img

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: ফুটবলে গার্হস্থ্য সহিংসতা, লুকানো সংকট ও নীতিগত করণীয়

প্রকাশিত :  ১৪:০০, ২০ জুলাই ২০২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: ফুটবলে গার্হস্থ্য সহিংসতা, লুকানো সংকট ও নীতিগত করণীয়

॥ হুসনা খান হাসি ॥

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রীড়া আয়োজন। এই প্রতিযোগিতা কেবল শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়, বরং জাতীয় পরিচয়, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক সংহতির এক অনন্য প্রতীক। কোটি কোটি দর্শকের আবেগ, গণমাধ্যমের বিপুল উপস্থিতি এবং খেলোয়াড়দের অসাধারণ জনপ্রিয়তা ফুটবলকে শুধু একটি খেলা নয়, একটি শক্তিশালী সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু এই আলো ঝলমলে বাস্তবতার আড়ালে এমন কিছু জটিল সামাজিক সংকট রয়েছে, যেগুলো নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে সীমিত। গার্হস্থ্য সহিংসতা তার অন্যতম।

গার্হস্থ্য সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সংকট, যা পরিবার, শিশু, কর্মক্ষেত্র এবং বৃহত্তর সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা যায়, ক্ষমতার অসমতা, মানসিক চাপ, রাগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং জবাবদিহির অভাব একত্রে সহিংস আচরণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। পেশাদার খেলাধুলার পরিবেশে এই ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয় উচ্চমাত্রার প্রতিযোগিতা, চরম পারফরম্যান্সের চাপ, জনসমালোচনার ভয়, দীর্ঘ ভ্রমণ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সংকোচন এবং কখনও কখনও খ্যাতিজনিত বিশেষ সুবিধা।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণা ইঙ্গিত করে যে ক্রীড়া তারকা হওয়া নিজেই গার্হস্থ্য সহিংসতার কারণ নয়। বরং কিছু কাঠামোগত ও মনস্তাত্ত্বিক ঝুঁকির কারণে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সহিংসতার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেতে পারে। অর্থাৎ সমস্যার মূল খেলাধুলা নয়, বরং ক্ষমতার অপব্যবহার, অপর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি।

এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো “তারকাখ্যাতির সংস্কৃতি”। জনপ্রিয় খেলোয়াড়দের ঘিরে গড়ে ওঠা সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ অনেক সময় অভিযোগকে গুরুত্বহীন করে তোলে। সমর্থক, স্পন্সর, ক্লাব কিংবা গণমাধ্যমের একটি অংশ কখনও কখনও মাঠের সাফল্যকে ব্যক্তিগত আচরণের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়। এর ফলে ভুক্তভোগীরা বিচারের পরিবর্তে সামাজিক অবিশ্বাস, চরিত্রহনন এবং মানসিক চাপে পড়েন। এই সংস্কৃতি অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধকে দুর্বল করে।

মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়ায় মানসিক সুস্থতা শারীরিক সক্ষমতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বহু পেশাদার খেলোয়াড় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করেন, কারণ এখনো অনেক ক্ষেত্রে এটিকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। ফলস্বরূপ, উদ্বেগ, হতাশা, রাগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা কিংবা সম্পর্কগত সংকট দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থেকে যায়। তাই মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে ঐচ্ছিক সুবিধা নয়, বরং পেশাদার ক্রীড়া ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

ফিফা বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসর কেবল খেলোয়াড়দের দক্ষতার নয়, ক্রীড়া প্রশাসনের নৈতিক মানদণ্ডেরও পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা, জাতীয় ফেডারেশন এবং ক্লাবগুলোর উচিত গার্হস্থ্য সহিংসতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নীতি গ্রহণ করা, যেখানে অভিযোগ তদন্তের স্বাধীন ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ শাস্তিমূলক প্রক্রিয়া এবং ভুক্তভোগী সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা থাকবে। একই সঙ্গে খেলোয়াড়, কোচ এবং কর্মকর্তাদের জন্য বাধ্যতামূলক আচরণবিধি, লিঙ্গসমতা, সম্মানজনক সম্পর্ক এবং সহিংসতা প্রতিরোধ বিষয়ক প্রশিক্ষণ চালু করা সময়ের দাবি।

গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে খেলোয়াড়ের জনপ্রিয়তা বা ক্রীড়া সাফল্যকে কেন্দ্র করে ঘটনাকে আড়াল না করে মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক দায়িত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একইভাবে সমর্থকদেরও উপলব্ধি করতে হবে যে একজন খেলোয়াড়ের অসাধারণ পারফরম্যান্স কখনোই তার ব্যক্তিগত জীবনের সহিংস আচরণের নৈতিক বৈধতা তৈরি করতে পারে না।

