img

ট্রাম্পের অনৈতিকতা এবং ইউরোপের মেরুদণ্ডহীনতা

প্রকাশিত :  ২০:২০, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৫:১৯, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

ড. জ্যাকি রেজওয়ানা আনোয়ার FRSA, MBBS, DTM&H, MS & PhD

ট্রাম্পের অনৈতিকতা এবং ইউরোপের মেরুদণ্ডহীনতা

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের ছাতার তলার পুঁজিবাদী ও ন‍্যাটোভুক্ত দেশগুলো নিয়ে পশ্চিমা ব্লক এবং বিপরীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের ছাতার তলার কমিউনিস্ট ও ওয়ারসোভুক্ত দেশগুলো নিয়ে পূর্ব ব্লকের মধ‍্যে শীতল যুদ্ধের কথা আমরা সবাই জানি। সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকাতে ১৯৫১ সালে ন‍্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা হিসেবে ‘গ্রীনল‍্যান্ড ডিফেন্স এ‍্যগ্রিমেন্ট’ হয় যেখানে গ্রীনল‍্যান্ড ডেনমার্কের স্বায়ত্বশসিত অংশ হলেও যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রীনল‍্যান্ডে ঘাঁটি নির্মাণ, মার্কিন সেনা মোতায়েন থেকে শুরু ক’রে বহু অধিকার দেওয়া হয়। এত সব অধিকার থাকার পরও গ্রীনল‍্যান্ড বিষয়ে ট্রাম্প যা চান তাকে সোজা বাংলায় বলা যায় ‘জোর দখল’।
এখন কথা হচ্ছে, ট্রাম্প তো চাইলে গ্রীনল্যান্ডকে দখল না ক’রে লীজ নিতে পারতেন। অন‍্য দেশের ভূখন্ডে লীজ নেওয়ার উদাহরণ তো বহু রয়েছে। বৃটিশরা যেমন লীজ নিয়েছিল হংকং যেটি ১৯৯৭ সালে চীনকে ফেরত দিয়েছে। তেমনি আবার যুক্তরাষ্ট্র কিউবার কাছ থেকে গুয়েন্তানমো বে লীজ নিয়েছিল বন্দীশালা স্থাপনের জন‍্যে। কিন্তু না, গ্রীনাল‍্যান্ডের ক্ষেত্রে লীজ নয়, ট্রাম্প চাইছেন সম্পূর্ণ দখল - এ যেন অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানাবার মতলব।
সময়ের সাথে সাথে গ্রীনল‍্যান্ড তথা আর্টিক অন্চল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে এই অন্চলে বরফ গলতে শুরু করেছে, ফলে সেখানে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্র বাড়বে বৈ কমবেনা। সেখানে প্রচুর তেল ও খনিজ সম্পদ রয়েছে। ট্রাম্প মিথ্যে দাবি করেছেন যে চীন ও রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ গ্রীনল্যান্ডের সব জায়গায় মোতায়েন রয়েছে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যে এটি দখল করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। যদিও নিরাপত্তার সব কাজ মালিকানা ছাড়াও করা সম্ভব তবু ট্রাম্প বলছেন তিনি গ্রীনল্যান্ডের মালিক হতে চান। ট্রাম্প আরো বলছেন তিনি গ্রীনল্যান্ডকে নিরাপদ করতে চান। কিন্তু সত্য হলো, তিনি সেখানকার খনিজ সম্পদ কবজা করতে চান এবং যুক্তরাষ্ট্রকে আয়তনে আরো বড় করতে চান।
যদিও ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের একটি মিত্র দেশ ও এবং গ্রীনল‍্যান্ডে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বিমানঘাঁটি রয়েছে তা সত্বেও তিনি ন‍্যাটোর চুক্তির প্রতি কোনো রকম তোয়াক্কা করছেননা। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, তিনি আন্তর্জাতিক আইনকানুন মানবেন না, তিনি যা করবেন তা তাঁর নিজস্ব নৈতিকতার উপর ভিত্তি করেই করবেন। যাকে জিন ক্যারলকে যৌন  নিপীড়নের জন্য দায়ী করা হয়েছে; যার বিরুদ্ধে শত শত ঠিকাদার মামলা করেছে পাওনা পরিশোধ না করার জন‍্যে; জেফরি এপস্টাইনের মত ব‍্যাক্তি যার প্রাক্তন বন্ধু; যিনি নারী সাংবাদিকদের চুপ করাতে চাইলে তাদের 'পিগি' (শুয়োরছানা) বলে ডাকেন; যিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে আনেন; যার অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি কোনো শ্রদ্ধা নেই - তাঁর নৈতিকতার উপর নির্ভর করব আমরা?
এদিকে আমরা দেখলাম, ভেনেজুয়েলা অভ্যুত্থানের কয়েক ঘণ্টা পরেই ট্রাম্পের নীতি নির্ধারণী প্রধান স্টিফেন মিলারের স্ত্রী কেটি মিলার একটি ছবি টুইট করেন। সেখানে দেখা যায় গ্রীনল্যান্ড মার্কিন পতাকার রঙে ঢাকা এবং তাতে ক্যাপশন ছিল - "শীঘ্রই আসছে"। ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের প্রকাশ্য অবৈধ অভ্যুত্থানের বিষয়ে ইউরোপীয় নেতারা সবাই বেশ নিশ্চুপ ছিলেন। তাঁরা কেবল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানিয়েছিলেন। যা ছিল স্পষ্টতই অবৈধ, তা নিয়ে তাঁরা টুঁ - শব্দটিও করতে পারেননি। এখন তো দেখা যাচ্ছে ইউরোপ নিজেই ট্রাম্পের পরবর্তী লক্ষ্য হতে যাচ্ছে।

