উপন্যাসে বিভাজন, বৈষম্য ও মানবিক মূল্যবোধ
সাহিত্য সমাজের দর্পন। মানু্ষের জীবন বোধ, জীবন প্রণালী, চিন্তা, চেতনা, আর্থ সামাজিক চিত্রেরই এক প্রতিচ্ছবি হচ্ছেসাহিত্য। কবি সাহিত্যিকরা তাদের সাহিত্য কর্মে সমাজের রূপ যেমন অংকন করেন পাশাপাশি সমাজ বিনির্মানে তাদের নিরন্তর প্রয়াশও পরিলক্ষিত হয় সাহিত্যে। মানুষের ভাবনা ও প্রাত্যহিক জীবনের মূর্ত প্রকাশ ঘটে সাহিত্যে। এই অর্থে সাহিত্য জীবনেরই প্রতিচ্ছব। কবিতা, ছোট গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাস সব মিলেই সাহিত্য। প্যারীচাঁদ মিত্রের প্রথম উপন্যাস ‘আলালের ঘরের দুলাল’ এই উপন্যাসের মাধ্যমেই উপন্যাসের যাত্রা। উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের একটি মডার্ন ফর্ম। উপন্যাসের পূর্বে বাংলা সাহিত্যের শুরুর দিকটি আলোচনা আবশ্যক।
বাংলা ভাষার প্রথম বইটি হচ্ছে ‘চর্যাপদ’। বাঙলার পন্ডিতরা চর্যাপদকে দাবী করেন বাংলাবলে। চর্যাপদে আর্য ভাষার প্রভাব রয়েছে। ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত বই ‘বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ গন্ত্রে চর্যাপদকে বাঙালির বলে উল্লেখ করেছেন। ২৪ জন বৌদ্ধ বাউল কবির ৪৬টি পূর্ণ কবিতা নিয়েই রচিত হয় চর্যাপদ।চর্যাপদরচিত হয়েছিল ৯৫০ থেকে ১২০০ অব্দের মধ্যে। মহা পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদকে নেপালের রাজ দরবার থেকে আবিষ্কার করেন। মধ্যযুগের রচিত হয়েছিল ‘শ্রী কৃষ্ণকীর্তন’ মহা কাব্য, যা রচনা করেন বড়ু চণ্ডীদাস। তিনিই হচ্ছেন বাংলা ভাষার প্রথমমহা কবি। ডক্টর হুমায়ূন আজাদ বড়ু চণ্ডীদাসকে আমাদের প্রথম রবীন্দ্রনাথ বলে দাবী করেন।
বাংলা সাহিত্যের এক অপরাজেয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপধ্যায়। অসংখ্য জনপ্রিয় উপন্যাস লিখে তিনি বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে সমাদৃত হয়ে আছেন। দেবদাস পড়েননি এমন কম সাহিত্যানুরাগী রয়েছেন। কৈশোর ও যৌবনের সন্ধিক্ষনে বইটি পড়ে নিরবে কেঁদেছেন অনেক তরুণ। দেবদাসের শেষ পৃষ্ঠায় তাঁর কথনটি —“মরনে ক্ষতি নাই কিন্তু এমন করিয়া কারো যেন মৃত্যু না হয়। একটি স্নেহার্দ কন্টস্বর যেন তার ললাটে পৌঁছে, একটি স্নেহময়ী মুখ দেখিয়া যেন জীবনের অন্ত শেষ হয়”। যা মানব হৃদয়কে সহজেই আহত করে।
শরৎচন্দ্র তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস শ্রীকান্তে একটি পর্যায়ে লিখেন, “আগামীকাল বাঙালি ও মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে ফুটবল ম্যাচ” কথাটিতে স্পষ্টতই বিভাজন লক্ষনীয়, যেন মুসলমানরা বাঙালি নন। শুধু হিন্দু বাঙালিই বাঙালি এই চেতনাটি তাঁর সামন্ত চেতনারই বহিঃপ্রকাশ। হিন্দুরা বাঙালিত্বের একক দাবীদার এই উক্তিটি তাঁর শ্রেনী চেতনার এক নগ্নপ্রকাশ বলেই আমি মনে করি।
আবার শরৎচন্দ্র চট্টোপধ্যায় হিন্দু সমাজের রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে তাঁর গল্প উপন্যাসে প্রতিবাদ করেছেন। তাঁর ‘গৃহদাহ’ ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসের কারনে তিনি হিন্দু প্রতিক্রিয়াশীলদের কাছে বিরাগভাজন হয়েছেন।
