img

মুনরো ডকট্রিন থেকে মাদুরো: যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কি এই গ্রহ নিরাপদ?

প্রকাশিত :  ০৬:১১, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:১৫, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬

মুনরো ডকট্রিন থেকে মাদুরো: যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কি এই গ্রহ নিরাপদ?

সাইফুল খান 

বিশ্ব রাজনীতিতে কিছু ঘটনা থাকে, যা কেবল একটি দেশের ভাগ্য নয়। বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রকৃত চরিত্র উন্মোচন করে দেয়। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ঠিক তেমনই একটি ঘটনা। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; বরং দুই শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা এক বিশেষ মার্কিন ভূরাজনৈতিক দর্শনের ধারাবাহিক বহিঃপ্রকাশ।

এই দর্শনের নাম মুনরো ডকট্রিন।

এর বাস্তব ফলাফল আজকের বিশ্বে সার্বভৌমত্বের অনিশ্চয়তা।

মুনরো ডকট্রিন: প্রতিরক্ষা নীতি থেকে আধিপত্যের ব্লুপ্রিন্ট

১৮২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রেসিডেন্ট জেমস মুনরো কংগ্রেসে যে নীতিগত ঘোষণা দেন। সেটি ইতিহাসে পরিচিত হয় মুনরো ডকট্রিন নামে। তৎকালীন আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় এই ঘোষণার উদ্দেশ্য ছিল মূলত প্রতিরক্ষামূলক। লাতিন আমেরিকার দেশগুলো তখন একে একে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ থেকে মুক্ত হচ্ছে। আশঙ্কা ছিলো স্পেন, পর্তুগাল কিংবা অন্য কোন ইউরোপীয় শক্তি আবারও সেখানে আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করতে পারে। মুনরো ডকট্রিনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, ইউরোপীয় শক্তি আমেরিকা মহাদেশে নতুন করে হস্তক্ষেপ বা উপনিবেশ স্থাপন করতে পারবে না। এবং এমন কোনো প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হবে।

এই নীতি ঘোষণার সময় যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে সমমর্যাদার সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেনি; বরং নিজেকে উপস্থাপন করেছিল এক ধরনের রক্ষাকবচ হিসেবে। যে লাতিন আমেরিকাকে ইউরোপীয় পুনরুদ্ধারবাদ থেকে রক্ষা করবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নিরপেক্ষ থাকার অঙ্গীকারও করেছিলো। ফলে প্রথম দৃষ্টিতে মুনরো ডকট্রিন ছিল সীমিত, প্রতিরোধমূলক এবং কূটনৈতিক সতর্কবার্তা।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নীতির ব্যাখ্যা বদলাতে থাকে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে মুনরো ডকট্রিন আর কেবল ইউরোপীয় শক্তিকে ঠেকানোর ঘোষণা থাকে না; এটি ধীরে ধীরে একতরফা আঞ্চলিক মালিকানার দাবিতে রূপ নেয়। এর অন্তর্নিহিত অর্থ দাঁড়ায় লাতিন আমেরিকা ইউরোপের নয়, কিন্তু তা স্বাধীন ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রও নয়; বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয়। এই পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে আমেরিকা মহাদেশের একমাত্র বৈধ তত্ত্বাবধায়ক শক্তি হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করে, যেখানে অন্য কোনো বহিরাগত শক্তির উপস্থিতি অগ্রহণযোগ্য।

বিশ শতকের শুরুতে এই মানসিকতা আরও স্পষ্ট রূপ পায় রুজভেল্ট করোলারির মাধ্যমে। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, লাতিন আমেরিকার কোনো রাষ্ট্র যদি রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল হয়, ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয় বা ‘আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালনে অক্ষম’ বলে বিবেচিত হয়। তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারবে। এর মাধ্যমে মুনরো ডকট্রিন প্রথমবারের মতো সক্রিয় সামরিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের নীতিগত বৈধতা লাভ করে। ফলাফল হিসেবে দেখা যায় বারবার সামরিক অভিযান, সরকার উৎখাত, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং যুক্তরাষ্ট্র ঘেঁষা শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। এই সময় থেকে মুনরো ডকট্রিন কার্যত একটি শাসন কাঠামোর ভিত্তি হয়ে ওঠে।

