img

পারস্য উপসাগরের দহন ও বিশ্ব অর্থনীতির মহাসংকট: বাংলাদেশের ঝুঁকির গতিপ্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা

প্রকাশিত :  ০৯:৫১, ১০ মার্চ ২০২৬

পারস্য উপসাগরের দহন ও বিশ্ব অর্থনীতির মহাসংকট: বাংলাদেশের ঝুঁকির গতিপ্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তারিখটি বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওই দিন ভোররাতে ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমানবাহিনী ইরানের রাজধানী তেহরানসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে একযোগে ভয়াবহ বিমান হামলা চালায়। এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন বা \'রেজিম চেঞ্জ\'। এই আকস্মিক সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন এবং তার কম্পাউন্ড ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এই একটি ঘটনাই মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে কয়েক দশকের জন্য অস্থির করে তোলার জন্য যথেষ্ট ছিল। খামেনির মৃত্যুর পর তার পুত্র মোজতবা খামেনিকে তাড়াহুড়ো করে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যা দেশটির অভ্যন্তরে কট্টরপন্থী শিবিরের বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু এই রাজনৈতিক পালাবদল কেবল ইরানের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এর উত্তাপ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক নৌপথ এবং উদীয়মান দেশগুলোর অর্থনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশ, যারা আমদানিকৃত জ্বালানি এবং প্রবাসী আয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই যুদ্ধ এক অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে রূপ নিয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক আগ্নেয়গিরি: হরমুজ প্রণালির শ্বাসরোধ ও বিশ্ববাজারের কম্পন

যুদ্ধের সূচনালগ্নেই ইরান তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে—হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই সরু জলপথটি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী। বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ইরানের পক্ষ থেকে এই পথ কার্যত অচল করে দেওয়ার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ সরবরাহ শৃঙ্খল বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২০০টিরও বেশি তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকার পারস্য উপসাগরের বাইরে আটকা পড়ে আছে, কারণ যুদ্ধকালীন ঝুঁকি বীমা বা \'ওয়ার রিস্ক ইন্স্যুরেন্স\' ছাড়া কোনো জাহাজই এই এলাকায় প্রবেশ করতে সাহস পাচ্ছে না।

এই অবরোধের তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের দামে। যুদ্ধ শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৬৫-৬৭ ডলার, তা মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১১৫ ডলারে পৌঁছেছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১১৯ ডলার পর্যন্ত স্পর্শ করেছে। জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কেবল পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাসায়নিক সার উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা একে \'জ্বালানি শক\' হিসেবে অভিহিত করছেন, যা ১৯৭০-এর দশকের বিশ্বমন্দার স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে।

বিশ্বের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতেও এই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। নিউইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিট থেকে শুরু করে টোকিও বা হংকং—সবখানেই সূচকের বড় পতন লক্ষ্য করা গেছে। ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ একদিনেই ৪০০ পয়েন্টের বেশি হারিয়েছে, আর দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি (KOSPI) সূচক ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর সবচেয়ে বড় ধসের সম্মুখীন হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তার ভয়ে পুঁজি সরিয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন, যার ফলে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।

বাংলাদেশ অর্থনীতিতে প্রথম আঘাত: জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট

বাংলাদেশের জন্য এই যুদ্ধ কোনো দূরবর্তী সংবাদ নয়, বরং এটি সরাসরি আমাদের রান্নাঘর এবং কারখানার চাকা থামিয়ে দেওয়ার অশনিসংকেত। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া এবং পারস্য উপসাগরে অস্থিরতার কারণে সৌদি আরব, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) দাবি করছে যে দেশে কয়েক সপ্তাহের মজুত রয়েছে, কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই নিশ্চয়তা ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে।

জ্বালানি তেলের এই সংকট সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতকে আঘাত করেছে। দেশে বর্তমানে গ্যাসের অভাব প্রকট, কারণ আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহ থমকে গেছে। কাতার থেকে আসা এলএনজি জাহাজগুলো এখন ঝুঁকিপূর্ণ পথ এড়িয়ে বিকল্প পথ খুঁজছে, যার ফলে জাহাজভাড়া ও সময়—উভয়ই বাড়ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে সরকার ইতিমধ্যে কঠোর সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করেছে। মার্চ ২০২৬-এর শুরুতে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং আসন্ন ঈদুল ফিতরের ছুটি এগিয়ে আনা হয়েছে। এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় আকারের বিদ্যুৎ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার কমিয়ে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো।

