img

দক্ষিণ এশিয়ার নতুন সমীকরণ: পাকিস্তান–বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা আলোচনা ও ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ

প্রকাশিত :  ১৩:২৪, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫

দক্ষিণ এশিয়ার নতুন সমীকরণ: পাকিস্তান–বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা আলোচনা ও ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ

সাইফুল খান 

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি আবারও এক সংবেদনশীল মোড়ে দাঁড়িয়ে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভারতীয় ও পাকিস্তানি মিডিয়ায় বাংলাদেশ–পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে যে আলোচনা জোরালো হয়েছে, তা কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রশ্ন নয়; বরং এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ভারসাম্য, শক্তির বিন্যাস এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত বহন করে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বিষয়টিকে দেখছে “potential strategic shift” হিসেবে, যেখানে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ভারতের কৌশলগত কক্ষপথের বাইরে গিয়ে বিকল্প সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে পারে বলে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে (DNA India analysis)। অন্যদিকে পাকিস্তানি মিডিয়া ও রাজনৈতিক ভাষ্য এটিকে উপস্থাপন করছে “renewed Muslim-world alignment” বা দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক শীতলতার পর সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে (Pakistan-based political commentary)।

আলোচনা বনাম বাস্তবতা: ‘ন্যাটো-স্টাইল’ শব্দবন্ধের বিভ্রান্তি

ভারতীয় মিডিয়ার একাংশে দাবি করা হচ্ছে যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান একটি “ন্যাটো-স্টাইল ডিফেন্স প্যাক্ট”-এর দিকে এগোচ্ছে, যা ভারতের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে (Zee News strategic commentary)। তবে একই প্রতিবেদনের ভেতরেই স্বীকার করা হচ্ছে—এটি এখনো আলোচনা ও সম্ভাবনার স্তরে, কোনো আনুষ্ঠানিক, আইনি বা বাধ্যতামূলক চুক্তিতে রূপ নেয়নি (Business Today security analysis)।

এখানে “ন্যাটো-স্টাইল” শব্দটি মূলত একটি বিশ্লেষণী রূপক—বাস্তবে ন্যাটোর মতো Article-5 ভিত্তিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা নিশ্চয়তা এখন পর্যন্ত কোথাও ঘোষণা করা হয়নি। এমনকি পাকিস্তানি মিডিয়াতেও সরকারিভাবে এমন কোনো চুক্তি স্বাক্ষরের দাবি নেই; বরং সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা সংলাপ ও কৌশলগত বোঝাপড়া বৃদ্ধির কথাই বেশি উঠে আসছে (Pakistan political reports)।

পাকিস্তানি দৃষ্টিভঙ্গি: কৌশলগত সুযোগ ও প্রতীকী বার্তা

পাকিস্তানি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ–পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা কেবল দ্বিপাক্ষিক সামরিক বা কূটনৈতিক সম্পর্কের পুনরুজ্জীবন নয়; বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে একটি প্রতীকী ও কৌশলগত পুনঃসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাকিস্তানি বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, ১৯৭১ পরবর্তী দীর্ঘ সময় ধরে ঢাকা–ইসলামাবাদ সম্পর্ক যে দূরত্বে ছিল, সেই অধ্যায়ের ধীরে ধীরে অবসান নিজেই একটি রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেকে প্রধান ও প্রায় একক প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকে তারা ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী অবস্থানের বিরুদ্ধে নরম কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ কৌশলগত সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

