এই ছড়াটি আমি কয়েক বছর আগে লিখেছিলাম। কোন এক অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতেই লেখা হয়েছিল। পরবর্তীতে অনেকেই তাদের লেখায় ছড়াটি উদ্ধৃত করতে দেখেছি। এই সময়ে এসে আমার এই ছড়াটি আবার মনে গুনগুন করতে থাকলো এই কারণে যে, মানুষের মুখের কথা কখনো কখনো এমন ঝড় তোলে, যা পরে সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাজনীতিতে বলা একটি বাক্যও অনেক সময় আলোড়ন, বিতর্ক, এমনকি আইনি জটিলতার কারণ হতে পারে।
সম্প্রতি কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক মোস্তাক মিয়া দাবি করেছেন যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ ১০ কোটি টাকা এবং আসিফ মাহমুদ সজীব ভুইয়া ১৫ কোটি টাকা নিয়েছেন। এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে নানা মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন বক্তব্য দিয়ে মোস্তাক মিয়া কি নিজেই কোনো দুর্বিপাকে পড়লেন? গণতান্ত্রিক সমাজে অভিযোগ করার অধিকার অবশ্যই রয়েছে। দুর্নীতি, অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলা নাগরিক দায়িত্বের মধ্যেও পড়ে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো; যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ আছে কি না। কারণ অভিযোগ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়।
যদি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম বা কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ তোলা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই জনগণ জানতে চাইবে, সেই তথ্যের ভিত্তি কী? কোনো নথি আছে কি? কোনো তদন্ত হয়েছে কি? নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য? এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকলে অভিযোগকারীর বক্তব্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়।
রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য অনেক সময় কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একটি বক্তব্য মুহূর্তেই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বক্তব্যের দায়ও আগের চেয়ে অনেক বেশি। কোনো অভিযোগ যদি প্রমাণিত না হয়, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা পক্ষ তা মানহানিকর বলে দাবি করতে পারে। সেক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়।
অন্যদিকে, যদি অভিযোগকারীর কাছে শক্ত প্রমাণ থাকে এবং তিনি তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করতে পারেন, তাহলে বিষয়টি তদন্তের দিকে যেতে পারে। তখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে অভিযোগের সত্যতা, অভিযোগকারীর বক্তব্য নয়।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দায়িত্বশীল ভাষার ব্যবহার ক্রমেই কমে যাচ্ছে বলে অনেকেই মনে করেন। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করছে, পাল্টা জবাবও আসছে একই ভঙ্গিতে। এতে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লেও জনগণের আস্থা বাড়ে না। বরং সাধারণ মানুষ প্রকৃত তথ্যের পরিবর্তে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যায়।
মোস্তাক মিয়ার বক্তব্যের পর কী ঘটতে পারে, তা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, তিনি তার অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের প্রমাণ উপস্থাপন করেন। দ্বিতীয়ত, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কী প্রতিক্রিয়া জানান। তৃতীয়ত, কোনো তদন্তকারী সংস্থা বিষয়টি আমলে নেয় কি না। এবং চতুর্থত, অভিযোগটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি আইনি প্রক্রিয়ায় গড়ায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন নেতা-নেত্রীর বিরুদ্ধে বড় বড় অভিযোগ এসেছে। কিছু অভিযোগ পরে প্রমাণিত হয়েছে, আবার অনেক অভিযোগ সময়ের সঙ্গে হারিয়েও গেছে। তাই কেবল অভিযোগ শুনেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কথার শক্তি অনেক। একটি বক্তব্য যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে পারে, তেমনি ভিত্তিহীন বক্তব্য মানুষের সম্মানহানি ও সামাজিক অস্থিরতার কারণও হতে পারে। তাই জনজীবনে দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