পরবর্তীতে ঠান্ডা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই নীতির নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয় আদর্শিক সংঘাতের ভিত্তিতে। সমাজতান্ত্রিক বা বিপ্লবী কোনো রাজনৈতিক শক্তি যদি লাতিন আমেরিকার কোথাও ক্ষমতায় আসে, তবে সেটিকে কেবল সেই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখা হয়নি; বরং পুরো আমেরিকা মহাদেশের জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই যুক্তির আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার উৎখাত, সামরিক শাসনকে সমর্থন, গোপন অভিযান পরিচালনা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতকে প্রশ্রয় দিয়েছে। মুনরো ডকট্রিন তখন আর ভৌগোলিক নীতি নয়, বরং আদর্শিক যুদ্ধের হাতিয়ার।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে নীতিটির ভাষা আবার বদলায়। এবার সামনে আনা হয় মাদক, সন্ত্রাস, অপরাধ এবং তথাকথিত ব্যর্থ রাষ্ট্রের ধারণা। এসব মোকাবিলার নামে লাতিন আমেরিকায় নিরাপত্তা সহযোগিতা, সামরিক উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখা হয়। শব্দ পরিবর্তিত হলেও মূল কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে। আমেরিকা মহাদেশে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই থাকবে।

এইভাবে মুনরো ডকট্রিন তার জন্মলগ্নের প্রতিরক্ষামূলক চরিত্র হারিয়ে ধীরে ধীরে পরিণত হয় আধিপত্যের একটি পূর্ণাঙ্গ ব্লুপ্রিন্টে। যেখানে নীতির ভাষা ব্যবহার করে শক্তির রাজনীতি বৈধতা পায় এবং সার্বভৌমত্ব বাস্তবে শর্তসাপেক্ষ হয়ে ওঠে।

চিলিতে নির্বাচিত সরকার উৎখাত 

চিলিতে আমেরিকার হাতে নির্বাচিত সরকার উৎখাতের ঘটনাটি শীতল যুদ্ধকালীন লাতিন আমেরিকার রাজনীতির একটি পূর্ণাঙ্গ ও ন্যাক্কারজনক পরিকল্পিত অধ্যায়। ১৯৭০ সালে চিলিতে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক নেতা সালভাদোর আয়েন্দে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি ক্ষমতায় এসে তামা শিল্পসহ গুরুত্বপূর্ণ খাত জাতীয়করণ করেন এবং সমাজভিত্তিক অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু করেন। এতে চিলির অভ্যন্তরীণ ধনী শ্রেণি ও বহুজাতিক করপোরেশন, বিশেষ করে মার্কিন কোম্পানিগুলোর স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের চোখে আয়েন্দের সরকার লাতিন আমেরিকায় সমাজতন্ত্র বিস্তারের একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।

এই সময় আমেরিকার ক্ষমতায় ছিলেন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার এবং গোটা প্রক্রিয়ার কার্যকর হাতিয়ার ছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। নিক্সন প্রশাসনের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত ছিলো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হলেও আয়েন্দেকে ক্ষমতায় থাকতে দেওয়া যাবে না। নিক্সনের নির্দেশ অনুযায়ী চিলির অর্থনীতি এমনভাবে চাপে ফেলা হয়, যাতে দেশটি “চিৎকার করে ওঠে”।

এরপর শুরু হয় বহুস্তরীয় সরকার পরিবর্তন প্রক্রিয়া। প্রথম ধাপে অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালানো হয়। আন্তর্জাতিক ঋণ ও সহায়তা বন্ধ করা হয়, বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চিলির বিরুদ্ধে মার্কিন প্রভাব খাটানো হয়, বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার করা হয়। এর ফলে চিলিতে মুদ্রাস্ফীতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও পণ্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে।

দ্বিতীয় ধাপে অভ্যন্তরীণ বিরোধী শক্তিগুলোকে সক্রিয় করা হয়। সিআইএ গোপনে ডানপন্থী রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সংগঠন, ট্রাক মালিকদের ধর্মঘট, পেশাজীবী গোষ্ঠী এবং সরকারবিরোধী গণমাধ্যমকে অর্থ ও কৌশলগত সহায়তা দেয়। উদ্দেশ্য ছিল আয়েন্দের সরকারকে অকার্যকর, বিশৃঙ্খল ও ব্যর্থ হিসেবে তুলে ধরা।

তৃতীয় ধাপে চালানো হয় তথ্যযুদ্ধ ও প্রোপাগান্ডা। সংবাদপত্র, রেডিও ও রাজনৈতিক প্রচারের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রকে চিলির জন্য ধ্বংসাত্মক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আয়েন্দেকে দুর্ভিক্ষ, অরাজকতা ও জাতীয় নিরাপত্তা সংকটের জন্য দায়ী করা হয়। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর ভেতরে এই ধারণা জোরদার করা হয় যে দেশ রক্ষার দায়িত্ব এখন রাজনীতিবিদদের হাত থেকে সেনাবাহিনীর হাতে নিতে হবে।