পাকিস্তানি মিডিয়া ও থিঙ্কট্যাংক বিশ্লেষণে প্রায়ই উঠে আসে যে, বাংলাদেশ একটি জনবহুল, অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসরমান এবং ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান ইসলামাবাদের কাছে কেবল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ক্ষেত্র নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক কূটনীতির একটি সম্ভাব্য প্রবেশদ্বার। এই কারণে পাকিস্তানি বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করলে ইসলামাবাদ দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেকে পুরোপুরি ‘ভারতকেন্দ্রিক প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি’ হিসেবে না রেখে একটি স্বাধীন কূটনৈতিক খেলোয়াড় হিসেবে তুলে ধরতে পারবে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতীকী রাজনীতি। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনায় বাংলাদেশকে প্রায়ই একটি “হারানো অধ্যায়” হিসেবে দেখা হয়, যার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা মানে অতীতের একটি জটিল ইতিহাসকে নতুন বাস্তবতার আলোকে পুনর্বিন্যাস করা। পাকিস্তানি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের জন্য একটি নরম ভাবমূর্তি তৈরি করতে পারে। যেখানে ইসলামাবাদকে শুধুমাত্র নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক বা সংঘাতমুখী রাষ্ট্র নয়, বরং অতীতের তিক্ততা পেরিয়ে বাস্তববাদী সম্পর্ক গড়তে সক্ষম রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব।

কিছু পাকিস্তানি রাজনৈতিক নেতা ও সাবেক কূটনীতিকের বক্তব্যে এমন ইঙ্গিতও পাওয়া যায় যে, আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক সংকটের সময়ে বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে পাশে পাওয়া ইসলামাবাদের জন্য একটি সম্ভাব্য কৌশলগত বিকল্প হতে পারে। এটি সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে ঘোষিত না হলেও, ভারত–পাকিস্তান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন সমীকরণ তৈরির চিন্তাভাবনার অংশ হিসেবেই এ ধরনের আলোচনা দেখা যায়। ভারতীয় মিডিয়ায় উদ্ধৃত কিছু আঞ্চলিক রাজনৈতিক মন্তব্যেও ইঙ্গিত করা হয় যে, পাকিস্তান চায় বাংলাদেশ যেন একচেটিয়াভাবে ভারতের প্রভাববলয়ে আবদ্ধ না থাকে, বরং বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে।

সব মিলিয়ে পাকিস্তানি দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশ–পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা একটি বহুস্তরবিশিষ্ট কৌশল। এর একদিকে রয়েছে ভারতের আঞ্চলিক প্রভাবকে প্রতীকীভাবে চ্যালেঞ্জ করার বার্তা, অন্যদিকে রয়েছে নিজেদের কূটনৈতিক পরিসর বিস্তারের চেষ্টা এবং অতীতের ভার কাটিয়ে নতুন বাস্তবতায় সম্পর্ক পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষা। এই কারণে ইসলামাবাদের কাছে বাংলাদেশ কেবল আরেকটি দ্বিপাক্ষিক অংশীদার নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক দাবা খেলায় একটি নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি।

ভারতের উদ্বেগ: ‘টু-ফ্রন্ট থিঙ্কিং’-এর পুনরুত্থান

ভারতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত পরিমণ্ডলে সাম্প্রতিক আলোচনাগুলো নতুন করে “টু-ফ্রন্ট চ্যালেঞ্জ” ধারণাকে সক্রিয় করে তুলেছে। ঐতিহাসিকভাবে এই ধারণাটি মূলত পাকিস্তান ও চীনের সম্ভাব্য সমন্বিত চাপকে ঘিরে গড়ে উঠলেও, সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে পূর্ব সীমান্ত বিশেষ করে বাংলাদেশকে ঘিরে কৌশলগত অনিশ্চয়তার প্রসঙ্গও যুক্ত হচ্ছে। এখানে বাংলাদেশের অবস্থানকে সরাসরি শত্রু হিসেবে নয়, বরং সম্ভাব্য ‘স্ট্র্যাটেজিক ভেরিয়েবল’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ভারতের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিকল্পনায় অতিরিক্ত হিসাব যোগ করছে।

ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যদি বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বা সামরিক যোগাযোগ বাড়ায় যেমন প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি বিনিময় কিংবা প্রতিরক্ষা সংলাপ।তাহলে সেটি অবিলম্বে সামরিক হুমকিতে রূপ নেবে না। তবে এর মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত প্রভাব ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে ভারতের পরিকল্পনাকারীদের একই সময়ে পশ্চিম ও পূর্ব সীমান্তে সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে, যা সম্পদ বণ্টন, বাহিনী মোতায়েন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা নীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।

