বেতন বাড়ানোর নামে মধ্যবিত্তকে মূল্যস্ফীতির আগুনে ঠেলে দেওয়া
বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখন আর অর্থনীতিবিদদের গ্রাফে আবদ্ধ কোনো পরিসংখ্যান নয়; এটি মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে প্রতিদিন জ্বলতে থাকা অগ্নিকাণ্ড। বাজারে গেলেই এর দাপট উপলব্ধি করা যায়—এই অগ্নি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এমন এক বাস্তবতায়, রাজস্ব আদায় না বাড়িয়ে নতুন বেতনকাঠামোর আলোচনা আসলে স্বস্তির বার্তা বয়ে আনে না, বরং সংকটের আরেক দফার পূর্বাভাস দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সতর্কবার্তাকে হালকাভাবে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কর আদায় না বাড়িয়ে বেতন বাড়ানোর অর্থ হলো, সরকারকে ব্যাংক ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে তোলা। আর সেই ঋণ যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থনীতিতে প্রবেশ করে, তখন টাকার যোগান বাড়ে, কিন্তু পণ্যের যোগান বাড়ে না। ফলাফল একটিই—মূল্যস্ফীতি। এটির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী কারা? সরকারি চাকরিজীবী নন, বড় ব্যবসায়ীরাও নন; বরং সেই মধ্যবিত্ত ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাই, যাদের আয় স্থিতিশীল কিন্তু ব্যয় প্রতিদিন উর্ধ্বমুখী।
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ব্যাংক সুদের হার ১৫ শতাংশ অতিক্রম করেছে, শেয়ারবাজারে আস্থা সংকটপূর্ণ, আর সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য প্রতিদিন মুদ্রাস্ফীতির কারণে ক্ষয়িষ্ণু। একদিকে ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, অন্যদিকে পুঁজিবাজারে অনিশ্চয়তা—এই দ্বিমুখী চাপে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা কার্যত \'দুই দিক থেকে আঘাত\' খাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের ব্যাংক-ঋণনির্ভর ব্যয় বৃদ্ধি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নয়, বরং আস্থার বাজারের জন্যও একটি বড় হুমকি।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের স্থবিরতা। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নির্বাচনী ক্যালকুলেশনের মাঝে উদ্যোক্তারা এখন \'রাখি দেখি\' নীতিতে আবদ্ধ। বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না, উৎপাদন বাড়ে না এবং রাজস্ব আয়ও বাড়ে না। অথচ এই কাঠামোগত দুর্বলতা নিরসন না করেই যদি সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে তা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
এ অবস্থায় ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। \'বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২\' সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে গভর্নরের বক্তব্য আসলে একটি কঠিন বাস্তবতার স্বীকৃতি—কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না করতে পারলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়া সম্ভব নয়। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিতে ব্যস্ত; কিন্তু তারা কি ব্যাংকিং সংস্কারের মতো অজনপ্রিয় অথচ অত্যন্ত জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত?
রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক প্রবণতা নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। তবে এই স্বস্তি যেন আত্মতুষ্টিতে রূপ নেয় না। ৪৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি কোনো ক্ষণস্থায়ী সমস্যা নয়—বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ব্যর্থতার ফসল। এই ঘাটতি পুনরায় ব্যাংক ঋণ দিয়ে মেটানোর চেষ্টা করলে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সকল প্রচেষ্টাই বিফল হয়ে যাবে।
বেতন বৃদ্ধি একটি জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত হতে পারে, কিন্তু রাজস্ব সংস্কার ছাড়া এটি দায়িত্বজ্ঞানহীন। জনপ্রিয়তার লোভে নেওয়া সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত মূল্য পরিশোধ করতে হয় মধ্যবিত্ত ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদেরই। আজ বেতন যতই বাড়ানো হোক না কেন, কাল সেই বাড়তি আয়ের ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে যাবে—কারণ বাজারদর তা গ্রাস করে নেবে।
ড. আহসান এইচ মনসুরের সতর্কবার্তা তাই উপেক্ষা করার মতো নয়। এটি অর্থনীতির পক্ষ থেকে একটি শেষ সতর্ক সংকেত। এখনই যদি রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাংকিং সংস্কারের বিষয়ে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হবে। প্রশ্ন হলো, সেই সংকটের দায়ভার কে নেবে?



