চতুর্থ ধাপে চিলির সামরিক বাহিনীর সঙ্গে গোপন যোগাযোগ বজায় রাখা হয়। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সরাসরি অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা না করলেও অভ্যুত্থানপন্থী কর্মকর্তাদের উৎসাহ দেয়, সামরিক নেতৃত্বের ভেতরে অসন্তোষ উসকে দেয় এবং স্পষ্ট সংকেত দেয় যে সেনাবাহিনী ক্ষমতা নিলে যুক্তরাষ্ট্র তা মেনে নেবে।

এই দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল আসে ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। জেনারেল অগুস্তো পিনোশের নেতৃত্বে চিলির সেনাবাহিনী সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায়। রাষ্ট্রপতি প্রাসাদে হামলার সময় সালভাদোর আয়েন্দে নিহত হন। এর মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার উৎখাত হয় এবং দীর্ঘ, দমনমূলক সামরিক শাসনের সূচনা হয়। পিনোশের শাসনামলে হাজার হাজার মানুষ নিহত, নির্যাতিত ও গুম হয়, তবুও যুক্তরাষ্ট্র এই সরকারকে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন দিয়ে যায়।

এই সমগ্র ঘটনা প্রমাণ করে, চিলির সরকার উৎখাত কোনো আকস্মিক সামরিক বিদ্রোহ ছিল না। এটি ছিল নিক্সন প্রশাসনের অধীনে পরিচালিত একটি সুপরিকল্পিত, ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত কৌশল। যেখানে অর্থনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ বিভাজন, প্রোপাগান্ডা, গোয়েন্দা তৎপরতা ও সামরিক বাস্তবতা একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছিলো। এটি দেখিয়ে দেয়, আধুনিক বিশ্ব রাজনীতিতে নৈতিকতা নয়, বরং শক্তি ও কৌশলই রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণ করে।

বর্তমানে এই একই নীতির প্রয়োগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের উপর। 

পানামা ১৯৮৯: সার্বভৌমত্বের ওপর প্রথম প্রকাশ্য আঘাত

১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে পানামায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান চালায়। যা পরিচিত অপারেশন জাস্ট কজ নামে। আধুনিক-আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটি একটি বিতর্কিত ঘটনা। এটি ছিল সেই মুহূর্ত, যখন যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা, নিরাপত্তা পরিষদ কিংবা বৈশ্বিক সম্মতির তোয়াক্কা না করে সরাসরি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে পূর্ণমাত্রার সামরিক আক্রমণ চালায় এবং তা প্রকাশ্যভাবে বৈধ বলে উপস্থাপন করে।

এই অভিযানের আনুষ্ঠানিক যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয় মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা, মাদক চোরাচালান দমন এবং পানামায় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা। কিন্তু বাস্তবে এই অভিযান ছিল মুনরো ডকট্রিনের আধুনিক ও নগ্ন প্রয়োগ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে শুধু আঞ্চলিক তত্ত্বাবধায়ক নয়, বরং চূড়ান্ত বিচারক হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করে।

অভিযানের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র পানামার সামরিক স্থাপনা ও রাজধানী শহরে ব্যাপক বোমাবর্ষণ চালায়। আবাসিক এলাকা, দরিদ্র বসতি এবং বেসামরিক অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো পরে জানায়, এই অভিযানে বিপুল সংখ্যক বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়। যদিও প্রকৃত সংখ্যা আজও বিতর্কিত ও আংশিকভাবে গোপন রাখা হয়েছে। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাজধানী শহরে এমন মাত্রার আগ্রাসন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিম গোলার্ধে প্রায় নজিরবিহীন ছিল।

এই অভিযানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল রাষ্ট্রপ্রধান ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে জীবিত আটক করা। যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা তাকে গ্রেপ্তার করে পানামা থেকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে দেশটির অভ্যন্তরীণ আদালতে বিচার করা হয়। এর মধ্য দিয়ে একটি মৌলিক আন্তর্জাতিক নীতিকে কার্যত বাতিল করে দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপ্রধান সাধারনত আন্তর্জাতিক আইনের দ্বারা সুরক্ষিত এবং অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আদালতের এখতিয়ারের বাইরে।

এই ঘটনা স্পষ্ট করে দেয় যে, শক্তিশালী রাষ্ট্র চাইলে আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করেই অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ করতে পারে, বিচার করতে পারে এবং বন্দি করে রাখতে পারে। এটি ছিল সার্বভৌমত্ব ধারণার ওপর সরাসরি ও প্রকাশ্য আঘাত, যা আর কোনো পরোক্ষ কূটনৈতিক ভাষার আড়ালে রাখা হয়নি।

পানামা ১৯৮৯-এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করে। এখান থেকেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি নতুন বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। সার্বভৌমত্ব আর অখণ্ড বা নিঃশর্ত নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। কোনো রাষ্ট্র যদি শক্তিশালী শক্তির স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তবে তার রাষ্ট্রপ্রধান ব্যক্তিগতভাবেও নিরাপদ নন।

