img

ভারত কাঠামোগতভাবে যথেষ্ট নড়বড়ে দেশ

প্রকাশিত :  ১৭:২৭, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১২:১১, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬

ভারত কাঠামোগতভাবে যথেষ্ট নড়বড়ে দেশ

সাইফুল খান 

আন্তর্জাতিক পরিসরে ভারত নিজেকে "একটি উদীয়মান বৈশ্বিক শক্তি" হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক আপ্রাণ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, রাষ্ট্রটি একাধিক আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এই সংকটসমূহ তাৎক্ষণিক বা অস্থায়ী নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক দক্ষতার ঘাটতি (institutional deficit), শাসনব্যবস্থায় ক্লান্তি (governance fatigue) এবং কৌশলগত অতিবিস্তৃতির (strategic overreach) গভীর ও জটিল ফলশ্রুতি। 

বিষয়টি বিশদভাবে আলোচনার দাবী রাখে।

রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার অসামঞ্জস্য: ভারতের রাষ্ট্রীয় আচরণে বর্তমানে যে বৈপরীত্যটি সবচেয়ে প্রকট। তা হলো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার মধ্যে গভীর কাঠামোগত অসামঞ্জস্য। একদিকে ভারত নিজেকে একটি আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি ও বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশীদার হিসেবে কল্পনা করতে পছন্দ করে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের বাস্তব কার্যক্ষমতা সেই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যসমূহের ভার বহনে পুরোটাই অক্ষম প্রমাণিত। এই দ্বৈত বাস্তবতা ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতাকে (state capacity) একটি দীর্ঘস্থায়ী চাপের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।

এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে একটি দীর্ঘমেয়াদী নীতিনির্ধারণ–বাস্তবায়ন ব্যবধান (Policy–Implementation Gap)। যা কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতার ফল নয়, বরং ভারতের শাসন কাঠামোর অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। উচ্চ পর্যায়ে সুপরিকল্পিত কৌশলগত নীতিমালা প্রণীত হলেও, মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর ও সময়োপযোগী বাস্তবায়ন প্রায়ই বিলম্বিত, বিকৃত বা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এর ফলে রাষ্ট্রের ঘোষিত প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব ফলাফলের মধ্যে একটি স্থায়ী বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়ে আছে। যা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়েই ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করে।

ভারতের জটিল ও ভারী আমলাতান্ত্রিক কাঠামো এই ব্যবধানকে আরও তীব্র করে তুলেছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া অতিমাত্রায় কেন্দ্রভিত্তিক হলেও বাস্তবায়নের দায়ভার বহন করে রাজ্যসমূহ ও স্থানীয় প্রশাসন। যেখানে সক্ষমতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সম্পদের মধ্যে মারাত্মক বৈষম্য বিদ্যমান। এই কেন্দ্র–রাজ্য ফেডারেল টানাপোড়েন (federal tensions) নীতিমালার একক ও সমন্বিত প্রয়োগকে দুর্বল করে এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে প্রশাসনিক অচলাবস্থায় রূপান্তরিত করে।

এছাড়াও, ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় আন্তঃসংস্থাগত সমন্বয়ের ঘাটতি (institutional coordination failure) একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এই ক্ষেত্রসমূহে নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রায়ই বিচ্ছিন্নভাবে গৃহীত হয়। যার ফলে একটি সুসংহত জাতীয় কৌশল (grand strategy) গড়ে ওঠে না। এর পরিণতিতে রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদ ও মনোযোগ ছড়িয়ে পড়ে এবং কৌশলগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ অস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই কাঠামোগত দুর্বলতা ভারতের আন্তর্জাতিক ভূমিকায়ও প্রতিনিয়ত প্রতিফলিত হয়। বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোতে ভারত প্রায়ই উচ্চাভিলাষী অবস্থান গ্রহণ করলেও, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পর্যায়ে কার্যকর নেতৃত্ব প্রদান করতে ব্যর্থ হয়। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ ভারতের রাষ্ট্রীয় চরিত্রকে একটি “অত্যধিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী কিন্তু অপর্যাপ্ত প্রস্তুতিশীল রাষ্ট্র” (over-ambitious but under-prepared state) হিসেবে চিহ্নিত করছেন। যেখানে রাজনৈতিক বক্তব্য (rhetoric) বাস্তব সক্ষমতার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে অগ্রসর।

