img

এপস্টিন কেলেঙ্কারিতে সাবেক ব্রিটিশ মন্ত্রী পিটার ম্যান্ডেলসন গ্রেপ্তার

প্রকাশিত :  ০৮:৫১, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

এপস্টিন কেলেঙ্কারিতে সাবেক ব্রিটিশ মন্ত্রী পিটার ম্যান্ডেলসন গ্রেপ্তার

ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কূটনীতি জগতে নতুন এক কেলেঙ্কারি আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। প্রাক্তন যুক্তরাজ্য রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসনকে লন্ডন পুলিশ গ্রেফতার করেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সরকারি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় দুর্নীতি ও অন্যায় কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। গ্রেফতারি অভিযান ঘটেছে জেফরি এপস্টেইনের সাথে তার সম্পর্কের তথ্য প্রকাশের পর।

কয়েক দশক ধরে যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই রাজনীতিককে সোমবার লন্ডনের নিজ বাড়ি থেকে নিয়ে যায় কর্তৃপক্ষ।

মেট্রোপলিটন পুলিশ সরাসরি ম্যান্ডেলসনের নাম প্রকাশ না করার নীতি মেনে জানিয়েছে, লন্ডনের একটি পুলিশ স্টেশন থেকে ৭২ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে \'সরকারি দপ্তরে অসদাচরণের সন্দেহে\' গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের \'দ্য টাইমস\' পত্রিকার প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, খাকি প্যান্ট, ধূসর সোয়েটার এবং গাঢ় রঙের জ্যাকেট পরা ম্যান্ডেলসনকে সাদা পোশাকের এক পুলিশ কর্মকর্তা গাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছেন।

ম্যান্ডেলসন (৭২) এখনো ব্রিটিশ রাজকীয় উপাধি \'লর্ড\' ধারণ করেন। গত মাসে মার্কিন বিচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত একগুচ্ছ ইমেইলে প্রয়াত জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার নতুন তথ্য সামনে আসার পর থেকেই তিনি বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন।

ওই ইমেইলগুলোতে দেখা গেছে, এপস্টিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক জনসমক্ষে যা জানা ছিল তার চেয়েও অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ। এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের সরকারের মন্ত্রী থাকাকালীন ম্যান্ডেলসন এপস্টিনের সঙ্গে বিভিন্ন তথ্য শেয়ার করেছিলেন।

চলতি মাসের শুরুর দিকে ম্যান্ডেলসন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেন এবং পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ থেকে সরে দাঁড়ান। এর আগে এপস্টিন সংশ্লিষ্টতার জেরে গত বছর তাকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তিনি আগে বলেছিলেন যে, যৌন পাচারকারী এপস্টিনের সঙ্গে অতীতের সম্পর্কের জন্য তিনি \'গভীরভাবে\' অনুতপ্ত।

ম্যান্ডেলসনের এই গ্রেপ্তার ব্রিটেনের রাজপরিবারের সদস্য অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর (প্রিন্স অ্যান্ড্রু) গ্রেপ্তারের এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ঘটল। অ্যান্ড্রুকেও এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্কের জেরে একই ধরনের তদন্তে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল।

ব্রিটিশ সরকার এখন সাবেক এই প্রিন্সকে রাজপরিবারের উত্তরাধিকার থেকে বাদ দেওয়ার জন্য আইন প্রণয়নের কথা ভাবছে। যদিও অ্যান্ড্রু তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এপস্টিন কেলেঙ্কারির এই রেশ এখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে, যার পদত্যাগেরও দাবি উঠেছে কিছু মহল থেকে। আল জাজিরার প্রতিবেদক জোনাহ হাল বলেন, \'এটি স্টারমারের বর্তমান অবস্থানে আরও রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি ও নাটকীয়তা যোগ করবে। মনে হচ্ছে, এপস্টিন কেলেঙ্কারির প্রভাব আটলান্টিকের অপর পারের (যুক্তরাষ্ট্র) চেয়ে এখানে (যুক্তরাজ্য) বেশি তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে।\'

ইংলিশ চ্যানেলে নৌকা ডুবে শিশুসহ নিহত ৫ | JANOMOT | জনমত

img

স্টারমারকে ঘিরে বাড়ছে জল্পনা, ব্রিটেন কি ফের রাজনৈতিক পালাবদলের দ্বারপ্রান্তে?