বিশ্বকাপ আমাদের শিখিয়েছে, ফুটবল মানুষকে একত্রিত করতে পারে। সেই ঐক্যের শক্তিকে যদি মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় ব্যবহার করা যায়, তবে খেলাধুলা সামাজিক পরিবর্তনেরও একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। তাই ফুটবলের ভবিষ্যৎ শুধু নতুন কৌশল, উন্নত প্রযুক্তি কিংবা রেকর্ড ভাঙার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করে এমন একটি ক্রীড়া সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর, যেখানে সম্মান, জবাবদিহি, লিঙ্গসমতা এবং মানবাধিকার সমানভাবে মূল্যায়িত হবে।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়। আমরা কি শুধু সেরা গোল এবং সেরা খেলোয়াড়কে উদযাপন করব, নাকি এমন একটি ফুটবল সংস্কৃতি গড়ে তুলব যেখানে মাঠের বাইরেও ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং নিরাপত্তা সমান গুরুত্ব পাবে? যদি ফুটবল সত্যিই বিশ্বের খেলা হয়, তবে এর সবচেয়ে বড় জয় হবে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে প্রতিটি মানুষ সহিংসতামুক্ত, মর্যাদাপূর্ণ এবং নিরাপদ জীবনের অধিকার ভোগ করবে।

লন্ডন, যুক্তরাজ্য
১৯/০৭২০২৬
img

সিলেটের রেলপথে আটকে থাকা প্রতিশ্রুতি: ৩ সেপ্টেম্বরও পেরোল, টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস কোথায়?

প্রকাশিত :  ১৫:৫৯, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত

সিলেটবাসীর কাছে রেল এখন যেন প্রতিশ্রুতির আরেক নাম। কখনো নতুন আন্তনগর ট্রেন চালুর ঘোষণা, কখনো ডাবল লাইন নির্মাণের আশ্বাস, আবার কখনো সিলেট–জাফলং রেলসড়ক কিংবা ময়মনসিংহ–সিলেট সরাসরি রেল যোগাযোগের পরিকল্পনা—বছরের পর বছর ধরে এসব কথা শুনে আসছেন এই অঞ্চলের মানুষ। কিন্তু ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব যেন ক্রমেই বাড়ছে।

সর্বশেষ আলোচনায় ছিল ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’। সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল, এই ট্রেন ঢাকার সঙ্গে সিলেটের রেল যোগাযোগকে আরও দ্রুত ও আধুনিক করবে। সিলেট-৬ আসনের এমপি এমরান আহমদ চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে সংসদে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সিলেট–ঢাকা রেলপথে ‘টাঙ্গুয়া’ নামে নতুন একটি ট্রেন চালু হবে।

কথা ছিল মে ও জুন মাসে। নির্ধারিত ৩ সেপ্টেম্বরও পেরিয়ে গেছে। কিন্তু ট্রেন চালুর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকেও নতুন ট্রেন চালুর বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—সংসদে নির্দিষ্ট তারিখ দিয়ে যে ট্রেন চালুর কথা বলা হয়েছিল, সেই টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস কোথায়?
সিলেট-৬ আসনের এমপি এমরান আহমদ চৌধুরী জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি আবার সংসদে তুলবেন।

সিলেটের রেল যোগাযোগের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতাগুলোর একটি হলো একক রেললাইন। ২০১৯ সালে আখাউড়া–সিলেট রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করার প্রকল্পের ঘোষণা সিলেটবাসীর মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করেছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা ও সিলেটের মধ্যে রেলযাত্রা আরও দ্রুত, নিরাপদ ও আধুনিক হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু অর্থসংকটের কারণে প্রকল্পটি স্থগিত রয়েছে। ফলে সিলেটের সঙ্গে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও যোগাযোগকেন্দ্রগুলোর রেলসংযোগের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নও থমকে আছে।

এই রেলপথ শুধু ঢাকা–সিলেট যাতায়াতের বিষয় নয়। এর সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ভারতের আগরতলার সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের বিষয়টিও যুক্ত। ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত না হওয়ায় আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

ময়মনসিংহ ও সিলেটের মানুষের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক। দুই অঞ্চলের মানুষের আত্মীয়তা যেমন গভীর, তেমনি পণ্যবাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগও রয়েছে।

