ফ্রিডম হাউসের প্রতিবেদন: দেশে বেড়েছে ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা
প্রকাশিত :
১২:০৬, ১৪ নভেম্বর ২০২৫
মার্কিন সংস্থা ফ্রিডম হাউস জানিয়েছে, বিশ্বে অনলাইনের স্বাধীনতা কমে গেলেও বাংলাদেশে এর উন্নতি হয়েছে । আজ প্রকাশিত ‘ফ্রিডম অন দ্য নেট ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছর মূল্যায়নে থাকা ৭২টি দেশের মধ্যে ইন্টারনেট স্বাধীনতায় সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে বাংলাদেশে।
এ গবেষণায় ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে।
ফ্রিডম হাউস বলছে, ২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে হওয়া অভ্যুত্থানে একটি কর্তৃত্ববাদী সরকার ক্ষমতা হারায়। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ডিজিটাল ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক সংস্কার আনে। এর ফলেই বাংলাদেশের ইন্টারনেট স্বাধীনতা সূচক ৫ পয়েন্ট বেড়ে ১০০-এর মধ্যে ৪৫ হয়েছে। গত বছর এই স্কোর ছিল ৪০। এটি গত সাত বছরের সেরা অবস্থান।
তবে এত উন্নতির পরও বাংলাদেশ এখনো ‘আংশিক মুক্ত’ দেশ হিসেবে তালিকায় রয়ে গেছে—যে অবস্থানে ২০১৩ সাল থেকে রয়েছে।
ফ্রিডম হাউস তিনটি বড় বিষয় দেখে স্কোর নির্ধারণ করে—
(১) ইন্টারনেটে প্রবেশের বাধা,
(২) অনলাইনে প্রকাশিত বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ,
(৩) ব্যবহারকারীর অধিকার লঙ্ঘন।
এই তিনটি বিভাগে মোট ২১টি সূচক ব্যবহার করে প্রতিটি দেশের অনলাইন স্বাধীনতার মাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা কিছু বড় পরিবর্তন হলো—২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মুহাম্মদ এমদাদ-উল-বারীকে বিটিআরসির চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়। তিনি ইন্টারনেট বন্ধ না করার নীতি গ্রহণ করেন এবং ইন্টারনেট প্রবেশাধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে দেখার কথা বলেন।
২০২৫ সালের মে মাসে সরকার বিতর্কিত সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ) বাতিল করে। এর বদলে সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ (সিএসও) জারি হয়।
এতে কিছু ভালো দিক যেমন অনলাইন হয়রানি ও যৌন নির্যাতনবিরোধী সুরক্ষা রয়েছে, তবে আগের মতোই কিছু উদ্বেগজনক বিষয়—যেমন অনলাইনে বক্তব্যের জন্য শাস্তি ও নজরদারি রয়ে গেছে।
এদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে। তবে ভারত ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে পেছনে রয়েছে। পাকিস্তান ২৭ পয়েন্ট পেয়ে ‘মুক্ত নয়’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শ্রীলঙ্কা ৫৩ ও ভারত ৫১ পয়েন্ট পেয়ে দুটোই ‘আংশিক মুক্ত’ শ্রেণিতে রয়েছে।
সব আন্তঃনগর ট্রেনে বসছে স্টারলিংক ইন্টারনেট, বাস-ফেরিতেও চালুর পরিকল্পনা
প্রকাশিত :
১১:০৮, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
দেশে প্রথমবারের মতো চলন্ত ট্রেনে স্টারলিংকের ইন্টারনেট সেবার পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল) ও বাংলাদেশ রেলওয়ের যৌথ উদ্যোগে এই পাইলট প্রকল্প শুরু হয়। বর্তমানে কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেনে ইন্টারনেট সেবা রয়েছে। এর মাধ্যমে যাত্রীরা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ট্রেনের ভেতরেই ওয়াই-ফাই ব্যবহার করতে পারছেন।
গত ঈদুল ফিতরের আগে দেশের কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেনে পরীক্ষামূলকভাবে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সংযোগে ব্যাপক সাড়া মিলেছে যাত্রীদের। তাদের দাবি, সব আন্তঃনগর ট্রেনেই এই সেবা চালু হোক। যা আমলে নিয়ে এরইমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক সাড়া জানানো হয়েছে।
শুধু ট্রেনেই নয়, ভবিষ্যতে বাস ও ফেরির যাত্রীদের জন্যও এই ধরনের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা বাণিজ্যিকভাবে চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৩ মার্চ দেশে প্রথমবারের মতো চলন্ত ট্রেনে পরীক্ষামূলকভাবে সরাসরি স্যাটেলাইটভিত্তিক উচ্চগতির স্টারলিংক ইন্টারনেট সেবা চালু করা হয়। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার নির্দেশনায় এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়। এতে বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করছে বিএসসিএল এবং সহযোগিতা দিচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
প্রাথমিক পর্যায়ে পর্যটক এক্সপ্রেস, কক্সবাজার এক্সপ্রেস, উপবন এক্সপ্রেস ও বনলতা এক্সপ্রেস—এই তিনটি আন্তঃনগর ট্রেনে পরীক্ষামূলকভাবে ফ্রি ওয়াই-ফাই সেবা চালু করা হয়। ট্রেনের প্রতিটি বগিতে কিউআর কোড সংযুক্ত করা হয়, যা স্ক্যান করে যাত্রীরা সহজেই ইন্টারনেট সংযোগে যুক্ত হতে পারেন। পুরো প্রক্রিয়াটি এমনভাবে সাজানো হয় যাতে কোনো জটিলতা ছাড়াই যাত্রীরা দ্রুত সংযোগ পেতে পারেন।
পরীক্ষামূলক এই উদ্যোগে যাত্রীদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সাড়া পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, এই তিনটি ট্রেনে ভ্রমণরত যাত্রীরা সম্মিলিতভাবে প্রায় ১১ টেরাবাইট ডেটা ব্যবহার করেছেন। ট্রেনের প্রতিটি বগিতে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করে যাত্রীরা সহজেই ফ্রি ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পেরেছেন। কোনো জটিল সেট-আপ ছাড়াই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সংযোগ পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে যেসব রুটে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল বা অনিয়মিত, সেখানে এই সেবা কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখা দিয়েছে।