এই অভিযানের পর বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নীরব কিন্তু গভীর উপলব্ধি জন্ম নেয়। আইন তখনই কার্যকর, যখন তা ক্ষমতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। ক্ষমতার মুখোমুখি হলে আন্তর্জাতিক আইন কেবল নৈতিক ভাষ্য হয়ে থাকে, কার্যকর প্রতিরক্ষা নয়। পানামা তাই শুধু একটি সামরিক অভিযান ছিলো না; এটি ছিল বিশ্বব্যবস্থার এক নতুন বাস্তবতার ঘোষণা।

ইরাক ২০০৩: মিথ্যার ভিত্তিতে রাষ্ট্র ধ্বংস

২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধ আধুনিক বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে এক গভীর নীতিগত প্রতারণার উদাহরণ হয়ে আছে। এই যুদ্ধ কোনো আকস্মিক সংঘর্ষ বা অনিবার্য আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুত করা একটি রাজনৈতিক ও সামরিক পরিকল্পনা। যার ভিত্তি দাঁড় করানো হয়েছিল ভয়, বিভ্রান্তি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য বিকৃতির ওপর।

যুদ্ধের পক্ষে যে যুক্তিগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপস্থাপন করা হয়। সেগুলো ছিল অত্যন্ত গুরুতর। বলা হয়েছিল, ইরাকের হাতে রয়েছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র, যা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্য হুমকি। দাবি করা হয়েছিল, ইরাক বৈশ্বিক নিরাপত্তাকে বিপন্ন করছে এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা দিচ্ছে। এই তিনটি যুক্তিকে একত্র করে যুদ্ধকে একটি নৈতিক ও অনিবার্য দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়।

কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এবং রাষ্ট্রটি সম্পূর্ণভাবে দখল হয়ে যাওয়ার পর বাস্তবতা ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে। ব্যাপক অনুসন্ধান, তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের পর কোথাও কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। যেসব তথ্যের ভিত্তিতে যুদ্ধকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো যে ভুল, অতিরঞ্জিত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিকৃত ছিল, তা একে একে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

কিন্তু ততক্ষণে ইরাক রাষ্ট্র হিসেবে কার্যত ভেঙে পড়েছে। এই যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক ছিল একটি বিদ্যমান রাষ্ট্র কাঠামোকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া। সেনাবাহিনী, প্রশাসন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা সবকিছু একযোগে ভেঙে দেওয়া হয়। কোনো কার্যকর বিকল্প কাঠামো তৈরি না করেই। এর ফলে সৃষ্টি হয় এক শূন্যতা, যেখানে আইন, শাসন ও নিরাপত্তা একসঙ্গে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এই শূন্যতার ভেতর জন্ম নেয় গোষ্ঠীগত সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং চরমপন্থার বিস্তার।

ইরাকের ধ্বংস শুধু দেশটির সীমানার ভেতর সীমাবদ্ধ থাকেনি। পুরো অঞ্চলকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে সহিংসতার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে, শরণার্থী সংকট তৈরি হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য চিরতরে বদলে যেতে থাকে। একটি যুদ্ধ, যা নাকি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য শুরু হয়েছিল, সেটিই পরিণত হয় অনিরাপত্তার স্থায়ী উৎসে।

এই প্রেক্ষাপটে সাদ্দাম হুসেইনকে আটক করা, বিচার করা এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ছিল কেবল দৃশ্যমান ও প্রতীকী অংশ। বিশ্ব মিডিয়ার সামনে এটি উপস্থাপন করা হয় ন্যায়বিচারের বিজয় হিসেবে। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল একটি বৃহত্তর বিপর্যয়ের ক্ষুদ্র দৃশ্য। একজন শাসকের পতনের আড়ালে একটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্র, তার সামাজিক বন্ধন, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ধ্বংস হয়ে যায়।

“ইরাক ২০০৩” স্পষ্ট করে দেয় আধুনিক হস্তক্ষেপের প্রকৃতি কেবল শাসক পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে রাষ্ট্র ধ্বংস মানে সমাজ ধ্বংস, নিরাপত্তা ভাঙন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অনিশ্চিত ও সহিংস বাস্তবতা রেখে যাওয়া। এই যুদ্ধ প্রমাণ করে, শক্তির নামে পরিচালিত হস্তক্ষেপ শুধু বর্তমানকে বদলায় না; একটি দেশের ভবিষ্যৎকেও মুছে দিতে পারে এমনকি ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

