প্রকাশিত :  ১৬:৫৪, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১
সর্বশেষ আপডেট: ০২:৩৩, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২১

সাপ্তাহিক জনমত : বায়ান্নো বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস

সাপ্তাহিক জনমত : বায়ান্নো বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস

ফারুক আহমদ: ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরে নিয়মিতভাবে প্রকাশিত সবচে’ দীর্ঘজীবী বাংলা পত্রিকা হচ্ছে সাপ্তাহিক জনমত। উপমহাদেশের বাইরে বাংলা পত্রিকা প্রকাশনার ইতিহাসে সাপ্তাহিক জনমত শুধু একটি মাইল ফলকই নয়; একইসঙ্গে বিলাতসহ  ইউরোপের বাঙালি সম্প্রদায়ের প্রায় অর্ধ-শতাব্দীর একটি লিখিত ইতিহাসও বটে।

এ টি এম ওয়ালী আশরাফ, আনিস আহমদ, এস জেড শাহ ও রাব্বী মাহমুদ হাসানের মালিকানাধীনে এবং ফজলে রাব্বী মাহমুদ হাসানের সম্পাদনায় ১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। 

তখন ‘জনমত পাবলিশার্স লি.’-এর পক্ষে আনিস আহমদ কর্তৃক  দক্ষিণ লন্ডনের ৩০৩ ব্রিক্সটন রোড থেকে মুদ্রিত হয়ে ১৮ গ্যালভেস্টন রোড, পূর্ব পাটনি থেকে প্রকাশিত হয় (জনমত, ২৩ ডিসেম্বর ২০১০)। ম্যাগাজিন আকারের (১১.৭ মি. মি. ঢ ১৬.৫ মি. মি.) বিশ পৃষ্ঠার  কাগজটির মূল্য ছিল এক শিলিং। 

পত্রিকাটির প্রকাশনা সম্পর্কে প্রথম বর্ষ, প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে বলা হয়:

বিলাতে বসবাসকারী লক্ষাধিক বাঙালি। এদের মধ্যে একের সঙ্গে অন্যের এবং এদের সঙ্গে বহির্জগতের এবং দেশের সর্বপ্রকার পরিস্থিতির সঙ্গে এক কার্যকরি যোগসূত্র সৃষ্টি করাই এ পত্রিকার উদ্দেশ্য; দু’টি প্রশ্নই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া মাতৃভাষার মাধ্যমে একে অন্যের সংগে সংযোগ সৃষ্টি করা, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পর্যায়ে মতামত ব্যক্ত করা এবং সর্বোপরি সংবাদ সরবরাহের সুবিধা বা সুযোগের প্রশ্নও সামান্য নয়। 

এ পত্রিকা মূলতঃ সমাজকেন্দ্রিক, রাজনীতিকেন্দ্রিক নয়। তাই রাজনীতি পর্যালোচনাপেক্ষা গঠনমূলক সামাজিক চেতনা সৃষ্টি করার দায়িত্ব প্রাথমিক। বিলাতে বসবাসকারী বিপুলসংখ্যক বাঙালির প্রতিদিনের সমস্যা ও প্রশ্নের পরিচিতি দেয়া, সকলকে এ সমস্যা সম্পর্কে সচেতন করে এবং সমস্যাগুলিকে মেনে নিয়ে সেগুলি সমাধানের পথে সাহায্য করা, এ পত্রিকার প্রাথমিক দিক। প্রবাসী বাঙালির দৈনন্দিন জীবন দেশীয় এবং বিদেশীয় রাজনীতি প্রত্যক্ষভাবে যতটা প্রভাবিত এবং যতটুকু প্রবৃত্ত করে, বিদেশে বসবাসকারী বাঙালির মুখপত্র হিসেবে জনমত-এর রাজনৈতিক দায়িত্ব ততটুকু। 

