img

কথা রেখেছেন সেনাপ্রধান: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব ও এক নীতিবান অফিসারের উপাখ্যান

প্রকাশিত :  ১৯:৪০, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৭:০৩, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

কথা রেখেছেন সেনাপ্রধান: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব ও এক নীতিবান অফিসারের উপাখ্যান

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

সংকট থেকে উত্তরণ: এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে সেনাবাহিনীর ভূমিকা

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল একটি সাধারণ নির্বাচনের দিন ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির গভীর ক্ষত থেকে উত্তরণের এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সেনাবাহিনী ও তার নেতৃত্বের ওপর জনগণের আস্থার চূড়ান্ত পরীক্ষা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভূখণ্ডে বিগত দেড় দশকের অস্থিরতা এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামল শেষে এই নির্বাচনটি ছিল এক কাঙ্ক্ষিত মাইলফলক। এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি তাঁর প্রতিটি প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন এবং পেশাদারিত্ব, সততা ও নিরপেক্ষতার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন—সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।

“আমি কথা দিচ্ছি, সেনাবাহিনী সঠিক সময়ে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে”—তাঁর এই বলিষ্ঠ প্রতিশ্রুতি আজ বাস্তবায়িত হয়েছে। এটি বাংলাদেশের সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান নিজেকে কেবল একজন দক্ষ সেনাপতি হিসেবেই নয়, বরং একজন নীতিবান ও আদর্শিক অফিসার হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যা দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণকে সুগম করেছে।

১. ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ ও স্থিতিশীলতার পথে যাত্রা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সাক্ষী হয়। দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে এক ব্যাপক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। সেই সংকটময় মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়, তখন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, সেনাবাহিনী নিজ জনগণের ওপর গুলি চালাবে না। এই একটি ঘোষণা কেবল হাজার হাজার প্রাণ বাঁচায়নি, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তরের পথকেও সুগম করেছিল।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়েছে। সেই সময়েই সেনাপ্রধান ঘোষণা করেছিলেন যে, নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে না দেওয়া পর্যন্ত সেনাবাহিনী মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাবে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই সুদূরপ্রসারী প্রতিশ্রুতিরই বাস্তব প্রতিফলন।

২. নীতিবান নেতৃত্বের অনন্য উদাহরণ

একটি দেশের সেনাবাহিনী প্রধান যখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকেন, তখন তা সেই বাহিনীর পেশাদারিত্বের শ্রেষ্ঠ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান শুরু থেকেই নিজেকে একজন নীতিবান অফিসার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে যে, সেনাবাহিনী কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না। ‘অফিসার্স অ্যাড্রেস’ থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি তাঁর সদস্যদের পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে এবং জনগণের প্রতি মানবিক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

সেনাপ্রধানের চরিত্রের আরেকটি বলিষ্ঠ দিক ছিল অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, সেনাবাহিনীর কোনো সদস্যের যদি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকে বা কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে চলা বিভিন্ন অপপ্রচারের বিপরীতে তিনি ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, যারা এসব করছে তারা “আমাদের সন্তানের মতো”। এই ধরনের সহনশীলতা ও পিতৃসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

৩. ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন: সেনাবাহিনীর সার্বিক সহযোগিতা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা ছিল নির্বাচন কমিশনের জন্য এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। এই নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য এবং প্রথমবারের মতো সংসদীয় ভোটের সঙ্গে সংবিধান সংস্কারের ওপর একটি জাতীয় গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই জটিল প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সেনাপ্রধানের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় এক নিবিড় নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হয়েছিল।

এবারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ সেনাসদস্য ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় সারা দেশে ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। নির্বাচনের আগে থেকেই সেনাপ্রধান দেশের বিভিন্ন সেনানিবাস সফর করে প্রস্তুতি তদারকি করেন। বিশেষ করে ময়মনসিংহ ও ঢাকার বিভিন্ন সেনাক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে তিনি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন—নাগরিকবান্ধব আচরণ বজায় রেখে যেন একটি শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা হয়।

রাজধানীর ভোটকেন্দ্রগুলোতে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটারদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। বিশেষ করে তরুণ ও নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। সেনাপ্রধানের কড়া নির্দেশ ছিল, কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে যেন তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেনাবাহিনীর টহল দলগুলো (পেট্রোলিং ফোর্স) যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে মাত্র পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে, যা ভোটারদের মনে স্বস্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।