শিল্প খাতেও এই প্রভাব সুদূরপ্রসারী। গ্যাস সংকটের কারণে দেশের পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার মধ্যে চারটির উৎপাদন বন্ধ করে দিতে হয়েছে। আমদানিকৃত গ্যাস এখন কৃষি ও সার কারখানার পরিবর্তে বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা হচ্ছে, যাতে লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়। কিন্তু এর ফলে কৃষি খাতে সারের তীব্র সংকট এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশি প্রবাসী ইতিমধ্যে যুদ্ধের প্রভাব অনুভব করতে শুরু করেছেন। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে তেল স্থাপনায় হামলা এবং অর্থনৈতিক মন্দার কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আকাশপথ বন্ধ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে কাতার ও ওমানেও এলএনজি সরবরাজ ও কার্গো সমস্যা এবং ভিসানীতির জটিলতা প্রবাসীদের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে।

রান্নাঘরের বাজার ও \'ওয়ার প্রিমিয়াম\'-এর দহন

সাধারণ মানুষের কাছে এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব অনুভূত হচ্ছে নিত্যপণ্যের বাজারে। যদিও বাংলাদেশ সরাসরি যুদ্ধে জড়িত নয়, কিন্তু আমদানিকৃত পণ্যের ওপর যুদ্ধের দোহাই দিয়ে \'ওয়ার প্রিমিয়াম\' যুক্ত হচ্ছে। ভোজ্য তেল, চিনি এবং ডাল—যা মূলত আমদানিনির্ভর—এগুলোর দাম বাজারে হুহু করে বাড়ছে। খুলনার বাজারে ইতিমধ্যে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৪-৫ টাকা বেড়েছে, আর খোলা তেলের দাম বেড়েছে ৭ টাকা পর্যন্ত। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন যে, সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো যুদ্ধের অজুহাতে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে, যা বাজারে এক কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে।

রমজান মাস চলায় মুরগি ও গরুর মাংসের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিপ্রতি ২২০ টাকায় পৌঁছেছে, যা এক সপ্তাহ আগে ১৭০-১৮০ টাকা ছিল। গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি ৮৫০ টাকা ছাড়িয়েছে। তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহন খরচ বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে শাকসবজি থেকে শুরু করে চাল-ডাল পর্যন্ত প্রতিটি পণ্যে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা শুকনো ফল যেমন খেজুর, এপ্রিকট এবং বাদামের দাম ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, কারণ বিমান যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এই পণ্যগুলোর আমদানি থমকে গেছে।

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ও বাংলাদেশের \'ট্যারিফ ক্লিফ\' আতঙ্ক

২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের \'স্বল্পোন্নত দেশ\' (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার কথা। এটি একটি দেশের জন্য গৌরবের বিষয় হলেও বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এলডিসি স্ট্যাটাস চলে গেলে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডার মতো বড় বাজারগুলোতে শুল্কমুক্ত সুবিধা (এভরিথিং বাট আর্মস-ইবিএ) হারাবে। বর্তমানে যুদ্ধের কারণে রপ্তানি আয় যেখানে কমছে, সেখানে ৯-১২ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপিত হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না।

অর্থনীতিবিদরা একে \'ট্যারিফ ক্লিফ\' বা শুল্কের পাহাড় বলে অভিহিত করছেন। গ্র্যাজুয়েশনের ফলে স্বল্প সুদে বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার সুযোগও কমে যাবে। এখন যেখানে ১-২ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া যায়, গ্র্যাজুয়েশনের পর তা ৫-৭ শতাংশ বাণিজ্যিক হারে নিতে হবে, যা দেশের ঋণের বোঝা এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে (ডেবট সার্ভিসিং) মারাত্মক চাপে ফেলবে। ব্যবসায়ী ও সিপিডি-র মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সরকারকে গ্র্যাজুয়েশন প্রক্রিয়া অন্তত ২০৩২ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে।

ডলার সংকট ও ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ডলারের সংকট নতুন কিছু নয়, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। আমদানি ব্যয় বাড়ার বিপরীতে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স কমতে থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও ২০২৫ সালের মাঝামাঝি রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের ওপরে উঠেছিল, কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে তা আবার কমতে শুরু করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকায় স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করলেও বাজারে ডলারের তীব্র সংকট রয়েছে। অনেক ব্যাংক এখন এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খুলতে অপরাগতা প্রকাশ করছে, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আমদানিকারকদের জন্য। এর ফলে শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন কমিয়ে বাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দেবে।

যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতির সম্ভাব্য রূপরেখা

যদি ইরান-ইসরায়েল-মার্কিন যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক অন্ধকার যুগের দিকে ধাবিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মূলত তিনটি সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট বিবেচনা করছেন:

