img

শ্রদ্ধাঞ্জলি: কুঁড়েঘরের মোজাফফর: আপসহীন রাজনীতির প্রতীক

প্রকাশিত :  ০৭:০৪, ২৫ আগষ্ট ২০২৫

শ্রদ্ধাঞ্জলি: কুঁড়েঘরের মোজাফফর: আপসহীন রাজনীতির প্রতীক

সংগ্রাম দত্ত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে যাদের উচ্চারণ মানেই সততা, আদর্শ আর সংগ্রামের কথা মনে পড়ে। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ঠিক তেমনই একজন মানুষ। তিনি ছিলেন ন্যাপের সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্থায়ী সরকারের উপদেষ্টা, আবার সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন ‘কুঁড়েঘরের মোজাফফর’ নামেই। ক্ষমতার মোহ বা পদ-পদবির চকচকে দুনিয়া তার মন ছুঁতে পারেনি। সাদামাটা জীবন, আপসহীন নীতি আর অকৃত্রিম নেতৃত্বই তাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন দিয়েছে।

ছাত্র থেকে শিক্ষক, শিক্ষক থেকে রাজনীতিক

১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে জন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর শেষ করে তিনি প্রথমে বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করেন। পরে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনই তার জীবনের বাঁকবদল ঘটায়। আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত হয়ে তিনি বুঝেছিলেন—এই জাতির মুক্তির পথ রাজনীতির মধ্য দিয়েই। তাই ১৯৫৪ সালে অধ্যাপনার নিরাপদ চাকরি ছেড়ে ঝুঁকিপূর্ণ রাজনীতিকে বেছে নেন।

রাজনৈতিক উত্থান ও সংগ্রাম

মোজাফফর আহমদের রাজনৈতিক যাত্রা ছিল চড়াই-উতরাই ভরা। ১৯৫৭ সালে ন্যাপের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলেছিলেন, যা পরবর্তীতে বাঙালির স্বাধীনতার আন্দোলনের ভিত্তি হয়ে ওঠে। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে, এমনকি ধরিয়ে দিলে পুরস্কার ঘোষণা দেয়। তিনি তখন আত্মগোপনে থেকে আন্দোলন সংগঠিত করেন দীর্ঘ আট বছর।

১৯৬৬ সালে প্রকাশ্যে রাজনীতিতে ফিরে আসেন তিনি। ১৯৬৭ সালে ন্যাপ বিভক্ত হলে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি নেতৃত্ব দেন, কারাবরণও করেন।

মুক্তিযুদ্ধের অনন্য ভূমিকা

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা ছিল স্মরণীয়। অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে গেরিলা বাহিনী সংগঠনে তিনি ছিলেন অগ্রভাগে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রকাশিত নতুন বাংলা পত্রিকাও তার নেতৃত্বে বের হয়, যা পরে ন্যাপের মুখপত্রে পরিণত হয়।

শ্রীমঙ্গলে সরল উপস্থিতি, অমলিন স্মৃতি

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ছিলেন অতি সাধারণ জীবনযাপনের মানুষ। তাঁর রাজনীতি যেমন ছিল নীতিনিষ্ঠ, তেমনি জীবনযাত্রাও ছিল একেবারে সাধারণ।

একটি স্মৃতি আজও মানুষের মনে জ্বলজ্বল করে—জিয়াউর রহমানের আমলে শ্রীমঙ্গলে এক সফরে তিনি পায়ে হেঁটে প্রবেশ করেছিলেন শহরে। পূর্বাশা আবাসিক এলাকার তৎকালীন পৌর কমিশনার মোঃ আহাদ মিয়া সাহেবের বাসার সামনে গাড়ি রেখে লুঙ্গি ও লম্বা শার্ট পরে, ভোরবেলা হেঁটে যাচ্ছিলেন ন্যাপ নেতা রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর বাসার দিকে। তাঁর পিছু পিছু অসংখ্য মানুষ। তখনকার দৃশ্য আজও চোখে ভাসে—নেতার এই সাধারণ সাজসজ্জা, মানুষের প্রতি টান, আর রাজনীতিকে জনতার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার অনন্য ধরণ।

১৯৮৩ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আগমুহূর্তে আবারও শ্রীমঙ্গলে আসেন তিনি। এলাকার মানুষ রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীকে নির্বাচন করার জন্য চাপ দিতে থাকেন। কিন্তু তিনি দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন—“টাকা-পয়সা নেই, কিভাবে নির্বাচন করব?” তখনই প্রফেসর মোজাফফর সোজাসাপ্টা বলেছিলেন—

 “এই টাকার খেলায় দাঁড়িয়ে তুমি কি করবে? নির্বাচন তো এখন অন্য রকমের ব্যাপার, শুধু টাকার খেলা।”

তখন এলাকার অনেকেই তাঁকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, রাসেন্দ্র বাবু জিতবেনই। প্রফেসর মোজাফফর হাসিমুখে উত্তর দিয়েছিলেন—

 “ঠিক আছে, নির্বাচনের ফলাফলের পর দেখা হবে। তবে বউয়ের সোনা-গয়না যেন বিক্রি করতে না হয়!”

