img

জামায়াতের কৌশলে ম্লান জয়শঙ্করের ঢাকা সফর

প্রকাশিত :  ০৮:৫৫, ০১ জানুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১২:৩১, ০১ জানুয়ারী ২০২৬

জামায়াতের কৌশলে ম্লান জয়শঙ্করের ঢাকা সফর

সাইফুল খান 

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের ঢাকা সফরকে ধরা হয়েছিলো দুই দেশের সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে। ভারতের বিদেশমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাষ্ট্রীয় দাফন অনুষ্ঠানে শোক জানাতে এসে বিএনপি সভাপতি জনাব তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ব্যক্তিগত শোকবার্তাও দিয়েছেন। এটি ছিল রাষ্ট্রীয় স্তরে সৌহার্দ্যপূর্ণ বার্তা পাঠানোর একটি প্রচেষ্টা, বিশেষ করে দীর্ঘ বিরতির পর ভারতে-বাংলাদেশে সম্পর্কের টোন পুনরায় ইতিবাচক দিকে নিয়ে আসার চেষ্টা। তবে সেই প্রচেষ্টার ধার ও সিগন্যালিংয়ের প্রভাব জামায়াতের কৌশলের কারণে কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান রয়টার্সকে সাক্ষাৎকার দিয়ে স্বীকার করেছেন যে, তিনি এক ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে এক বৈঠক করেছেন (রয়টার্সের সংবাদটি প্রকাশিত হয় ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ; মিঃ জয়শঙ্কর তখন ঢাকায়)। যা গোপন রাখা হয়েছিল ওই কূটনীতিকের অনুরোধে। তিনি (ডাঃ শফিক) আরো স্পষ্ট করে বলেন, অন্যান্য দেশের কূটনীতিকরা তাদের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগ করেন, কিন্তু ভারতীয় কূটনীতিক যোগাযোগ গোপন রাখতে বলেছিলেন। একই সাথে তিনি প্রশ্ন রাখেন, কেন গোপন রাখতে হবে?  যেখানে সকল দেশের কুটনীতিবিদেরা প্রকাশ্যে যোগাযোগ করছেন তাদের সাথে।

এই সংবাদটি যখন বিভিন্ন দেশি পত্রিকা ও অনলাইন মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে। তখন অনেক প্রচারমূলক খবর কেবল “গোপন বৈঠক” এবং “ভারতীয় কূটনীতিকের নির্দেশ” ধরনের শিরোনামে উঠে আসে। এভাবে খন্ডিত বা সংক্ষিপ্ত নিউজ প্রচারের ফলে একটি ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে যে, জামায়াত তার নিজস্ব কৌশলবোধ ছাড়াই ভারতের কথা মানছে।  এই ভুল বোঝাবুঝির চর্চা বেশি হওয়ায় পক্ষান্তরে কুটনৈতিক লাভ জামায়াতেরই বেশি হয়েছে৷

জামায়াতের কৌশলগত এই নিরবতার একটা একাডেমিক ডিপ্লোমেটিক নাম আছে, Strategic Ambiguity। Strategic Ambiguity হলো এমন একটি কৌশল। যেখানে কোনো রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক শক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে তার নীতি, অবস্থান বা ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ পরিষ্কার করে প্রকাশ না করে অস্পষ্ট রাখে, যাতে একাধিক সম্ভাব্য ব্যাখ্যার পথ খোলা থাকে।

এর লক্ষ্য হলো,প্রতিপক্ষকে অনিশ্চয়তায় রাখা।নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখা, একই সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন পক্ষকে ভিন্ন বার্তা দেওয়া। সহজ ভাষায়, জানিয়ে না জানানো তথা স্পষ্ট না করা। আন্তর্জাতিক কুটনীতিতে এটা প্রতিষ্ঠিত ও বৈধ একাডেমিক প্রক্রিয়া।

একাডেমিকভাবে Strategic Ambiguity কোথায় ব্যবহৃত হয়?