অর্থনৈতিক কাঠামোর ভঙ্গুরতা: ভারতের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা বহির্বিশ্বে প্রায়ই উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও বৃহৎ বাজারের সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হলেও, এই অগ্রগতির অন্তর্নিহিত কাঠামো গভীর ও বহুমাত্রিক দুর্বলতায় আচ্ছন্ন। জিডিপি প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক হলেও, অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুণগত মান (quality of growth) নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন থেকেই যায়। ভারত বর্তমানে একটি অন্তর্ভুক্তিহীন ও কর্মসংস্থান-বিচ্ছিন্ন প্রবৃদ্ধি মডেল (jobless and exclusionary growth model) অনুসরণ করছে। যেখানে সামষ্টিক অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ ব্যাপক ও টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হচ্ছে।

এই প্রবণতার কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের শ্রমবাজারের কাঠামোগত সংকট। শ্রমশক্তির একটি বৃহৎ অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে (informal sector) নিয়োজিত। যেখানে মজুরি অনিশ্চিত, সামাজিক সুরক্ষা সীমিত এবং শ্রম অধিকার কার্যত অনুপস্থিত। অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশনের গতি সত্ত্বেও এই বিশাল শ্রমশক্তিকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সক্ষমতা অপর্যাপ্ত রয়ে গেছে। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একটি সংকীর্ণ উৎপাদনশীল গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, যা সামগ্রিক ভোক্তা চাহিদা ও অভ্যন্তরীণ বাজারের স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে।

তদুপরি, ভারতের অর্থনৈতিক কাঠামোতে আয় ও সম্পদের ক্রমবর্ধমান অসমতা একটি গুরুতর সামাজিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। উচ্চ আয়ের শ্রেণি ও কর্পোরেট খাত প্রবৃদ্ধির তুলনামূলক অধিক সুফল ভোগ করলেও, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা (real purchasing power) ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হচ্ছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির এই আর্থিক চাপ একদিকে অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে দুর্বল করছে, অন্যদিকে সামাজিক অসন্তোষ ও রাজনৈতিক মেরুকরণকে মারাত্মকভাবে উস্কে দিচ্ছে।

ভারতের কৃষি খাত, যা এখনও দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবিকার উৎস। দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগত স্থবিরতা (structural stagnation) ও নীতিগত অবহেলার শিকার। কৃষি আয়ের নিম্নগতি, বাজারে প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি এবং ঋণসংকট গ্রামীণ অর্থনীতিকে নাজুক করে তুলেছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব শহরমুখী অভিবাসন, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ এবং শহুরে বেকারত্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের অর্থনীতিকে একটি গাঠনিক ভারসাম্যহীনতার মধ্য দিয়ে অগ্রসরমান ব্যবস্থা (economy marked by structural imbalance) হিসেবে বিবেচনা করা যায়। যেখানে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ভোগের মধ্যে প্রয়োজনীয় সামঞ্জস্য অনুপস্থিত। প্রবৃদ্ধি-নির্ভর উন্নয়নের উপর অতিরিক্ত জোর দিয়ে মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও শ্রমঘন শিল্পায়নের প্রতি পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ায় এই ভারসাম্যহীনতা আরও গভীর হয়েছে।

সামাজিক সংহতির ক্ষয় ও অভ্যন্তরীণ বৈধতার সংকটঃ ভারতের রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার একটি মৌলিক ভিত্তি ছিল তার বহুত্ববাদী সামাজিক চুক্তি (pluralistic social contract)। যেখানে ভাষা, ধর্ম, জাতিগত পরিচয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয়ের ভেতরে সহাবস্থানের কিতাবি কথার কথা বলত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরসমূহে এই তথককথিত সামাজিক সংহতিও ক্রমান্বয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে এবং তার স্থানে একটি সংকীর্ণ ও সংখ্যাগুরু-ভিত্তিক উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক আখ্যান (majoritarian political narrative) ক্রমশ প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। এই রূপান্তর কেবল সামাজিক স্তরে নয়, বরং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বৈধতার (internal legitimacy) কাঠামোকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে রাষ্ট্র ও মতাদর্শের ক্রমবর্ধমান সংমিশ্রণ (ideological capture of the state)। শাসনক্ষমতার সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট ( উচ্চ বর্ণীয় উগ্র হিন্দু) সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পরিচয়ের অতিরিক্ত সংযুক্তি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের নিরপেক্ষতা ও সর্বজনীনতার ধারণাকে ক্ষুণ্ন করছে। বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের ওপর রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক প্রভাব বৃদ্ধির ফলে নাগরিকদের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার অবক্ষয় ঘটছে। একটি আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে যেখানে প্রতিষ্ঠানসমূহই সামাজিক ঐকমত্যের বাহক হওয়ার কথা, সেখানে এই আস্থা সংকট একটি গুরুতর কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