জাতি হিসাবে বাঙালির স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট এবং এ দিক থেকে জনমত-এর আবেদন জাতীয়তাবাদ; দেশাত্ববোধের প্রশ্ন এখানে জড়িত। 

২১শে ফেব্রুয়ারি জনমত প্রকাশনার দিন নির্ধারণের কারণ এতই স্পষ্ট যে, সে বিষয়ে কিছু বলা বাহুল্য না হলেও নিষ্প্রয়োজনীয়। পুনরাবৃত্তি হলেও এতটুকু বলা কর্তব্য যে, মাতৃভাষা দাবির প্রশ্নে যাঁরা শহীদ হয়েছেন এ দিনটিতে তাদের স্মরণ করলেই আমাদের দায়িত্ব সম্পূর্ণ হবে নাÑ এ সম্পর্কে গঠনমূলক কিছু করে সে সত্যকে সজীব রাখার প্রচেষ্টায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। বিলাতের এ ধরনের প্রচেষ্টা একেবারে প্রথম না হলেও এ আবেদন প্রথম এবং দৃষ্টিভঙ্গি মৌলিক এবং বিস্তীর্ণতর। তবু যে কথা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ জনমত-এর জনপ্রিয়তা, স্বার্থকতা ও সমৃদ্ধি সব কিছুই আপনাদের সহযোগিতা, আনুকূল্য ও অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল। জনমত প্রসঙ্গে যে কোনো উপদেশ অথবা পরামর্শ আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করবো। যা কিছু ত্রুটি রইলো তা আপনাদের সুন্দর দৃষ্টি দিয়ে সামান্য করে দেখবেন।

সাপ্তাহিক জনমতের আত্মপ্রকাশের সঙ্গে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয় রেনেসাঁসের যোগসূত্র বিদ্যমান। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের রক্তাক্ত অভ্যুত্থান ঘটে। ঠিক এরই সতের বছর পরে, ব্রিটেনের রাজধানী লন্ডনে একই দিনে জনমতের জন্মকে বিলাতের বাঙালি সম্প্রদায় বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের ফসল হিসেবে চিহ্নিত করেই গর্ববোধ করেন। জনমত তার জন্মের পর সূতিকাগার থেকে বেরুতে না বেরুতেই শুরু হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ। সে-সময় বিলাতের বাঙালি অধ্যুষিত প্রায় প্রতিটি উল্লেখযোগ্য শহর থেকে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় প্রচারপত্র এবং সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। সেগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে গৌরবজনক ভূমিকা পালন করলেও প্রচার ছিল এক-একটি এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তখন সাপ্তাহিক জনমত’ই ছিল বিলাতসহ সমগ্র ইউরোপে বাঙালি সম্প্রদায়ের নিরপেক্ষ ও নির্ভীক সংগ্রামী মুখপত্র। কাগজটি বাঙালিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে এর পক্ষে জনমত গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।  

স্বাধীনতা সংগ্রামে সাপ্তাহিক জনমতের ভূমিকা সম্পর্কে বহির্বিশ্বে নিযুক্ত মুজিবনগর সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি (পরবর্তীকালে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি) বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী লিখেছেন: 

ওয়ালী আশরাফ সম্পাদিত সাপ্তাহিক জনমত পত্রিকা আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে বিশেষ অবদান রেখেছে। বাঙালি মহলে পত্রিকাটি ছিল বহুল প্রচারিত। ব্রিটেনের বাহিরেও প্রবাসীগণের অনেকে পত্রিকাটির গ্রাহক ছিলেন। স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হওয়ার পর তারা নিজেরাই পাকিস্তান দূতাবাস থেকে যে সব বিজ্ঞাপন নিয়মিত পেতেন সেগুলো প্রত্যাখান করেন। পত্রিকায় ওয়ালী আশরাফ ও আনিস আহমদ জোরালো ভাষায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে সম্পাদকীয় লিখেছেন (চৌধুরী ১৯৯২: ১৪৫)।