International Relations (আন্তর্জাতিক সম্পর্ক) এ বহুল ব্যবহৃত হয় এই কৌশল। একটা উদাহরণ দিয়ে পরিষ্কার করি। তাইওয়ান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে বলে না। চীন আক্রমণ করলে তারা সামরিকভাবে তাইওয়ানকে রক্ষা করবে কি-না। ফলে, চীন নিশ্চিত হতে পারে না, তাইওয়ানও অতিরিক্ত ঝুঁকি নিতে পারে না। এটাই Strategic Ambiguity-এর ক্লাসিক উদাহরণ।

Deterrence Theory (প্রতিরোধ তত্ত্ব) এর ক্ষেত্রে  এই কৌশল ব্যবহার হয়। যেমন নিউক্লিয়ার বা সামরিক শক্তির ক্ষেত্রে। কতটা শক্তি ব্যবহার করা হবে, কতটুকু সীমা অতিক্রম করলে যুদ্ধ হবে। এগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রাখা হয়, যাতে প্রতিপক্ষ ভুল হিসাব করতে ভয় পায়।

Strategic Communication & Signaling এর ক্ষেত্রে এই কৌশল ব্যবহৃত হয়। রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব কখনো স্পষ্ট বার্তা না দিয়ে এমন ভাষা ব্যবহার করে যা মিত্রদের আশ্বস্ত করে, প্রতিপক্ষকে সতর্ক করে,জনমতকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।

Game Theory (খেলা তত্ত্ব) তে  Strategic Ambiguity এখানে কাজ করে incomplete information পরিস্থিতিতে। যদি প্রতিপক্ষ আপনার সীমা না জানে। তবে সে ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করবে। এতে আপনার bargaining power বাড়ে।

Political Science এবং Public Policy এর ক্ষেত্রে,  ঘরোয়া রাজনীতিতে বিতর্কিত ইস্যুতে দলগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট অবস্থান নেয়। যাতে ভিন্ন ভিন্ন ভোটব্যাংক ক্ষুব্ধ না হয়। এটিও Strategic Ambiguity-এর রাজনৈতিক প্রয়োগ।

Strategic Ambiguity কেন কার্যকর?

এর সুবিধা-অসুবিধা দুটোই আছে।

সুবিধাগুলো হলো-

কৌশলগত নমনীয়তা (flexibility)।

প্রতিপক্ষের ভুল হিসাবের ঝুঁকি বাড়ানো।

অপ্রয়োজনীয় সংঘাত এড়ানো।

দরকষাকষিতে শক্ত অবস্থান।

অসুবিধা হলো -

ঝুঁকি বাড়ে। ভুল ব্যাখ্যা থেকে যুদ্ধ বা সংঘাত।মিত্রদের আস্থাহীনতা। দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বাসযোগ্যতায় ক্ষয়।

Strategic ambiguity এর ইংরেজি সংজ্ঞা হলো-  "Strategic Ambiguity is a deliberate policy of maintaining uncertainty about intentions, commitments, or red lines in order to enhance deterrence, bargaining power, and strategic flexibility."

(Strategic Ambiguity বলতে এমন একটি সচেতন কৌশলগত নীতিকে বোঝায়, যেখানে কোনো রাষ্ট্র বা পক্ষ তার উদ্দেশ্য, প্রতিশ্রুতি কিংবা ‘রেড লাইন’ সম্পর্কে ইচ্ছাকৃতভাবে অনিশ্চয়তা বজায় রাখে। যার মাধ্যমে প্রতিরোধক্ষমতা জোরদার করা, দরকষাকষিতে কৌশলগত প্রভাব বৃদ্ধি করা এবং নীতিগত নমনীয়তা সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।)

