img

নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘুদের আতঙ্ক: গণতন্ত্রের মান এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন

প্রকাশিত :  ০৯:১৯, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘুদের আতঙ্ক: গণতন্ত্রের মান এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন

সংগ্রাম দত্ত: ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা বিবিসি নিউজ বাংলা গত ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে \"নির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোট, \'কোন দিকে যাব আমরা\'?\" শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নির্বাচন এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশের যশোর জেলার অভয়নগরের হিন্দু সংখ্যালঘু বাসিন্দারা জানিয়েছেন যে তারা ভোট দিতে ইচ্ছুক হলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ভোটের মাধ্যমে তাদের মতামত প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব। নির্মল বিশ্বাস বলেন, \"আমরা যদি বিএনপিরে ভোট দিই তালি আমাগে জামাত আইসে ধরে বসবে, আর যদি জামাতরে ভোট দিই তালি বিএনপি আইসে ধরে বসবে। কোন দিকে যাবো আমরা কন?\" (বিবিসি নিউজ বাংলা, ০৯ জানুয়ারি ২০২৬)।

একই গ্রামের শিউলি বিশ্বাসের মন্তব্য, \"আমরা হয়ে গেছি বলের মতো, যেদিকে যাই সেদিকে লাথি খাই,\" সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীন অবস্থাকে তুলে ধরে।

বিবিসি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের মে মাসে যশোরের ডহরমসিয়াহাটি গ্রামে হিন্দু অধ্যুষিত ১৮টি বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, স্থানীয় এক বিএনপি নেতার হত্যাকাণ্ডের পর।

শিউলি বিশ্বাস নির্বাচনের আগে নিরাপত্তার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছেন: \"আমরা অবশ্যই ভোট দিতে যাব। কিন্তু আমাদের কথা হচ্ছে আমাদের যে নিরাপত্তা দেবে আমরা তারেই ভোট দেব।\"

নির্মল রোজারিও বলেন, \"আমার জীবন যদি রক্ষা না হয়, আমার পরিবার যদি রক্ষা না হয়, তাহলে ভোটের বিবেচনা পরে হবে।\"

ইতিহাস প্রমাণ করে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা প্রতিটি নির্বাচনের আগে ও পরে আতঙ্কের মধ্যে থাকে।

২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনের পর সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ ঘটেছিল। এরপর ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বিগত সরকারের সময়েও সংখ্যালঘুদের ওপর বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ঘটেছে।

২০১২ সালের রামু থেকে থেকে ২০২৩ পর্যন্ত  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্মীয় উস্কানি ও মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়ে দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চালানো হয়েছে। মন্দির লুটপাট, প্রতিমা ভাঙচুর এবং হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাও নিয়মিতভাবে ঘটেছে, কিন্তু বিচার বা প্রতিকার খুবই সীমিত হয়েছে।

২০২৪ সালের  আগস্টের পরও সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ থেমে নেই। বিশেষ করে ১৮ ডিসেম্বর, ময়মনসিংহ জেলার ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে মারধর ও হত্যা করে একটি গাছের ডালে ঝুলিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে।

নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘুদের ভোটাধিকার ও নিরাপত্তা বিষয়েও বিবিসি প্রতিবেদন গভীর বিশ্লেষণ করেছে। রঞ্জন কর্মকার বলেন, \"নির্বাচনে অংশগ্রহণ করো কিন্তু আমাকে সুরক্ষাটা কোথায় দিলেন, নিরাপত্তা কোথায় দিলেন। আমার রাজনৈতিক বিশ্বাস প্রকাশের জায়গাটা কোথায় দিলেন, দিচ্ছেন নাতো। তাহলে এইরকম একটা অবস্থায় মাইনরিটিরা কীভাবে অংশগ্রহণ করবে?\" (বিবিসি নিউজ বাংলা, ০৯ জানুয়ারি ২০২৬)। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, ভোট প্রদানের সময় সুরক্ষা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রধান শর্ত।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বিবিসি প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সংখ্যালঘু ভোটারদের বড় অংশ সাধারণত আওয়ামী লীগের প্রতি প্রবণ, কিন্তু এবার আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি ও জামায়াত দুই জোটই সংখ্যালঘু ভোটারদের নজরে এসেছে।

জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহম্মদ তাহের বলেন, \"আগের পারসেপশনগুলো এখন আর নেই। সংখ্যালঘুরা নতুন করে ভাবছে এবং আমাদের ফ্রেন্ড হিসেবে দেখছে।\"

বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও আশ্বাস দেন, ভোটের পরে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিবিসি প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার অনেক ঘটনা রাজনৈতিক কারণে সংঘটিত হয়, যেমন গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, \"একটা এলাকায় যে ধর্মের লোকই হোক, তার ভোট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দলের চেয়ে বেশি দায়িত্ব হলো প্রার্থীর। প্রার্থী কতটুকু আস্থা দিতে পারবে, সেই বিষয়েই ভোট নির্ভর করে।\"

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করা না হলে গণতন্ত্র পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয় না। নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘুদের আতঙ্ক, অতীত নির্যাতনের স্মৃতি এবং রাজনৈতিক চাপ এই দেশের গণতন্ত্রকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

বিবিসি নিউজ বাংলার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, অতীতের নির্যাতন এবং রাজনৈতিক চাপ বিবেচনা না করলে ভবিষ্যতে গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব ও ন্যায় নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব, যেন সংখ্যালঘু ভোটাররা ভয়মুক্তভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং তাদের ভোটাধিকার নিরাপদে প্রয়োগ করতে পারে।


মতামত এর আরও খবর

img

প্রায়োরিটি সিট: কিন্তু মানবতা কোথায়?

প্রকাশিত :  ০৯:২৮, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬

জান্নাতুল ফেরদৌস ডলি

যুক্তরাজ্যে বেশিরভাগ মানুষকেই যাতায়াত করার জন্য ট্রেন, বাস প্রভৃতি যানবাহনে চলাচল করতে হয়।প্রতিদিনই আমি যে পরিস্থিতি স্বচক্ষে মোকাবিলা করি সেটি অত্যন্ত নিন্দনীয়!  ট্রেনের দরজার পাশে,কখনো  মাঝখানে হ্যান্ড্রেল ধরে বৃদ্ধ মানুষ অথবা পেটে হাত ধরে গর্ভবতী নারী দাড়িয়ে থাকেন।Priority Seat থাকা সত্ত্বেও আজকাল কিছু মানুষের মানবিক বোধের অভাবে যাতায়াত  অনেক কঠিন ও কষ্টদায়ক হয়ে পড়েছে। 

ইচ্ছা করেই অনেকে দেখেও না দেখার ভান,মোবাইলের স্ক্রিনে ধ্যানমগ্ন থাকা,কানে হেডফোন লাগিয়ে ঘুমে বিভোর। যেনো মোবাইলের স্ক্রিনের রিফ্লেক্সশন আর আরামদায়ক সিট-ই তাদের মানবতা।কিন্তু ,সেদিকে তাদের বিন্দুমাত্রও খেয়াল নেই যাদের জন্য  সিট ত্যাগ করা জরুরি। please offer this priority seat \'লেখাটি প্রতিদিনই দেখি ট্রেনে,বাসে। কিন্তু এই লেখার মানে বুঝার ক্ষমতা,বিবেক বোধ কিছু মানুষ সম্পূর্ণরুপে হারিয়ে ফেলেছে যার ফলে অসুস্থ মানুষ তাদের স্বস্থির বদলে অস্বস্তিতায় ভোগতে হচ্ছে। 

অথচ আমি বসা ছিলাম ট্রেনে সেদিন।একজন প্রেগন্যান্ট মহিলা কে দেখলাম  বাগিতে একজন বেবিকে নিয়ে ট্রেনের দরজার সামনে দাড়িয়ে আছেন,আমি সাথে সাথে উঠে তাকে অফার করলাম সিট তিনি অত্যন্ত খুশি হয়ে ক্লান্ত শরীর টা নিয়ে সিটে বসে একটা স্বস্থির হাসি দিলেন।

তখন বিশ্বাস করুন, এই হাসিতে আমি মানবিকতার জয় দেখেছি।মূলত একটা সিট ছেড়ে দিলে কেউ গরীব হয়ে যায় না।বরং এটি মানবতার, সভ্যতার বিশাল একটি আয়না যার মধ্যে আমরা আমাদের বিবেক বোধের পরিচয় খুঁজে  পাই।

