img

পারস্য উপসাগরের দহন ও বিশ্ব অর্থনীতির মহাসংকট: বাংলাদেশের ঝুঁকির গতিপ্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা

প্রকাশিত :  ০৯:৫১, ১০ মার্চ ২০২৬

পারস্য উপসাগরের দহন ও বিশ্ব অর্থনীতির মহাসংকট: বাংলাদেশের ঝুঁকির গতিপ্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তারিখটি বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওই দিন ভোররাতে ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমানবাহিনী ইরানের রাজধানী তেহরানসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে একযোগে ভয়াবহ বিমান হামলা চালায়। এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন বা \'রেজিম চেঞ্জ\'। এই আকস্মিক সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন এবং তার কম্পাউন্ড ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এই একটি ঘটনাই মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে কয়েক দশকের জন্য অস্থির করে তোলার জন্য যথেষ্ট ছিল। খামেনির মৃত্যুর পর তার পুত্র মোজতবা খামেনিকে তাড়াহুড়ো করে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যা দেশটির অভ্যন্তরে কট্টরপন্থী শিবিরের বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু এই রাজনৈতিক পালাবদল কেবল ইরানের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এর উত্তাপ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক নৌপথ এবং উদীয়মান দেশগুলোর অর্থনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশ, যারা আমদানিকৃত জ্বালানি এবং প্রবাসী আয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই যুদ্ধ এক অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে রূপ নিয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক আগ্নেয়গিরি: হরমুজ প্রণালির শ্বাসরোধ ও বিশ্ববাজারের কম্পন

যুদ্ধের সূচনালগ্নেই ইরান তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে—হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই সরু জলপথটি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী। বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ইরানের পক্ষ থেকে এই পথ কার্যত অচল করে দেওয়ার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ সরবরাহ শৃঙ্খল বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২০০টিরও বেশি তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকার পারস্য উপসাগরের বাইরে আটকা পড়ে আছে, কারণ যুদ্ধকালীন ঝুঁকি বীমা বা \'ওয়ার রিস্ক ইন্স্যুরেন্স\' ছাড়া কোনো জাহাজই এই এলাকায় প্রবেশ করতে সাহস পাচ্ছে না।

এই অবরোধের তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের দামে। যুদ্ধ শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৬৫-৬৭ ডলার, তা মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১১৫ ডলারে পৌঁছেছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১১৯ ডলার পর্যন্ত স্পর্শ করেছে। জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কেবল পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাসায়নিক সার উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা একে \'জ্বালানি শক\' হিসেবে অভিহিত করছেন, যা ১৯৭০-এর দশকের বিশ্বমন্দার স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে।

বিশ্বের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতেও এই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। নিউইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিট থেকে শুরু করে টোকিও বা হংকং—সবখানেই সূচকের বড় পতন লক্ষ্য করা গেছে। ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ একদিনেই ৪০০ পয়েন্টের বেশি হারিয়েছে, আর দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি (KOSPI) সূচক ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর সবচেয়ে বড় ধসের সম্মুখীন হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তার ভয়ে পুঁজি সরিয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন, যার ফলে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।

বাংলাদেশ অর্থনীতিতে প্রথম আঘাত: জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট

বাংলাদেশের জন্য এই যুদ্ধ কোনো দূরবর্তী সংবাদ নয়, বরং এটি সরাসরি আমাদের রান্নাঘর এবং কারখানার চাকা থামিয়ে দেওয়ার অশনিসংকেত। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া এবং পারস্য উপসাগরে অস্থিরতার কারণে সৌদি আরব, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) দাবি করছে যে দেশে কয়েক সপ্তাহের মজুত রয়েছে, কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই নিশ্চয়তা ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে।

জ্বালানি তেলের এই সংকট সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতকে আঘাত করেছে। দেশে বর্তমানে গ্যাসের অভাব প্রকট, কারণ আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহ থমকে গেছে। কাতার থেকে আসা এলএনজি জাহাজগুলো এখন ঝুঁকিপূর্ণ পথ এড়িয়ে বিকল্প পথ খুঁজছে, যার ফলে জাহাজভাড়া ও সময়—উভয়ই বাড়ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে সরকার ইতিমধ্যে কঠোর সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করেছে। মার্চ ২০২৬-এর শুরুতে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং আসন্ন ঈদুল ফিতরের ছুটি এগিয়ে আনা হয়েছে। এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় আকারের বিদ্যুৎ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার কমিয়ে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো।