"বৃটেন আসলে এখন একটি নামমাত্র সার্বভৌম দেশ। ফ্রান্স বা এমনকি দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায় বৃটেনের সার্বভৌমত্ব কম। আমরা আসলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি 'ভ্যাসাল স্টেট' (আজ্ঞাবহ রাষ্ট্র) হয়ে গেছি। আমাদের নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র নেই (যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল), আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অ্যামাজনের ক্লাউড সার্ভিস ব্যবহার করে, আমাদের পেমেন্ট সিস্টেম মার্কিন মালিকানাধীন। সেই সাথে কিয়ার স্টার্মার এমন একজন প্রধানমন্ত্রী যিনি এই ভঙ্গুর অবস্থারই প্রতিফলন। তাঁর নিজের কোনো মেরুদণ্ড বা নতুন কোনো ধারণা নেই।"
ব্রিটিশ সরকারের জন্যে বিষয়টি একটি বড় উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তারাও কোনো স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারছে না। ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী যেখানে সরাসরি প্রতিবাদ করছেন, সেখানে বৃটিশ সরকার বলছে তারা "রানিং কমেন্টারি" দেবে না। এটি বৃটিশ রাজনৈতিক শ্রেণির দেউলিয়াত্ব প্রকাশ করে। ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে অভিবাসন মন্ত্রী মাইক ট্যাপকে যখন স্কাই নিউজে প্রশ্ন করা হয় যে, ট্রাম্প যদি গ্রীনল্যান্ড দখল করেন তবে বৃটেন কি তার নিন্দা জানাবে? মাইক ট্যাপ সরাসরি কোনো উত্তর দিতে পারেননি। তিনি বারবার বলেছেন যে, "মিত্রদের সাথে আমাদের গোপন কূটনৈতিক আলোচনা চলছে" এবং "ন্যাটো আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা হবে”। সাংবাদিক যখন তাঁকে চেপে ধরেন যে তিনি অন্তত এটুকু বলতে পারেন কি না যে "ট্রাম্পের গ্রীনল্যান্ড দখল করা উচিত নয়", তখন তিনি প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে বলেন, "আমি কাল্পনিক বিষয় নিয়ে কোনো রানিং কমেন্টারি দেব না।"
প্রথমে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার ষ্টার্মার চুপ থাকলেও পরে বুঝতে পেরেছিলেন যে তাদের আগের অবস্থান (চুপ থাকা) টিকবে না। তাই স্টার্মার শেষ পর্যন্ত মুখ খুলেছেন। তিনি বলেছেন, "আমি ডেনিশ প্রধানমন্ত্রীর পাশে আছি এবং গ্রীনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি যা বলেছেন তা সঠিক।" তবে এটি কেবল একটি লোকদেখানো বিবৃতি বলে মনে হচ্ছে। যারা প্যালেস্টাইনে নিহত তিন ব্রিটিশ সেনার জন্যে দাঁড়াতে পারেনি, তারা গ্রীনল্যান্ডবাসীদের জন্যে কতটা দাঁড়াবে তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ থাকাটাই স্বাভাবিক।