তবু দুই বিভাগকে সরাসরি রেলপথে যুক্ত করা যায়নি।

২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহে এক জনসভায় তৎকালীন ধর্মমন্ত্রী প্রিন্সিপাল মতিউর রহমান বলেছিলেন, “ময়মনসিংহ–সিলেট রেলপথে শিগগিরই আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হবে।”

এরপর ২০১৯ সালে সিলেট–চট্টগ্রাম এবং ময়মনসিংহ–সিলেট রুটে নতুন দুটি আন্তনগর ট্রেন চালুর পরিকল্পনার কথা জানায় রেলওয়ে। ওই সময় ইন্দোনেশিয়ার PT INKA থেকে আধুনিক কোচও আমদানি করা হয়। এসব কোচের একটি অংশ ওই রুটে ব্যবহারের কথা ছিল।

কিন্তু ঘোষণার পর বছর পেরিয়েছে। ট্রেন আর চালু হয়নি।

২০২১ সালের ৯ অক্টোবর রাজধানীর বেইলি রোডের অফিসার্স ক্লাবে বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমন্বয় পরিষদের বার্ষিক সম্মেলনে তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জানিয়েছিলেন, ময়মনসিংহের সঙ্গে সিলেটের সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনে জরিপ চলছে।

তিনি আরও বলেছিলেন, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ থেকে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার উড়ালসড়ক নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। হাওরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
কিন্তু এসব ঘোষণার পরও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

বর্তমানে সিলেট থেকে ময়মনসিংহ যেতে যাত্রীদের ঘুরপথে যেতে হয়। কখনো ঢাকা, কখনো ভৈরব হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে সময় লাগে প্রায় ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা।
অথচ সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু করা গেলে এই যাত্রা প্রায় ৭ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব হতো।
অর্থাৎ একটি রেললাইন শুধু দুই শহরের দূরত্ব কমাত না; কমাত সময়, পরিবহন ব্যয় এবং মানুষের দুর্ভোগও। একই সঙ্গে ময়মনসিংহ ও সিলেটের ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও সামাজিক যোগাযোগ আরও গতিশীল হতে পারত।

সিলেটের রেল যোগাযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক হতাশার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’।
২০২৩ সালে অনুমোদন পাওয়া এই ট্রেনকে ঘিরে সিলেটবাসীর প্রত্যাশা ছিল অনেক। আধুনিক, ননস্টপ ও আন্তর্জাতিক মানের সেবা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ঢাকার সঙ্গে সিলেটের দ্রুত রেল যোগাযোগে এটি নতুন দিগন্ত খুলবে—এমন আশাই করেছিলেন যাত্রীরা।
কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা, ইঞ্জিনের স্বল্পতা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে ট্রেনটি চালু হয়নি।

এরপর মে ও জুন মাসে বিষয়টি আবার সামনে আসে। সিলেট-৬ আসনের এমপি এমরান আহমদ চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী সংসদে জানান, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সিলেট–ঢাকা রেলপথে ‘টাঙ্গুয়া’ নামে নতুন ট্রেন চালু হবে।
কিন্তু ৩ সেপ্টেম্বর পেরিয়ে গেলেও টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেসের কোনো দেখা নেই।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টও নতুন ট্রেন চালুর বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেনি। ফলে সংসদে ঘোষিত নির্দিষ্ট তারিখও যখন পার হয়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—ঘোষণাটি কি কেবল ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

শুধু নতুন ট্রেন নয়, বিদ্যমান আন্তনগর ট্রেনের সেবাও নিয়ে সিলেটবাসীর অভিযোগের শেষ নেই।
সিলেট থেকে ঢাকাগামী আন্তনগর ট্রেনগুলোতে পথে বিভিন্ন স্টেশনে ব্যাপক যাত্রী ওঠানামার কারণে অনেক সময় ট্রেনের ভেতরে চলাচলের জায়গা থাকে না। আশুগঞ্জ, ভৈরব বাজার, নরসিংদীসহ বিভিন্ন স্টেশন থেকে যাত্রী ওঠায় সিলেট থেকে যাত্রা করা অনেক যাত্রীকে দীর্ঘ পথ দাঁড়িয়ে যেতে হয়—এমন অভিযোগ রয়েছে।
এ নিয়ে সম্প্রতি সিলেটবাসী মানববন্ধনও করেছেন। তাঁদের দাবি, ঢাকা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের দিকে যাওয়ার পথে আন্তনগর ট্রেনের স্টপেজ কমানো হোক, যাতে দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রীরা তুলনামূলক স্বস্তিতে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।

