img

‘আর্জেন্টিনা’ নিন্দিত থেকে নন্দিত যেভাবে

প্রকাশিত :  ০৮:২৪, ২৬ ডিসেম্বর ২০২২

‘আর্জেন্টিনা’ নিন্দিত থেকে নন্দিত যেভাবে

মোহাম্মদ মাসুদ খান

এবারের ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরের উত্তাপ এখন দুনিয়া জুড়ে। আমাদের দেশে এর উত্তাপটা বরাবরই মাত্রাতিরিক্ত। মূলত ল্যাটিন দুই ফুটবল পরাশক্তি ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনাকে ঘিরেই আমাদের যতো উন্মাদনা। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া দুই দেশের পতাকা আর জার্সিতে সয়লাব।

জায়ান্ট স্ক্রিনে দলবেঁধে রাতভর খেলা দেখার উৎসব গলি থেকে রাজপথে, মহল্লা থেকে টিএসসি পর্যন্ত। গ্রুপ পর্ব শেষে ৩ ডিসেম্বর-২০২২ থেকে শুরু হয়েছে দ্বিতীয় পর্বের লড়াই।  

মূলত ফুটবলের কল্যাণেই ল্যাটিন দেশগুলোর খ্যাতি বিশ্বব্যাপী। যদিও আরেক ল্যাটিন দেশ উরুগুয়ে গ্রুপ পর্বের বাঁধা ডিঙ্গাতে পারেনি।  তবে এই উরুগুয়ে ১৯৩০ সালে প্রথম বার এবং ১৯৫০ সালে দ্বিতীয় দফায় বিশ্বকাপ জয়ী এক ফুটবল পরাশক্তি।

অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা ৫ বার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলে ১৯৭৮ ও ১৯৮৬ সালে দ্বিতীয় কাপ জয় করে। আর রানার্স আপ ট্রফি পায় ১৯৩০, ১৯৯০ এবং ২০১৪ সালে।

সাম্বা নাচের দেশ আর কিংবদন্তী ফুটবলার পেলে, সক্রেটিস, জিকো, রোমারিও, ডুঙ্গা, বেবেটা, রোনালদো’র দেশ ব্রাজিল একমাত্র দেশ যারা এ পর্যন্ত ২১ টি বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরেই খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। তারা মোট ৭ বার ফাইনাল খেলে ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২ সাল পর্যন্ত সর্বাধিক ৫ বার বিশ্বকাপ শিরোপা জয় করে। ১৯৫০ ও ১৯৯৮ সালে ব্রাজিল রানার্সআপ ট্রফি অর্জন করে।

ফুটবলে ব্রাজিলের জনপ্রিয়তা সর্বজনবিদিত, তাদের ছন্দময় নৈপুণ্যে বিশ্ববাসী মুগ্ধ হয়।

পক্ষান্তরে ফুটবল পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ১৯৭৮ সালে প্রথম বার নিজেদের মাঠে কাপ জিতলেও তা ছিল বিতর্কিত এবং বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে এক কলঙ্কময় অধ্যায়। তবে তারা এ বদনাম গোছাতে সক্ষম হয় ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে। সেবার দিয়াগো ম্যারাডোনার অসাধারণ নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনা ২য় বারের মতো বিশ্বকাপ জয় করে বিশ্বকে তাঁক লাগিয়ে দেয়। 

পৃথিবী জুড়ে সৃষ্টি হয় কোটি কোটি ম্যারাডোনা পাগল ভক্ত। ৮৬ পরবর্তী সময় থেকে ম্যারাডোনা আর আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তার পালে হাওয়া লাগে। আমাদের দেশে এটি রূপ নেয় প্রকট আকারে।

এবার আসা যাক ১৯৭৮ সালের বিতর্কিত শিরোপাধারী নিন্দিত আর্জেন্টিনা ফুটবল দল কিভাবে ১৯৮৬ সালে নন্দিত ফুটবল দলে পরিণত হলো।

১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা ছিল সামরিক শাসনের কবলে। সামরিক জান্তা জেনারেল ভিদেলা তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। তার দু’বছর আগে ৭৬ সালে এক সামরিক অভ্যুথানের মাধ্যমে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইসাবেল পেরনকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে সামরিক জান্তা ভিদেলা ক্ষমতা দখল করেন। শুরু হয় দেশ জুড়ে অরাজকতা। লুটপাট আর দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয় পুরো আর্জেন্টিনা। 