বৃটেন আসলে এখন একটি নামমাত্র সার্বভৌম দেশ। ফ্রান্স বা এমনকি দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায় বৃটেনের সার্বভৌমত্ব কম। আমরা আসলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি 'ভ্যাসাল স্টেট' (আজ্ঞাবহ রাষ্ট্র) হয়ে গেছি। আমাদের নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র নেই (যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল), আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অ্যামাজনের ক্লাউড সার্ভিস ব্যবহার করে, আমাদের পেমেন্ট সিস্টেম মার্কিন মালিকানাধীন। সেই সাথে কিয়ার স্টার্মার এমন একজন প্রধানমন্ত্রী যিনি এই ভঙ্গুর অবস্থারই প্রতিফলন। তাঁর নিজের কোনো মেরুদণ্ড বা নতুন কোনো ধারণা নেই।
গ্রীনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা এবং ইউক্রেন এই তিনটি ক্ষেত্রেই ইউরোপীয় নেতাদের এবং একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) দুর্বলতা ও বিভাজনও আশঙ্কাজনকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এই ভয়াবহ ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, 'ব্রেক্সিট'কে এখন আর কেবল একটি বোকামি বলে মনে হয় না। এটিকে এখন প্রায় আত্মঘাতী বলে মনে হয়। বাস্তব অর্থেই ইউরোপ এখন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া - এই তিনটি বড় শিকারী শক্তির মাঝখানে পড়ে গেছে।
ইউরোপের এখন কী করা উচিত? ইউরোপের প্রথম কাজ হওয়া উচিত একটি শক্তিশালী ডিজিটাল প্রাচীর (Firewall) তৈরি করা। চীন যা করেছে নিজেদের ড‍্যাটা এবং টেক কোম্পানিগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে। ইউরোপ যদি গুগল, মেটা বা অ্যামাজনের ওপর নির্ভরশীল না হতো, তবে আজ ইউরোপে ৫০০০ বিলিয়ন ডলারের অন্তত আধা ডজন কোম্পানি থাকত।
গত ৪০ বছর ধরে ইউরোপীয় নেতারা তাঁদের নিজস্ব শিল্প গড়ে তোলার পরিবর্তে নিওলিবারেলিজম বা বাজার অর্থনীতির ওপর অন্ধ বিশ্বাস রেখেছেন। তাঁরা ভেবেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র তাদের আজীবন রক্ষা করবে। কিন্তু হুয়াওয়ের সিইও যেমন বলেছিলেন, একটি দেশের যদি নিজস্ব ড‍্যাটা সুইচ না থাকে, তবে তার সেনাবাহিনী না থাকার মতোই অবস্থা। ইউরোপ আজ প্রযুক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দাসে পরিণত হয়েছে।
আমরা প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। আপনি যখন অ্যাপল পে বা ভিসা কার্ডে টাকা দিচ্ছেন, মেটা-র প্রোডাক্ট ব্যবহার করছেন বা আপনার ফ্ল্যাট যখন ব্ল্যাকস্টোনের মতো কোনো মার্কিন কোম্পানি কিনছে - তার মানে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো আমাদের হাতে নেই। এই পরনির্ভরশীলতা থেকে বের হতে না পারলে আমরা কোনোদিনই প্রকৃত স্বাধীন হতে পারব না। বর্তমান যুগে প্রকৃত স্বাধীনতার অর্থ নিজেদের ড‍্যাটার উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ থাকা। বৃটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের এ ব‍্যাপারে বড় ধরনের কোনো উদ‍্যোগ দৃশ‍্যমান না। ট্রাম্প যদি শেষ পর্যন্ত গ্রীনল্যান্ড দখল করেই নেন তখন হয়তো ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বৃটেনের ঘুম ভাঙবে।

