নরসুন্দার তীরে শতবর্ষের মিষ্টি স্মৃতি - লক্ষ্মী নারায়ণ মিষ্টান্ন ভান্ডারের অমলিন ঐতিহ্য
সংগ্রাম দত্ত: বাংলাদেশে কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের একরামপুর এলাকায় মৃতপ্রায় নরসুন্দা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট এক মিষ্টির দোকান—দেখতে সাদামাটা, কিন্তু ইতিহাসে ভরপুর। ‘লক্ষ্মী নারায়ণ মিষ্টান্ন ভান্ডার’ নামের এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি দোকান নয়, বরং এক শতাব্দীর স্বাদ, স্মৃতি আর ঐতিহ্যের ধারক।
১৯১৬ সালে ব্রিটিশ ভারতের সময় যাত্রা শুরু হয় এই দোকানের। প্রতিষ্ঠাতা আনন্দ চন্দ্র বসাকের হাত ধরে শুরু হওয়া এই পথচলা আজও অব্যাহত রয়েছে তাঁর বংশধরদের হাতেই। বর্তমানে দোকানটি পরিচালনা করছেন অলক বসাক ও তাঁর বড় ভাই মানিক চন্দ্র বসাক। তিন প্রজন্ম ধরে একই স্বাদ আর সুনাম ধরে রাখার এই গল্প কিশোরগঞ্জবাসীর কাছে এক গর্বের বিষয়।
দোকানটিতে ঢুকলে চোখে পড়ে পরিচিত সব মিষ্টির সারি—রসগোল্লা, চমচম, কালোজাম, জিলাপি, সন্দেশ, কাঁচাগোল্লা। পুরোনো দিনের লম্বা কাঁচের আলমারিতে সাজানো মিষ্টিগুলো যেন সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একপাশে কয়েকটি টেবিল, আর নিরিবিলি আড্ডার জন্য ছোট দুটি কেবিন—এখানেই জমে ওঠে শহরের নানান গল্প।
অলক বসাক জানান, একসময় নরসুন্দা নদী ছিল খরস্রোতা, আর দোকানে জ্বলত তেলের বাতি। তখনকার দিনে রসগোল্লা, কাঁচাগোল্লা, রসমঞ্জুরী আর বাদশাভোগ ছিল প্রধান আকর্ষণ। বড় আকারের বাদশাভোগের একটি মিষ্টির দাম ছিল মাত্র আট আনা। ব্রিটিশ আমলে কিশোরগঞ্জের সুগারমিল ও পাটকলের বিদেশি কর্মকর্তারাও করাচি ফেরার সময় এই দোকানের মিষ্টি নিতে ভুলতেন না।
সময় বদলেছে, বদলেছে দাম আর পরিবেশ, কিন্তু স্বাদে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বর্তমানে রসগোল্লা থেকে শুরু করে রসমঞ্জুরী, মালাইকারী, দই, সন্দেশ—সবই পাওয়া যায় এখানে সাশ্রয়ী দামে। প্রতিদিন প্রায় আড়াই থেকে তিন মণ মিষ্টি তৈরি হয়, আর ঈদের সময় সেই পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।
শুধু মিষ্টি নয়, সকালের নাস্তার জন্যও এই দোকান সমান জনপ্রিয়। ভোরের হাঁটা শেষে অনেকেই এখানে বসেন পরোটা-ভাজি আর চায়ের আড্ডায়। ষাটোর্ধ্ব শাহজাহান সাহেব বলেন, “ছোটবেলা থেকে এই দোকানের সঙ্গে সম্পর্ক। এখনও মেয়ের জন্য এলাচ দেওয়া রসগোল্লা নিয়ে যাই, আর গিন্নির জন্য কাঁচাগোল্লা।”
ক্রেতাদের কাছে এই দোকানের প্রতি টান শুধু স্বাদের জন্য নয়, বরং স্মৃতির জন্যও। রোকেয়া সুলতানা জানান, পরিবারের যেকোনো অনুষ্ঠানের জন্য মিষ্টি কিনতে হলে তাদের প্রথম পছন্দ এই লক্ষ্মী নারায়ণই।
এমনকি দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদও ছাত্রজীবনে নিয়মিত এখানে আসতেন বলে জানান দোকান মালিকরা।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এই প্রতিষ্ঠান প্রমাণ করে—স্বাদ যদি সত্যিকারের হয়, তবে সময় তাকে মুছে দিতে পারে না। অলক বসাকের স্বপ্ন, এই ঐতিহ্য যেন আরও শত বছর ধরে একইভাবে বেঁচে থাকে, নতুন প্রজন্মের হাত ধরে।
কিশোরগঞ্জের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা লক্ষ্মী নারায়ণ মিষ্টান্ন ভান্ডার তাই শুধু একটি দোকান নয়—এটি এক জীবন্ত ঐতিহ্যের নাম।



