শিল্প খাতেও এই প্রভাব সুদূরপ্রসারী। গ্যাস সংকটের কারণে দেশের পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার মধ্যে চারটির উৎপাদন বন্ধ করে দিতে হয়েছে। আমদানিকৃত গ্যাস এখন কৃষি ও সার কারখানার পরিবর্তে বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা হচ্ছে, যাতে লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়। কিন্তু এর ফলে কৃষি খাতে সারের তীব্র সংকট এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশি প্রবাসী ইতিমধ্যে যুদ্ধের প্রভাব অনুভব করতে শুরু করেছেন। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে তেল স্থাপনায় হামলা এবং অর্থনৈতিক মন্দার কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আকাশপথ বন্ধ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে কাতার ও ওমানেও এলএনজি সরবরাজ ও কার্গো সমস্যা এবং ভিসানীতির জটিলতা প্রবাসীদের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে।

রান্নাঘরের বাজার ও \'ওয়ার প্রিমিয়াম\'-এর দহন

সাধারণ মানুষের কাছে এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব অনুভূত হচ্ছে নিত্যপণ্যের বাজারে। যদিও বাংলাদেশ সরাসরি যুদ্ধে জড়িত নয়, কিন্তু আমদানিকৃত পণ্যের ওপর যুদ্ধের দোহাই দিয়ে \'ওয়ার প্রিমিয়াম\' যুক্ত হচ্ছে। ভোজ্য তেল, চিনি এবং ডাল—যা মূলত আমদানিনির্ভর—এগুলোর দাম বাজারে হুহু করে বাড়ছে। খুলনার বাজারে ইতিমধ্যে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৪-৫ টাকা বেড়েছে, আর খোলা তেলের দাম বেড়েছে ৭ টাকা পর্যন্ত। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন যে, সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো যুদ্ধের অজুহাতে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে, যা বাজারে এক কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে।

রমজান মাস চলায় মুরগি ও গরুর মাংসের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিপ্রতি ২২০ টাকায় পৌঁছেছে, যা এক সপ্তাহ আগে ১৭০-১৮০ টাকা ছিল। গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি ৮৫০ টাকা ছাড়িয়েছে। তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহন খরচ বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে শাকসবজি থেকে শুরু করে চাল-ডাল পর্যন্ত প্রতিটি পণ্যে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা শুকনো ফল যেমন খেজুর, এপ্রিকট এবং বাদামের দাম ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, কারণ বিমান যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এই পণ্যগুলোর আমদানি থমকে গেছে।

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ও বাংলাদেশের \'ট্যারিফ ক্লিফ\' আতঙ্ক

২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের \'স্বল্পোন্নত দেশ\' (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার কথা। এটি একটি দেশের জন্য গৌরবের বিষয় হলেও বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এলডিসি স্ট্যাটাস চলে গেলে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডার মতো বড় বাজারগুলোতে শুল্কমুক্ত সুবিধা (এভরিথিং বাট আর্মস-ইবিএ) হারাবে। বর্তমানে যুদ্ধের কারণে রপ্তানি আয় যেখানে কমছে, সেখানে ৯-১২ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপিত হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না।

অর্থনীতিবিদরা একে \'ট্যারিফ ক্লিফ\' বা শুল্কের পাহাড় বলে অভিহিত করছেন। গ্র্যাজুয়েশনের ফলে স্বল্প সুদে বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার সুযোগও কমে যাবে। এখন যেখানে ১-২ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া যায়, গ্র্যাজুয়েশনের পর তা ৫-৭ শতাংশ বাণিজ্যিক হারে নিতে হবে, যা দেশের ঋণের বোঝা এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে (ডেবট সার্ভিসিং) মারাত্মক চাপে ফেলবে। ব্যবসায়ী ও সিপিডি-র মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সরকারকে গ্র্যাজুয়েশন প্রক্রিয়া অন্তত ২০৩২ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে।

ডলার সংকট ও ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ডলারের সংকট নতুন কিছু নয়, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। আমদানি ব্যয় বাড়ার বিপরীতে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স কমতে থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও ২০২৫ সালের মাঝামাঝি রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের ওপরে উঠেছিল, কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে তা আবার কমতে শুরু করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকায় স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করলেও বাজারে ডলারের তীব্র সংকট রয়েছে। অনেক ব্যাংক এখন এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খুলতে অপরাগতা প্রকাশ করছে, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আমদানিকারকদের জন্য। এর ফলে শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন কমিয়ে বাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দেবে।

যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতির সম্ভাব্য রূপরেখা

যদি ইরান-ইসরায়েল-মার্কিন যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক অন্ধকার যুগের দিকে ধাবিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মূলত তিনটি সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট বিবেচনা করছেন:

 ১. সীমিত সংঘাত (১-৩ মাস): এই পরিস্থিতিতে তেলের দাম ১০০ ডলারের আশপাশে থাকবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দাভাব দেখা দিলেও তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ হয়তো কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে।