লিবিয়া ২০১১:বোমাবর্ষণের রাজনীতি

২০১১ সালের আগে লিবিয়া ছিল আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে ধনী রাষ্ট্রগুলোর একটি এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিক থেকে ব্যতিক্রমী। তেলসম্পদের আয় সরাসরি রাষ্ট্রীয় কল্যাণে ব্যবহৃত হতো। শিক্ষা ও চিকিৎসা ছিল প্রায় বিনামূল্যে। জ্বালানি ও খাদ্যে ভর্তুকি ছিল ব্যাপক এবং মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে অনেক উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের চেয়েও লিবিয়া এগিয়ে ছিল। রাজনৈতিক কাঠামো ছিল কঠোর ও কর্তৃত্ববাদী, কিন্তু রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কার্যকর ছিল এবং কেন্দ্রীয় সরকার পুরো ভূখণ্ডে কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সক্ষম ছিল।

আরব অঞ্চলের অস্থিরতার ঢেউ লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর আভ্যন্তরীণ সংঘাত দ্রুত আন্তর্জাতিক রূপ নেয়। এই পর্যায়ে মানবাধিকার রক্ষার যুক্তিতে বহুপাক্ষিক সামরিক জোট ন্যাটো লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে। বলা হয়, সাধারণ নাগরিকদের রক্ষা করাই এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু খুব দ্রুত এই সীমিত ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবে রূপ নেয় সরাসরি শাসন পরিবর্তনের অভিযানে।

বিমান হামলার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, সেনা কাঠামো এবং প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করা হয়। এর পরিণতিতে লিবিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি নিহত হন। কিন্তু একজন শাসকের পতনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রও ভেঙে পড়ে। কেন্দ্রীয় সরকার বিলুপ্ত হয়ে যায়, জাতীয় সেনাবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয় এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের জায়গা দখল করে নেয় অসংখ্য সশস্ত্র গোষ্ঠী।

এই শূন্যতার ভেতর লিবিয়া পরিণত হয় অস্ত্রের অবাধ বাজারে। গুদাম ভেঙে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ছড়িয়ে পড়ে গোটা উত্তর আফ্রিকা ও সাহেল অঞ্চলে। মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো নিজেদের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, কোনো কেন্দ্রীয় আইন বা বিচারব্যবস্থা কার্যকর থাকে না। 

মানবপাচার, দাসবাজার, জঙ্গি সংগঠনের বিস্তার এবং সীমান্তপারের অপরাধ লিবিয়াকে একটি স্থায়ী বিশৃঙ্খলার কেন্দ্রে পরিণত করে।

যে মানবাধিকারের নামে এই হস্তক্ষেপ করা হয়েছিল, বাস্তবে সেই মানবাধিকারই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে, রাষ্ট্রীয় সেবা ভেঙে পড়ে এবং লিবিয়ার নাগরিকরা নিজেদের দেশেই উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। নারী ও শিশু পাচার আন্তর্জাতিক উদ্বেগে পরিণত হলেও কার্যকর রাষ্ট্র না থাকায় তা রোধের কোনো উপায় তৈরি হয়নি।

লিবিয়ার অভিজ্ঞতা একটি গভীর প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। মানবাধিকার রক্ষার নামে একটি দেশকে রাষ্ট্রহীন করে দেওয়া কি আদৌ নৈতিক? একটি কার্যকর রাষ্ট্র ভেঙে দিয়ে যদি তার জায়গায় স্থায়ী বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা ও মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। তবে সেই হস্তক্ষেপকে কীভাবে ন্যায়সংগত বলা যায়?

লিবিয়া দেখিয়ে দেয়, শাসন পরিবর্তন মানেই মুক্তি নয়। অনেক ক্ষেত্রে তা রাষ্ট্রের মৃত্যু ডেকে আনে, যেখানে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নেয় অনিরাপত্তা, বিভক্তি ও স্থায়ী অরাজকতায়।

মাদুরো ও ভেনেজুয়েলা: লাতিন আমেরিকার জন্য চূড়ান্ত বার্তা

ভেনেজুয়েলা কোনো সামরিক শক্তিধর রাষ্ট্র নয়, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো নিরাপত্তা হুমকিও নয়। দেশটির সেনাবাহিনী আঞ্চলিক প্রতিরক্ষার বাইরে গিয়ে কোনো বৈশ্বিক ক্ষমতা প্রক্ষেপণের সক্ষমতা রাখে না। ভৌগোলিকভাবেও এটি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের জন্য সরাসরি সামরিক ঝুঁকি তৈরি করে না। তবুও ভেনেজুয়েলা বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক আক্রমণের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। এর কারণ সামরিক নয়, বরং কাঠামোগত ও ভূরাজনৈতিক।