নির্বাচনে জয়ের পর ঢাকায় পার্টির মিটিংয়ে তিনি সবার সামনে সেই ঘটনাটি হেসে হেসে স্মরণ করেছিলেন। এভাবেই তিনি রাজনীতির কঠিন বাস্তবতাকে রসিকতার আড়ালে তুলে ধরতেন।

ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়

৯০-এর পর অনেকবার দেখা হতো কাকরাইলের তার ৫০ নম্বর বাসায় কিংবা কুমিল্লার বাড়িতে। সেখানে বসেই তিনি বলতেন—

“রাজনীতি তো এখন নেই। কিন্তু গরিব যতদিন আছে, গরিবের রাজনীতি থাকবেই। চুপচাপ বসে থাকো। সময় যখন হবে, তখন হাল ধরতে পারবে।”

কথা বলতেন ভীষণ সুন্দর করে, পরিষ্কার যুক্তি দিয়ে। মাঝেমধ্যেই হেসে জিজ্ঞেস করতেন—“কি বলছি, বুঝতে পারছ তো?”

এই সরল অথচ দৃঢ় চরিত্রই তাঁকে ভিন্নমাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল।

পদকের প্রতি অনীহা

স্বাধীনতার পরও অধ্যাপক মোজাফফর গণতন্ত্র ও ন্যায়ের পথে ছিলেন অবিচল। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি আবারও কারারুদ্ধ হন। তাঁর জীবনের এক বড় বৈশিষ্ট্য—নীতির প্রশ্নে আপসহীনতা। এরই প্রকাশ ঘটে ২০১৫ সালে, যখন সরকার তাঁকে স্বাধীনতা পদক দিতে চাইলেও তিনি তা\' গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান।

শিক্ষা ও সামাজিক উদ্যোগ

রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষার প্রসারেও তিনি ছিলেন নিবেদিত। নারায়ণগঞ্জের মদনপুরে প্রতিষ্ঠা করেন সামাজিক বিজ্ঞান পরিষদ, যেখানে তিনি নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

শেষ প্রস্থান

২০১৯ সালের ২৩ আগস্ট তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে তাঁর রেখে যাওয়া জীবনদর্শন আজও আলোকিত করে যারা ক্ষমতার প্রলোভন নয়, বরং মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করতে চায়।

কুঁড়েঘরের মোজাফফর হয়তো আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর নাম উচ্চারিত হলেই মনে পড়ে যায়—বাংলাদেশের রাজনীতিতে সততা ও আদর্শের এক আলোকবর্তিকা ছিলেন তিনি।


img

উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ভঙ্গুর অর্থনীতি ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিত :  ১০:৩১, ০২ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১০:৩৭, ০২ মে ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

ঢাকা, ২ মে ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের অবসান ঘটিয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় বসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনীতি এবং উত্তাল বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সংকট নতুন এই প্রশাসনের সামনে এক পর্বতসম চ্যালেঞ্জ দাঁড় করিয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা এবং আগামীকালের পুঁজিবাজারের গতিপথ নিয়ে একটি নিবিড় বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।

সামষ্টিক অর্থনীতি: ভঙ্গুর উত্তরণের রূপরেখা

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে এক অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাত্র ৩.৯৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ধাক্কা কাটিয়ে সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে এই যাত্রার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের স্থবিরতা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রবৃদ্ধি ৪.৭ শতাংশ প্রাক্কলন করলেও বিশ্বব্যাংক কিছুটা রক্ষণশীল অবস্থান নিয়ে ৩.৯ শতাংশের পূর্বাভাস দিয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির মাত্র ২২.৪৮ শতাংশে নেমে আসা এবং ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট এই বিনিয়োগ মন্দাকে আরও ঘনীভূত করেছে।

সাধারণ মানুষের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো জীবনযাত্রার অসহনীয় ব্যয়। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.৭১ শতাংশে দাঁড়ালেও এটি সাধারণ ভোক্তাদের জন্য খুব বেশি স্বস্তি বয়ে আনে নি। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.২৪ শতাংশে নামলেও অ-খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.০৯ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে, যা পরিবহন, গৃহায়ণ ও পরিষেবা খাতের উচ্চমূল্যকে নির্দেশ করে। আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। যেখানে ভারত (২.৭%) ও শ্রীলঙ্কা (০.৬%) তাদের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো ৯ শতাংশের কাছাকাছি সীমায় আটকে আছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছে, কারণ মজুরি বৃদ্ধির হার (৮.০৯%) এখনো জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে।