প্রকাশিত :  ১৭:৩৮, ২৪ জুন ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত
এক সময় বিশ্বের কাছে সংসদীয় গণতন্ত্রের আদর্শ ছিল ব্রিটেন। ওয়েস্টমিনস্টারের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দীর্ঘমেয়াদি নীতি এবং স্থিতিশীল নেতৃত্বকে অনুসরণ করেছে অসংখ্য দেশ। কিন্তু গত এক দশকের ব্রিটেন যেন সেই পরিচিত ছবির সম্পূর্ণ বিপরীত এক বাস্তবতার মুখোমুখি।

প্রধানমন্ত্রী বদল এখন আর বিরল ঘটনা নয়, বরং প্রায় নিয়মিত রাজনৈতিক অধ্যায়। ডেভিড ক্যামেরন থেকে থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক হয়ে আজ কিয়ার স্টারমার—নেতৃত্বের এই দ্রুত পালাবদল ব্রিটিশ রাজনীতির গভীরে জমে থাকা অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে আবারও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব কি চাপের মুখে? লেবার পার্টি-র অন্দরমহলে কি নতুন নেতৃত্বের আলোচনা শুরু হয়েছে? যদিও দলীয় নেতৃত্ব এ ধরনের জল্পনাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ, তবুও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, অর্থনৈতিক বাস্তবতা যদি দ্রুত না বদলায়, তাহলে স্টারমারের জন্য পথ সহজ হবে না।

আসলে ব্রিটেনের বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনীতি। ব্রেক্সিটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, কোভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের ধাক্কা, ইউক্রেন যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকট এবং দীর্ঘ সময়ের উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনে বড় চাপ তৈরি করেছে। বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল, খাদ্যদ্রব্যের দাম থেকে শুরু করে দৈনন্দিন যাতায়াতের খরচ—সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে। ফলে ‘জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট’ এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক সংকটেও পরিণত হয়েছে।

অর্থনীতির পাশাপাশি অভিবাসন প্রশ্নও ব্রিটিশ রাজনীতির অন্যতম বিস্ফোরক ইস্যু হয়ে উঠেছে। ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশ, আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মেরুকরণও তীব্র হচ্ছে।

এই আবহেই নতুন করে আলোচনায় উঠে আসছে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের প্রভাবশালী নেতা অ্যান্ডি বার্নহামের নাম। যদিও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নেতৃত্বের দৌড়ে নেই, তবুও লেবার পার্টি-র ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনায় তাঁর উপস্থিতি ক্রমশ দৃশ্যমান। স্বাস্থ্যসেবা, আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে তাঁর অবস্থান তাঁকে দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুখে পরিণত করেছে।

অন্যদিকে, ব্রিটিশ রাজনীতির প্রচলিত সমীকরণকে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন নাইজেল ফারাজ। তাঁর নেতৃত্বে রিফর্ম ইউকে অভিবাসন, জাতীয় পরিচয় এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের প্রতি অসন্তোষকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। এক সময় যে ক্ষোভ মূলত কনজারভেটিভ পার্টি-র ভোটব্যাঙ্কে সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ছে।

ফলে আজ লেবার পার্টি এবং কনজারভেটিভ পার্টি—দুই প্রধান দলই এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। ভোটারদের একটি অংশ গ্রীন পার্টি, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস কিংবা রিফর্ম ইউকে-এর মতো বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকছে। ঐতিহ্যগত দুই-দলীয় রাজনীতির ভিত্তি আগের তুলনায় অনেকটাই নড়বড়ে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

তবে এই মুহূর্তে একটি বিষয় স্পষ্ট—ব্রিটেনের সংকট কেবল কোনও এক নেতা বা এক দলের সংকট নয়। এটি অর্থনৈতিক স্থবিরতা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অভিবাসন বিতর্ক, রাজনৈতিক বিভাজন এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার প্রতি ক্রমবর্ধমান অনাস্থার সম্মিলিত ফল।

সেই কারণেই কিয়ার স্টারমারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ককে শুধু ব্যক্তিগত নেতৃত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে একটি বড় সত্য—ব্রিটেন আজ নতুন রাজনৈতিক পরিচয় খুঁজছে। আর সেই সন্ধানের পথ কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তার উত্তর এখনও ওয়েস্টমিনস্টারের করিডরেও স্পষ্ট নয়।


যুক্তরাজ্য এর আরও খবর