১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে শরৎচন্দ্র চট্টোপধ্যায়কে ডি লিট ডিগ্রী প্রদান করে। এই সময় হিন্দু রক্ষণশীলরা শরৎচন্দ্রকে ডি লিট ডিগ্রী প্রদান করার সমালোচনা করে।
অনেক কালজয়ী উপন্যাসের জনক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপধ্যায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্থম বি এ পরীক্ষা দিয়েছিলেন ১৩ জন, পাশ করেন দুই জন। সেই ভাগ্যবান দুজন হলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপধ্যায় ও যদুনাথ বসু। তাঁরা উপমহাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম স্নাতক। উপন্যাসে জীবনের বহু দিক স্থান পায়। উপন্যাসে অনেক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত লক্ষ করা য়ায়। প্রগতিশীলতার বদলে লালন করা হয় রক্ষনশীলতাকে। বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণকান্তের উইল—এর বিধবা রূপসী নারী রোহিনী। রোহীনী বাল্যবিধবা। তৎকালীন সমাজ রোহানীর কামনা বাসনা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র যেন সেই সমাজেরই প্রতিভূ। বঙ্কিমচন্দ্র রোহীনীকে শাস্তি দেন; বন্দুকের গুলিতে মরতে হয় রোহীনীকে। বঙ্কিমচন্দ্র রোহীনীকে মেরে হিন্দু সমাজের প্রথা রক্ষা করেন।
আধুনিক কালের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাসে পাই ভিন্নচিত্র। রবীন্দ্রনাথের চোখের বালীর বিনোদিনীও বিধবা কিন্তু তাকে শাস্তি দেন নি। তার কামনা বাসনাক সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবিতা, ছোট গল্প ও প্রবন্ধে এক বিস্ময়কর প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোরা উপন্যাসের গৌরমোহন বাবু যখন হিন্দু সমাজের রীতি, নীতি প্রথা ও রক্ষনশীলতাকে আকরে ধরতে চায়। সমাজের বাস্তবতার সাথে কোনোভাবেই আপোষ করতে চায় না। ব্রম্মধর্মের মেয়ের সাথে তার বন্ধু বিনয়ের বিয়ে হোক — তা সে কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারে না। এক সময় গোরা জানতে পারে সে আইরিশ, হিন্দুর ঘরে বেড়ে উঠা। সে নিজকে আবিষ্কার করলো নতুন রূপে। সে বললো, “আমি আজ ভারতবর্ষীয়। আমার মধ্যে হিন্দু মুসলমান খৃষ্টান কোনো সমাজের কোনো বিরোধ নেই, ভারত বর্ষের সকল জাতই আমার জাত”। তার আরেকটি উক্তি হলো, “আজ আমি এমন শূচী হয়ে উঠেছি যে চন্ডালের ঘরে আমার আর অপবিত্রতার ভয় রইলো না”। রবীন্দ্রনাথগোরাকে সৃস্টি করলেন এক নতুন মানুষ রূপে, সে আজ সবার, তার কাছে আর জাতের বলাই নেই। গোরা যেন রবীন্দ্রনাথের এক বিষ্ময়কর সৃষ্টি।
সমাজ প্রতিনিয়তই বিকাশমান। বিকাশমান সমাজব্যবস্থায় সাহিত্য কর্মের বিকাশও লক্ষনীয়। এই বিকাশ ও উম্মীলন সময়ের ধারাবাহিকতায়ই ঘটে। তাই প্রাচীন ও আধুনিককালের সাহিত্য কর্মে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। লেখক ও ঔপন্যাসিকদের মধ্যে সমাজের রীতি নীতির প্রভাব যেমন পড়ে, আবার ঐ লেখক ও ঔপন্যাসিকরাই সমাজের উর্ধ্বে উঠে সমাজকে নির্মান করেন নতুন নিয়মে। কেউ যেমন প্রথাগত নীতিতে ভেসে যান, আবার কেউ পরিত্যাগ করেন প্রতাগত নীতি বোধ। এই ভাবেই সৃষ্টিশীল সাহিত্য মনণশীলতাকে সম্বৃদ্ধ করে। সাহিত্য হয়ে উঠে জীবনসম্ভারে ও শিল্পনিপুনতায় অসাধারণ।
মোঃ চন্দন মিয়া: প্রাক্তন প্রভাষক, কলামিষ্ট ও কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব।


















