চাইলেও এখন বোমা বানাতে পারবে? যুদ্ধের আগুনে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মূল অবকাঠামো আজ প্রায় পঙ্গু। নাতানজ ও ফরদোর মতো প্রধান ভূগর্ভস্থ প্লান্টগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। তবে সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে আছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা প্রায় ৪৪০ দশমিক ১৯ কেজি ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, এক বছরের বেশি সময় ধরে এই বিশাল মজুতের সঠিক হদিস তাদের জানা নেই।

মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দাবি, গ্রানাইট পাথরের ৮০ থেকে ১০০ মিটার গভীরে অবস্থিত গোপন ও সুরক্ষিত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ সুড়ঙ্গে হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ ও এই ইউরেনিয়াম লুকিয়ে ফেলেছে তেহরান। আর এ কারণেই ট্রাম্প সম্প্রতি হুংকার ছেড়েছেন, আমাদের হয়তো সেখানেই গিয়ে অভিযান চালাতে হতে পারে!

তাত্ত্বিকভাবে, ওই গোপন মজুতের নাগাল পেলে সামান্য সেন্ট্রিফিউজ দিয়েই অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়াম বানিয়ে ফেলা সম্ভব। ইরান যদিও যুদ্ধ বন্ধের বিনিময়ে এই মজুত হালকা বা পাতলা করার প্রস্তাব দিয়েছে, তবুও ওয়াশিংটনের কড়া নজর এবং পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের হিমশীতল পাহাড়ের আড়ালে এখন ঝুলে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তথা গোটা বিশ্বের ভাগ্য।