৪. জনআস্থা ও সাফল্যের প্রতিফলন

জাতীয় জনমত জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মানুষের কাছে সেনাবাহিনীর গ্রহণযোগ্যতা বর্তমানে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। জুলাই অভ্যুত্থানে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে দেশের অধিকাংশ মানুষ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। জরিপে আরও উঠে এসেছে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সেনাপ্রধানের নির্দেশনায় পূর্ণ আস্থা রাখেন। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, সেনাবাহিনী তার নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে, কারণ সেনাপ্রধান নিজে একজন নীতিবান অফিসার হিসেবে বাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ড’ সুসংহত রেখেছেন।

নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনী এখন ধীরে ধীরে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেনাপ্রধানের ঘোষণা অনুযায়ী, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে সেনাবাহিনীর ওপর অর্পিত অতিরিক্ত এই দায়িত্ব পালন শেষ হবে এবং তারা পুনরায় পেশাদার প্রশিক্ষণ ও দেশের প্রতিরক্ষায় পূর্ণ মনোনিবেশ করবে।

৫. এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা

জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান কেবল একটি বাহিনীর প্রধান হিসেবে নয়, বরং একজন সংকট উত্তরণকারী নেতা হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, যখন একটি প্রতিষ্ঠান জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখে, তখন তা জাতির ত্রাণকর্তা হতে পারে। সঠিক সময়ে একটি স্বচ্ছ নির্বাচন উপহার দেওয়ার মাধ্যমে তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন।

তাঁর এই নীতিবান নেতৃত্ব ও সার্বিক সহযোগিতা কেবল বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামরিক কর্মকর্তাদের জন্যও এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; বরং এটি ছিল বন্দুকের নলের পরিবর্তে জনগণের রায়কে প্রতিষ্ঠিত করার এক সাহসী সংগ্রাম, যার সফল প্রহরী ছিলেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।

img

নিঃশব্দে নীরব হয়ে যাওয়া এক জীবনের আলো—শিপ্রা পালের স্মৃতিতে শ্রদ্ধার ফুল

প্রকাশিত :  ০৯:৩৩, ২৭ এপ্রিল ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: কিশোরগঞ্জ শহরের বত্রিশ আবাসিক এলাকার লিংক রোডের বাসিন্দা শিপ্রা পাল (৭২) ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি নিজের উপস্থিতি দিয়ে চারপাশে রেখে গেছেন শান্তি, আস্থা আর স্নেহের উষ্ণতা। ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল সকাল আনুমানিক ৭টা ৫০ মিনিটে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বিদায়ে নিভে গেছে একটি নীরব কিন্তু গভীর আলোর প্রদীপ।

পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ মা ও সহধর্মিণী। স্বামী, এক পুত্র, দুই কন্যা—সবাইকে ঘিরে তার জীবন ছিল দায়িত্ব, ভালোবাসা আর ত্যাগের এক অবিরাম অধ্যায়। দীর্ঘ জীবনের পথে তিনি সন্তানদের মানুষ করে গড়ে তুলেছেন দৃঢ় মনোবল ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে।

শুধু পরিবার নয়, কর্মজীবনেও তিনি রেখে গেছেন সুনামের ছাপ। দীর্ঘদিন কিশোরগঞ্জ জেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে সততা ও নিষ্ঠার জন্য সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন আস্থার প্রতীক। কাজের বাইরে সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে করে তুলেছিল এলাকাবাসীর কাছে শ্রদ্ধার পাত্র।

প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি লিভার সিরোসিসে ভুগছিলেন। শারীরিক কষ্টের মধ্যেও তিনি হার মানেননি। উন্নত চিকিৎসার আশায় ভারতের চেন্নাইয়ে গিয়েও লড়াই চালিয়ে গেছেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। কিন্তু নিয়তির কাছে শেষ পর্যন্ত থেমে যায় সেই দৃঢ় জীবনযুদ্ধ।

স্থানীয়দের কাছে শিপ্রা পাল ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি সহজ-সরল আচরণ, আন্তরিকতা ও সদা হাস্যোজ্জ্বল স্বভাব দিয়ে সবার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। প্রতিবেশীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল পারিবারিক বন্ধনের মতোই ঘনিষ্ঠ। তাই তাঁর মৃত্যুতে শুধু পরিবার নয়, পুরো এলাকা যেন হারিয়েছে এক আপনজনকে।

জীবনের পরতে পরতে তিনি রেখে গেছেন দায়িত্ববোধ, নীরব শক্তি আর মানবিকতার দৃষ্টান্ত। শিপ্রা পালের স্মৃতি তাই থেকে যাবে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার এক নীরব ইতিহাস হয়ে।


মতামত এর আরও খবর