তবে সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম স্বস্তির জায়গা হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রিজার্ভ ৩৫.১১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয় এবং মার্চ মাসে তা ৩৪.১২ বিলিয়ন ডলারে স্থিতিশীল রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ মার্চ মাসে ৩.৭৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোয় বহিঃখাতের ওপর চাপ কিছুটা কমেছে। মুদ্রার বিনিময় হার প্রতি ডলারে ১২২.৬২ টাকার আশপাশে স্থিতিশীল রয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের 'ক্রলিং পেগ' পদ্ধতির সুফল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে যখন দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো এক বিশাল সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের পূর্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে সংস্কারের সূচনা করেছিল, তা এগিয়ে নেওয়া ও জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই এই সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার সময় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা এবং গুমসংক্রান্ত অপরাধের সংজ্ঞাসংবলিত ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ তামাদি বা বাতিল হয়ে যাওয়া নিয়ে দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকার একে আইনি অসংগতি দূর করার প্রক্রিয়া বললেও প্রধান বিরোধী দলগুলো একে গণতান্ত্রিক সংস্কারের পরিপন্থী হিসেবে অভিহিত করেছে।

রাজনৈতিক মেরুকরণের পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং খাতের ক্ষত এখনো অত্যন্ত গভীর। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬.৪ ট্রিলিয়ন টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৫.৭৩ শতাংশ। খেলাপি ঋণ আদায় ও ব্যাংকিং সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ানো সম্ভব হবে না, যা সরাসরি জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে।

১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচি ও সাফল্য

ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এই কর্মসূচির আওতায় ইতিমধ্যে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রায় ৩৭ হাজার ৮১৪টি নিম্ন আয়ের পরিবারকে মাসিকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। কৃষকদের জন্য 'ফার্মার কার্ড' এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফের উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া শিক্ষাখাতে 'ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব' এবং ৮ হাজার ২৩২টি মাদ্রাসায় ফ্রি ওয়াই-ফাই নিশ্চিত করার কাজ চলমান রয়েছে। তবে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে থাকায় (মার্চে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬২.৯ শতাংশ অর্জিত) এই বিপুল ব্যয়ের সংস্থান করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক চাপের কালো মেঘ

২০২৬ সালের বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দেশে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই সংকটের কারণে শিল্পকারখানাগুলোতে প্রতিদিন ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে, যা তৈরি পোশাক রপ্তানিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। সরকার জ্বালানি ভর্তুকি বাবদ মার্চ মাসে এক মাসেই ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যা বাজেটে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

আগামী ২৪ নভেম্বর ২০২৬-এ বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণ করবে। এই উত্তরণের পর বাংলাদেশ বর্তমানে প্রাপ্ত প্রায় ৭০ শতাংশ রপ্তানি সুবিধা হারাবে। নতুন সরকারকে অতি দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে জিএসপি+ বা সমজাতীয় চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে; অন্যথায় টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাত প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাবে।

আগামীকাল রোববার (৩ মে ২০২৬) পুঁজিবাজারের পূর্বাভাস

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘকাল ধরেই বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটে ভুগছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা চার বছর বাজার নিম্নমুখী ছিল। আগামীকাল ৩ মে ২০২৬, সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন শুরু হবে। গত ৩০ এপ্রিল ডিএসই ব্রড ইনডেক্স ৫,২৮৬.৮৮ পয়েন্টে অবস্থান করছিল।

আগামীকালের বাজার মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। প্রথমত, গত সপ্তাহের শেষ দিকে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মুনাফা সংগ্রহের (প্রফিট বুকিং) যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা আগামীকালও অব্যাহত থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার ১০ শতাংশের উপরে থাকায় বড় বিনিয়োগকারীরা ইক্যুইটি বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। তৃতীয়ত, জ্বালানি সংকটের খবর এবং লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা উৎপাদনমুখী বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

সেক্টরভিত্তিক সম্ভাবনা ও পূর্বাভাস:

ব্যাংকিং খাতে যমুনা ব্যাংক বা ব্র্যাক ব্যাংকের ভালো লভ্যাংশ ঘোষণার কারণে এই খাতটি স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, জ্বালানি সংকটের কারণে সিমেন্ট ও টেক্সটাইল খাতের শেয়ারগুলো চাপে থাকতে পারে। আগামীকালের সেশনে বাজার ৯৫ শতাংশ সম্ভাবনা সতর্কাবস্থায় (কশাস মোড) থাকবে। দিনের শেষে সূচক ২০ থেকে ৩০ পয়েন্টের সংশোধনী (কারেকশন) দেখতে পারে এবং লেনদেনের পরিমাণ ৭০০ থেকে ৮৫০ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ডিএসই সূচকটি চলতি প্রান্তিকের শেষে ৭,২৩৪ পয়েন্টের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগোলেও স্বল্পমেয়াদী অস্থিরতা কাটতে সময় লাগবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য পরামর্শ হলো, পেনাল্টি শেয়ার এড়িয়ে শক্তিশালী মৌলভিত্তিসম্পন্ন ডিভিডেন্ড-পেওয়ারি শেয়ারে নজর দেওয়া।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এক ক্রান্তিকাল পার করছে। নতুন সরকারের সংস্কার পদক্ষেপ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে আসার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর টেকসই উন্নয়ন।

মতামত এর আরও খবর