ট্রাম্পের অনৈতিকতা এবং ইউরোপের মেরুদণ্ডহীনতা
ড. জ্যাকি রেজওয়ানা আনোয়ার FRSA, MBBS, DTM&H, MS & PhD
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের ছাতার তলার পুঁজিবাদী ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো নিয়ে পশ্চিমা ব্লক এবং বিপরীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের ছাতার তলার কমিউনিস্ট ও ওয়ারসোভুক্ত দেশগুলো নিয়ে পূর্ব ব্লকের মধ্যে শীতল যুদ্ধের কথা আমরা সবাই জানি। সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকাতে ১৯৫১ সালে ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা হিসেবে ‘গ্রীনল্যান্ড ডিফেন্স এ্যগ্রিমেন্ট’ হয় যেখানে গ্রীনল্যান্ড ডেনমার্কের স্বায়ত্বশসিত অংশ হলেও যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রীনল্যান্ডে ঘাঁটি নির্মাণ, মার্কিন সেনা মোতায়েন থেকে শুরু ক’রে বহু অধিকার দেওয়া হয়। এত সব অধিকার থাকার পরও গ্রীনল্যান্ড বিষয়ে ট্রাম্প যা চান তাকে সোজা বাংলায় বলা যায় ‘জোর দখল’।
এখন কথা হচ্ছে, ট্রাম্প তো চাইলে গ্রীনল্যান্ডকে দখল না ক’রে লীজ নিতে পারতেন। অন্য দেশের ভূখন্ডে লীজ নেওয়ার উদাহরণ তো বহু রয়েছে। বৃটিশরা যেমন লীজ নিয়েছিল হংকং যেটি ১৯৯৭ সালে চীনকে ফেরত দিয়েছে। তেমনি আবার যুক্তরাষ্ট্র কিউবার কাছ থেকে গুয়েন্তানমো বে লীজ নিয়েছিল বন্দীশালা স্থাপনের জন্যে। কিন্তু না, গ্রীনাল্যান্ডের ক্ষেত্রে লীজ নয়, ট্রাম্প চাইছেন সম্পূর্ণ দখল - এ যেন অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানাবার মতলব।
সময়ের সাথে সাথে গ্রীনল্যান্ড তথা আর্টিক অন্চল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে এই অন্চলে বরফ গলতে শুরু করেছে, ফলে সেখানে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্র বাড়বে বৈ কমবেনা। সেখানে প্রচুর তেল ও খনিজ সম্পদ রয়েছে। ট্রাম্প মিথ্যে দাবি করেছেন যে চীন ও রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ গ্রীনল্যান্ডের সব জায়গায় মোতায়েন রয়েছে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যে এটি দখল করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। যদিও নিরাপত্তার সব কাজ মালিকানা ছাড়াও করা সম্ভব তবু ট্রাম্প বলছেন তিনি গ্রীনল্যান্ডের মালিক হতে চান। ট্রাম্প আরো বলছেন তিনি গ্রীনল্যান্ডকে নিরাপদ করতে চান। কিন্তু সত্য হলো, তিনি সেখানকার খনিজ সম্পদ কবজা করতে চান এবং যুক্তরাষ্ট্রকে আয়তনে আরো বড় করতে চান।
যদিও ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের একটি মিত্র দেশ ও এবং গ্রীনল্যান্ডে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বিমানঘাঁটি রয়েছে তা সত্বেও তিনি ন্যাটোর চুক্তির প্রতি কোনো রকম তোয়াক্কা করছেননা। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, তিনি আন্তর্জাতিক আইনকানুন মানবেন না, তিনি যা করবেন তা তাঁর নিজস্ব নৈতিকতার উপর ভিত্তি করেই করবেন। যাকে জিন ক্যারলকে যৌন নিপীড়নের জন্য দায়ী করা হয়েছে; যার বিরুদ্ধে শত শত ঠিকাদার মামলা করেছে পাওনা পরিশোধ না করার জন্যে; জেফরি এপস্টাইনের মত ব্যাক্তি যার প্রাক্তন বন্ধু; যিনি নারী সাংবাদিকদের চুপ করাতে চাইলে তাদের 'পিগি' (শুয়োরছানা) বলে ডাকেন; যিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে আনেন; যার অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি কোনো শ্রদ্ধা নেই - তাঁর নৈতিকতার উপর নির্ভর করব আমরা?