আরেকদিন আমি দাড়িয়েই ছিলাম ট্রেনে দরজার পাশে দেখলাম হোয়াইটচ্যাপেল স্টেশন থেকে একজন 

 বৃদ্ধ মানুষ (হাতে একটি সাপোর্টার লাঠি ছিল) ট্রেনে উঠে সিট খুজতেছেন অসহায়ের মতো অথচ তার প্রায়োরিটি সিটে বসে আছে তরুণ একজন মানুষ যার দুই চোখ মোবাইলের স্ক্রিনে।গেম আর আড্ডায় মাতোয়ারা সে ডিভাইসে। যেখানে কিছু সময়ের জন্য প্রাপ্য ব্যক্তিকে সিট অফার করা মানিবিক দায়িত্ব সেখানে আজকাল মানুষ এটাকে কষ্টসাধ্য ভেবে এড়িয়ে চলে,যা কখনোই কাম্য নয়।একটি দেশের, সংস্কৃতি, মানবিকতার পরিচয় এই ছোট্ট বিষয় গুলা থেকেই অনুধাবন করা হয়। 

প্রায় কয়েক মাস আগে,আমি ট্রেনে করে হোয়াটচ্যাপেলে যাচ্ছিলাম,সৌভাগ্যক্রমে ওই ট্রেনে আমার শ্রদ্ধেয় একজন স্যার আতাউর রহমান (pdg পীর)  ছিলেন।যার জন্য স্যারের সাথে দেখা হল,স্যার একটি সিটে বসা ছিলেন

স্যার তো বয়স অনুযায়ী প্রায়োরিটি সিট পাওয়ার যোগ্য কারণ তিনি যথেষ্ট বয়স্ক চাইলে সিটে বসে থাকতে পারতেন, তবুও তিনি একজন গর্ভবতী মহিলাকে দাড়াতে দেখে সাথে সাথে নিজে উঠে সিট অফার করলেন

মহিলাটি অবাক হয়ে চেয়ে রইলো আর অসংখ্য ধন্যবাদ দিয়ে অবসাদের শরীর টা নিয়ে বসল। তখন যে প্রশান্তি আর স্বস্থির ছাপ দেখেছিলাম মহিলার চেহারায় তা অসম্ভব সুন্দর ছিল।স্যার এতো মানিবিক মানুষ আমি গর্বিত । ট্রেনের আরও অনেক মানুষ এটি দেখে শিক্ষা অর্জন করবে আশা করি কারণ তারা চুপচাপ বসে ছিল।অথচ প্রায়োরিটি সিট অফার করা তাদের কাছে অপশনাল ব্যাপার মাত্র মনে হয়েছিল।আসলে এটি নৈতিক, মানবিক দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের।স্যার একজন বয়স্ক মানুষ হয়েও একজন গর্ভবতী মহিলাকে প্রায়োরিটি দিলেন

আর এদিকে অনেক তরুণ তরুণী বসেই রইলো যা বিবেকহীনতা আর মূর্খতার পরিচয়। 

তাই আমাদের উচিত, আমরা যে দেশেই বাস করিনা কেন,যে যানবাহন ই চড়িনা কেন,প্রায়োরিটি সিটের মর্ম আমরা যাতে না ভুলি,যোগ্য ব্যক্তিদের সিট দিতে যেন কখনো ইতস্ততবোধ না করি।

তাই আসুন আমরা আমাদের বিবেক বোধকে জাগ্রত করি,priority seat টি সগর্বে অফার করি,আমরা আগে নিজে বদলাই, তাহলেই আমাদের আশে পাশের মানুষ বদলাবে।বদলাবে ট্রেনের এমন করুণ প

পরিস্থিতি। 

তাই আমার কবিতার  ভাষায় অনুরোধ _

\'নয়কো কভু ছোট একটি মাত্র সিট 

ছাড়লে হবে যে মানবিকতার জিৎ

একটু আরাম ত্যাগ করে নাও

বিবেক বোধের জন্য, 

দুর্বল ব্যক্তিকে সিট দিয়ে দাও

তবেই তুমি মানুষরুপে ধন্য।



~জান্নাতুল ফেরদৌস ডলি
ই-মেইল: jannatuljannatul6745@gmail.com

মতামত এর আরও খবর