থিংক-ট্যাংক ঘনিষ্ঠ ভারতীয় বিশ্লেষণগুলো বিশেষভাবে জোর দিচ্ছে “ইনটেনশন বনাম ক্যাপাবিলিটি” পার্থক্যের ওপর। বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ নয়। এটি তারা স্পষ্টভাবে স্বীকার করছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে কৌশলগত অভিপ্রায় নিয়ে। তাদের দৃষ্টিতে, ঢাকার পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে একটি প্রতীকী বার্তা দিতে পারে, যা ভারতের আঞ্চলিক নেতৃত্ব ও নিরাপত্তা বয়ানকে কিছুটা জটিল করে তোলে।

তবে একই সঙ্গে ভারতীয় কৌশলগত লেখালেখিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকারোক্তিও রয়েছে। বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে একটি ব্যালান্সিং স্ট্র্যাটেজি অনুসরণ করে এসেছে। ভারত, চীন, পশ্চিমা বিশ্ব, মুসলিম দেশসমূহ সব পক্ষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করা। এই বাস্তবতা ভারতীয় বিশ্লেষকরা অস্বীকার করছেন না। বরং তারা বলছেন, ঢাকার কোনো এক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন মানেই অন্য পক্ষের সঙ্গে বৈরিতা নয়; এটি অনেক সময় বিকল্প কৌশলগত দরজা খোলা রাখার নীতি।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের উদ্বেগকে অনেক বিশ্লেষক “থ্রেট পারসেপশন” হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন, বাস্তব সংঘাতের পূর্বাভাস হিসেবে নয়। বাংলাদেশ-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবসান নির্দেশ করে। এমন সিদ্ধান্তে ভারতীয় বিশ্লেষণগুলো পৌঁছায়নি। বরং তারা এটিকে ঢাকার কৌশলগত বিকল্প সম্প্রসারণ এবং দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছে।

সব মিলিয়ে, “টু-ফ্রন্ট থিঙ্কিং”-এর পুনরুত্থান ভারতের নিরাপত্তা আলোচনায় একটি সতর্ক সংকেত মাত্র। এটি ভারতের জন্য নতুন হিসাবের খাতা খুললেও, একই সঙ্গে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন, বাস্তববাদী ও বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির অনুসারী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিচ্ছেদ নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল কৌশলগত বাস্তবতায় উভয় দেশের জন্য নতুন সমন্বয় ও বোঝাপড়ার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত বহন করে।

বাংলাদেশের অবস্থান: স্বাধীনতা ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তের কৌশলগত অনুসন্ধান

 আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে লক্ষ্য করা যায়, ঢাকা এখনো পর্যন্ত কোনো সামরিক জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হওয়ার স্পষ্ট বার্তা দেয়নি; বরং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ সহযোগিতা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। এই অবস্থানটি মূলত সেই কৌশলগত স্বাধীনতার প্রতিফলন, যা বহু মধ্যম শক্তির রাষ্ট্র তাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত রক্ষা এবং বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় নিজেকে জড়িয়ে না ফেলতে অনুসরণ করে থাকে।

বাংলাদেশের এই সতর্ক অবস্থানের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা কাজ করছে। ভারতীয় আঞ্চলিক হেজিমনির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ভৌগোলিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রাধান্য বাংলাদেশের জন্য একদিকে অনিবার্য প্রতিবেশী বাস্তবতা, অন্যদিকে একটি কৌশলগত সীমাবদ্ধতাও। সীমান্ত হত্যা, নদীর পানিবণ্টনে একতরফা সিদ্ধান্ত, ট্রানজিট ও নিরাপত্তা ইস্যুতে অসম সম্পর্ক, এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এই সবকিছু বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একটি স্বাভাবিক সতর্কতা তৈরি করেছে। ফলে ঢাকা এমন কোনো অবস্থানে যেতে চায় না, যেখানে কোনো একক শক্তির কৌশলগত ছায়াতলে তার পররাষ্ট্রনীতি আবদ্ধ হয়ে পড়ে।

