img

শ্রদ্ধাঞ্জলি: কুঁড়েঘরের মোজাফফর: আপসহীন রাজনীতির প্রতীক

প্রকাশিত :  ০৭:০৪, ২৫ আগষ্ট ২০২৫

শ্রদ্ধাঞ্জলি: কুঁড়েঘরের মোজাফফর: আপসহীন রাজনীতির প্রতীক

সংগ্রাম দত্ত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে যাদের উচ্চারণ মানেই সততা, আদর্শ আর সংগ্রামের কথা মনে পড়ে। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ঠিক তেমনই একজন মানুষ। তিনি ছিলেন ন্যাপের সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্থায়ী সরকারের উপদেষ্টা, আবার সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন ‘কুঁড়েঘরের মোজাফফর’ নামেই। ক্ষমতার মোহ বা পদ-পদবির চকচকে দুনিয়া তার মন ছুঁতে পারেনি। সাদামাটা জীবন, আপসহীন নীতি আর অকৃত্রিম নেতৃত্বই তাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন দিয়েছে।

ছাত্র থেকে শিক্ষক, শিক্ষক থেকে রাজনীতিক

১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে জন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর শেষ করে তিনি প্রথমে বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করেন। পরে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনই তার জীবনের বাঁকবদল ঘটায়। আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত হয়ে তিনি বুঝেছিলেন—এই জাতির মুক্তির পথ রাজনীতির মধ্য দিয়েই। তাই ১৯৫৪ সালে অধ্যাপনার নিরাপদ চাকরি ছেড়ে ঝুঁকিপূর্ণ রাজনীতিকে বেছে নেন।

রাজনৈতিক উত্থান ও সংগ্রাম

মোজাফফর আহমদের রাজনৈতিক যাত্রা ছিল চড়াই-উতরাই ভরা। ১৯৫৭ সালে ন্যাপের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলেছিলেন, যা পরবর্তীতে বাঙালির স্বাধীনতার আন্দোলনের ভিত্তি হয়ে ওঠে। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে, এমনকি ধরিয়ে দিলে পুরস্কার ঘোষণা দেয়। তিনি তখন আত্মগোপনে থেকে আন্দোলন সংগঠিত করেন দীর্ঘ আট বছর।

১৯৬৬ সালে প্রকাশ্যে রাজনীতিতে ফিরে আসেন তিনি। ১৯৬৭ সালে ন্যাপ বিভক্ত হলে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি নেতৃত্ব দেন, কারাবরণও করেন।

মুক্তিযুদ্ধের অনন্য ভূমিকা

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা ছিল স্মরণীয়। অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে গেরিলা বাহিনী সংগঠনে তিনি ছিলেন অগ্রভাগে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রকাশিত নতুন বাংলা পত্রিকাও তার নেতৃত্বে বের হয়, যা পরে ন্যাপের মুখপত্রে পরিণত হয়।

শ্রীমঙ্গলে সরল উপস্থিতি, অমলিন স্মৃতি

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ছিলেন অতি সাধারণ জীবনযাপনের মানুষ। তাঁর রাজনীতি যেমন ছিল নীতিনিষ্ঠ, তেমনি জীবনযাত্রাও ছিল একেবারে সাধারণ।

একটি স্মৃতি আজও মানুষের মনে জ্বলজ্বল করে—জিয়াউর রহমানের আমলে শ্রীমঙ্গলে এক সফরে তিনি পায়ে হেঁটে প্রবেশ করেছিলেন শহরে। পূর্বাশা আবাসিক এলাকার তৎকালীন পৌর কমিশনার মোঃ আহাদ মিয়া সাহেবের বাসার সামনে গাড়ি রেখে লুঙ্গি ও লম্বা শার্ট পরে, ভোরবেলা হেঁটে যাচ্ছিলেন ন্যাপ নেতা রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর বাসার দিকে। তাঁর পিছু পিছু অসংখ্য মানুষ। তখনকার দৃশ্য আজও চোখে ভাসে—নেতার এই সাধারণ সাজসজ্জা, মানুষের প্রতি টান, আর রাজনীতিকে জনতার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার অনন্য ধরণ।