কৌশলগত নীরবতার পেছনের কারণ

জামায়াত দীর্ঘদিন অঘোষিত এবং সর্বশেষ ঘোষিত রাজনৈতিক নিষিদ্ধ অবস্থায় ছিল। এখন আবার প্রধান রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করছে, এটাই তার প্রথম স্টেজের বড় পরিবর্তন। এই অবস্থায় প্রকাশ্যে প্রতিটি কথা বলা তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিলো। এতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা প্রশাসনিক ও আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হতে পারত। প্রকাশ্যে না জানিয়েও যখন তারা ডিপ্লোম্যাটিক যোগাযোগ চালিয়েছে, তখন সে যোগাযোগটির প্রভাব নির্দিষ্ট পরিপ্রেক্ষিত, নির্বাচনের আগের সময় ও রাজনৈতিক পুনর্গঠন এটা বিবেচনায় নিয়েছে। এই ধাঁচটাকেই কূটনীতিতে Strategic Ambiguity বা কৌশলগত অস্পষ্টতা বলা হয়। যেখানে পক্ষগুলো নিজেদের অবস্থান প্রকাশ্যে স্পষ্ট না রেখে সময় ও সুযোগের অনুকূলে ব্যবহার করে। জামায়াতের এই নিরবতা এবং পরবর্তীকালে তথ্য প্রকাশ সেই কৌশলগত অস্পষ্টতার বাস্তব উদাহরণ।

জয়শঙ্করের সফর কেন ম্লান হলো?

জয়শঙ্করের সফর মূলত রাষ্ট্রীয় বার্তা ও সম্পর্কের পুনরুদ্ধার কেন্দ্রিক ছিল। শোক জানানো, উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ, দ্বিপাক্ষিক টোন তৈরি করা। কিন্তু জামায়াতের গোপন বৈঠক নিয়ে তথ্য বেরিয়ে আসার পর মিডিয়া প্রচারের ধরণ এমনভাবে দাঁড়ায় যে, “ভারতীয় কূটনীতিকের গোপন বৈঠক”-এর ব্যাখ্যা ভুলভাবে ফুটে ওঠে। জামায়াতকে ভারত-নির্ভর বা নির্দেশিত সংস্থার মতো দেখানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে জয়শঙ্করের সফরের মেসেজে বিভক্ততা তৈরি হয়।

ফলে যেখানে একটি রাষ্ট্রীয় সফরের লক্ষ্য ছিল সম্পর্কের সমন্বয় ও তাদের স্বার্থে কোন বিশেষ দলের সাথে ইতিবাচক টোন সেট করা। যেটা সাধারনত ভারত করে থাকে। সেখানে এমন একটি বিষয় সামনে আসে যা নিউজ সাইকেলকে বিতর্কিত করে তুলেছে। অনেক পাঠক বা দর্শক এটিকে “ভারতীয় কূটনীতির প্রভাব” বা “জামায়াতের অনির্দিষ্ট কৌশল” হিসাবে বুঝেছে। যা জয়শঙ্করের উদ্দেশ্যের ধারকে ম্লান করে দিয়েছে।

জামায়াতের লাভ কী?

এখানে উল্টো ফল হলো যদিও কিছু সংবাদ শিরোনামে দেখে মনে হতে পারে জামায়াত “ভারতের কথা মতো” কাজ করেছে। বাস্তবে জামায়াত নিজের অবস্থান তুলে ধরেছে যে, তারা সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক চায় এবং কখনো একপক্ষের প্রতি পক্ষপাতী নয়। জামায়াতের বক্তব্য ছিলো অন্যান্য রাষ্ট্রের কূটনীতিকদের সঙ্গে তাদের প্রকাশ্য যোগাযোগ রয়েছে এবং ভারত সহ তাদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক চায়। এই বার্তাটাই পরিপূর্ণ প্রেক্ষাপটে তাদের কূটনৈতিক অবস্থানকে একটু বেশি শক্ত করেছে। কিন্তু সংবাদ পরিবেশনের ভুল উপস্থাপনা প্রথম দিকে এটি অনেকের কাছে অন্যরূপে ফুটেছে।

কূটনীতির চোখে এই ঘটনা  “Narrative Control” এবং Strategic Ambiguity–র একটি নমুনা। রাষ্ট্রীয় বয়ান ও রাজনৈতিক দলের বয়ান যখন সমান্তরালভাবে চলে এবং মিডিয়া তা খন্ডিতভাবে তুলে ধরে। তখন বিভিন্ন ফ্রেম তৈরির সুযোগ তৈরি হয়। কোনো একটি বক্তব্য যদি সময় এবং প্রেক্ষাপটে ঠিকভাবে ব্যাখ্যা না করা হয়, তখন তা বিপক্ষের বার্তা বা উদ্দেশ্যকে ভুলভাবে স্থান দিতে পারে। এটাই এখানে ঘটেছে।