সিলেটবাসীর বক্তব্য, আন্তনগর ট্রেনের মূল বৈশিষ্ট্যই হলো দ্রুত ও তুলনামূলক আরামদায়ক যাত্রা। কিন্তু পথে অতিরিক্ত স্টপেজ ও যাত্রী ওঠানামার কারণে সেই সুবিধা অনেকটাই নষ্ট হচ্ছে।

সিলেট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা শ্রীমঙ্গল। চা-বাগান, পাহাড়, বনাঞ্চল, হাওর ও বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে শ্রীমঙ্গল দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য।

প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা রয়েছে এখানে। রাধানগরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্র। পাশাপাশি লেবু, আনারস, কাঁঠাল ও চা-বাগানের বিস্তৃত চাষাবাদকে ঘিরে গড়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতি। এসব খাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শত শত মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন।
ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাধানগরের নামও। ১৭৮ বিঘা জমির ডলুছড়া পাহাড় ব্রিটিশ শাসনামলে শ্রীমঙ্গলের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও দানবীর রাধা নাথ দেব চৌধুরী কিনেছিলেন। পরে তিনি জমিটি তাঁর চার সন্তানের মধ্যে বণ্টন করেন। তাঁদের কেউ কেউ জমি বিক্রি করেন, আর অবশিষ্ট জমির একটি অংশ সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন কারণে হাতছাড়া হয়ে যায়। তাঁর নাম থেকেই গড়ে ওঠে ‘রাধানগর’, যা বর্তমানে সিলেট বিভাগের অন্যতম উন্নত ও সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে পরিচিত।

এত সম্ভাবনার পরও শ্রীমঙ্গলসহ সিলেট বিভাগের পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে ঘিরে আধুনিক রেলসেবা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবাসী ও অর্থনৈতিক অঞ্চল। বিপুল প্রবাসী আয়, চা শিল্প, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং পর্যটন—সব মিলিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে এ অঞ্চলের গুরুত্ব উল্লেখযোগ্য।
জাফলং, রাতারগুল, বিছানাকান্দি, লালাখান কিংবা শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান—প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রই দেশের পর্যটন খাতকে আরও বড় করার সম্ভাবনা রাখে। কিন্তু আধুনিক ও দ্রুত রেল যোগাযোগের অভাব সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর পথে একটি বড় সীমাবদ্ধতা।
ঢাকা থেকে সিলেটগামী ট্রেনগুলোর অনেকগুলো এখনো পুরোনো ইঞ্জিননির্ভর। কোথাও কোথাও রেলের গতিবেগ ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটারের নিচে নেমে আসে। ফলে সড়কপথের যানজট ও দীর্ঘ যাত্রার বিকল্প হিসেবে যে রেলকে আরও কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, সেটিও অনেক ক্ষেত্রে সময়সাশ্রয়ী বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।

২০১৭ থেকে শুরু করে পরবর্তী বছরগুলোতে সিলেটের রেল যোগাযোগ নিয়ে একের পর এক ঘোষণা এসেছে। নতুন ট্রেন, ডাবল লাইন, সরাসরি ময়মনসিংহ–সিলেট রেল যোগাযোগ, সিলেট–জাফলং রেলসড়ক—প্রতিটি উদ্যোগই মানুষের মনে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
কিন্তু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবায়নের দূরত্ব দিন দিন স্পষ্ট হয়েছে।

সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষ মানববন্ধন, মিছিল, সভা ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে রেল যোগাযোগ উন্নয়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের বক্তব্য এখন অনেকটা অভিন্ন—আর ঘোষণা নয়, এবার তাঁরা বাস্তব কাজ দেখতে চান।
কারণ একটি ট্রেন শুধু কয়েকশ যাত্রীকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায় না। একটি কার্যকর রেলপথের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের সময়, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, কর্মসংস্থান এবং একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতি।

৩ সেপ্টেম্বর পেরিয়ে গেছে। সংসদে ঘোষিত তারিখও এখন অতীত। অথচ সিলেটবাসীর অপেক্ষা শেষ হয়নি।
তাঁরা আর নতুন কোনো তারিখ শুনতে চান না। তাঁরা দেখতে চান ট্রেন। দেখতে চান আধুনিক রেললাইন। চান দ্রুতগামী ও নির্ভরযোগ্য রেলসেবা।
সিলেটের রেলপথ যেন আর প্রতিশ্রুতির স্টেশনে দাঁড়িয়ে না থাকে—এটাই এখন এই অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা।