img

কথা বলুন লাগাম টেনে

প্রকাশিত :  ০৮:৪২, ০১ জুন ২০২৬

কথা বলুন লাগাম টেনে

আবদুল হামিদ মাহবুব


\'কথা বলুন লাগাম টেনে,

কথারও তো সীমা থাকে

লাগামছাড়া কথা বলে,

পড়তে পারেন দুর্বিপাকে।\'

এই ছড়াটি আমি কয়েক বছর আগে লিখেছিলাম। কোন এক অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতেই লেখা হয়েছিল। পরবর্তীতে অনেকেই তাদের লেখায় ছড়াটি উদ্ধৃত করতে দেখেছি। এই সময়ে এসে আমার এই ছড়াটি আবার মনে গুনগুন করতে থাকলো এই কারণে যে, মানুষের মুখের কথা কখনো কখনো এমন ঝড় তোলে, যা পরে সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাজনীতিতে বলা একটি বাক্যও অনেক সময় আলোড়ন, বিতর্ক, এমনকি আইনি জটিলতার কারণ হতে পারে।

সম্প্রতি কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক মোস্তাক মিয়া দাবি করেছেন যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ ১০ কোটি টাকা এবং আসিফ মাহমুদ সজীব ভুইয়া ১৫ কোটি টাকা নিয়েছেন। এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে নানা মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন বক্তব্য দিয়ে মোস্তাক মিয়া কি নিজেই কোনো দুর্বিপাকে পড়লেন? গণতান্ত্রিক সমাজে অভিযোগ করার অধিকার অবশ্যই রয়েছে। দুর্নীতি, অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলা নাগরিক দায়িত্বের মধ্যেও পড়ে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো; যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ আছে কি না। কারণ অভিযোগ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়।

যদি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম বা কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ তোলা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই জনগণ জানতে চাইবে, সেই তথ্যের ভিত্তি কী? কোনো নথি আছে কি? কোনো তদন্ত হয়েছে কি? নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য? এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকলে অভিযোগকারীর বক্তব্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়।

রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য অনেক সময় কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একটি বক্তব্য মুহূর্তেই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বক্তব্যের দায়ও আগের চেয়ে অনেক বেশি। কোনো অভিযোগ যদি প্রমাণিত না হয়, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা পক্ষ তা মানহানিকর বলে দাবি করতে পারে। সেক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়।

অন্যদিকে, যদি অভিযোগকারীর কাছে শক্ত প্রমাণ থাকে এবং তিনি তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করতে পারেন, তাহলে বিষয়টি তদন্তের দিকে যেতে পারে। তখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে অভিযোগের সত্যতা, অভিযোগকারীর বক্তব্য নয়।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দায়িত্বশীল ভাষার ব্যবহার ক্রমেই কমে যাচ্ছে বলে অনেকেই মনে করেন। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করছে, পাল্টা জবাবও আসছে একই ভঙ্গিতে। এতে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লেও জনগণের আস্থা বাড়ে না। বরং সাধারণ মানুষ প্রকৃত তথ্যের পরিবর্তে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যায়।

মোস্তাক মিয়ার বক্তব্যের পর কী ঘটতে পারে, তা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, তিনি তার অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের প্রমাণ উপস্থাপন করেন। দ্বিতীয়ত, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কী প্রতিক্রিয়া জানান। তৃতীয়ত, কোনো তদন্তকারী সংস্থা বিষয়টি আমলে নেয় কি না। এবং চতুর্থত, অভিযোগটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি আইনি প্রক্রিয়ায় গড়ায়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন নেতা-নেত্রীর বিরুদ্ধে বড় বড় অভিযোগ এসেছে। কিছু অভিযোগ পরে প্রমাণিত হয়েছে, আবার অনেক অভিযোগ সময়ের সঙ্গে হারিয়েও গেছে। তাই কেবল অভিযোগ শুনেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, কথার শক্তি অনেক। একটি বক্তব্য যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে পারে, তেমনি ভিত্তিহীন বক্তব্য মানুষের সম্মানহানি ও সামাজিক অস্থিরতার কারণও হতে পারে। তাই জনজীবনে দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

শুরুতে উদ্ধৃত ছড়াটির শিক্ষাই এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। কথা বলার স্বাধীনতা অবশ্যই আছে, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও জড়িত। লাগামছাড়া বক্তব্য কখনো করতালি পেতে পারে, কিন্তু পরে তা বক্তার জন্যই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সুতরাং মোস্তাক মিয়া দুর্বিপাকে পড়েছেন কি না, তার চূড়ান্ত উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এটুকু বলা যায়, তার বক্তব্য এখন জনসমক্ষে এসেছে। ফলে প্রমাণ, জবাব এবং জবাবদিহিতার প্রশ্নও সামনে চলে এসেছে। রাজনীতিতে যেমন অভিযোগের গুরুত্ব আছে, তেমনি সেই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করার দায়ও কম নয়। আর সেখানেই নির্ধারিত হবে, এই বক্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক বিতর্ক হয়ে থাকবে, নাকি বড় কোনো ঘটনার সূচনা করবে।


লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব।
মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪
ই-মেইল:  [email protected]
img

যুদ্ধের ময়দানে উজ্জীবিত ইরানের পরমাণু স্বপ্ন: ইউরোশিয়া রিভিউ

প্রকাশিত :  ০৬:২২, ২২ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:২৭, ২২ অক্টোবর ২০২৬

