img

বেতন বাড়ানোর নামে মধ্যবিত্তকে মূল্যস্ফীতির আগুনে ঠেলে দেওয়া

প্রকাশিত :  ১২:৪৫, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বেতন বাড়ানোর নামে মধ্যবিত্তকে মূল্যস্ফীতির আগুনে ঠেলে দেওয়া

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখন আর অর্থনীতিবিদদের গ্রাফে আবদ্ধ কোনো পরিসংখ্যান নয়; এটি মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে প্রতিদিন জ্বলতে থাকা অগ্নিকাণ্ড। বাজারে গেলেই এর দাপট উপলব্ধি করা যায়—এই অগ্নি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এমন এক বাস্তবতায়, রাজস্ব আদায় না বাড়িয়ে নতুন বেতনকাঠামোর আলোচনা আসলে স্বস্তির বার্তা বয়ে আনে না, বরং সংকটের আরেক দফার পূর্বাভাস দেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সতর্কবার্তাকে হালকাভাবে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কর আদায় না বাড়িয়ে বেতন বাড়ানোর অর্থ হলো, সরকারকে ব্যাংক ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে তোলা। আর সেই ঋণ যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থনীতিতে প্রবেশ করে, তখন টাকার যোগান বাড়ে, কিন্তু পণ্যের যোগান বাড়ে না। ফলাফল একটিই—মূল্যস্ফীতি। এটির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী কারা? সরকারি চাকরিজীবী নন, বড় ব্যবসায়ীরাও নন; বরং সেই মধ্যবিত্ত ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাই, যাদের আয় স্থিতিশীল কিন্তু ব্যয় প্রতিদিন উর্ধ্বমুখী।

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ব্যাংক সুদের হার ১৫ শতাংশ অতিক্রম করেছে, শেয়ারবাজারে আস্থা সংকটপূর্ণ, আর সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য প্রতিদিন মুদ্রাস্ফীতির কারণে ক্ষয়িষ্ণু। একদিকে ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, অন্যদিকে পুঁজিবাজারে অনিশ্চয়তা—এই দ্বিমুখী চাপে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা কার্যত \'দুই দিক থেকে আঘাত\' খাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের ব্যাংক-ঋণনির্ভর ব্যয় বৃদ্ধি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নয়, বরং আস্থার বাজারের জন্যও একটি বড় হুমকি।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের স্থবিরতা। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নির্বাচনী ক্যালকুলেশনের মাঝে উদ্যোক্তারা এখন \'রাখি দেখি\' নীতিতে আবদ্ধ। বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না, উৎপাদন বাড়ে না এবং রাজস্ব আয়ও বাড়ে না। অথচ এই কাঠামোগত দুর্বলতা নিরসন না করেই যদি সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে তা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।

এ অবস্থায় ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। \'বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২\' সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে গভর্নরের বক্তব্য আসলে একটি কঠিন বাস্তবতার স্বীকৃতি—কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না করতে পারলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়া সম্ভব নয়। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিতে ব্যস্ত; কিন্তু তারা কি ব্যাংকিং সংস্কারের মতো অজনপ্রিয় অথচ অত্যন্ত জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত?

রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক প্রবণতা নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। তবে এই স্বস্তি যেন আত্মতুষ্টিতে রূপ নেয় না। ৪৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি কোনো ক্ষণস্থায়ী সমস্যা নয়—বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ব্যর্থতার ফসল। এই ঘাটতি পুনরায় ব্যাংক ঋণ দিয়ে মেটানোর চেষ্টা করলে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সকল প্রচেষ্টাই বিফল হয়ে যাবে।

বেতন বৃদ্ধি একটি জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত হতে পারে, কিন্তু রাজস্ব সংস্কার ছাড়া এটি দায়িত্বজ্ঞানহীন। জনপ্রিয়তার লোভে নেওয়া সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত মূল্য পরিশোধ করতে হয় মধ্যবিত্ত ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদেরই। আজ বেতন যতই বাড়ানো হোক না কেন, কাল সেই বাড়তি আয়ের ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে যাবে—কারণ বাজারদর তা গ্রাস করে নেবে।

ড. আহসান এইচ মনসুরের সতর্কবার্তা তাই উপেক্ষা করার মতো নয়। এটি অর্থনীতির পক্ষ থেকে একটি শেষ সতর্ক সংকেত। এখনই যদি রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাংকিং সংস্কারের বিষয়ে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হবে। প্রশ্ন হলো, সেই সংকটের দায়ভার কে নেবে?

img

নিঃশব্দে নীরব হয়ে যাওয়া এক জীবনের আলো—শিপ্রা পালের স্মৃতিতে শ্রদ্ধার ফুল

প্রকাশিত :  ০৯:৩৩, ২৭ এপ্রিল ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: কিশোরগঞ্জ শহরের বত্রিশ আবাসিক এলাকার লিংক রোডের বাসিন্দা শিপ্রা পাল (৭২) ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি নিজের উপস্থিতি দিয়ে চারপাশে রেখে গেছেন শান্তি, আস্থা আর স্নেহের উষ্ণতা। ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল সকাল আনুমানিক ৭টা ৫০ মিনিটে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বিদায়ে নিভে গেছে একটি নীরব কিন্তু গভীর আলোর প্রদীপ।

পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ মা ও সহধর্মিণী। স্বামী, এক পুত্র, দুই কন্যা—সবাইকে ঘিরে তার জীবন ছিল দায়িত্ব, ভালোবাসা আর ত্যাগের এক অবিরাম অধ্যায়। দীর্ঘ জীবনের পথে তিনি সন্তানদের মানুষ করে গড়ে তুলেছেন দৃঢ় মনোবল ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে।

শুধু পরিবার নয়, কর্মজীবনেও তিনি রেখে গেছেন সুনামের ছাপ। দীর্ঘদিন কিশোরগঞ্জ জেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে সততা ও নিষ্ঠার জন্য সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন আস্থার প্রতীক। কাজের বাইরে সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে করে তুলেছিল এলাকাবাসীর কাছে শ্রদ্ধার পাত্র।

প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি লিভার সিরোসিসে ভুগছিলেন। শারীরিক কষ্টের মধ্যেও তিনি হার মানেননি। উন্নত চিকিৎসার আশায় ভারতের চেন্নাইয়ে গিয়েও লড়াই চালিয়ে গেছেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। কিন্তু নিয়তির কাছে শেষ পর্যন্ত থেমে যায় সেই দৃঢ় জীবনযুদ্ধ।

স্থানীয়দের কাছে শিপ্রা পাল ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি সহজ-সরল আচরণ, আন্তরিকতা ও সদা হাস্যোজ্জ্বল স্বভাব দিয়ে সবার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। প্রতিবেশীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল পারিবারিক বন্ধনের মতোই ঘনিষ্ঠ। তাই তাঁর মৃত্যুতে শুধু পরিবার নয়, পুরো এলাকা যেন হারিয়েছে এক আপনজনকে।

জীবনের পরতে পরতে তিনি রেখে গেছেন দায়িত্ববোধ, নীরব শক্তি আর মানবিকতার দৃষ্টান্ত। শিপ্রা পালের স্মৃতি তাই থেকে যাবে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার এক নীরব ইতিহাস হয়ে।


মতামত এর আরও খবর