img

আলঝেইমার রোগ: প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও পরিচর্যার গুরুত্ব

প্রকাশিত :  ১৭:০১, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৭:০৩, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আলঝেইমার রোগ: প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও পরিচর্যার গুরুত্ব

॥ হুসনা খান হাসি॥

প্রতি বছর ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আলঝেইমার রোগ দিবস পালিত হয়, আলঝেইমার রোগ এবং অন্যান্য ধরনের ডিমেনশিয়া সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। ১৯৯৪ সালে Alzheimer’s Disease International (ADI) এই দিবসটি চালু করে। এরপর থেকে এটি সচেতনতা বৃদ্ধি, রোগকে ঘিরে বিদ্যমান সামাজিক নেতিবাচক ধারণা ও বৈষম্য কমানো এবং উন্নত রোগ নির্ণয় ও পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালে এই বার্তার গুরুত্ব আরও বেড়েছে, কারণ বিশ্বব্যাপী ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আলঝেইমার রোগ একটি ক্রমশ অবনতিশীল মস্তিষ্কজনিত রোগ, যা ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি, চিন্তাশক্তি, যুক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা এবং দৈনন্দিন কাজ সম্পাদনের সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এটি ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতে, ডিমেনশিয়ার মোট রোগীর প্রায় ৬০–৭০ শতাংশ আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। ডিমেনশিয়াকে বার্ধক্যের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়, যদিও বয়স বৃদ্ধি এর অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ।

এই প্রেক্ষাপটে ডিমেনশিয়া বর্তমানে বিশ্বের একটি বড় স্বাস্থ্য ও সামাজিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫৭ মিলিয়ন মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন, যাদের মধ্যে ৬০ শতাংশেরও বেশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বসবাস করতেন। প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ কোটি নতুন ডিমেনশিয়া রোগী শনাক্ত হন। ডিমেনশিয়া বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর সপ্তম প্রধান কারণ এবং বয়স্ক মানুষের প্রতিবন্ধিতা ও অন্যের ওপর নির্ভরশীলতার অন্যতম প্রধান কারণ।

এই বাস্তবতা ডিমেনশিয়াকে শুধু দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করা স্মৃতিশক্তির সমস্যা বা বারবার ভুলে যাওয়াকে শুধুমাত্র বয়সের স্বাভাবিক প্রভাব বলে উপেক্ষা করা উচিত নয়। দ্রুত রোগ শনাক্ত হলে রোগী ও তাঁর পরিবার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি রোগ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা লাভ করতে পারেন। একই সঙ্গে চিকিৎসা, ভবিষ্যৎ পরিচর্যা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আগেভাগে পরিকল্পনা করা সম্ভব হয়।

এ কারণে রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং সেগুলো সময়মতো শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলঝেইমারের শুরুতে একজন ব্যক্তি সাম্প্রতিক ঘটনা বারবার ভুলে যেতে পারেন, গুরুত্বপূর্ণ জিনিস কোথায় রেখেছেন তা মনে রাখতে না পারেন অথবা পরিচিত স্থানেও বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন। কথা বলার সময় উপযুক্ত শব্দ খুঁজে পেতে সমস্যা, পরিচিত কাজ করতে অসুবিধা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দুর্বলতাও দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি ব্যক্তির মেজাজ, আচরণ ও ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে লক্ষণ এক রকম নয়। তাই দীর্ঘদিন ধরে এমন সমস্যা চলতে থাকলে নিজে রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

এসব লক্ষণ দেখা দিলে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া শুধু রোগটি শনাক্ত করার জন্যই নয়, বরং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা পাওয়ার পথও তৈরি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) -এর মতে, উপযুক্ত সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ। সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত হলে রোগী চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা এবং সামাজিক সেবার সুযোগ পেতে পারেন। একই সঙ্গে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক পরিচর্যার মাধ্যমে তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ, প্রয়োজন এবং স্বাধীনতাকে যথাসম্ভব সম্মান করা যায়। তবে অনেক দেশে সচেতনতার অভাব, সামাজিক কলঙ্ক, বিশেষজ্ঞের স্বল্পতা এবং স্বাস্থ্যসেবায় অসম প্রবেশাধিকারের কারণে সময়মতো রোগ নির্ণয় এখনও কঠিন। এই প্রেক্ষাপটে, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করার গুরুত্ব শুধু রোগীর বর্তমান উপসর্গ নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা এবং নতুন চিকিৎসা-পদ্ধতির সুযোগ গ্রহণের পথও তৈরি করতে পারে।