সফরের উদ্দেশ্য বনাম বাস্তব প্রতিক্রিয়া

জয়শঙ্করের সফরের মধ্য দিয়ে ভারত মূলত তিনটি সংকেত দিতে চেয়েছিল:

১. বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল হলেও ভারত বিচ্ছিন্ন নয় বরং এখনো পূর্ণমাত্রায় প্রাসঙ্গিক।

২. দিল্লি সব প্রধান রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে সক্ষম। আগের মতই বাংলদেশে নির্বাচন পূর্ব কোন হাই অফিসিয়ালের ঢাকা সফরের সিলসিলা অব্যাহত আছে।

৩. ভারত এখনো এই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী কূটনৈতিক খেলোয়াড়।

কিন্তু জামায়াত নেতার বক্তব্য সেই সংকেতের ওপর একটি counter-narrative চাপিয়ে দেয়। জনাব শফিক বলেন, ভারতীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে তার বৈঠক নতুন কিছু নয়, কিন্তু সেগুলো গোপন রাখতে বলা হয়েছিল। এই একটি বাক্যই কূটনৈতিকভাবে বহুস্তরের অর্থ বহন করে।

একদিকে এটি দেখায় ভারত কেবল ক্ষমতাসীন বা ‘পছন্দের’ শক্তির সঙ্গেই নয়, বরং বিতর্কিত ও দীর্ঘদিন কোণঠাসা রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গেও যোগাযোগ রেখেছে। অন্যদিকে এটি ভারতের জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর, কারণ এতে তাদের কূটনীতির দ্বৈততা ও পর্দার আড়ালের বাস্তবতা প্রকাশ পায়।

দেশি গণমাধ্যমের খণ্ডিত উপস্থাপনা: কার লাভ?

দেশীয় অনেক পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টাল বিষয়টি তুলে ধরেছে খণ্ডিতভাবে। “ভারতের অনুরোধে গোপন বৈঠক”, “জামায়াত–ভারত গোপন যোগাযোগ” ইত্যাদি শিরোনামে।

এই খণ্ডিত উপস্থাপনা দুইটি কাজ করেছে।

১. ভারতকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।

২. অজান্তেই জামায়াতকে একটি বড় রাজনৈতিক সুবিধা দিয়েছে।

কারণ, সম্পূর্ণ বক্তব্য পড়লে বোঝা যায়- জামায়াত আসলে নিজেকে স্বচ্ছ, ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী কূটনীতিতে বিশ্বাসী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে। তারা বলেনি যে তারা ভারতের নির্দেশ মানে; বরং বলেছে, তারা সবার সঙ্গে কথা বলে এবং প্রকাশ্যেই বলে।

গণমাধ্যম যখন কেবল “গোপন রাখতে বলা হয়েছিল” অংশটুকু আলাদা করে তুলে ধরে, তখন বিষয়টি সেনসেশনাল হয়। কিন্তু একই সঙ্গে জামায়াতের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বাস্তবতাও প্রকাশ্যে চলে আসে। যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের পক্ষে যায়।

এখানে “ম্লান” শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। সফর ব্যর্থ হয়নি, বাতিল হয়নি, কিংবা অর্থহীন হয়ে যায়নি। কিন্তু, সফরের মূল বার্তা একচ্ছত্র থাকেনি। মিডিয়া ফোকাস বিভক্ত হয়েছে। ভারতের কূটনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নের মুখে পড়েছে। একটি রাষ্ট্রীয় সফর সাধারণত নিজস্ব বয়ান তৈরি করে। কিন্তু এখানে জামায়াতের বক্তব্য সেই বয়ানের ওপর একটি ছায়া ফেলেছে। কূটনীতির ভাষায় এটিকে বলা যায়-Dilution of Diplomatic Signalling।