ভেনেজুয়েলার প্রথম “অপরাধ” হলো এটি তেলসমৃদ্ধ। বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেল মজুদের একটি এই দেশের হাতে থাকা মানে, বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতিতে একটি স্বাধীন দরকষাকষির ক্ষমতা থাকা। এই সম্পদ যদি যুক্তরাষ্ট্রঘনিষ্ঠ কোনো সরকারের নিয়ন্ত্রণে না থাকে। তাহলে তা কেবল অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত সমস্যায় পরিণত হয়। ইতিহাস দেখিয়েছে, যেখানে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে এবং সেগুলোর ওপর মার্কিন প্রভাব সীমিত, সেখানেই চাপ সৃষ্টি অনিবার্য হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয় কারণ হলো ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে অবস্থান করছে। দেশটির নীতিনির্ধারণ, তেলনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং আঞ্চলিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশিত কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এটি এমন একটি রাষ্ট্র, যা প্রকাশ্যেই বলে এসেছে যে তারা একক প্রভাববলয়ের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। এই অবস্থান নিজেই ভেনেজুয়েলাকে “অসহযোগী” রাষ্ট্রের তালিকায় ঠেলে দেয়।

তৃতীয় এবং সবচেয়ে স্পর্শকাতর কারণ হলো ভেনেজুয়েলার বিকল্প জোটে আগ্রহ। বহুমুখী কূটনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা খোঁজা এবং আঞ্চলিক স্বাধীন অবস্থান নেওয়া। এই প্রবণতাগুলো লাতিন আমেরিকার জন্য ঐতিহাসিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গিতে। মুনরো ডকট্রিনের মানসিকতা অনুযায়ী, এই অঞ্চল অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়তে পারবে না। এই ধারণাই দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর রয়েছে।

এই তিনটি বৈশিষ্ট্য তেলসমৃদ্ধ হওয়া, মার্কিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা এবং বিকল্প জোটে আগ্রহ ইতিহাসের বিচারে একটি দেশকে “সমস্যা” হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য যথেষ্ট। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে এই তিনটি একসঙ্গে উপস্থিত থাকায় দেশটি ক্রমশ চাপের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

নিকোলাস মাদুরোর ঘটনা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। তিনি নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান। কিন্তু সেই নির্বাচন তাকে নিরাপত্তা দেয়নি। তিনি রাষ্ট্রপ্রধান, কিন্তু সেই পদ তাকে সুরক্ষা দেয়নি। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও ছিল, কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত নির্ধারক হয়ে ওঠেনি। একপর্যায়ে তার বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়, বিকল্প নেতৃত্ব স্বীকৃত হয় এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে বিভাজন তৈরির চেষ্টা চালানো হয়।

এর মধ্য দিয়ে একটি কঠোর বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় নির্বাচিত হওয়া যথেষ্ট নয়, রাষ্ট্রপ্রধান হওয়াও ঢাল নয়, এমনকি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও চূড়ান্ত নিশ্চয়তা দেয় না। যদি কোনো রাষ্ট্র মার্কিন কৌশলগত স্বার্থের বাইরে অবস্থান নেয়। তবে তার শাসক ব্যক্তি নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রই চাপের মুখে পড়ে।

মাদুরো ও ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা লাতিন আমেরিকার জন্য একটি চূড়ান্ত সতর্কসংকেত। এখানে মূল প্রশ্ন গণতন্ত্র, মানবাধিকার বা শাসনব্যবস্থা নয়; মূল প্রশ্ন হলো অবস্থান। মার্কিন স্বার্থের বাইরে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হয়, আর সেই অপরাধের শাস্তি ব্যক্তি নয় ভোগ করে পুরো রাষ্ট্র।

তাহলে কি কেবল লাতিন আমেরিকাই অনিরাপদ?

ইতিহাস ও সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দেখিয়ে দেয়, লাতিন আমেরিকা শুধু একা অনিরাপদ নয়। পৃথিবীর প্রায় সব অঞ্চলেও একই ধরণের শাসন, সামরিক হুমকি ও শক্তির ভারসাম্যের খেলা চলে। মধ্যপ্রাচ্যে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং লিবিয়ায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা শূন্যের কোটায়। সেখানকার রাষ্ট্রগুলো প্রাত্যহিকভাবে ঘিরে থাকে শক্তিশালী প্রতিবেশী বা বিদেশী হস্তক্ষেপের চাপে। আফ্রিকায় যেমন কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান বা লাইবেরিয়ার উদাহরণ, দীর্ঘ সময় ধরে অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও বিদেশী আগ্রাসনের কারণে কোনো রাষ্ট্র এককভাবে দাঁড়াতে পারেনি। দক্ষিণ এশিয়াতেও পাকিস্তান, আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং মিয়ানমারের মতো দেশগুলোতে দেখা যায় ভূরাজনৈতিক চাপে, অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও সীমান্ত বিরোধে রাষ্ট্র এককভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। পূর্ব ইউরোপের ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম নয়; ইউক্রেনের সাম্প্রতিক সংকট, বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য ছোট রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপে তারা প্রায়ই বড় শক্তির সঙ্গে জোট বাঁধার ওপর নির্ভর করে।