বর্তমানে আলঝেইমার রোগের সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব নয়। তবে রোগটি শুরুতেই শনাক্ত হলে উপযুক্ত সময়ে চিকিৎসা ও সহায়তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। কিছু ওষুধ রোগের বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। একই সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ের আলঝেইমার রোগীদের জন্য নতুন ধরনের disease-modifying treatment বা রোগের অগ্রগতি ধীর করার চিকিৎসা তৈরি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৬ সালের Alzheimer’s Association-এর প্রতিবেদনে lecanemab ও donanemab-এর অনুমোদনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এগুলো কোনো নিরাময় নয় এবং প্রত্যেক রোগীর জন্য উপযুক্তও নয়। এসব চিকিৎসার সম্ভাব্য উপকারিতা ও ঝুঁকি স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীদের মাধ্যমে সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন

তবে, চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীর সামগ্রিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক পরিচর্যাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আলঝেইমার রোগের প্রভাব শুধু স্মৃতিশক্তির ওপর পড়ে না; এটি ব্যক্তির স্বাধীনতা, যোগাযোগ, আবেগ এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনকেও প্রভাবিত করে। তাই শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে রোগীর সামগ্রিক সুস্থতার দিকে নজর দিতে হবে। নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, মানসিক অনুশীলন, সামাজিক যোগাযোগ, পুনর্বাসন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং মানসিক সহায়তা রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে। পাশাপাশি রোগীর পরিবার ও পরিচর্যাকারীদেরও যথাযথ সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।

এই প্রেক্ষাপটে, রোগীর পরিচর্যায় পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আলঝেইমার রোগ একজন ব্যক্তির পাশাপাশি তাঁর পরিবারকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনেরা প্রায়ই দীর্ঘ সময় ধরে রোগীর দৈনন্দিন পরিচর্যা ও তদারকির দায়িত্ব পালন করেন। WHO-এর হিসাব অনুযায়ী, অনানুষ্ঠানিক পরিচর্যাকারীরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ ঘণ্টা রোগীর পরিচর্যা ও তদারকিতে ব্যয় করেন। ২০১৯ সালে ডিমেনশিয়ার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক পরিচর্যার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাই পরিচর্যাকারীদের প্রশিক্ষণ, কাউন্সেলিং, বিশ্রামের সুযোগ এবং সামাজিক সহায়তা প্রদান অত্যন্ত জরুরি।