লেখক ড. জ্যাকি রেজওয়ানা আনোয়ার FRSA, MBBS, DTM&H, MS  & PhD একজন চিকিৎসক, জনপ্রিয় সিনিয়র সংবাদ পাঠক, কলামিস্ট ও আন্তর্জাতিক স্পীকার।

img

উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ভঙ্গুর অর্থনীতি ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিত :  ১০:৩১, ০২ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১০:৩৭, ০২ মে ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

ঢাকা, ২ মে ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের অবসান ঘটিয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় বসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনীতি এবং উত্তাল বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সংকট নতুন এই প্রশাসনের সামনে এক পর্বতসম চ্যালেঞ্জ দাঁড় করিয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা এবং আগামীকালের পুঁজিবাজারের গতিপথ নিয়ে একটি নিবিড় বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।

সামষ্টিক অর্থনীতি: ভঙ্গুর উত্তরণের রূপরেখা

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে এক অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাত্র ৩.৯৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ধাক্কা কাটিয়ে সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে এই যাত্রার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের স্থবিরতা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রবৃদ্ধি ৪.৭ শতাংশ প্রাক্কলন করলেও বিশ্বব্যাংক কিছুটা রক্ষণশীল অবস্থান নিয়ে ৩.৯ শতাংশের পূর্বাভাস দিয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির মাত্র ২২.৪৮ শতাংশে নেমে আসা এবং ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট এই বিনিয়োগ মন্দাকে আরও ঘনীভূত করেছে।

সাধারণ মানুষের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো জীবনযাত্রার অসহনীয় ব্যয়। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.৭১ শতাংশে দাঁড়ালেও এটি সাধারণ ভোক্তাদের জন্য খুব বেশি স্বস্তি বয়ে আনে নি। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.২৪ শতাংশে নামলেও অ-খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.০৯ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে, যা পরিবহন, গৃহায়ণ ও পরিষেবা খাতের উচ্চমূল্যকে নির্দেশ করে। আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। যেখানে ভারত (২.৭%) ও শ্রীলঙ্কা (০.৬%) তাদের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো ৯ শতাংশের কাছাকাছি সীমায় আটকে আছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছে, কারণ মজুরি বৃদ্ধির হার (৮.০৯%) এখনো জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে।

তবে সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম স্বস্তির জায়গা হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রিজার্ভ ৩৫.১১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয় এবং মার্চ মাসে তা ৩৪.১২ বিলিয়ন ডলারে স্থিতিশীল রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ মার্চ মাসে ৩.৭৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোয় বহিঃখাতের ওপর চাপ কিছুটা কমেছে। মুদ্রার বিনিময় হার প্রতি ডলারে ১২২.৬২ টাকার আশপাশে স্থিতিশীল রয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের 'ক্রলিং পেগ' পদ্ধতির সুফল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে যখন দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো এক বিশাল সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের পূর্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে সংস্কারের সূচনা করেছিল, তা এগিয়ে নেওয়া ও জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই এই সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার সময় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা এবং গুমসংক্রান্ত অপরাধের সংজ্ঞাসংবলিত ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ তামাদি বা বাতিল হয়ে যাওয়া নিয়ে দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকার একে আইনি অসংগতি দূর করার প্রক্রিয়া বললেও প্রধান বিরোধী দলগুলো একে গণতান্ত্রিক সংস্কারের পরিপন্থী হিসেবে অভিহিত করেছে।