 ২. দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধ (৬-৯ মাস): এটি হবে সবচেয়ে বিপর্যয়কর। তেলের দাম ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বিশ্বজুড়ে খাদ্যাভাব এবং মুদ্রাস্ফীতি ডাবল ডিজিট ছাড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

 ৩. বৈশ্বিক জড়িয়ে পড়া: যদি রাশিয়া বা চীন এই যুদ্ধে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে, তবে এটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের রূপ নিতে পারে, যেখানে অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ আর কার্যকর থাকবে না।

বাংলাদেশের জন্য করণীয় হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন কেবল জ্বালানি সাশ্রয় নয়, বরং বিকল্প উৎসের দিকে নজর দিতে হবে। ভারত বা রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চুক্তি, অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা এবং কৃষিতে ভর্তুকি বাড়িয়ে খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প পথ নেই। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং প্রয়োজনে তাদের বিকল্প শ্রমবাজারে পাঠানোর জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।

একটি সতর্কবার্তা

পরিশেষে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল দুটি দেশের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়; এটি বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর চরম আঘাত। প্রথম আলোর সাংবাদিকের ভাষায় বলতে গেলে, “তেহরানের আকাশে যখন ক্ষেপণাস্ত্রের আলো দেখা যায়, তার উত্তাপ বাংলাদেশের কৃষকের চুলার ওপরও অনুভূত হয়।” যুদ্ধের দামামা হয়তো দূরে বাজছে, কিন্তু তার ক্ষুধা ও অস্থিরতা আমাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশ এখন এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন। দূরদর্শী নেতৃত্ব, জাতীয় ঐক্য এবং কঠোর অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা—এই তিনটিই হতে পারে এই মহাসংকট থেকে উত্তরণের চাবিকাঠি। যদি এই যুদ্ধ এখনই না থামে, তবে বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক ধস নামবে, তার ফল ভোগ করতে হবে আগামী কয়েক প্রজন্মকে। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এই মেঘ কাটানোর একমাত্র উপায় নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝেও অবিচল থেকে বিকল্প পথ খুঁজে বের করা।

img

সাংবাদিক রাষ্ট্রের কর্মচারী নন

প্রকাশিত :  ১১:০০, ০৬ জুন ২০২৬

আবদুল হামিদ মাহবুব

সম্প্রতি বরগুনা জেলা প্রশাসনের একটি চিঠি সাংবাদিক মহলে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। চিঠিতে জেলার কর্মরত সাংবাদিকদের প্রতি মাসের প্রথম রবিবার জেলা প্রশাসকের কাছে জেলার বিভিন্ন সমস্যা, অনিয়ম, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হয়েছে। নির্দেশটি জেলা প্রশাসকের। আর চিঠি ইস্যু করেছেন একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র মোঃ সোহেল রেজা। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বরগুনা জেলা প্রশাসনের জারিকৃত চিঠির বিষয় নিয়ে ইতোমধ্যে একটি তথ্যবহুল আলোচনা লিখেছেন। যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার সাথে যুক্ত,  এরা হয়তো সেটা দেখেছেন। আমি এখানে সাংবাদিকতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিছু কথা তুলে ধরছি সকল পাঠকের জানার জন্য। পাশাপাশি আমাদের সাংবাদিক বন্ধুদেরও বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

বরগুনা জেলা প্রশাসনের চিঠিটি দেখে অনেকের কাছে প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, প্রশাসন ও গণমাধ্যমের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির একটি উদ্যোগ এটি। কিন্তু বিষয়টি গভীরভাবে ভাবলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। সাংবাদিক কি প্রশাসনের কাছে নিয়মিত রিপোর্ট দেওয়ার মানুষ? সাংবাদিক কি প্রশাসনের অনানুষ্ঠানিক তথ্য সংগ্রহকারী? নাকি তাঁর প্রধান দায়িত্ব জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা?

সাংবাদিকতার মূল দর্শন বলছে, সংবাদমাধ্যমের জন্ম হয়েছে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার জন্য। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের বাইরে এটি একটি স্বাধীন সামাজিক শক্তি। এর প্রধান কাজ হলো জনস্বার্থ রক্ষা করা, দুর্নীতি ও অনিয়ম তুলে ধরা এবং ক্ষমতার ব্যবহার সম্পর্কে জনগণকে সচেতন রাখা।