এমন পরিস্থিতিতে অনেকগুলো দেশ বিশ্বকাপের ভেন্যু পরিবর্তনের জন্য ফিফাকে অনুরোধ জানায়। হাতে সময় না থাকায় তা তখন সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত অস্থিতিশীল আর্জেন্টিনাতেই বসে বিশ্বকাপের ১১তম আসর। প্রতিবাদ স্বরূপ সেই বিশ্বকাপ বর্জন করেন জার্মান তারকা পল ব্রেইটনার, ডাচ তারকা ইয়োহান করুইফসহ আরও অনেকে।

১১তম বিশ্বকাপ ফুটবল আসর শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে সামরিক জান্তা সরকার হত্যা করে আয়োজক কমিটির প্রধানকে, যাতে জান্তা সরকারের অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ কোন প্রতিবাদ না করতে পারে।

সেবার আর্জেন্টিনাকে কাপ পাইয়ে দিতে যা যা করা দরকার তার সব কিছুই করেছিল সেই সামরিক জান্তা সরকার। খেলার সময় সূচি সুবিধামতো নির্ধারণ, পাতনো ম্যাচ খেলা, প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের গালমন্দ এমনকি বাসায় আক্রমণ পর্যন্ত করা হয়েছে শুধুমাত্র আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতাতে।

বহু বিতর্কের মধ্যে সে বছর ১ জুন ষোলটি দেশকে নিয়ে শুরু হয় বিশ্বকাপের আসর। প্রথম পর্ব খুড়িঁয়ে খুঁড়িয়ে কোনমতে পার করলেও দ্বিতীয় রাউন্ডে স্বাগতিক আর্জেন্টিনাকে ব্রাজিল, পেরু ও পোল্যান্ডের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হয়।  

আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল উভয়ই তাদের ১ম ম্যাচে জয়ী হয়। ২য় ম্যাচে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয় এবং খেলাটি ড্র হয়। ব্রাজিল শেষ ম্যাচে পোল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-১ গোলে জয়ী হয়। তাই ফাইনালে যেতে এক কঠিন সমীকরণের মুখে পড়ে আর্জেন্টিনা, পেরুর বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচে আর্জিন্টিনাকে ফাইনালে যেতে দরকার হয় ৪-০ গোল ব্যবধানে জয়ী হওয়া। শক্তিশালী পেরুর বিরুদ্ধে যা ছিলো দুরূহ। 

তখন সবাই যখন ভাবছিল স্বাগতিকদের আর ফাইনালে ওঠা সম্ভব নয়, আর তখনই আর্জেন্টিনা এক পাতানো ম্যাচে পেরুকে ৬-০ গোল ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনলে ওঠে যায়। এ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে নানা সমালোচনা শুরু হয়। 

আর্জেন্টিনা ছিল পাশের দেশ পেরুতে প্রধান গম সরবরাহকারী দেশ। অন্যদিকে ১৩ জন পেরুর নাগরিক বন্দী ছিল আর্জেন্টিনার কারাগারে। তাই আর্জেন্টিনার জান্তা সরকার পেরুকে বাধ্য করে তাদের বিরুদ্ধে খারাপ ম্যাচ খেলতে। 

এছাড়াও সেবার স্বাগতিক আর্জেন্টিনার সবগুলো ম্যাচেই রাতে সব শেষে হতো যাতে তারা পুর্বের ম্যাচের ফলাফল জেনে ম্যাচ খেলতে পারে। বলাবাহুল্য এই বিতর্কের কারণে ১৯৮৬ বিশ্বকাপ আসর থেকে খেলার সূচিতে পরিবর্তন আসে। একই গ্রুপের দুটি দলের মধ্যে শেষ ম্যাচ একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হবে, যাতে কেউ কারো ফলাফল আগাম জানতে না পারে।

এদিকে, ফাইনালে আর্জেন্টিনার জান্তা সরকার আরও বিতর্কিত কাজ করে। প্রতিপক্ষ নেদারল্যান্ড দলকে স্টেডিয়ামে সরাসরি প্রবেশ না করিয়ে বহু পথ ঘুরিয়ে মাঠে আনা হয়।  মাঠে প্রবেশের সময় স্বাগতিক দর্শক দ্বারা নেদারল্যান্ডের ফুটবলাররা গাল মন্দের শিকার হন। ফাইনাল শুরুর আগেই ডাচ দলকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলা হয়। 