সামাজিক স্তরে এই পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটছে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মেরুকরণে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সমূহের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব সংক্রান্ত উদ্বেগ ক্রমেই ব্যাপকভাবে বাড়ছে। যা কেবল মানবাধিকার প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা (social alienation) তৈরি করছে। এই বিচ্ছিন্নতা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সহনশীলতা ও পারস্পরিক আস্থাকে ক্ষয় করে। যা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা টিকিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য। এই অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করছে। নাগরিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং বিরোধী কণ্ঠের জন্য স্থান সংকুচিত হওয়ায় ভারত ক্রমশ একটি “নির্বাচনী গণতন্ত্র” (electoral democracy) থেকে “নিয়ন্ত্রিত বা সংকুচিত গণতন্ত্রের” (constrained democracy) দিকে দ্রুত সরে যাচ্ছে। এমন মূল্যায়ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে ক্রমেই দৃঢ় হচ্ছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ বৈধতা কেবল নাগরিকদের চোখেই নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতেও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে।

নিরাপত্তা বিষয়ক দ্বিধা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় চাপ:  ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো বর্তমানে একটি বহুমাত্রিক ও দীর্ঘস্থায়ী চাপের পরিবেশে অবস্থান করছে। যেখানে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক হুমকিগুলো একে অপরকে শক্তিশালী করে তুলছে। একই সময়ে একাধিক ফ্রন্টে সক্রিয় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে ভারতের সামরিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পদ ক্রমশ অতিরিক্ত প্রসারিত হয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতা ভারতের জন্য একটি ক্লাসিক নিরাপত্তা দ্বিধা (Security Dilemma) সৃষ্টি করেছে। যেখানে একদিকে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন, অন্যদিকে সেই প্রচেষ্টাই প্রতিবেশী শক্তিগুলোর মধ্যে সন্দেহ ও উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলছে।

ভারতের পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তানের সাথে দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতা এখনো একটি স্থায়ী নিরাপত্তা উদ্বেগ হিসেবে বিদ্যমান। সীমান্তে নিয়মিত সংঘর্ষ, কাশ্মীর-কেন্দ্রিক অস্থিরতা এবং সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত অভিযোগসমূহ ভারতের নিরাপত্তা পরিকল্পনাকে প্রতিনিয়ত প্রতিক্রিয়াশীল (reactive) করে রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা নীতি প্রায়ই তাৎক্ষণিক সংকট ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ থেকে যায়, দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সমাধান বা আস্থাভিত্তিক উদ্যোগের জন্য পর্যাপ্ত কৌশলগত পরিসর তৈরি হয় না।

উত্তর সীমান্তে চীনের সাথে ভারতের সম্পর্ক আরও জটিল ও কাঠামোগতভাবে গভীর সংকটের রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত সীমান্ত প্রশ্ন, সাম্প্রতিক বছরসমূহে সামরিক মুখোমুখি অবস্থান এবং আস্থার ঘাটতি ভারতকে একটি প্রতিক্রিয়াশীল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এখানে ভারতের কৌশলগত অবস্থান অনেকাংশে প্রতিরোধমূলক ও প্রতিক্রিয়াশীল, সক্রিয় ও উদ্যোগী (proactive) কৌশলের তুলনায়। চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতার তুলনায় ভারতের সীমিত অবকাঠামোগত প্রস্তুতি এই অঞ্চলে একটি অসম ক্ষমতার বাস্তবতা (asymmetric power reality) তৈরি করেছে। যা দীর্ঘমেয়াদে ভারতের জন্য কৌশলগত অসুবিধার ইঙ্গিত বহন করে।