বৃহত্তর প্রেক্ষাপট: বদলাচ্ছে কূটনৈতিক খেলা

এই ঘটনা একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ভারত এখন আর একমাত্র বয়ান নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলো আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের অবস্থান সক্রিয়ভাবে উপস্থাপন করছে। মিডিয়া শুধু খবরদাতা নয়, বরং কূটনৈতিক খেলায় অনিচ্ছাকৃত অংশীদার হয়ে উঠছে। জামায়াত এখানে কোনো আক্রমণাত্মক কূটনীতি করেনি। তারা করেছে pre-emptive narrative positioning। যা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দরকষাকষিতে কাজে লাগবে।

উপসংহার

জয়শঙ্করের ঢাকা সফর রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং থাকবে। কিন্তু জামায়াতের সময়োচিত বক্তব্য ও দীর্ঘদিনের কৌশলগত নীরবতা ভেঙে দেওয়া। এই সফরের রাজনৈতিক বার্তাকে কিছুটা ম্লান করেছে, বিশেষ করে বয়ান ও প্রতীকি দিক থেকে। এটি প্রমাণ করে, বর্তমান রাজনীতিতে ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্রের হাতে নয়; বয়ান যার দখলে, প্রভাবও তার কাছেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সেই বয়ানের লড়াইই শুরু হয়েছে। যেখানে জামায়াত কৌশলগতভাবে এখন যথেষ্ট এগিয়ে। 

লেখক - ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।

মতামত এর আরও খবর

img

পুঁজিবাজারের প্রাণশক্তি ফিরিয়ে আনতে একজন 'হিরো'র প্রয়োজন

প্রকাশিত :  ১৯:৪৬, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:৪৮, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

​সম্পাদকীয়

​পুঁজিবাজার আসলে শুধু সূচক, লেনদেন কিংবা কিছু সংখ্যার সমষ্টি নয়। এর ভেতরে জড়িয়ে থাকে লাখো বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশা, সঞ্চয়, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। একটি প্রাণবন্ত বাজার গড়ে তুলতে হলে দরকার এমন কিছু মানুষ, যাঁদের চিন্তা, সময় ও আগ্রহ গভীরভাবে এই বাজারকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।

​এই প্রসঙ্গেই উঠে আসে পুঁজিবাজারের বহুল আলোচিত নাম আবুল খায়ের, বাজারে যিনি পরিচিত 'হিরো' নামে। তাঁকে নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে, বিতর্কও থাকতে পারে; তবে একটি সত্য অস্বীকারের উপায় নেই, বাজারের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের আগ্রহ ও সক্রিয় উপস্থিতি আলোচনায় একটি আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।

​এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, একজন সক্রিয় বাজারসংশ্লিষ্ট মানুষকে আমরা আসলে কোন দৃষ্টিতে দেখছি? তাঁকে দূরে ঠেলে রাখার সংস্কৃতি কি বাজারকে সত্যিই শক্তিশালী করবে, নাকি নিয়মকানুনের সীমার মধ্যে থেকে তাঁর মতো সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের শক্তিকে কাজে লাগানোই বেশি ফলদায়ক হবে?

​সক্রিয় বিনিয়োগকারী যত বাড়ে, বাজার নিয়ে আলোচনা যত জমে ওঠে, কোম্পানির মৌলভিত্তি নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণে আগ্রহ যত বাড়ে, বাজারও ততই প্রাণবন্ত হওয়ার সুযোগ পায়। কেউ যদি প্রতিদিন বাজার নিয়ে ভাবেন, কোম্পানির পারফরম্যান্স অনুসরণ করেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেন, তাহলে মূল আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত, সেই আগ্রহকে কীভাবে গঠনমূলক দিকে চালিত করা যায়।

​আমরা মনে করি, কোনো সক্রিয় অংশগ্রহণকারীকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের মাপকাঠিতে নয়, বরং বাজারের নিয়ম, স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার কাঠামোর ভেতরেই মূল্যায়ন করা উচিত। নিয়ম হবে সবার জন্য সমান; কিন্তু যাঁরা সেই নিয়ম মেনে বাজারে সক্রিয় থাকেন, তাঁদের অবদানও স্বীকৃতি পাওয়া উচিত।