১৯৮৩ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আগমুহূর্তে আবারও শ্রীমঙ্গলে আসেন তিনি। এলাকার মানুষ রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীকে নির্বাচন করার জন্য চাপ দিতে থাকেন। কিন্তু তিনি দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন—“টাকা-পয়সা নেই, কিভাবে নির্বাচন করব?” তখনই প্রফেসর মোজাফফর সোজাসাপ্টা বলেছিলেন—

 “এই টাকার খেলায় দাঁড়িয়ে তুমি কি করবে? নির্বাচন তো এখন অন্য রকমের ব্যাপার, শুধু টাকার খেলা।”

তখন এলাকার অনেকেই তাঁকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, রাসেন্দ্র বাবু জিতবেনই। প্রফেসর মোজাফফর হাসিমুখে উত্তর দিয়েছিলেন—

 “ঠিক আছে, নির্বাচনের ফলাফলের পর দেখা হবে। তবে বউয়ের সোনা-গয়না যেন বিক্রি করতে না হয়!”

নির্বাচনে জয়ের পর ঢাকায় পার্টির মিটিংয়ে তিনি সবার সামনে সেই ঘটনাটি হেসে হেসে স্মরণ করেছিলেন। এভাবেই তিনি রাজনীতির কঠিন বাস্তবতাকে রসিকতার আড়ালে তুলে ধরতেন।

ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়

৯০-এর পর অনেকবার দেখা হতো কাকরাইলের তার ৫০ নম্বর বাসায় কিংবা কুমিল্লার বাড়িতে। সেখানে বসেই তিনি বলতেন—

“রাজনীতি তো এখন নেই। কিন্তু গরিব যতদিন আছে, গরিবের রাজনীতি থাকবেই। চুপচাপ বসে থাকো। সময় যখন হবে, তখন হাল ধরতে পারবে।”

কথা বলতেন ভীষণ সুন্দর করে, পরিষ্কার যুক্তি দিয়ে। মাঝেমধ্যেই হেসে জিজ্ঞেস করতেন—“কি বলছি, বুঝতে পারছ তো?”

এই সরল অথচ দৃঢ় চরিত্রই তাঁকে ভিন্নমাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল।

পদকের প্রতি অনীহা

স্বাধীনতার পরও অধ্যাপক মোজাফফর গণতন্ত্র ও ন্যায়ের পথে ছিলেন অবিচল। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি আবারও কারারুদ্ধ হন। তাঁর জীবনের এক বড় বৈশিষ্ট্য—নীতির প্রশ্নে আপসহীনতা। এরই প্রকাশ ঘটে ২০১৫ সালে, যখন সরকার তাঁকে স্বাধীনতা পদক দিতে চাইলেও তিনি তা\' গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান।

শিক্ষা ও সামাজিক উদ্যোগ

রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষার প্রসারেও তিনি ছিলেন নিবেদিত। নারায়ণগঞ্জের মদনপুরে প্রতিষ্ঠা করেন সামাজিক বিজ্ঞান পরিষদ, যেখানে তিনি নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

শেষ প্রস্থান

২০১৯ সালের ২৩ আগস্ট তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে তাঁর রেখে যাওয়া জীবনদর্শন আজও আলোকিত করে যারা ক্ষমতার প্রলোভন নয়, বরং মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করতে চায়।

কুঁড়েঘরের মোজাফফর হয়তো আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর নাম উচ্চারিত হলেই মনে পড়ে যায়—বাংলাদেশের রাজনীতিতে সততা ও আদর্শের এক আলোকবর্তিকা ছিলেন তিনি।


img

সূচকের পতনের চেয়ে বড় সংকট আস্থার অবক্ষয়

প্রকাশিত :  ১১:২৯, ২২ জুন ২০২৬

✍️ নিজস্ব প্রতিবেদক

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দরপতন নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত এক যুগে বিনিয়োগকারীরা উত্থানের চেয়ে পতনের গল্পই বেশি শুনেছেন। তবু প্রতি বড় দরপতনের দিন আমাদের সামনে নতুন করে একটি প্রশ্ন হাজির হয়—সমস্যাটা কী কেবল বাজারের, নাকি এর পেছনে অর্থনীতি, নীতি এবং আস্থার আরও গভীর সংকট কাজ করছে?

সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৮৫ পয়েন্টের বেশি হারিয়েছে। এক দিনে শতাংশ দেড় ভাগের বেশি পতন নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু উদ্বেগের প্রকৃত কারণ সূচকের পতন নয়; বরং বাজারের সামগ্রিক চিত্র। অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম কমেছে, লেনদেনের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও প্রকট হয়েছে।

পুঁজিবাজার মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বিনিয়োগকারী যখন বিশ্বাস করেন যে অর্থনীতি স্থিতিশীল, নীতিনির্ধারকরা সুস্পষ্ট অবস্থানে আছেন এবং বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তখন তিনি বিনিয়োগে আগ্রহী হন। বিপরীতে অনিশ্চয়তা বাড়লে তিনি অপেক্ষার পথ বেছে নেন। বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে সেই অপেক্ষার প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বিষয়। তেলের দাম, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের দুর্বলতার ব্যাখ্যা কেবল বাইরের ঘটনায় খুঁজলে ভুল হবে। কারণ আমাদের বাজার বহুদিন ধরেই তারল্যসংকট, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণের সমস্যায় ভুগছে।

সোমবারের বাজারে তারল্যসংকটের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিপুল অঙ্কের সরকারি সুকুক ইস্যুর কারণে আর্থিক খাতের একটি বড় অংশের অর্থ শেয়ারবাজারের বাইরে চলে গেছে। এটি সাময়িক ঘটনা হলেও এর মধ্য দিয়ে একটি পুরোনো বাস্তবতা আবার সামনে এসেছে—বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনও পর্যাপ্ত দীর্ঘমেয়াদি তহবিল আকর্ষণ করতে পারেনি। ফলে সামান্য চাপ এলেই বাজার নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

এদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নজরদারি বাজারের জন্য ইতিবাচক বার্তা। কারসাজি ও কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তবে এটিও সত্য যে দীর্ঘদিন ধরে বাজারের একটি অংশ অস্বাভাবিক লেনদেন ও জল্পনানির্ভর প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল। ফলে নজরদারি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অর্থের একটি অংশ বাজার ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। এটিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং দীর্ঘমেয়াদে এটি বাজারকে আরও সুস্থ ও স্বচ্ছ করে তুলতে পারে।

ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর অনেক শেয়ারের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদে কিছু কোম্পানির শেয়ারে বড় ধরনের দরপতন দেখা গেলেও বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী এটি অস্বাভাবিক নয়। দীর্ঘদিন কৃত্রিমভাবে আটকে রাখা দাম একসময় বাস্তবতার মুখোমুখি হবেই।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কোথায়?

প্রথমত, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। বিনিয়োগকারীরা যেন মনে করেন, এখানে নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য এবং কারসাজিকারীরা কোনোভাবেই পার পাবে না। দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলছে, শক্তিশালী পেনশন ফান্ড, মিউচুয়াল ফান্ড এবং দীর্ঘমেয়াদি তহবিল ছাড়া স্থিতিশীল পুঁজিবাজার গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনার উদ্যোগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগকারীদের সামনে মানসম্মত বিনিয়োগের সুযোগ যত বাড়বে, বাজার তত শক্তিশালী হবে।

স্বল্পমেয়াদে সূচক আরও কিছুটা ওঠানামা করতে পারে। সেটি বাজারের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হলে সূচকের দৈনিক ওঠানামার বাইরে গিয়ে মূল সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে।

কারণ পুঁজিবাজার কেবল কিছু শেয়ারের দর বাড়া–কমার নাম নয়। এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। আর সেই আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরলে সূচকের কয়েক পয়েন্ট পতনের চেয়েও বড় ক্ষতি হয়ে যায়।