শুরুতে উদ্ধৃত ছড়াটির শিক্ষাই এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। কথা বলার স্বাধীনতা অবশ্যই আছে, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও জড়িত। লাগামছাড়া বক্তব্য কখনো করতালি পেতে পারে, কিন্তু পরে তা বক্তার জন্যই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সুতরাং মোস্তাক মিয়া দুর্বিপাকে পড়েছেন কি না, তার চূড়ান্ত উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এটুকু বলা যায়, তার বক্তব্য এখন জনসমক্ষে এসেছে। ফলে প্রমাণ, জবাব এবং জবাবদিহিতার প্রশ্নও সামনে চলে এসেছে। রাজনীতিতে যেমন অভিযোগের গুরুত্ব আছে, তেমনি সেই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করার দায়ও কম নয়। আর সেখানেই নির্ধারিত হবে, এই বক্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক বিতর্ক হয়ে থাকবে, নাকি বড় কোনো ঘটনার সূচনা করবে।
চীন যখন ২০২৬ সালের বসন্তে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সিকিউরিটিজে নিজেদের বিনিয়োগ কমাতে শুরু করল, তখন ওয়াশিংটনের মূলধারার অনেক বিশ্লেষক স্বভাবগতভাবেই একে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘রুটিন’ ঘটনা বলে আখ্যা দেন। কিন্তু তাঁদের তা করা উচিত ছিল না। যা ঘটছে, তা আসলে এক দশকব্যাপী কৌশলের চূড়ান্ত পরিণতি; একটি পরিকল্পনা, যা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সর্বোচ্চ মুহূর্তে চীন চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ গ্রহণ ব্যয়কে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
পরিসংখ্যানগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৩ সালে চীনের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে আসে ৬৯৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে এবং পরের মাসে আরও কমে দাঁড়ায় ৬৫২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে।
শুধু ২০২৬ সালের মার্চ মাসেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট মার্কিন ট্রেজারি ধারণ ১৩৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার কমে যায়। একই সময়ে শীর্ষ ১০ বিদেশি ধারকের মধ্যে জাপান, চীন, বেলজিয়াম, কানাডা, ফ্রান্সসহ সাতটি দেশ একযোগে তাদের ঝুঁকি বা এক্সপোজার কমিয়ে আনে।
খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এল-এরিয়ান এ পরিবর্তনকে সরাসরি একটি কাঠামোগত রূপান্তর হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বাজারে চীনের অংশীদারত্ব এখন মাত্র ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ‘১৫ বছর আগে অর্জিত ২৮ শতাংশের সর্বোচ্চ অবস্থানের এক-চতুর্থাংশ মাত্র।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ধারাবাহিকভাবে নতুন ঋণপত্র ইস্যুর পরিপ্রেক্ষিতে এই পতন আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক কাঠামো মূলত ধারাবাহিকভাবে আগ্রহী ঋণদাতাদের ওপর নির্ভরশীল। ওয়াশিংটন সামরিক ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ফেডারেল কর্মচারীদের বেতন এবং বৈদেশিক প্রতিশ্রুতিগুলোর অর্থায়নের জন্য নিয়মিত বাজেটঘাটতি পরিচালনা করে এবং সেই ঘাটতি পূরণ করে নতুন ঋণ ইস্যুর মাধ্যমে।
এমন পরিস্থিতিতে চীনের মতো বড় ঋণদাতা যখন পিছু হটতে শুরু করে, তখন এর গাণিতিক প্রভাব অত্যন্ত কঠোর হয়। এর ফলে ট্রেজারির সুদের হার (ইয়িল্ড) বাড়ে, পুরোনো ঋণ নবায়নের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং বিদেশি চাহিদা কমে যাওয়ায় ডলারের ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়।
প্রকৃত প্রশ্নটি আসলে এই নয় যে মার্কিন ডলার রাতারাতি তার বৈশ্বিক আধিপত্য হারাবে কি না। তা হবে না। আসল প্রশ্ন হলো, চীনের পদক্ষেপগুলো কি অন্য দেশগুলোকে একই সময়ে ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে সরে যেতে উৎসাহিত করবে?