একসময় ইরানের রাজনীতিতে পারমাণবিক বোমা তৈরির আলোচনা ছিল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও গোপনীয়। তবে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সঙ্গে টানা আট মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলেছে। এখন দেশটির নীতিনির্ধারক ও আইনপ্রণেতারা প্রকাশ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দাবি তুলছেন।

অথচ এই দেশেই একদিন সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির একটি ধর্মীয় ফতোয়া ছিল আইন, যেখানে গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি বা সংরক্ষণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে তেহরান বিশ্ববাসীকে এটাই বোঝানোর চেষ্টা করেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক কাজের জন্য। কিন্তু যুদ্ধের কালো মেঘ সেই পুরোনো ধারণাকে এক নিমিষে উড়িয়ে দিয়েছে।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের প্রথম দফার আকস্মিক আঘাতেই কেঁপে উঠেছিল ইরান। সেই হামলায় শুধু সামরিক বা পারমাণবিক স্থাপনাই ধ্বংস হয়নি, প্রাণ হারিয়েছেন খেসারত দেওয়া বহু সাধারণ নাগরিক এবং খামেনিসহ শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব। যদিও পরবর্তী সময়ে সরাসরি বড় ধরনের সামরিক তৎপরতা কমিয়ে এনে নৌ-অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপের পথ বেছে নিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের সাত দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে উল্টো নতুন হামলার হুমকি দিয়েছেন। ওয়াশিংটনের সাফ কথা, চুক্তি করতে হলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে।

আর ঠিক এ অনিশ্চিত ও চরম অস্তিত্বের সংকটের মাঝেই তেহরানের অন্দরে শুরু হয়েছে তীব্র দন্তনখ লড়াই। একপক্ষ বলছে, পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য ইরান এরই মধ্যে অনেক চড়া মূল্য চুকিয়ে ফেলেছে। পার্লামেন্ট সদস্য আহমাদ বাখশায়্যাশ আরদেস্তানি কিংবা মহসেন রেজাইয়ের মতো শীর্ষ নিরাপত্তা কর্তারা মনে করেন, এখন আর পিছু হটার সময় নেই; বরং শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে পরমাণু অস্ত্র অর্জনের পথেই হাঁটা উচিত।

রক্ষণশীল বিশ্লেষক দাউদ মোদাররেসিয়ানের ভাষায়, একটি পরমাণু বোমা অর্জন করা আজকের দিনে রুটি-রুজির চেয়েও বড় ও জরুরি প্রয়োজন, যা দেশের টিকে থাকার একমাত্র নিশ্চয়তা। তারা ট্রাম্পের সেই পুরোনো কথারই প্রতিধ্বনি করেন, যেখানে উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের উদাহরণ টেনে ট্রাম্প বলেছিলেন, কারও হাতে ১১টি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকলে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠেও রয়েছে শক্ত যুক্তি। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবের এই চিন্তার তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে আছে, তাদের পরমাণু বোমার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, একটি বোমা বড়জোর ৫০ থেকে ১ লাখ মানুষের প্রাণ নিতে পারে, কিন্তু হরমুজ প্রণালি আটকে দিলে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও কোটি কোটি মানুষের জীবন জিম্মি করা সম্ভব। সাংবাদিক সিনা জাহানি কিংবা বিশ্লেষক আমির আলী আবুলফাতদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর এ উন্মাদনা সরাসরি ইসরায়েলের ফাঁদে পা দেওয়ার শামিল। বোমা তৈরির কাজ শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকান বোমায় দেশের বাকি অবকাঠটুকুও ধূলিসাৎ হয়ে যাবে, এমন আত্মঘাতী পথ কোনো সুরক্ষাই দিতে পারে না।

কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, ইরান কি চাইলেও এখন বোমা বানাতে পারবে? যুদ্ধের আগুনে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মূল অবকাঠামো আজ প্রায় পঙ্গু। নাতানজ ও ফরদোর মতো প্রধান ভূগর্ভস্থ প্লান্টগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। তবে সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে আছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা প্রায় ৪৪০ দশমিক ১৯ কেজি ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, এক বছরের বেশি সময় ধরে এই বিশাল মজুতের সঠিক হদিস তাদের জানা নেই।

মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দাবি, গ্রানাইট পাথরের ৮০ থেকে ১০০ মিটার গভীরে অবস্থিত গোপন ও সুরক্ষিত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ সুড়ঙ্গে হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ ও এই ইউরেনিয়াম লুকিয়ে ফেলেছে তেহরান। আর এ কারণেই ট্রাম্প সম্প্রতি হুংকার ছেড়েছেন, আমাদের হয়তো সেখানেই গিয়ে অভিযান চালাতে হতে পারে!

তাত্ত্বিকভাবে, ওই গোপন মজুতের নাগাল পেলে সামান্য সেন্ট্রিফিউজ দিয়েই অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়াম বানিয়ে ফেলা সম্ভব। ইরান যদিও যুদ্ধ বন্ধের বিনিময়ে এই মজুত হালকা বা পাতলা করার প্রস্তাব দিয়েছে, তবুও ওয়াশিংটনের কড়া নজর এবং পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের হিমশীতল পাহাড়ের আড়ালে এখন ঝুলে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তথা গোটা বিশ্বের ভাগ্য।