ডাচ দল ছিলও সে সময়ের সবচাইতে শক্তিশালী ফুটবল দল। তখন তাদের সেরা তারকা ছিলেন ইয়োহান করুইফ। জানা যায়, আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা সরকারের নির্দেশে কিছু দুর্বৃত্ত নেদারল্যান্ডের তারকা ফুটবলার ইয়োহান করুইফের বাসায় হামলা চালায়, যাতে তিনি  বিশ্বকাপে না খেলেন।

১৯৭৮ সালে প্রথমবার নিজেদের মাঠে বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে আর্জেন্টিনা

ফাইনালের আগেই মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়া ও তারকা ফুটবলার ইয়োহান করুইফ বিহীন নেদারল্যান্ড দল শেষ পর্যন্ত ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে ৩-১ গোলের ব্যবধানে হেরে যায়।

এই নিন্দিত আর্জেন্টিনাই এখন নন্দিত ও জনপ্রিয় ফুটবল দল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। 

মূলত মেক্সিকো বিশ্বকাপে ১৯৮৬ সালে দিয়াগো ম্যারাডনার নেতৃত্বে অসাধারণ ফুটবল খেলে আর্জেন্টিনা দল নন্দিত হিসাবে বিশ্বকাপ জয় করে। অবশ্য ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনা নন্দিত হবার অন্যতম কারণ ছিল কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড দলকে ২-১ গোলে হারানো।

মেক্সিকো সিটি’র এস্তাদিও আসতেকা স্টেডিয়ামে ১৯৮৬ সালের ২২ জুন অনুষ্ঠিত আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড জাতীয় দলের মধ্যকার কোয়ার্টার ফাইনালটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার সংঘটিত ফকল্যান্ড যুদ্ধের ৪ বছর পর। 

উল্লেখ্য, ১৯৮২ সালের এপ্রিল-জুন মাসে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মাঝে সংঘটিত প্রকট যুদ্ধে যুক্তরাজ্যের প্রধান রাজ্য ইংল্যান্ডের কাছে আর্জেন্টিনা পরাজিত হয়। সেসময় যুক্তরাজ্য প্রায় নয় হাজার মাইল আটলান্টিক সাগর পাড়ি দিয়ে আর্জেন্টিনার দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত ফকল্যান্ড দ্বীপটি আর্জেন্টিনার কবল থেকে উদ্ধার করে।

চার বছর পর ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি তাই ফুটবল দ্বৈরথে নতুন মাত্রা যোগ করে। বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্ববাসীর নজর ছিল সেই খেলাটির দিকে। ইংল্যান্ডের কাছে ফকল্যান্ড যুদ্ধে পরাজয়ের কারণে আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের প্রতি বিশ্ববাসীর এক প্রকার সহানুভূতি ছিল। সেই ম্যাচে ফুটবল ইতিহাসের দুটি বিখ্যাত গোল হয়েছিল। আর সেই দুটি গোলই করেছিলেন আর্জেন্টিনার তৎকালীন অধিনায়ক ও সেরা খেলোয়াড় দিয়াগো ম্যারাডোনা।

দ্বিতীয়ার্ধে অর্থাৎ খেলার ৫১ মিনিটে করা ম্যাচের ১ম গোলটি “ঈশ্বরের হাতের গোল” নামে খ্যাত। রেফারির চোখকে ফাঁকি দিয়ে ম্যারডোনা হাত দিয়ে গোলটি করেছিলেন। ১ম গোলের চার মিনিট পর ম্যারাডোনা ইংল্যান্ড দলের রক্ষণভাগের পাঁচ জন খেলোয়াড় ও শেষে গোল রক্ষক পিটার শিল্টনকে কাটিয়ে ২য় গোলটি করেন। 

২০০২ সালে ফিফা অনলাইনে ভোটের আয়োজন করলে ২য় গোলটি শতাব্দীর সেরা গোল হিসাবে নির্বাচিত হয়।

পরে ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা ফুটবল দল ২৬ জুন ’৮৬ সেমিফাইনালে বেলজিয়ামকে ২-০ এবং ২৯ জুন ’৮৬ ফাইনালে পশ্চিম জার্মানীকে ৩-২ গোলে হারিয়ে ২য় বারের মতো বিশ্বকাপ ফুটবল ট্রফি জয় করে নন্দিত ফুটবল দল হিসাবে বিশ্ব ফুটবলে পরিচিতি অর্জন করে।

শুধু তাই নয়, ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনা ম্যারাডনার নেতৃত্বে ফাইনালে ওঠে।