এইসব আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিও জটিল রয়ে গেছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্বাধীনতাকামীদের ক্ষোভের বিচ্ছুরণ  মিডিয়া কভারেজ না পেলেও তাদের কার্যক্রম থেমে নেই। মধ্য ভারতের কিছু অঞ্চলে মাওবাদী কার্যক্রম এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরো দুর্বল করে রেখেছে। এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা আন্তর্জাতিক হুমকির সাথে মিলিত হয়ে একটি বহুমুখী নিরাপত্তা চাপ (multi-front security stress) তৈরি করেছে। যেখানে সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিরোধ নিশ্চিত করতে হচ্ছে।

এই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি হলো কৌশলগত ক্লান্তি (strategic fatigue)। সীমিত প্রতিরক্ষা বাজেট, ক্রমবর্ধমান সামরিক ব্যয় এবং আধুনিকায়নের প্রয়োজন ভারতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত ব্যয় সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত করে, যা দীর্ঘমেয়াদে আবার নিরাপত্তার সামাজিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে।

আঞ্চলিক কূটনীতিতে আস্থার ঘাটতি 

দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের অবস্থান ঐতিহাসিকভাবে একটি স্বাভাবিক নেতৃত্বের দাবিদার হিসেবে উপস্থাপিত হলেও, বাস্তবে এই নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা (acceptance of leadership) ক্রমশ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে। ভারত ঘোষণাগতভাবে “প্রতিবেশী প্রথম” (Neighbourhood First) নীতি অনুসরণ করার কথা বললেও, আঞ্চলিক বাস্তবতায় এই নীতির কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য প্রয়োগের ঘাটতি স্পষ্ট। এর ফলে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে ভারতের প্রতি একটি গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী আস্থার ঘাটতি (trust deficit) তৈরি হয়েছে, যা ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য একটি মৌলিক প্রতিবন্ধকতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

এই আস্থার সংকটের মূল কারণগুলোর একটি হলো ভারতের কূটনৈতিক আচরণে অসম শক্তি সম্পর্কের প্রতিফলন। একটি বৃহৎ রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক প্রাধান্য অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের কাছে সহযোগিতামূলক নেতৃত্বের পরিবর্তে আধিপত্যবাদী চাপ (hegemonic pressure) হিসেবে প্রতিভাত হয়। সীমান্ত সংকট, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্য ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা সংক্রান্ত বিষয়ে ভারতের অবস্থান প্রায়ই একপাক্ষিক ও স্বার্থকেন্দ্রিক বলে বিবেচিত হয়, যা পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করে।

নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মতো প্রতিবেশী দেশসমূহের সঙ্গে সম্পর্কের গতিপথ এই বাস্তবতার প্রতিফলন বহন করে। নীতিগত সংবেদনশীলতা ও সমতার অভাব অনেক ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে সহযোগিতার বদলে সন্দেহ ও প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামোসমূহ কার্যত অকার্যকর বা স্থবির হয়ে পড়েছে, যেখানে ভারতের নেতৃত্ব একটি সহযোগিতামূলক আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা (cooperative regional stability) গড়ে তোলার পরিবর্তে একটি বিতর্কিত নেতৃত্ব (contested leadership) হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে।

এই আস্থার সংকট ভারতের কৌশলগত পরিসরকে আরও সংকুচিত করছে, কারণ প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহ বিকল্প অংশীদার খোঁজার দিকে ঝুঁকছে। আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখতে ব্যর্থ হলে ভারতের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বহিঃশক্তির প্রভাব দ্বারা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। এই বাস্তবতা ভারতের জন্য একটি পরোক্ষ কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, যেখানে আঞ্চলিক প্রাধান্য রক্ষার প্রচেষ্টা উল্টো আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া (regional pushback) সৃষ্টি করছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আঞ্চলিক নেতৃত্ব কেবল শক্তির ভিত্তিতে নয়, বরং নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, সংবেদনশীল কূটনীতি ও পারস্পরিক সম্মানের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ক্ষেত্রে ভারতের কূটনৈতিক ভাষা ও আচরণ প্রায়ই তার ঘোষিত নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়ছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের নেতৃত্বের দাবির সঙ্গে তার বাস্তব গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে একটি স্পষ্ট ফাঁক সৃষ্টি হয়েছে।

