img

আইনশৃঙ্খলার ভাঙন ও বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়া

প্রকাশিত :  ২০:০৫, ১২ মে ২০২৬

আইনশৃঙ্খলার ভাঙন ও বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়া

মু. সায়েম আহমাদ 

একটা দেশ তখনই সুখী দেশ বলা যায়। যেখানে দেশের মানুষ স্বাচ্ছন্দে চলাফেরা করতে পারে, নিজের জীবন পরিচালনায় স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আজ চরম উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিদিনের খবরের কাগজ খুললেই চোখে পড়ছে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, গণপিটুনি, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতার হৃদয়বিদারক ঘটনা। এসব ঘটনা আর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং তা একটি গভীর সামাজিক ব্যাধির লক্ষণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। 

সম্প্রতি গাজীপুরে ঘটে যাওয়া একটি নৃশংস ঘটনা দেশবাসীকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত সহিংসতা, কখনো মিটফোর্ড এলাকায় প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড, কখনো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীর প্রাণহানি, আবার কখনো গ্রামে সালিশের নামে নারীর ওপর অমানবিক নির্যাতন। এসব কিছু একই সূত্রে গাঁথা। 

অপরাধ ঘটে, কিছুদিন আলোচনা হয়, ত‌দন্ত কমিটি গঠন হয়, তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু চাপা পড়ে যায়।

আইনের প্রতি চরম অবজ্ঞা এবং অপরাধীদের নির্ভীক আচরণ প্রমাণ করে যে, অপরাধীরা আর আইনকে ভয় পায় না। কারণ তারা জানে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শাস্তি নিশ্চিত নয়। অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে বিচারিক কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। যার নাম বিচারহীনতার সংস্কৃতি। 

বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি শুধু অপরাধ বাড়াচ্ছে না, সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও ভেঙে দিচ্ছে। যখন একজন সাধারণ মানুষ দেখে, অপরাধ করেও কেউ পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন তার মধ্যেও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ক্ষয় হতে থাকে। ফলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে, তৈরি হয় গণপিটুনি ও প্রতিশোধের রাজনীতি। এটি একটি বিপজ্জনক চক্র, যা রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক হুমকি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা কমে যাওয়াও একটি বড় সংকেত। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহলের চাপে তদন্ত দুর্বল হয়, সাক্ষীরা নিরাপত্তাহীনতায় মুখ খুলতে চান না। বিচার যদি শক্তিশালী না হয়, তাহলে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন বিচার ব্যবস্থার সংস্কার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। অপরাধী যে-ই হোক, তার পরিচয় বা ক্ষমতা বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারবে না। এই বার্তাটি স্পষ্টভাবে দিতে হবে এবং কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। দেশের মানুষ নিরাপত্তা চায়, ন্যায়বিচার চায়। হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হলে বিচারহীনতার এই অন্ধকার অধ্যায়ের ইতি টানতেই হবে। নইলে আজ গাজীপুর হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে, কাল অন্য কোনো জেলায় ঘটবে না তারই-বা নিশ্চয়তা কী ! এভাবেই দীর্ঘ হবে লাশের মিছিল, আর প্রশ্নবিদ্ধ হবে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি। সুতরাং, এখনই সময় বিচার ব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা শক্তিশালী করা।


মু. সায়েম আহমাদ
তরুণ কলাম লেখক ও সংগঠক
img

সূচকের পতনের চেয়ে বড় সংকট আস্থার অবক্ষয়

প্রকাশিত :  ১১:২৯, ২২ জুন ২০২৬

✍️ নিজস্ব প্রতিবেদক

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দরপতন নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত এক যুগে বিনিয়োগকারীরা উত্থানের চেয়ে পতনের গল্পই বেশি শুনেছেন। তবু প্রতি বড় দরপতনের দিন আমাদের সামনে নতুন করে একটি প্রশ্ন হাজির হয়—সমস্যাটা কী কেবল বাজারের, নাকি এর পেছনে অর্থনীতি, নীতি এবং আস্থার আরও গভীর সংকট কাজ করছে?

সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৮৫ পয়েন্টের বেশি হারিয়েছে। এক দিনে শতাংশ দেড় ভাগের বেশি পতন নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু উদ্বেগের প্রকৃত কারণ সূচকের পতন নয়; বরং বাজারের সামগ্রিক চিত্র। অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম কমেছে, লেনদেনের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও প্রকট হয়েছে।

পুঁজিবাজার মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বিনিয়োগকারী যখন বিশ্বাস করেন যে অর্থনীতি স্থিতিশীল, নীতিনির্ধারকরা সুস্পষ্ট অবস্থানে আছেন এবং বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তখন তিনি বিনিয়োগে আগ্রহী হন। বিপরীতে অনিশ্চয়তা বাড়লে তিনি অপেক্ষার পথ বেছে নেন। বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে সেই অপেক্ষার প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বিষয়। তেলের দাম, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের দুর্বলতার ব্যাখ্যা কেবল বাইরের ঘটনায় খুঁজলে ভুল হবে। কারণ আমাদের বাজার বহুদিন ধরেই তারল্যসংকট, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণের সমস্যায় ভুগছে।

সোমবারের বাজারে তারল্যসংকটের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিপুল অঙ্কের সরকারি সুকুক ইস্যুর কারণে আর্থিক খাতের একটি বড় অংশের অর্থ শেয়ারবাজারের বাইরে চলে গেছে। এটি সাময়িক ঘটনা হলেও এর মধ্য দিয়ে একটি পুরোনো বাস্তবতা আবার সামনে এসেছে—বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনও পর্যাপ্ত দীর্ঘমেয়াদি তহবিল আকর্ষণ করতে পারেনি। ফলে সামান্য চাপ এলেই বাজার নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

এদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নজরদারি বাজারের জন্য ইতিবাচক বার্তা। কারসাজি ও কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তবে এটিও সত্য যে দীর্ঘদিন ধরে বাজারের একটি অংশ অস্বাভাবিক লেনদেন ও জল্পনানির্ভর প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল। ফলে নজরদারি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অর্থের একটি অংশ বাজার ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। এটিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং দীর্ঘমেয়াদে এটি বাজারকে আরও সুস্থ ও স্বচ্ছ করে তুলতে পারে।

ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর অনেক শেয়ারের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদে কিছু কোম্পানির শেয়ারে বড় ধরনের দরপতন দেখা গেলেও বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী এটি অস্বাভাবিক নয়। দীর্ঘদিন কৃত্রিমভাবে আটকে রাখা দাম একসময় বাস্তবতার মুখোমুখি হবেই।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কোথায়?

প্রথমত, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। বিনিয়োগকারীরা যেন মনে করেন, এখানে নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য এবং কারসাজিকারীরা কোনোভাবেই পার পাবে না। দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলছে, শক্তিশালী পেনশন ফান্ড, মিউচুয়াল ফান্ড এবং দীর্ঘমেয়াদি তহবিল ছাড়া স্থিতিশীল পুঁজিবাজার গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনার উদ্যোগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগকারীদের সামনে মানসম্মত বিনিয়োগের সুযোগ যত বাড়বে, বাজার তত শক্তিশালী হবে।

স্বল্পমেয়াদে সূচক আরও কিছুটা ওঠানামা করতে পারে। সেটি বাজারের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হলে সূচকের দৈনিক ওঠানামার বাইরে গিয়ে মূল সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে।

কারণ পুঁজিবাজার কেবল কিছু শেয়ারের দর বাড়া–কমার নাম নয়। এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। আর সেই আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরলে সূচকের কয়েক পয়েন্ট পতনের চেয়েও বড় ক্ষতি হয়ে যায়।