সাংবাদিকতার আন্তর্জাতিক নীতিমালায় বারবার বলা হয়েছে, সাংবাদিকের প্রথম দায়িত্ব সত্যের প্রতি এবং তাঁর প্রথম আনুগত্য জনগণের প্রতি। কারণ সাংবাদিক কোনো সরকারি কর্মকর্তা নন। তিনি জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কাজ করেন। তাঁর দায়িত্ব সত্য তথ্য সংগ্রহ করা, যাচাই করা এবং জনগণের সামনে তুলে ধরা।

গণমাধ্যমকে দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার একটি স্বাধীন ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়। এই স্বাধীনতাই সংবাদমাধ্যমের শক্তি। যদি সংবাদমাধ্যম প্রশাসনিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয় বা সে রকম ধারণা তৈরি হয়, তাহলে তার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সংবাদমাধ্যমের অন্যতম প্রধান ভূমিকা হলো প্রহরীর ভূমিকা পালন করা। অর্থাৎ ক্ষমতা কোথায় কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কোথাও অনিয়ম হচ্ছে কি না, জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না; এসব বিষয়ে নজর রাখা। একজন সাংবাদিকের কাজ হচ্ছে পর্যবেক্ষণ করা, প্রশ্ন তোলা এবং তথ্য প্রকাশ করা। প্রশাসনের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া নয়।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা আচরণবিধিতেও সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ, সত্য ও নির্ভুল সংবাদ পরিবেশন এবং তথ্য যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে। কোথাও বলা নেই যে সাংবাদিকরা কোনো সরকারি কর্মকর্তার কাছে নিয়মিত প্রশাসনিক রিপোর্ট জমা দেবেন। এ কারণেই বরগুনা জেলা প্রশাসনের চিঠিটি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যে সাংবাদিক প্রশাসনের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করবেন, তিনি যদি একই সঙ্গে প্রশাসনের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদনও দেন, তাহলে তাঁর স্বাধীন অবস্থান কোথায় থাকবে?

রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ ও তদারকি ব্যবস্থা রয়েছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করে। ফলে জেলার পরিস্থিতি জানার জন্য সাংবাদিকদের প্রশাসনিক রিপোর্টদাতা হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তা কতটা যৌক্তিক, সেটি ভেবে দেখার বিষয়।

এ ধরনের উদ্যোগ থেকে কয়েকটি বাস্তব সমস্যা তৈরি হতে পারে। আমার বিবেচনায় সেগুলো হচ্ছে, সাধারণ মানুষের কাছে সাংবাদিকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, তথ্যদাতা বা অনিয়ম সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তিরা সাংবাদিকের কাছে তথ্য দিতে দ্বিধা করতে পারেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কারণ প্রশাসনের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক রিপোর্টিং সম্পর্ক সাংবাদিককে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলতে পারে এবং পেশাগত স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে এটাও সত্য যে জেলা প্রশাসনের উদ্দেশ্য হয়তো জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহ করা। কিন্তু গণতান্ত্রিক সমাজে শুধু উদ্দেশ্য নয়, পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন চাইলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করতে পারে, সংবাদ সম্মেলন করতে পারে, বিভিন্ন বিষয়ে মতামত নিতে পারে কিংবা জনগণের সমস্যা নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা আয়োজন করতে পারে। এসব উদ্যোগ গণতান্ত্রিক ও ইতিবাচক। কিন্তু সাংবাদিকদের কাছ থেকে নিয়মিত প্রশাসনিক প্রতিবেদন আহ্বান করা সাংবাদিকতার স্বাধীন ভূমিকা সম্পর্কে একটি ভুল ধারণার প্রতিফলন বলে মনে হয়।

প্রশাসনের উপলব্ধি করা দরকার, সাংবাদিক রাষ্ট্রের শত্রু নন, আবার রাষ্ট্রের কর্মচারীও নন। তিনি জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যে জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। একজন স্বাধীন সাংবাদিক অনেক সময় ক্ষমতাসীনদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারেন, কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য তিনি অপরিহার্য। কারণ স্বাধীন সাংবাদিকতাই অনিয়ম উন্মোচন করে, দুর্নীতি প্রকাশ করে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।

বরগুনা জেলা প্রশাসনের চিঠিটি হয়তো সদিচ্ছা থেকেই জারি করা হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তার আলোকে এটি একটি বিতর্কিত বার্তা বহন করে। সাংবাদিককে প্রশাসনের মাসিক রিপোর্টদাতায় পরিণত করা যায় না।

সাংবাদিক জনগণের প্রতিনিধি। তাঁর কাজ জনগণের পক্ষে সত্য তুলে ধরা, ক্ষমতার ওপর নজর রাখা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। প্রশাসন ও গণমাধ্যম; উভয়ই রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তবে তাদের ভূমিকা এক নয়। সেই ভিন্নতাকে সম্মান করাই একটি পরিণত গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব।
মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪, ই-মেইল:  [email protected]