উপসংহারঃ ভারত বর্তমানে এমন এক রূপান্তরকালীন পর্যায়ে অবস্থান করছে, যেখানে তার কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সামাজিক-অর্থনৈতিক ভিত্তিকে অতিক্রম করে গেছে। ভারত স্পষ্ঠত একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র (failed state) হওয়ার মুখে দাড়িয়ে। আবার একটি পূর্ণাঙ্গ সুসংহত বিশ্বশক্তিও (fully consolidated global power) নয়; বরং একে "অমীমাংসিত গাঠনিক দ্বন্দ্বসমূহের মধ্য দিয়ে অগ্রসরমান একটি রূপান্তরশীল রাষ্ট্র" (transitional state with unresolved structural contradictions) হিসাবে চিহ্নিত করা অধিকতর যথাযথ হবে। এই অন্তর্নিহিত বাস্তবতাকে স্বীকার না করে কেবলমাত্র বাহ্যিকভাবে বৈশ্বিক শক্তির মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ভারতের অভ্যন্তরীণ ভঙ্গুরতাকে আরও প্রকট করবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার বিশ্বাসযোগ্যতা ও নৈতিক অবস্থানকে ক্রমান্বয়ে হ্রাস করবে। একটি টেকসই ও সম্মানজনক বৈশ্বিক ভূমিকার জন্য ভারতের প্রয়োজন গঠনমূলক আত্মসমালোচনা, প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের উপর পুনর্দৃষ্টি প্রদান।

লেখক-ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।
img

পুঁজিবাজারে বড় চমক কি সময়ের ব্যাপার মাত্র?

প্রকাশিত :  ১৬:৫২, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের এই সময়টি বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধের মেঘ কাটিয়ে বিশ্ব আজ এক নতুন স্থিতিশীলতার সুপ্রভাতের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার পারদ নিম্নমুখী হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যের উল্লেখযোগ্য পতন বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এক বিশেষ স্বস্তির বার্তা বয়ে এনেছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করতে একের পর এক তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজের আগমন এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহের শক্তিশালী অবস্থান আগামী রবিবারের পুঁজিবাজারে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বিশ্লেষণটি মূলত বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও দেশীয় সামষ্টিক অর্থনীতির নিরিখে আমাদের পুঁজিবাজারের সম্ভাব্য গতিপথকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিবর্তন ও তেলের মূল্যপ্রবণতা

বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত জ্বালানি তেলের বাজার গত কয়েক মাস ধরে যে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে এসে তা নাটকীয়ভাবে স্তিমিত হতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) দামে এখন নিম্নমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। সাম্প্রতিক লেনদেনগুলোতে দেখা গেছে, ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৯৭.৯৯ ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের সেশনের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ কম। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি ৯৫ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমার নিচেও অবস্থান করছে। জেপি মরগানের মতো বিশ্বখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বাভাস দিচ্ছে যে, ২০২৬ সাল জুড়ে তেলের গড় মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৬০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি চমৎকার সংকেত।

এই দরপতনের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত দুই সপ্তাহের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য একটি \'গেম চেঞ্জার\' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালী—যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী—পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন তেলের বাজারদর থেকে \'যুদ্ধ ঝুঁকি প্রিমিয়াম\' বা \'ওয়ার প্রিমিয়াম\' সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন, যার ফলশ্রুতিতে দামের এই স্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা: সংকট থেকে সম্ভাবনার দ্বারে

বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে আসার এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থাপনায়ও এক অভাবনীয় গতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতের দুশ্চিন্তা লাঘব করে একের পর এক জ্বালানি তেল ও এলএনজিবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর এবং মহেশখালী টার্মিনালে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এটি শুধুমাত্র কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং সরকারের সুপরিকল্পিত আমদানি কৌশলেরই অংশ।

৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মালয়েশিয়া থেকে আসা দুটি বৃহৎ মাদার ট্যাংকার \'সেন্ট্রাল স্টার\' এবং \'ইস্টার্ন কুইন্স\' চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছে। তারা মোট ৫১,০০০ মেট্রিক টন জ্বালানি (২৫,০০০ টন ফার্নেস অয়েল ও ২৬,০০০ টন অকটেন) বহন করে এনেছে। এছাড়া সিঙ্গাপুর থেকে আসা আরেকটি জাহাজ ২৭,০০০ টন ডিজেল খালাস করেছে। তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। ১৫ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়া থেকে ৬৪,৬৭৮ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে \'মারান গ্যাস হাইড্রা\' মহেশখালীতে পৌঁছেছে এবং ১৮ এপ্রিল অ্যাঙ্গোলা থেকে আরও ৬৯,০১৫ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে \'লোবিটো\' আসার কথা রয়েছে। মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৩টি জ্বালানিবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছেছে, যা দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য এক বিরাট স্বস্তি।

সামষ্টিক অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলো ২০২৬ সালের শুরুতেই ক্রমান্বয়ে উন্নতির শিখরে আরোহণ করছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা অর্থনীতির অন্তর্নিহিত শক্তিরই পরিচায়ক। ৭ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.৩৫ বিলিয়ন ডলারে। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (এসিইউ) ও অন্যান্য বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের পরেও রিজার্ভের এই অবস্থান অত্যন্ত সন্তোষজনক।

রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রেও চলতি বছর নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। মার্চ মাসে প্রবাসীরা রেকর্ড ৩.৭৭৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, যা একক মাস হিসেবে এ যাবতকালের সর্বোচ্চ। এপ্রিলের প্রথমার্ধেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ১ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে ১,৭৮৮ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২১.৫ শতাংশ বেশি। এই শক্তিশালী রিজার্ভ ও রেকর্ড রেমিট্যান্সের ফলে ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে ৩.৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। একইসাথে খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি (যা সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ১৪.২৪ শতাংশ) নাটকীয়ভাবে কমে ফেব্রুয়ারিতে ২.৩৯ শতাংশে নেমে আসায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বাজার স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

পুঁজিবাজারের গতিপ্রকৃতি ও রবিবারের পূর্বাভাস

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বিগত কয়েক সপ্তাহের সংশোধন প্রক্রিয়ার পর এখন একটি শক্তিশালী ঘুরে দাঁড়ানোর (রিবাউন্ড) উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ডিএসই সূচক ৫,৬০০ পয়েন্টের ঘর স্পর্শ করার পর মুনাফা শিকারিদের চাপে কিছুটা কমলেও গড় দৈনিক লেনদেন ১,০০০ কোটি টাকার ওপরে থাকা নির্দেশ করে যে বাজারে পর্যাপ্ত তারল্য ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ রয়েছে।

আগামী রবিবার পুঁজিবাজার ইতিবাচক থাকার পেছনে তিনটি প্রধান প্রভাবক কাজ করবে বলে আমি মনে করি:

প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় তালিকাভুক্ত উৎপাদনশীল ও বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় কমে আসবে, যা সরাসরি তাদের কর্পোরেট মুনাফায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে সিমেন্ট, সিরামিক ও ওষুধ খাতের কোম্পানিগুলো এই জ্বালানি স্বস্তির বড় সুবিধাভোগী হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বিশ্বজুড়ে শান্তি আলোচনার অগ্রগতি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে \'রিস্ক-অন\' মেজাজ ফিরিয়ে এনেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারগুলোতে ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তৃতীয়ত, দেশের শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি বিনিয়োগকারীদের মনে এই বিশ্বাস জন্মাবে যে দেশের অর্থনীতি বড় কোনো ঝুঁকির মুখে নেই।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এপ্রিলের এই সময়টি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বিশেষ মাহেন্দ্রক্ষণ। একদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বস্তি, অন্যদিকে দেশীয় শক্তিশালী অর্থনৈতিক সূচক—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার জন্য প্রস্তুত। বিনিয়োগকারীদের ভয় কাটিয়ে যৌক্তিক ও তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাজারে অংশ নেওয়ার এখনই সময়। আশা করা যায়, আগামী রবিবারের লেনদেন বিনিয়োগকারীদের জন্য এক নতুন আশার আলো বয়ে আনবে এবং দেশের পুঁজিবাজার তার ইতিবাচক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে।

মতামত এর আরও খবর