সব অঞ্চলেই একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন দেখা যায় যে, রাষ্ট্র এককভাবে দাঁড়ায়, সেটি সবচেয়ে দুর্বল। শক্তিশালী রাষ্ট্র কিংবা আন্তর্জাতিক জোট ছাড়া তারা নিজেদের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে বা আগ্রাসন প্রতিরোধে সক্ষম নয়। 

আজকের বিশ্বে নিরাপত্তা কোনো নৈতিক প্রশ্ন নয়; এটি নির্ভর করে বাস্তবিক কিছু উপাদানের ওপর। প্রথমত, জোট বা মিত্রশক্তি; রাষ্ট্র যত বেশি বিশ্বস্ত সহযোগীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে, তার নিরাপত্তা তত বেশি।

দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা। দেশগুলো যদি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন কোনো দেশকে একা আক্রমণ করা বা ব্লক করা সহজ নয়। 

তৃতীয়ত, সামরিক ভারসাম্য; আধুনিক প্রযুক্তি, অস্ত্রশক্তি এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জাতীয় নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। 

চতুর্থত, কৌশলগত মূল্য; ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ, এবং আন্তর্জাতিক নীতিতে গুরুত্ব। যেগুলো শক্তিশালী রাষ্ট্রের আগ্রাসন নির্ধারণে প্রভাব ফেলে।

সুতরাং, নিরাপত্তা কোনো নৈতিক বা আইনি বিষয় নয়; এটি শক্তি, কৌশল ও সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্রের স্বাভাবিক দুর্বলতা তখনই ঘোঁচে, যখন তারা জোট, অর্থনৈতিক সমর্থন, সামরিক শক্তি এবং কৌশলগত গুরুত্বের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে। 

লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া কিংবা পূর্ব ইউরোপ যেখানে রাষ্ট্র এককভাবে দাঁড়ায়, সেখানেই নিরাপত্তার ঘাটতি সর্বাধিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

উপসংহার:  মুনরো ডকট্রিন থেকে মাদুরো এই ধারাবাহিকতা আমাদের শেখায়, আন্তর্জাতিক মঞ্চে শক্তি ছাড়া সার্বভৌমত্ব প্রায়শই কেবল প্রতীকী। ইতিহাস বলে, যে রাষ্ট্র নিজেকে এককভাবে শক্তিশালীদের সামনে দাঁড় করায়, তার স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। আন্তর্জাতিক আইন, সংস্থা বা চুক্তি শক্তিশালীদের জন্য হয় ভাষণ, আর দুর্বলদের জন্য শর্ত।

আজকের বিশ্বে কোনো রাষ্ট্র যদি বিকল্প শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, কৌশলগত মূল্য সংযোজন করতে না পারে, বা বহুমেরু বাস্তবতাকে কাজে লাগাতে অক্ষম হয়, তাহলে তার সার্বভৌমত্বের মর্যাদা কেবল নামমাত্র। এমন রাষ্ট্র যে কোনো সময় বিদেশী চাপ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা সামরিক হুমকির সম্মুখীন হতে পারে।

এটি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা দেশের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। লাতিন আমেরিকা হোক বা দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য হোক বা পূর্ব ইউরোপ। যে রাষ্ট্র প্রস্তুত নয়, সে সর্বদা সম্ভাব্য অনিরাপদ। এমন বাস্তবতায় সার্বভৌমত্ব শুধুমাত্র শক্তিশালী অবস্থান, কৌশলগত সম্পর্ক এবং বহুমুখী কূটনীতি দ্বারা রক্ষা করা সম্ভব।

অতএব মূল প্রশ্ন তারপর “কে পরবর্তী লক্ষ্য?” যেহেতু রাষ্ট্রটি যুক্তরাষ্ট্র। তাই এই গ্রহের কেউ নিরাপদ নয়, এটা প্রমানিত।

লেখক -ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।

মতামত এর আরও খবর

img

নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘুদের আতঙ্ক: গণতন্ত্রের মান এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন

প্রকাশিত :  ০৯:১৯, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা বিবিসি নিউজ বাংলা গত ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে \"নির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোট, \'কোন দিকে যাব আমরা\'?\" শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নির্বাচন এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশের যশোর জেলার অভয়নগরের হিন্দু সংখ্যালঘু বাসিন্দারা জানিয়েছেন যে তারা ভোট দিতে ইচ্ছুক হলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ভোটের মাধ্যমে তাদের মতামত প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব। নির্মল বিশ্বাস বলেন, \"আমরা যদি বিএনপিরে ভোট দিই তালি আমাগে জামাত আইসে ধরে বসবে, আর যদি জামাতরে ভোট দিই তালি বিএনপি আইসে ধরে বসবে। কোন দিকে যাবো আমরা কন?\" (বিবিসি নিউজ বাংলা, ০৯ জানুয়ারি ২০২৬)।