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীন যখন নিজেদের ব্যাংকগুলোকে ট্রেজারি বিনিয়োগ কমানোর পরামর্শ দেয়, তখন অর্থনীতিবিদ পিটার শিফ বিষয়টি নিয়ে তাঁর স্বভাবসুলভ সরাসরি মন্তব্য করেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গবেষক ব্র্যাড সেটসারের মতে, যদি চীন তাদের পুরো ট্রেজারি পোর্টফোলিও বিক্রি করে দেয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার প্রায় ৩০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই হিসাব কেবল সরাসরি বাজারগত প্রভাবকে বিবেচনায় নেয়; অন্য বৈশ্বিক ঋণদাতাদের মধ্যে সম্ভাব্য আতঙ্ক বা চেইন-রি–অ্যাকশনের প্রভাব এতে ধরা হয়নি।
বহু বছর ধরে চীন নীরবে একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। তাদের লক্ষ্য হলো, যদি কখনো তারা মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে বা তা থেকে সরে আসতে চায়, তাহলে যেন নিজেদের অর্থনীতি কোনো বড় ধাক্কা না খায়। এটিকে এমনভাবে ভাবা যায় যে চীন একটি সম্পূর্ণ নতুন আর্থিক ‘এলাকা’ গড়ে তুলছে, যাতে ভবিষ্যতে আর যুক্তরাষ্ট্রের ‘বাড়িতে’ বসবাস করতে না হয়। তারা এটি যেভাবে করছে:
বৈশ্বিক অবকাঠামো তৈরির ‘মহাযাত্রা’: চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) নামে একটি বিশাল প্রকল্প শুরু করেছে, যা ১৪০টির বেশি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে। সারা বিশ্বে সড়ক, বন্দর, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে তারা প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। উদ্দেশ্য হলো, এসব দেশ যেন যুক্তরাষ্ট্রের ডলার ব্যবহার না করেও সরাসরি চীনের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারে।
নিজস্ব আন্তর্জাতিক অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা: চীন সীমান্তের বাইরে লেনদেনের জন্য সিআইপিএস নামে নিজস্ব অর্থ প্রদানের নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। ২০২৪ সালে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ২৪ দশমিক ৪৭ ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ চীনা মুদ্রা ইউয়ানে লেনদেন সম্পন্ন হয়, যা আগের বছরের তুলনায় ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। এর পাশাপাশি চীন বিশ্বের ৪০টির বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বিশেষ মুদ্রা বিনিময় (কারেন্সি সোয়াপ) চুক্তি করেছে।
বন্ধুদের সঙ্গে ডলারবিহীন বাণিজ্য: এটি আর কেবল তাত্ত্বিক পরিকল্পনা নয়; বাস্তবেও এর প্রয়োগ শুরু হয়ে গেছে। বর্তমানে চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার প্রায় ৯৫ শতাংশ বাণিজ্য তাদের নিজস্ব স্থানীয় মুদ্রায় সম্পন্ন হয়। একইভাবে ২০২৪ সালে ব্রাজিল ও চীনের মধ্যকার প্রায় অর্ধেক বাণিজ্য ইউয়ানে পরিচালিত হয়েছে।
বিকল্প অর্থনৈতিক জোট গঠন: চীন ব্রিকস জোট সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই জোটে এখন সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ও ইথিওপিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ তেলসমৃদ্ধ ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দেশ যুক্ত হয়েছে। এই দেশগুলোকে একত্র করার মাধ্যমে চীন একটি সমান্তরাল বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কাঠামোগত ভিত্তি নির্মাণ করছে; অর্থাৎ যদি কখনো মার্কিন নেতৃত্বাধীন আর্থিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা চীন ইচ্ছাকৃতভাবে সেই ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তাদের কাছে ইতোমধ্যেই একটি বিকল্প বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক প্রস্তুত থাকবে, যা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতে পারবে।
এসব কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটি ধারাবাহিক কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ; প্রথমে বিকল্প পথ বা ‘প্রস্থানদ্বার’ তৈরি করা, তারপর ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং শেষ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, যেখানে মার্কিন ট্রেজারি বাজারে একটি বড় পদক্ষেপ নেওয়া যাবে—যার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা হবে অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু এর ফলে চীনের নিজের অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়কর ক্ষতি হবে না।