যাত্রীদের অভিজ্ঞতাতেও এর প্রতিফলন পাওয়া গেছে। ঢাকা থেকে সিলেটগামী উপবন এক্সপ্রেসের যাত্রী রায়হান আহমেদ বলেন, ট্রেনে সাধারণত ইন্টারনেট ব্যবহারে নানা সমস্যা থাকে এবং সংযোগ অনিয়মিত হয়। তবে এই সেবা চালুর পর পুরো যাত্রাপথে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পেরেছেন।
রাজশাহীগামী বনলতা এক্সপ্রেসের যাত্রী আবু সালেহ জানান, তিনি ট্রেনে বসেই অনলাইনে ভিডিও স্ট্রিমিং করতে পেরেছেন, যা আগে সম্ভব হয়নি। কিউআর কোড স্ক্যান করার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সংযোগ পাওয়া গেছে এবং পুরো যাত্রায় উল্লেখযোগ্য কোনো বাফারিং দেখা যায়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পরীক্ষামূলক পর্যায়ে পাওয়া এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এখন সেবাটি বাণিজ্যিকভাবে চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ট্রেন, বাস ও ফেরিতে একক সাবস্ক্রিপশন ব্যবস্থার মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ একজন যাত্রী একবার সাবস্ক্রিপশন নিলে একই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বিভিন্ন গণপরিবহনে ইন্টারনেট সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। এতে ব্যবহারকারীদের জন্য সুবিধা বাড়বে এবং সংযোগ ব্যবস্থাও আরও সমন্বিত হবে।
তবে এই সেবা চালুর ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যা না থাকলেও চলন্ত ট্রেনে যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, নির্দিষ্ট বগিতে সাময়িক ত্রুটি এবং দ্রুত মেরামতের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। চলন্ত অবস্থায় এসব যন্ত্রপাতি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা তুলনামূলকভাবে জটিল হওয়ায় এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এসব সমস্যার বেশিরভাগই নন-টেকনিক্যাল এবং সময়ের সঙ্গে সমাধানযোগ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ট্রেনের বাইরে গণপরিবহনে এই সেবা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে একটি টেকসই ব্যবসায়িক মডেল তৈরির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে ভর্তুকির ওপর নির্ভর করে এ ধরনের সেবা চালু রাখা কঠিন হওয়ায় বেসরকারি পরিবহন অপারেটরদের জন্যও এই সেবা উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হতে পারে এবং সেবার মান উন্নত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. ইমাদুর রহমান বলেন, চলন্ত ট্রেনে স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা চালুর পরীক্ষামূলক উদ্যোগে যাত্রীদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। এটি দেশে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগের চাহিদার একটি ইঙ্গিত বহন করে। তিনি জানান, পর্যায়ক্রমে বাস, ফেরি এবং দুর্গম এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এই সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। একইসঙ্গে একক সাবস্ক্রিপশন ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ তৈরির কাজ চলছে।
তিনি আরও জানান, এই সেবা চালুর জন্য ট্রেনের প্রতিটি বগি, বাস বা ফেরিতে বিশেষ স্যাটেলাইট রিসিভার এবং ওয়াই-ফাই রাউটার স্থাপন করা হচ্ছে। এসব যন্ত্র সরাসরি কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত ইন্টারনেট সিগন্যাল ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যাত্রীদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। যাত্রীরা বগিতে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করে সহজেই এই নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারবেন। ভবিষ্যতে একটি কেন্দ্রীয় সাবস্ক্রিপশন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হলে ব্যবহারকারীরা একটি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ট্রেন, বাস ও ফেরি—সব ধরনের পরিবহনে একইভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন।
এদিকে বিএসসিএল সূত্রে আরও জানা গেছে, দেশের দুর্গম এলাকাতেও স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে কাজ চলছে। এরইমধ্যে সীমান্তবর্তী অঞ্চল, হাওর এলাকা এবং নেটওয়ার্কবিহীন বিভিন্ন স্থানে মিলিয়ে ১১১টি পয়েন্টে এই সেবা চালু হয়েছে। যেখানে প্রচলিত ফাইবার অপটিক বা মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপন করা কঠিন, সেখানে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট কার্যকর বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
একইসঙ্গে দেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট ‘বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১’-এর ব্যবহারও ধীরে ধীরে বাড়ছে। বর্তমানে এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ৬৬টি টেলিভিশন চ্যানেলে সম্প্রচার সেবা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ট্রান্সপন্ডার ভাড়ার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে নেপাল ও ফিলিপাইনসহ কয়েকটি দেশে স্যাটেলাইট সেবা রপ্তানির সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।