তবে পরিবারের ওপর এই পরিচর্যার দায়িত্ব শুধু মানসিক ও সামাজিক চাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপও যুক্ত হয়। আলঝেইমার রোগের কারণে পরিবার ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর ব্যাপক আর্থিক চাপ তৈরি হয়। এর মধ্যে চিকিৎসা ব্যয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, সামাজিক সেবা এবং কর্মক্ষমতা হারানোর মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রে ৭ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ আলঝেইমার রোগ নিয়ে বসবাস করছেন। Alzheimer’s Association-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ডিমেনশিয়া-সম্পর্কিত স্বাস্থ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ব্যয় ৪০৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে তা প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ফলে দ্রুত রোগ নির্ণয়, যথাযথ পরিচর্যা এবং গবেষণায় বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ক্রমবর্ধমান এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় শুধু উন্নত চিকিৎসা ও পরিচর্যার ওপর নির্ভর করাই যথেষ্ট নয়। রোগের ঝুঁকি কমানো এবং এর সূত্রপাত বিলম্বিত করার দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আলঝেইমারের সব ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে কিছু পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি মোকাবিলার মাধ্যমে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমানো এবং রোগের সূত্রপাত বিলম্বিত করা সম্ভব হতে পারে। WHO-এর মতে, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান, অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, শ্রবণশক্তি হ্রাস এবং বায়ুদূষণ ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। WHO-এর ২০২৬ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী, এসব পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি মোকাবিলার মাধ্যমে ডিমেনশিয়ার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ঘটনা প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করা সম্ভব হতে পারে, যার পরিমাণ ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তাই নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং ধূমপান পরিহারের মতো পদক্ষেপ ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়া মোকাবিলায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোগটি সম্পর্কে সময়মতো সচেতন হওয়া এবং প্রাথমিক পর্যায়েই চিকিৎসা ও সহায়তা নেওয়া। প্রাথমিক রোগ নির্ণয়ের অন্যতম বড় বাধা হলো সামাজিক কলঙ্ক বা stigma। অনেকে বৈষম্যের ভয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে চান না অথবা মনে করেন যে এ রোগের ক্ষেত্রে কিছুই করার নেই। ২০২৪ সালের World Alzheimer Report-এ দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষের ৮০ শতাংশ মনে করতেন ডিমেনশিয়া বার্ধক্যের স্বাভাবিক অংশ। একই সময়ে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষের ৮৮ শতাংশ জানিয়েছেন যে তারা কোনো না কোনো ধরনের বৈষম্যের অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন। এসব তথ্য দেখায় যে বিশ্ব আলঝেইমার দিবসের মতো সচেতনতামূলক কর্মসূচি ভুল ধারণা দূর করা এবং স্মৃতিশক্তির সমস্যা ও ডিমেনশিয়া নিয়ে খোলামেলা আলোচনা উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

এই বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, সামাজিক সচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। রোগী ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্র, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্বই পারে আলঝেইমার আক্রান্ত মানুষের জীবনকে আরও নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সহনীয় করে তুলতে। সেই দায়িত্ব ও সচেতনতার সামগ্রিক বার্তাই বিশ্ব আলঝেইমার দিবসের তাৎপর্যকে আরও গভীর করে তোলে।

বিশ্ব আলঝেইমার দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আলঝেইমার রোগ কেবল স্মৃতিশক্তি হারানোর সমস্যা নয়; এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করে। বিশ্বব্যাপী ৫৭ মিলিয়ন মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত থাকার প্রেক্ষাপটে এবং প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি নতুন রোগী যুক্ত হওয়ায় দ্রুত শনাক্তকরণ ও যথাযথ পরিচর্যার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ, ব্যক্তি-কেন্দ্রিক পরিচর্যা, পরিচর্যাকারীদের সহায়তা এবং পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি কমানোর মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। তাই বিশ্ব আলঝেইমার দিবসের মূল বার্তা হওয়া উচিত: সচেতনতা বাড়াতে হবে, দ্রুত রোগ শনাক্ত করতে হবে, মানবিক পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে এবং গবেষণার মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য আরও কার্যকর সমাধান খুঁজে যেতে হবে।

হুসনা খান হাসি
লন্ডন, ইউকে
২১/০৯/২৯২৬

মতামত এর আরও খবর

img

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি : সরকার আরও ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি নিতে পারত

প্রকাশিত :  ০৬:২১, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৮:৫৫, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশে যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, তখনই বাড়ানো হয়েছে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম। এর প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে কিছু ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে পড়তে পারে। আবার কিছু পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে এবং সময়ের ব্যবধানে এর প্রভাব দৃশ্যমান হতে পারে।

তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে পরিবহন খাতে। বিশেষ করে গণপরিবহনে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়বে এবং এর চাপ সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে। বর্তমানে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এমনিতেই অনেক বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয় বাড়লে তাদের ওপর চাপ আরও বাড়বে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরোক্ষ প্রভাবও রয়েছে। কৃষিতে জ্বালানি ব্যবহারের খরচ বাড়বে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। কলকারখানায় উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। এসব প্রভাব হয়তো সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হবে না। কিন্তু ধীরে ধীরে পণ্যের দামে তার প্রভাব পড়তে পারে।