এই কৌশলের অংশ হিসেবেই পিপল’স ব্যাংক অব চায়না তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমশ সোনার দিকে সরিয়ে নিয়েছে। টানা ১৫ মাস ধরে সোনা কেনার পর চীনের স্বর্ণ মজুত রেকর্ড ২ হাজার ৩০৮ টনে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতির উদ্দেশ্য, স্পষ্টভাবে চীনের অর্থনীতিকে ‘নিষেধাজ্ঞা-প্রতিরোধী’ (স্যাংশন প্রুফ) করে তোলা। ২০২২ সালে রাশিয়ার সম্পদ জব্দ করার অভিজ্ঞতার সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এই কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
এখানে ঝুঁকি শুধু অর্থের প্রবাহে নয়; বরং চীনের এই পদক্ষেপ অন্য দেশগুলোকে একই পথ অনুসরণ করার মনস্তাত্ত্বিক অনুমতি দিতে পারে। জাপান উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে; উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো নীরবে তাদের সম্পদ বৈচিত্র্যময় করছে; আর দীর্ঘদিন ধরে ডলারকেন্দ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার বিষয়ে সতর্ক থাকা তথাকথিত ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো ক্রমেই ওয়াশিংটনের মুদ্রানীতির আধিপত্য থেকে প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব খুঁজছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে মার্কিন ডলারের অংশীদারত্ব নেমে এসেছে ৫৭ দশমিক ৮ শতাংশে, যেখানে ২০০১ সালে তা ছিল ৭২ শতাংশ। একই সময়ে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তিন বছর ধরে প্রতিবছর এক হাজার টনের বেশি স্বর্ণ ক্রয় করেছে।
প্রকৃত প্রশ্নটি আসলে এই নয় যে মার্কিন ডলার রাতারাতি তার বৈশ্বিক আধিপত্য হারাবে কি না। তা হবে না। আসল প্রশ্ন হলো, চীনের পদক্ষেপগুলো কি অন্য দেশগুলোকে একই সময়ে ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে সরে যেতে উৎসাহিত করবে?
এই মুহূর্তে অনেক দেশ দ্বিধাগ্রস্ত। কিন্তু তারা যদি বুঝতে পারে যে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো নিরাপদ, তাহলে সেটিই একটি ভবিষ্যদ্বাণীতে পরিণত হতে পারে। প্রথম কয়েকটি ‘ডমিনো’ যখন পড়ে যাবে, তখন বাকিগুলোও একে একে অনুসরণ করবে।
ওয়াশিংটনের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বাস্তবে রাজনৈতিক বক্তব্যে যতটা বড় করে দেখানো হয়, ততটা নয়। চীনের বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তার অভিঘাত যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাপর্যায়ে মূল্য, করপোরেট মুনাফা এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপর সরাসরি পড়বে।
অ্যাপল, নাইকি ও টেসলার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো গভীরভাবে চীনা উৎপাদন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া ইউএস–চায়না ইকোনিমক অ্যান্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশন ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছে যে বেইজিংয়ের হাতে এসব পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত করার সক্ষমতা ক্রমশ বাড়ছে।
চীনকে আবার ট্রেজারি কেনায় ফিরিয়ে আনা বা বিক্রি বন্ধ করতে বাধ্য করার জন্য হয় এমন বাজার-প্রণোদনা প্রয়োজন, যা ওয়াশিংটন বর্তমানে দিতে পারছে না; অথবা এমন চাপ প্রয়োগের ব্যবস্থা প্রয়োজন, যার সবচেয়ে বড় মূল্য পরিশোধ করতে হবে মার্কিন ভোক্তাদেরই।
২০২৬ সালের বসন্তে সংঘটিত ব্যাপক বাজারপতন হয়তো একক কোনো বিস্ফোরণ নয়, যা মার্কিন ডলারকে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় সতর্কসংকেত। বহু বছর ধরেই যাঁরা মনোযোগ দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন, তাঁরা এই প্রবণতা আসতে দেখেছেন।
আগামী দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা চীনের পরবর্তী পদক্ষেপ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, জাপান, সৌদি আরব এবং গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ কি এই মুহূর্তকে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিন্যাসের উপযুক্ত সময় হিসেবে দেখবে? যদি তারা তা–ই করে, তাহলে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ গতিপথ দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।
জাসিম আল-আজ্জাউই এমবিসি গ্রুপ, আবুধাবি টিভি এবং আল–জাজিরা ইংলিশে সংবাদ উপস্থাপক, অনুষ্ঠান সঞ্চালক এবং নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।