 ১. সীমিত সংঘাত (১-৩ মাস): এই পরিস্থিতিতে তেলের দাম ১০০ ডলারের আশপাশে থাকবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দাভাব দেখা দিলেও তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ হয়তো কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে।

 ২. দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধ (৬-৯ মাস): এটি হবে সবচেয়ে বিপর্যয়কর। তেলের দাম ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বিশ্বজুড়ে খাদ্যাভাব এবং মুদ্রাস্ফীতি ডাবল ডিজিট ছাড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

 ৩. বৈশ্বিক জড়িয়ে পড়া: যদি রাশিয়া বা চীন এই যুদ্ধে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে, তবে এটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের রূপ নিতে পারে, যেখানে অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ আর কার্যকর থাকবে না।

বাংলাদেশের জন্য করণীয় হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন কেবল জ্বালানি সাশ্রয় নয়, বরং বিকল্প উৎসের দিকে নজর দিতে হবে। ভারত বা রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চুক্তি, অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা এবং কৃষিতে ভর্তুকি বাড়িয়ে খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প পথ নেই। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং প্রয়োজনে তাদের বিকল্প শ্রমবাজারে পাঠানোর জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।

একটি সতর্কবার্তা

পরিশেষে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল দুটি দেশের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়; এটি বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর চরম আঘাত। প্রথম আলোর সাংবাদিকের ভাষায় বলতে গেলে, “তেহরানের আকাশে যখন ক্ষেপণাস্ত্রের আলো দেখা যায়, তার উত্তাপ বাংলাদেশের কৃষকের চুলার ওপরও অনুভূত হয়।” যুদ্ধের দামামা হয়তো দূরে বাজছে, কিন্তু তার ক্ষুধা ও অস্থিরতা আমাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশ এখন এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন। দূরদর্শী নেতৃত্ব, জাতীয় ঐক্য এবং কঠোর অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা—এই তিনটিই হতে পারে এই মহাসংকট থেকে উত্তরণের চাবিকাঠি। যদি এই যুদ্ধ এখনই না থামে, তবে বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক ধস নামবে, তার ফল ভোগ করতে হবে আগামী কয়েক প্রজন্মকে। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এই মেঘ কাটানোর একমাত্র উপায় নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝেও অবিচল থেকে বিকল্প পথ খুঁজে বের করা।

img

পুঁজিবাজারে বড় চমক কি সময়ের ব্যাপার মাত্র?

প্রকাশিত :  ১৬:৫২, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের এই সময়টি বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধের মেঘ কাটিয়ে বিশ্ব আজ এক নতুন স্থিতিশীলতার সুপ্রভাতের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার পারদ নিম্নমুখী হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যের উল্লেখযোগ্য পতন বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এক বিশেষ স্বস্তির বার্তা বয়ে এনেছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করতে একের পর এক তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজের আগমন এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহের শক্তিশালী অবস্থান আগামী রবিবারের পুঁজিবাজারে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বিশ্লেষণটি মূলত বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও দেশীয় সামষ্টিক অর্থনীতির নিরিখে আমাদের পুঁজিবাজারের সম্ভাব্য গতিপথকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিবর্তন ও তেলের মূল্যপ্রবণতা

বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত জ্বালানি তেলের বাজার গত কয়েক মাস ধরে যে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে এসে তা নাটকীয়ভাবে স্তিমিত হতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) দামে এখন নিম্নমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। সাম্প্রতিক লেনদেনগুলোতে দেখা গেছে, ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৯৭.৯৯ ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের সেশনের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ কম। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি ৯৫ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমার নিচেও অবস্থান করছে। জেপি মরগানের মতো বিশ্বখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বাভাস দিচ্ছে যে, ২০২৬ সাল জুড়ে তেলের গড় মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৬০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি চমৎকার সংকেত।

এই দরপতনের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত দুই সপ্তাহের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য একটি \'গেম চেঞ্জার\' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালী—যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী—পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন তেলের বাজারদর থেকে \'যুদ্ধ ঝুঁকি প্রিমিয়াম\' বা \'ওয়ার প্রিমিয়াম\' সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন, যার ফলশ্রুতিতে দামের এই স্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা: সংকট থেকে সম্ভাবনার দ্বারে

বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে আসার এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থাপনায়ও এক অভাবনীয় গতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতের দুশ্চিন্তা লাঘব করে একের পর এক জ্বালানি তেল ও এলএনজিবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর এবং মহেশখালী টার্মিনালে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এটি শুধুমাত্র কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং সরকারের সুপরিকল্পিত আমদানি কৌশলেরই অংশ।

৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মালয়েশিয়া থেকে আসা দুটি বৃহৎ মাদার ট্যাংকার \'সেন্ট্রাল স্টার\' এবং \'ইস্টার্ন কুইন্স\' চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছে। তারা মোট ৫১,০০০ মেট্রিক টন জ্বালানি (২৫,০০০ টন ফার্নেস অয়েল ও ২৬,০০০ টন অকটেন) বহন করে এনেছে। এছাড়া সিঙ্গাপুর থেকে আসা আরেকটি জাহাজ ২৭,০০০ টন ডিজেল খালাস করেছে। তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। ১৫ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়া থেকে ৬৪,৬৭৮ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে \'মারান গ্যাস হাইড্রা\' মহেশখালীতে পৌঁছেছে এবং ১৮ এপ্রিল অ্যাঙ্গোলা থেকে আরও ৬৯,০১৫ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে \'লোবিটো\' আসার কথা রয়েছে। মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৩টি জ্বালানিবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছেছে, যা দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য এক বিরাট স্বস্তি।

সামষ্টিক অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলো ২০২৬ সালের শুরুতেই ক্রমান্বয়ে উন্নতির শিখরে আরোহণ করছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা অর্থনীতির অন্তর্নিহিত শক্তিরই পরিচায়ক। ৭ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.৩৫ বিলিয়ন ডলারে। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (এসিইউ) ও অন্যান্য বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের পরেও রিজার্ভের এই অবস্থান অত্যন্ত সন্তোষজনক।

রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রেও চলতি বছর নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। মার্চ মাসে প্রবাসীরা রেকর্ড ৩.৭৭৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, যা একক মাস হিসেবে এ যাবতকালের সর্বোচ্চ। এপ্রিলের প্রথমার্ধেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ১ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে ১,৭৮৮ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২১.৫ শতাংশ বেশি। এই শক্তিশালী রিজার্ভ ও রেকর্ড রেমিট্যান্সের ফলে ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে ৩.৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। একইসাথে খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি (যা সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ১৪.২৪ শতাংশ) নাটকীয়ভাবে কমে ফেব্রুয়ারিতে ২.৩৯ শতাংশে নেমে আসায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বাজার স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

পুঁজিবাজারের গতিপ্রকৃতি ও রবিবারের পূর্বাভাস

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বিগত কয়েক সপ্তাহের সংশোধন প্রক্রিয়ার পর এখন একটি শক্তিশালী ঘুরে দাঁড়ানোর (রিবাউন্ড) উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ডিএসই সূচক ৫,৬০০ পয়েন্টের ঘর স্পর্শ করার পর মুনাফা শিকারিদের চাপে কিছুটা কমলেও গড় দৈনিক লেনদেন ১,০০০ কোটি টাকার ওপরে থাকা নির্দেশ করে যে বাজারে পর্যাপ্ত তারল্য ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ রয়েছে।

আগামী রবিবার পুঁজিবাজার ইতিবাচক থাকার পেছনে তিনটি প্রধান প্রভাবক কাজ করবে বলে আমি মনে করি:

প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় তালিকাভুক্ত উৎপাদনশীল ও বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় কমে আসবে, যা সরাসরি তাদের কর্পোরেট মুনাফায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে সিমেন্ট, সিরামিক ও ওষুধ খাতের কোম্পানিগুলো এই জ্বালানি স্বস্তির বড় সুবিধাভোগী হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বিশ্বজুড়ে শান্তি আলোচনার অগ্রগতি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে \'রিস্ক-অন\' মেজাজ ফিরিয়ে এনেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারগুলোতে ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তৃতীয়ত, দেশের শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি বিনিয়োগকারীদের মনে এই বিশ্বাস জন্মাবে যে দেশের অর্থনীতি বড় কোনো ঝুঁকির মুখে নেই।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এপ্রিলের এই সময়টি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বিশেষ মাহেন্দ্রক্ষণ। একদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বস্তি, অন্যদিকে দেশীয় শক্তিশালী অর্থনৈতিক সূচক—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার জন্য প্রস্তুত। বিনিয়োগকারীদের ভয় কাটিয়ে যৌক্তিক ও তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাজারে অংশ নেওয়ার এখনই সময়। আশা করা যায়, আগামী রবিবারের লেনদেন বিনিয়োগকারীদের জন্য এক নতুন আশার আলো বয়ে আনবে এবং দেশের পুঁজিবাজার তার ইতিবাচক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে।

মতামত এর আরও খবর