একই গ্রামের শিউলি বিশ্বাসের মন্তব্য, \"আমরা হয়ে গেছি বলের মতো, যেদিকে যাই সেদিকে লাথি খাই,\" সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীন অবস্থাকে তুলে ধরে।

বিবিসি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের মে মাসে যশোরের ডহরমসিয়াহাটি গ্রামে হিন্দু অধ্যুষিত ১৮টি বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, স্থানীয় এক বিএনপি নেতার হত্যাকাণ্ডের পর।

শিউলি বিশ্বাস নির্বাচনের আগে নিরাপত্তার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছেন: \"আমরা অবশ্যই ভোট দিতে যাব। কিন্তু আমাদের কথা হচ্ছে আমাদের যে নিরাপত্তা দেবে আমরা তারেই ভোট দেব।\"

নির্মল রোজারিও বলেন, \"আমার জীবন যদি রক্ষা না হয়, আমার পরিবার যদি রক্ষা না হয়, তাহলে ভোটের বিবেচনা পরে হবে।\"

ইতিহাস প্রমাণ করে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা প্রতিটি নির্বাচনের আগে ও পরে আতঙ্কের মধ্যে থাকে।

২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনের পর সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ ঘটেছিল। এরপর ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বিগত সরকারের সময়েও সংখ্যালঘুদের ওপর বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ঘটেছে।

২০১২ সালের রামু থেকে থেকে ২০২৩ পর্যন্ত  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্মীয় উস্কানি ও মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়ে দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চালানো হয়েছে। মন্দির লুটপাট, প্রতিমা ভাঙচুর এবং হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাও নিয়মিতভাবে ঘটেছে, কিন্তু বিচার বা প্রতিকার খুবই সীমিত হয়েছে।

২০২৪ সালের  আগস্টের পরও সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ থেমে নেই। বিশেষ করে ১৮ ডিসেম্বর, ময়মনসিংহ জেলার ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে মারধর ও হত্যা করে একটি গাছের ডালে ঝুলিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে।

নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘুদের ভোটাধিকার ও নিরাপত্তা বিষয়েও বিবিসি প্রতিবেদন গভীর বিশ্লেষণ করেছে। রঞ্জন কর্মকার বলেন, \"নির্বাচনে অংশগ্রহণ করো কিন্তু আমাকে সুরক্ষাটা কোথায় দিলেন, নিরাপত্তা কোথায় দিলেন। আমার রাজনৈতিক বিশ্বাস প্রকাশের জায়গাটা কোথায় দিলেন, দিচ্ছেন নাতো। তাহলে এইরকম একটা অবস্থায় মাইনরিটিরা কীভাবে অংশগ্রহণ করবে?\" (বিবিসি নিউজ বাংলা, ০৯ জানুয়ারি ২০২৬)। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, ভোট প্রদানের সময় সুরক্ষা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রধান শর্ত।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বিবিসি প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সংখ্যালঘু ভোটারদের বড় অংশ সাধারণত আওয়ামী লীগের প্রতি প্রবণ, কিন্তু এবার আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি ও জামায়াত দুই জোটই সংখ্যালঘু ভোটারদের নজরে এসেছে।

জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহম্মদ তাহের বলেন, \"আগের পারসেপশনগুলো এখন আর নেই। সংখ্যালঘুরা নতুন করে ভাবছে এবং আমাদের ফ্রেন্ড হিসেবে দেখছে।\"

বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও আশ্বাস দেন, ভোটের পরে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিবিসি প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার অনেক ঘটনা রাজনৈতিক কারণে সংঘটিত হয়, যেমন গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, \"একটা এলাকায় যে ধর্মের লোকই হোক, তার ভোট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দলের চেয়ে বেশি দায়িত্ব হলো প্রার্থীর। প্রার্থী কতটুকু আস্থা দিতে পারবে, সেই বিষয়েই ভোট নির্ভর করে।\"

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করা না হলে গণতন্ত্র পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয় না। নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘুদের আতঙ্ক, অতীত নির্যাতনের স্মৃতি এবং রাজনৈতিক চাপ এই দেশের গণতন্ত্রকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

বিবিসি নিউজ বাংলার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, অতীতের নির্যাতন এবং রাজনৈতিক চাপ বিবেচনা না করলে ভবিষ্যতে গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব ও ন্যায় নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব, যেন সংখ্যালঘু ভোটাররা ভয়মুক্তভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং তাদের ভোটাধিকার নিরাপদে প্রয়োগ করতে পারে।


মতামত এর আরও খবর