এরপর নন্দিত আর্জেন্টিনা আর কোন বিশ্বকাপ ফুটবলে শিরোপা না পেলেও জন্ম দেয় বহু তারকা খেলোয়াড়। ফুটবল কিংবদন্তী ম্যারাডোনার পর বাতিস্তুতা আর সর্বশেষ তারকা লিওনেল মেসি তার অনন্য উদাহরণ।

লেখকঃ সাধারণ সম্পাদক, শেরেবাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় অ্যালামনাই এসোসিয়েশন।

মতামত এর আরও খবর

img

বিভক্তির রাজনীতি নয়, এখন সময় এসেছে বাংলাদেশকে নিয়ে একসঙ্গে ভাবার

প্রকাশিত :  ১৩:৩৪, ২২ মে ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের রাজনীতি বহু বছর ধরেই যেন এক দীর্ঘ মেরুকরণের গল্প। এখানে মতের চেয়ে পরিচয় বড় হয়ে উঠেছে, যুক্তির চেয়ে উচ্চকণ্ঠের স্লোগান বেশি শোনা গেছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্টেছে ভাষা, বদলেছে প্রতিশ্রুতি, কিন্তু সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা একই থেকেছে—একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ।

এই দেশের মানুষ রাজনীতির কাছে খুব জটিল কিছু চায় না। তারা চায় এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে একজন তরুণ তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পাবে, একজন কৃষক ন্যায্য মূল্য পাবে, একজন মা তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন। মানুষ এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি চায়, যেখানে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করাই মূল লক্ষ্য নয়; বরং ভিন্নমতকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার মানসিকতা থাকবে।

সময়ের সঙ্গে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে। এখন মানুষ কেবল বক্তৃতা শোনে না, তারা আচরণও দেখে। নেতার ভাষা, সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি—এসবও আজ রাজনৈতিক মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সেই জায়গা থেকেই সাম্প্রতিক সময়ে অনেক মানুষের ভেতরে নতুন এক প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে তারেক রহমানকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং একটি তুলনামূলকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ভাষার প্রত্যাশাও কাজ করছে।

মানুষ আসলে এমন নেতৃত্ব খোঁজে, যা বিভক্তির দেয়ালকে আরও উঁচু না করে বরং সেতুবন্ধন তৈরি করতে চায়। কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার রাজনীতি প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে না দেখে তাকে গণতান্ত্রিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখতে শেখে। জাতীয় অগ্রগতি কখনো কোনো এক দলের একার অর্জন নয়; এটি সমষ্টিগত সহযোগিতা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধের ফল।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই—আমরা এখনও অনেক সময় দেশকে নয়, দলকে আগে ভাবি। রাজনৈতিক আনুগত্য এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে নাগরিক পরিচয় আড়ালে পড়ে যায়। অথচ রাষ্ট্র কোনো দলের সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্র মানে কোটি মানুষের শ্রম, স্বপ্ন, সংগ্রাম ও ভবিষ্যতের সম্মিলিত নাম। তাই মতভেদ থাকবে, সমালোচনাও থাকবে; কিন্তু সেই সমালোচনা যদি ধ্বংসের বদলে সংশোধনের পথ দেখায়, তবেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়।

বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। বিশ্ব অর্থনীতি বদলাচ্ছে, প্রযুক্তি নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে, তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক সংঘাতের পুরোনো ধারা ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন। এখন প্রয়োজন এমন এক জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানবসম্পদ, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে সমান গুরুত্ব দেবে।

তরুণদের কর্মসংস্থান, শিক্ষার আধুনিকায়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি এবং সহনশীল সমাজব্যবস্থা—এসব অর্জনের জন্য জাতীয় ঐক্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। কারণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রের অংশ হতে পারে, কিন্তু স্থায়ী বিভাজন কখনো উন্নয়নের ভিত্তি হতে পারে না।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যে জাতি সংকীর্ণতার দেয়াল ভেঙে বৃহত্তর স্বার্থে এক হতে পেরেছে, তারাই টেকসই অগ্রগতির পথে এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষ—তাদের পরিশ্রম, অভিযোজনক্ষমতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা।

এখন সময় এসেছে সেই শক্তিকে বিভক্তির রাজনীতিতে ক্ষয় না করে উন্নয়নের শক্তিতে রূপান্তর করার। কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস তাদেরই মনে রাখে, যারা মানুষকে ভাঙার নয়, এক করার কথা বলেছে; যারা ক্ষমতার নয়, দেশের ভবিষ্যতের কথা ভেবেছে।

মতামত এর আরও খবর