রাজনৈতিক মেরুকরণের পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং খাতের ক্ষত এখনো অত্যন্ত গভীর। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬.৪ ট্রিলিয়ন টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৫.৭৩ শতাংশ। খেলাপি ঋণ আদায় ও ব্যাংকিং সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ানো সম্ভব হবে না, যা সরাসরি জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে।

১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচি ও সাফল্য

ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এই কর্মসূচির আওতায় ইতিমধ্যে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রায় ৩৭ হাজার ৮১৪টি নিম্ন আয়ের পরিবারকে মাসিকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। কৃষকদের জন্য 'ফার্মার কার্ড' এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফের উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া শিক্ষাখাতে 'ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব' এবং ৮ হাজার ২৩২টি মাদ্রাসায় ফ্রি ওয়াই-ফাই নিশ্চিত করার কাজ চলমান রয়েছে। তবে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে থাকায় (মার্চে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬২.৯ শতাংশ অর্জিত) এই বিপুল ব্যয়ের সংস্থান করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক চাপের কালো মেঘ

২০২৬ সালের বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দেশে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই সংকটের কারণে শিল্পকারখানাগুলোতে প্রতিদিন ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে, যা তৈরি পোশাক রপ্তানিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। সরকার জ্বালানি ভর্তুকি বাবদ মার্চ মাসে এক মাসেই ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যা বাজেটে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

আগামী ২৪ নভেম্বর ২০২৬-এ বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণ করবে। এই উত্তরণের পর বাংলাদেশ বর্তমানে প্রাপ্ত প্রায় ৭০ শতাংশ রপ্তানি সুবিধা হারাবে। নতুন সরকারকে অতি দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে জিএসপি+ বা সমজাতীয় চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে; অন্যথায় টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাত প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাবে।

আগামীকাল রোববার (৩ মে ২০২৬) পুঁজিবাজারের পূর্বাভাস

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘকাল ধরেই বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটে ভুগছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা চার বছর বাজার নিম্নমুখী ছিল। আগামীকাল ৩ মে ২০২৬, সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন শুরু হবে। গত ৩০ এপ্রিল ডিএসই ব্রড ইনডেক্স ৫,২৮৬.৮৮ পয়েন্টে অবস্থান করছিল।

আগামীকালের বাজার মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। প্রথমত, গত সপ্তাহের শেষ দিকে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মুনাফা সংগ্রহের (প্রফিট বুকিং) যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা আগামীকালও অব্যাহত থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার ১০ শতাংশের উপরে থাকায় বড় বিনিয়োগকারীরা ইক্যুইটি বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। তৃতীয়ত, জ্বালানি সংকটের খবর এবং লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা উৎপাদনমুখী বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

সেক্টরভিত্তিক সম্ভাবনা ও পূর্বাভাস:

ব্যাংকিং খাতে যমুনা ব্যাংক বা ব্র্যাক ব্যাংকের ভালো লভ্যাংশ ঘোষণার কারণে এই খাতটি স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, জ্বালানি সংকটের কারণে সিমেন্ট ও টেক্সটাইল খাতের শেয়ারগুলো চাপে থাকতে পারে। আগামীকালের সেশনে বাজার ৯৫ শতাংশ সম্ভাবনা সতর্কাবস্থায় (কশাস মোড) থাকবে। দিনের শেষে সূচক ২০ থেকে ৩০ পয়েন্টের সংশোধনী (কারেকশন) দেখতে পারে এবং লেনদেনের পরিমাণ ৭০০ থেকে ৮৫০ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ডিএসই সূচকটি চলতি প্রান্তিকের শেষে ৭,২৩৪ পয়েন্টের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগোলেও স্বল্পমেয়াদী অস্থিরতা কাটতে সময় লাগবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য পরামর্শ হলো, পেনাল্টি শেয়ার এড়িয়ে শক্তিশালী মৌলভিত্তিসম্পন্ন ডিভিডেন্ড-পেওয়ারি শেয়ারে নজর দেওয়া।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এক ক্রান্তিকাল পার করছে। নতুন সরকারের সংস্কার পদক্ষেপ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে আসার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর টেকসই উন্নয়ন।

মতামত এর আরও খবর