এদিকে আমরা দেখলাম, ভেনেজুয়েলা অভ্যুত্থানের কয়েক ঘণ্টা পরেই ট্রাম্পের নীতি নির্ধারণী প্রধান স্টিফেন মিলারের স্ত্রী কেটি মিলার একটি ছবি টুইট করেন। সেখানে দেখা যায় গ্রীনল্যান্ড মার্কিন পতাকার রঙে ঢাকা এবং তাতে ক্যাপশন ছিল - "শীঘ্রই আসছে"। ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের প্রকাশ্য অবৈধ অভ্যুত্থানের বিষয়ে ইউরোপীয় নেতারা সবাই বেশ নিশ্চুপ ছিলেন। তাঁরা কেবল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানিয়েছিলেন। যা ছিল স্পষ্টতই অবৈধ, তা নিয়ে তাঁরা টুঁ - শব্দটিও করতে পারেননি। এখন তো দেখা যাচ্ছে ইউরোপ নিজেই ট্রাম্পের পরবর্তী লক্ষ্য হতে যাচ্ছে।
"বৃটেন আসলে এখন একটি নামমাত্র সার্বভৌম দেশ। ফ্রান্স বা এমনকি দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায় বৃটেনের সার্বভৌমত্ব কম। আমরা আসলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি 'ভ্যাসাল স্টেট' (আজ্ঞাবহ রাষ্ট্র) হয়ে গেছি। আমাদের নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র নেই (যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল), আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অ্যামাজনের ক্লাউড সার্ভিস ব্যবহার করে, আমাদের পেমেন্ট সিস্টেম মার্কিন মালিকানাধীন। সেই সাথে কিয়ার স্টার্মার এমন একজন প্রধানমন্ত্রী যিনি এই ভঙ্গুর অবস্থারই প্রতিফলন। তাঁর নিজের কোনো মেরুদণ্ড বা নতুন কোনো ধারণা নেই।"ব্রিটিশ সরকারের জন্যে বিষয়টি একটি বড় উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তারাও কোনো স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারছে না। ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী যেখানে সরাসরি প্রতিবাদ করছেন, সেখানে বৃটিশ সরকার বলছে তারা "রানিং কমেন্টারি" দেবে না। এটি বৃটিশ রাজনৈতিক শ্রেণির দেউলিয়াত্ব প্রকাশ করে। ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে অভিবাসন মন্ত্রী মাইক ট্যাপকে যখন স্কাই নিউজে প্রশ্ন করা হয় যে, ট্রাম্প যদি গ্রীনল্যান্ড দখল করেন তবে বৃটেন কি তার নিন্দা জানাবে? মাইক ট্যাপ সরাসরি কোনো উত্তর দিতে পারেননি। তিনি বারবার বলেছেন যে, "মিত্রদের সাথে আমাদের গোপন কূটনৈতিক আলোচনা চলছে" এবং "ন্যাটো আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা হবে”। সাংবাদিক যখন তাঁকে চেপে ধরেন যে তিনি অন্তত এটুকু বলতে পারেন কি না যে "ট্রাম্পের গ্রীনল্যান্ড দখল করা উচিত নয়", তখন তিনি প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে বলেন, "আমি কাল্পনিক বিষয় নিয়ে কোনো রানিং কমেন্টারি দেব না।"
প্রথমে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার ষ্টার্মার চুপ থাকলেও পরে বুঝতে পেরেছিলেন যে তাদের আগের অবস্থান (চুপ থাকা) টিকবে না। তাই স্টার্মার শেষ পর্যন্ত মুখ খুলেছেন। তিনি বলেছেন, "আমি ডেনিশ প্রধানমন্ত্রীর পাশে আছি এবং গ্রীনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি যা বলেছেন তা সঠিক।" তবে এটি কেবল একটি লোকদেখানো বিবৃতি বলে মনে হচ্ছে। যারা প্যালেস্টাইনে নিহত তিন ব্রিটিশ সেনার জন্যে দাঁড়াতে পারেনি, তারা গ্রীনল্যান্ডবাসীদের জন্যে কতটা দাঁড়াবে তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ থাকাটাই স্বাভাবিক।