এর পাশাপাশি রয়েছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রশ্ন। ভারতীয় মিডিয়া, বিনোদন শিল্প, ভাষাগত আধিপত্য ও সফট পাওয়ারের প্রবল উপস্থিতি বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করছে। এই প্রভাব অনেক সময় স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক আদান–প্রদানের সীমা ছাড়িয়ে জাতীয় আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এমন ধারণা দেশের একাংশ বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক মহলে দৃশ্যমান। ফলে কৌশলগত স্বাধীনতার ধারণা এখানে শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সার্বভৌমত্বের সঙ্গেও যুক্ত।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নীতি মূলত ভারসাম্য রক্ষার রাজনীতি। একদিকে ভারতসহ প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার বাস্তবতা নেই, অন্যদিকে কোনো একক শক্তির প্রভাববলয়ে ঢুকে পড়ার ঝুঁকিও ঢাকা নিতে চায় না। তাই প্রতিরক্ষা খাতে সক্ষমতা বৃদ্ধি, বহুমুখী উৎস থেকে অস্ত্র ও প্রযুক্তি সংগ্রহ, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা, এবং পশ্চিমা বিশ্ব, মুসলিম বিশ্ব ও পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সমান্তরাল কূটনৈতিক সম্পর্ক সব মিলিয়ে বাংলাদেশ নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সক্ষমতা জোরদার করতে চাইছে।

এই অবস্থানকে অনেকেই “নীরব কিন্তু দৃঢ় কৌশল” হিসেবে দেখছেন। প্রকাশ্য ঘোষণার বদলে ধীরে ধীরে সক্ষমতা বাড়ানো, বিকল্প অংশীদার তৈরি করা এবং আঞ্চলিক শক্তির চাপ মোকাবিলায় কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখা। এটাই বর্তমানে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয়।

উপসংহার:  বর্তমান প্রেক্ষাপটে বলা যায়, পাকিস্তান–বাংলাদেশ ‘ন্যাটো-স্টাইল’ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়িত হয়েছে এই দাবি অতিরঞ্জিত। ভারতীয় ও পাকিস্তানি মিডিয়ার অধিকাংশ রিপোর্ট আসলে বিশ্লেষণ, সম্ভাবনা ও রাজনৈতিক বক্তব্যের সমষ্টি, কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তির ঘোষণা নয় (combined Indian media analysis)।

তবে এটাও স্পষ্ট যে, এই আলোচনা দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে এক ধরনের নড়াচড়া নির্দেশ করছে। এটি বাস্তব চুক্তিতে রূপ নেবে কিনা, নাকি কেবল কূটনৈতিক চাপ ও বার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তা নির্ভর করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের উপর।

লেখক - ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক
img

যুদ্ধের ময়দানে উজ্জীবিত ইরানের পরমাণু স্বপ্ন: ইউরোশিয়া রিভিউ

প্রকাশিত :  ০৬:২২, ২২ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:২৭, ২২ অক্টোবর ২০২৬

একসময় ইরানের রাজনীতিতে পারমাণবিক বোমা তৈরির আলোচনা ছিল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও গোপনীয়। তবে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সঙ্গে টানা আট মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলেছে। এখন দেশটির নীতিনির্ধারক ও আইনপ্রণেতারা প্রকাশ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দাবি তুলছেন।

অথচ এই দেশেই একদিন সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির একটি ধর্মীয় ফতোয়া ছিল আইন, যেখানে গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি বা সংরক্ষণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে তেহরান বিশ্ববাসীকে এটাই বোঝানোর চেষ্টা করেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক কাজের জন্য। কিন্তু যুদ্ধের কালো মেঘ সেই পুরোনো ধারণাকে এক নিমিষে উড়িয়ে দিয়েছে।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের প্রথম দফার আকস্মিক আঘাতেই কেঁপে উঠেছিল ইরান। সেই হামলায় শুধু সামরিক বা পারমাণবিক স্থাপনাই ধ্বংস হয়নি, প্রাণ হারিয়েছেন খেসারত দেওয়া বহু সাধারণ নাগরিক এবং খামেনিসহ শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব। যদিও পরবর্তী সময়ে সরাসরি বড় ধরনের সামরিক তৎপরতা কমিয়ে এনে নৌ-অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপের পথ বেছে নিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের সাত দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে উল্টো নতুন হামলার হুমকি দিয়েছেন। ওয়াশিংটনের সাফ কথা, চুক্তি করতে হলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে।