​আবুল খায়েরকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও বাজারসংশ্লিষ্ট অনেকেই তাঁর সক্রিয়তার কথা জানেন। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব কাউকে ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করা নয়, বরং যেকোনো ইতিবাচক দিক তুলে ধরা এবং বাজারের স্বার্থে জরুরি প্রশ্নগুলো সামনে আনা।

​এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কোনো প্রতিবেদন বা সম্পাদকীয়তে কারও ইতিবাচক ভূমিকা তুলে ধরা মানেই এই নয় যে তার বিনিময়ে কোনো সুবিধা নেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা দাঁড়িয়ে থাকে স্বাধীনতা, দায়িত্বশীলতা এবং তথ্যনির্ভরতার ওপর। আমাদের অর্থনীতিবিষয়ক প্রতিবেদনেও এই নীতি সমানভাবে অনুসৃত হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন বা বাণিজ্যিক সম্পর্ককে সংবাদ বা সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়।

​বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে আমরা সবসময় অগ্রাধিকার দিই। কারণ শক্তিশালী পুঁজিবাজার মানে শুধু কিছু কোম্পানির শেয়ারদর বেড়ে যাওয়া নয়; এর অর্থ বাজারে আস্থা তৈরি হওয়া, অংশগ্রহণ বাড়া, ভালো কোম্পানির যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগসংস্কৃতি গড়ে ওঠা।

​এই প্রেক্ষাপটে আবুল খায়েরের মতো সক্রিয় অংশগ্রহণকারীর ভূমিকা নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। তাঁর উপস্থিতি নিয়ে কারও ভিন্নমত থাকতেই পারে, কিন্তু তাঁকে ঘিরে যে আগ্রহ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও সমীচীন নয়।

​বাজারে প্রাণ ফেরাতে দরকার আস্থা, স্বচ্ছতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ। দরকার এমন একটি পরিবেশ, যেখানে বিনিয়োগকারী নির্দ্বিধায় মত প্রকাশ করতে পারেন, বাজার নিয়ে ভাবতে পারেন এবং নিয়ম মেনে অংশ নিতে পারেন। কাউকে অকারণে দমিয়ে রাখার বদলে নিয়মের ভেতরে থেকে ইতিবাচক শক্তিকে কাজে লাগানোই হতে পারে একটি পরিণত পুঁজিবাজারের বৈশিষ্ট্য।

​কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে কেন এত কথা? উত্তরটা সহজ, ভালো কিছু চোখে পড়লে সেটি ভালো বলাই স্বাভাবিক। যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বাজারের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখেন, তাঁদের সেই দিক আলোচনায় আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

​আজকের পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আস্থা। বিনিয়োগকারীরা চান প্রাণবন্ত, স্বচ্ছ ও সুযোগসমৃদ্ধ একটি বাজার, যেখানে ভালো কোম্পানি প্রাপ্য মূল্যায়ন পায়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী উৎসাহ পান এবং ইতিবাচক অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ে।

​তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত কে বাজারে আছেন, তা নয়; বরং বাজারকে আরও কার্যকর করার উপায় কী, সেটিই।

​আবুল খায়ের যদি সত্যিই দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজার নিয়ে ভাবেন, কাজ করেন এবং সক্রিয় থাকেন, তবে তাঁর সেই আগ্রহকে বাজারের ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তরের সুযোগ আছে কি না, সেটিই এখন খতিয়ে দেখা দরকার।

​কারণ পুঁজিবাজারকে প্রাণবন্ত করতে শুধু নীতিমালাই যথেষ্ট নয়; দরকার মানুষ, দরকার অংশগ্রহণ, দরকার আস্থা, আর দরকার বাজারকে ভালোবাসে এমন সক্রিয় মানুষ।

​হিরো নিছক একজন ব্যক্তি। কিন্তু তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া আলোচনা আমাদের একটি বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আমরা কি সক্রিয় বাজার অংশগ্রহণকারীদের দূরে সরিয়ে রাখব, নাকি নিয়মের কাঠামোর ভেতরে রেখে তাঁদের ইতিবাচক শক্তিকে কাজে লাগাব?

​শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব একটি পুঁজিবাজার গড়তে দ্বিতীয় পথটিই বিবেচনার যোগ্য।