বৃটেন আসলে এখন একটি নামমাত্র সার্বভৌম দেশ। ফ্রান্স বা এমনকি দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায় বৃটেনের সার্বভৌমত্ব কম। আমরা আসলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি 'ভ্যাসাল স্টেট' (আজ্ঞাবহ রাষ্ট্র) হয়ে গেছি। আমাদের নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র নেই (যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল), আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অ্যামাজনের ক্লাউড সার্ভিস ব্যবহার করে, আমাদের পেমেন্ট সিস্টেম মার্কিন মালিকানাধীন। সেই সাথে কিয়ার স্টার্মার এমন একজন প্রধানমন্ত্রী যিনি এই ভঙ্গুর অবস্থারই প্রতিফলন। তাঁর নিজের কোনো মেরুদণ্ড বা নতুন কোনো ধারণা নেই।
গ্রীনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা এবং ইউক্রেন এই তিনটি ক্ষেত্রেই ইউরোপীয় নেতাদের এবং একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) দুর্বলতা ও বিভাজনও আশঙ্কাজনকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এই ভয়াবহ ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, 'ব্রেক্সিট'কে এখন আর কেবল একটি বোকামি বলে মনে হয় না। এটিকে এখন প্রায় আত্মঘাতী বলে মনে হয়। বাস্তব অর্থেই ইউরোপ এখন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া - এই তিনটি বড় শিকারী শক্তির মাঝখানে পড়ে গেছে।
ইউরোপের এখন কী করা উচিত? ইউরোপের প্রথম কাজ হওয়া উচিত একটি শক্তিশালী ডিজিটাল প্রাচীর (Firewall) তৈরি করা। চীন যা করেছে নিজেদের ড্যাটা এবং টেক কোম্পানিগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে। ইউরোপ যদি গুগল, মেটা বা অ্যামাজনের ওপর নির্ভরশীল না হতো, তবে আজ ইউরোপে ৫০০০ বিলিয়ন ডলারের অন্তত আধা ডজন কোম্পানি থাকত।
গত ৪০ বছর ধরে ইউরোপীয় নেতারা তাঁদের নিজস্ব শিল্প গড়ে তোলার পরিবর্তে নিওলিবারেলিজম বা বাজার অর্থনীতির ওপর অন্ধ বিশ্বাস রেখেছেন। তাঁরা ভেবেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র তাদের আজীবন রক্ষা করবে। কিন্তু হুয়াওয়ের সিইও যেমন বলেছিলেন, একটি দেশের যদি নিজস্ব ড্যাটা সুইচ না থাকে, তবে তার সেনাবাহিনী না থাকার মতোই অবস্থা। ইউরোপ আজ প্রযুক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দাসে পরিণত হয়েছে।
আমরা প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। আপনি যখন অ্যাপল পে বা ভিসা কার্ডে টাকা দিচ্ছেন, মেটা-র প্রোডাক্ট ব্যবহার করছেন বা আপনার ফ্ল্যাট যখন ব্ল্যাকস্টোনের মতো কোনো মার্কিন কোম্পানি কিনছে - তার মানে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো আমাদের হাতে নেই। এই পরনির্ভরশীলতা থেকে বের হতে না পারলে আমরা কোনোদিনই প্রকৃত স্বাধীন হতে পারব না। বর্তমান যুগে প্রকৃত স্বাধীনতার অর্থ নিজেদের ড্যাটার উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ থাকা। বৃটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের এ ব্যাপারে বড় ধরনের কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান না। ট্রাম্প যদি শেষ পর্যন্ত গ্রীনল্যান্ড দখল করেই নেন তখন হয়তো ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বৃটেনের ঘুম ভাঙবে।
লেখক ড. জ্যাকি রেজওয়ানা আনোয়ার FRSA, MBBS, DTM&H, MS & PhD একজন চিকিৎসক, জনপ্রিয় সিনিয়র সংবাদ পাঠক, কলামিস্ট ও আন্তর্জাতিক স্পীকার।



