আর ঠিক এ অনিশ্চিত ও চরম অস্তিত্বের সংকটের মাঝেই তেহরানের অন্দরে শুরু হয়েছে তীব্র দন্তনখ লড়াই। একপক্ষ বলছে, পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য ইরান এরই মধ্যে অনেক চড়া মূল্য চুকিয়ে ফেলেছে। পার্লামেন্ট সদস্য আহমাদ বাখশায়্যাশ আরদেস্তানি কিংবা মহসেন রেজাইয়ের মতো শীর্ষ নিরাপত্তা কর্তারা মনে করেন, এখন আর পিছু হটার সময় নেই; বরং শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে পরমাণু অস্ত্র অর্জনের পথেই হাঁটা উচিত।

রক্ষণশীল বিশ্লেষক দাউদ মোদাররেসিয়ানের ভাষায়, একটি পরমাণু বোমা অর্জন করা আজকের দিনে রুটি-রুজির চেয়েও বড় ও জরুরি প্রয়োজন, যা দেশের টিকে থাকার একমাত্র নিশ্চয়তা। তারা ট্রাম্পের সেই পুরোনো কথারই প্রতিধ্বনি করেন, যেখানে উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের উদাহরণ টেনে ট্রাম্প বলেছিলেন, কারও হাতে ১১টি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকলে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠেও রয়েছে শক্ত যুক্তি। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবের এই চিন্তার তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে আছে, তাদের পরমাণু বোমার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, একটি বোমা বড়জোর ৫০ থেকে ১ লাখ মানুষের প্রাণ নিতে পারে, কিন্তু হরমুজ প্রণালি আটকে দিলে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও কোটি কোটি মানুষের জীবন জিম্মি করা সম্ভব। সাংবাদিক সিনা জাহানি কিংবা বিশ্লেষক আমির আলী আবুলফাতদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর এ উন্মাদনা সরাসরি ইসরায়েলের ফাঁদে পা দেওয়ার শামিল। বোমা তৈরির কাজ শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকান বোমায় দেশের বাকি অবকাঠটুকুও ধূলিসাৎ হয়ে যাবে, এমন আত্মঘাতী পথ কোনো সুরক্ষাই দিতে পারে না।

কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, ইরান কি চাইলেও এখন বোমা বানাতে পারবে? যুদ্ধের আগুনে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মূল অবকাঠামো আজ প্রায় পঙ্গু। নাতানজ ও ফরদোর মতো প্রধান ভূগর্ভস্থ প্লান্টগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। তবে সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে আছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা প্রায় ৪৪০ দশমিক ১৯ কেজি ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, এক বছরের বেশি সময় ধরে এই বিশাল মজুতের সঠিক হদিস তাদের জানা নেই।

মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দাবি, গ্রানাইট পাথরের ৮০ থেকে ১০০ মিটার গভীরে অবস্থিত গোপন ও সুরক্ষিত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ সুড়ঙ্গে হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ ও এই ইউরেনিয়াম লুকিয়ে ফেলেছে তেহরান। আর এ কারণেই ট্রাম্প সম্প্রতি হুংকার ছেড়েছেন, আমাদের হয়তো সেখানেই গিয়ে অভিযান চালাতে হতে পারে!

তাত্ত্বিকভাবে, ওই গোপন মজুতের নাগাল পেলে সামান্য সেন্ট্রিফিউজ দিয়েই অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়াম বানিয়ে ফেলা সম্ভব। ইরান যদিও যুদ্ধ বন্ধের বিনিময়ে এই মজুত হালকা বা পাতলা করার প্রস্তাব দিয়েছে, তবুও ওয়াশিংটনের কড়া নজর এবং পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের হিমশীতল পাহাড়ের আড়ালে এখন ঝুলে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তথা গোটা বিশ্বের ভাগ্য।