সরকারের দিক থেকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্য ভর্তুকির চাপ কমানো। সরকারকে জ্বালানি খাতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ভর্তুকির বোঝা কমানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে কোন জ্বালানির দাম কতটুকু বাড়ানো হবে, তাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সব জ্বালানি তেলের ব্যবহারকারী এবং ব্যবহারক্ষেত্র এক নয়।

পেট্রোল ও অকটেন তুলনামূলক উচ্চ আয়ের মানুষ বেশি ব্যবহার করেন। অবশ্য মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ অকটেন ব্যবহার করে, বিশেষ করে বিভিন্ন রাইড শেয়ারিং সেবায় মোটরসাইকেল ব্যবহৃত হয়। ডিজেল গণপরিবহনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। একটি বাসে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব একসঙ্গে অনেক মানুষের ওপর পড়ে। একই সঙ্গে কৃষি এবং শিল্প-কারখানায় ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে। কেরোসিনের ক্ষেত্রেও নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যবহার বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

আমার মনে হয়, সরকার চাইলে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আরও ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি নিতে পারত। ডিজেল ও কেরোসিনের দাম না বাড়িয়ে অথবা খুব কম বাড়িয়ে পেট্রোল ও অকটেনের দাম তুলনামূলক বেশি বাড়ানো যেত। এখনও বিষয়টি সরকার পুনর্বিবেচনা করতে পারে। এতে ভর্তুকি কমানোর লক্ষ্য পুরোপুরি হয়তো অর্জিত হয়তো হবে না, কিন্তু সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কম রাখা সম্ভব হবে।

সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করছে; একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে। তাই ভর্তুকির সুবিধা কারা পাচ্ছে, তাও দেখতে হবে। আমাদের সমাজে আয়বৈষম্য অনেক বেশি। জ্বালানি তেলের ভর্তুকির সুবিধা যেমন উচ্চআয়ের মানুষ পান, তেমনি নিম্নআয়ের মানুষও পান। ফলে ঢালাওভাবে সব ধরনের জ্বালানির দাম একইভাবে বাড়ানো হলে প্রশ্ন আসে— নিম্নআয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব কি যথেষ্ট বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে? জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তাই সামাজিক বৈষম্য এবং মানুষের আয়স্তর বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। 

এর সঙ্গে এবার আরেকটি বিষয় যুক্ত হয়েছে— সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো। শুধু পে স্কেল নিজে মূল্যস্ফীতির ওপর খুব বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে আমি মনে করি না। কারণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার তুলনায় খুব বেশি নয়। কিন্তু নতুন পে স্কেল এবং একই সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি—এ দুটি ঘটনা একসঙ্গে মানুষের মধ্যে একটি ‘ইনফ্লেশনারি এক্সপেক্টেশন’ বা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে।

মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা তৈরি হলে তা বাজারের স্বাভাবিক আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। যেমন আমি যদি চালের ব্যবসায়ী হই এবং মনে করি, সামনে চালের দাম আরও বাড়বে, তাহলে আজই সব চাল বিক্রি না করে কিছুদিন ধরে রাখতে চাইতে পারি। একইভাবে আমি যদি পেঁয়াজের ব্যবসায়ী হই এবং মনে করি, সামনে পেঁয়াজের দাম বাড়বে, তাহলে বিক্রি না করে কিছুদিন মজুত রাখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তখন স্বাভাবিক বাজার ব্যবস্থার বাইরে কৃত্রিমভাবে পণ্য ধরে রাখার প্রবণতা তৈরি হয়। এর ফলে মূল্য আরও বাড়তে পারে।

আরেকটি বড় বিষয় হচ্ছে, সরকারি ব্যয়ের অপচয় কমানো জরুরি। প্রয়োজনীয় ব্যয় অবশ্যই করতে হবে। তবে অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। অনেক সরকারি অফিসে অতিরিক্ত সাজসজ্জা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। জেলা শহরের অফিস, সরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও এমন উদাহরণ রয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা, সরকারি সফর, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তাও পর্যালোচনা করা দরকার। পে স্কেলের মাধ্যমে সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি এসব ক্ষেত্রে দক্ষতা ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিশ্চিত করতে হবে। 

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, সিপিডি