img

শিল্পপতি জহুরুল ইসলাম—নির্মাণশিল্পের নীরব স্থপতি, মানবকল্যাণের এক আলোকবর্তিকা

প্রকাশিত :  ০৬:১৮, ১৮ মার্চ ২০২৬

শিল্পপতি জহুরুল ইসলাম—নির্মাণশিল্পের নীরব স্থপতি, মানবকল্যাণের এক আলোকবর্তিকা

সংগ্রাম দত্ত: বাংলাদেশের শিল্পোন্নয়ন, নির্মাণখাত ও প্রবাসে কর্মসংস্থানের ইতিহাসে কিছু নাম সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। তেমনই এক নাম জহুরুল ইসলাম—যিনি রাজনৈতিক ক্ষমতার মোহে না পড়ে কেবল সততা, দূরদৃষ্টি ও কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পপতি হিসেবে।

১৯২৮ সালের ১ আগস্ট কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার ভাগলপুর গ্রামে এক ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা আলহাজ আফতাব উদ্দিন আহম্মদ ছিলেন স্থানীয় সমাজজীবনে সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব ও পৌর চেয়ারম্যান। পারিবারিক ঐতিহ্যের শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত—মোঘল আমলে আগত পূর্বপুরুষদের নামানুসারেই এ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি স্থানের নামকরণ হয়েছে বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।

শৈশবে “সোনা” নামে পরিচিত জহুরুল ইসলাম পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠেন সবার “জহুর ভাই” এবং ব্যবসায়িক অঙ্গনে সম্মানিত “চেয়ারম্যান সাহেব”। শিক্ষাজীবনে নানা প্রতিকূলতা থাকলেও জ্ঞানার্জনের প্রতি তাঁর আগ্রহ কখনো ম্লান হয়নি। কলকাতার রিপন হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে উচ্চশিক্ষায় এগোলেও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টানতে হয় অকালেই। তবে পরবর্তীকালে শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদানই প্রমাণ করে—শিক্ষার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার ছিল গভীর ও আন্তরিক।

কর্মজীবনের সূচনা ১৯৪৮ সালে, মাত্র ৮০ টাকা বেতনে সি অ্যান্ড বি বিভাগে ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। সেখানেই নির্মাণশিল্পের হাতেখড়ি। মাত্র তিন বছরের মধ্যে চাকরি ছেড়ে শুরু করেন ঠিকাদারি ব্যবসা। ছোট কাজ দিয়ে শুরু হলেও দ্রুতই নিজের দক্ষতা ও সততার জোরে তিনি হয়ে ওঠেন প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার।

ঢাকার গুলিস্তান-টিকাটুলি সড়ক নির্মাণসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কাজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা পান নির্মাণ খাতে। আর্থিক সচ্ছলতা অর্জনের পর তিনি পরিবারকে ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং দীর্ঘদিন একটি বৃহৎ একান্নবর্তী পরিবার পরিচালনা করেন—যা তাঁর সামাজিক মূল্যবোধের এক অনন্য উদাহরণ।

১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন Eastern Housing Limited, যা পরবর্তীকালে দেশের অন্যতম বৃহৎ রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পায়। ১৯৭৫ সালে গড়ে তোলেন Bengal Development Corporation (বিডিসি), যা বাংলাদেশের নির্মাণখাতকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পৌঁছে দেয়। তাঁর প্রতিষ্ঠানের হাত ধরেই প্রথমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি নির্মাণ কোম্পানি প্রতিযোগিতামূলকভাবে কাজের সুযোগ পায়।

জাতীয় সংসদ ভবনের আঙ্গিনা, বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন, হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট কমপ্লেক্সসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণে তাঁর প্রতিষ্ঠানের অবদান রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে আবুধাবিতে প্রায় পাঁচ হাজার বাড়ি নির্মাণ, ইরাক ও ইয়েমেনে উপশহর গড়ে তোলার মতো প্রকল্প শুধু তাঁর ব্যবসায়িক সাফল্যই নয়, হাজারো বাংলাদেশির বিদেশে কর্মসংস্থানের পথও খুলে দেয়। এ ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন পথিকৃৎ।

ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৫৬ সালে সুরাইয়া বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। দাম্পত্য জীবনে এক ছেলে ও চার কন্যার জনক জহুরুল ইসলাম পরিবারকে সবসময় গুরুত্ব দিয়েছেন এবং মানবিক মূল্যবোধে সন্তানদের গড়ে তুলেছেন।

সমাজসেবায়ও তিনি ছিলেন অগ্রণী। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে কিশোরগঞ্জে প্রায় ২০০টি লঙ্গরখানা চালু করে কয়েক মাস ধরে দরিদ্র মানুষের খাদ্যের ব্যবস্থা করেন। ১৯৮৯ সালে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন Zahurul Islam Medical College, যা গ্রামীণ অঞ্চলে চিকিৎসা শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

মুক্তিযুদ্ধের সময় লন্ডনে অবস্থান করে ছদ্মনামে অর্থ সহায়তা প্রদান, ভাষা আন্দোলন ও আগরতলা মামলায় সহযোগিতা—সব মিলিয়ে দেশের ক্রান্তিকালে তাঁর ভূমিকা ছিল নীরব কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর এই অবদান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর লেখাতেও উঠে এসেছে।

ক্রীড়াক্ষেত্রেও ছিল তাঁর সম্পৃক্ততা। মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং নাভানা ক্রিকেট টুর্নামেন্টে পৃষ্ঠপোষকতা তাঁর বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বেরই প্রতিফলন।

১৯৯৫ সালের ১৮ অক্টোবর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু রেখে যান এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার—যেখানে শিল্পায়ন, মানবকল্যাণ ও দেশপ্রেম একসূত্রে গাঁথা।

জহুরুল ইসলাম প্রমাণ করে গেছেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছাড়াও একজন মানুষ কেবল কর্ম, সততা ও দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে একটি জাতির অগ্রযাত্রায় গভীর ছাপ রেখে যেতে পারেন। তাঁর জীবন কেবল সাফল্যের গল্প নয়, বরং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার স্থায়ী উৎস।


img

বৈশাখে পান্তা-ইলিশ যেভাবে এলো

প্রকাশিত :  ১৪:৫৬, ২১ এপ্রিল ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৫:০১, ২১ এপ্রিল ২০২৬

আবদুল হামিদ মাহবুব

বাংলা নববর্ষের (পহেলা বৈশাখ) প্রথম দিনে সকল বাঙালির ঘরেই যার যার সাধ্যমত ভালো-মন্দ খাওয়ার একটা রেওয়াজ চালু ছিল। কিন্তু সেই রেওয়াজ পান্তা-ইলিশে গড়ালো কিভাবে? প্রশ্নটা অনেকের মাথায় আসে। কিন্তু ঘটনা ক্রমে আমি ‘আবদুল হামিদ মাহবুব’ সেই কাহিনী কিছুটা জানি।

পান্তা-ইলিশের প্রচলনটা শুরু হয়েছে, ঢাকার বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। আমি তখন পত্রিকার কাজে ঢাকায় ছিলাম। মাসটা ছিল এপ্রিল। সম্ভবত ১৯৮২ অথবা ১৯৮৩ সাল। দৈনিক দেশ-এ আমি কাজ করতাম ‘মৌলভীবাজারের নিজস্ব সংবাদদাতা’ হিসেবে। আমার সাথে সখ্যতা ছিল দৈনিক দেশ-এর মফস্বলের দায়িত্বে থাকা আবু সাঈদ জুবেরীর। মফস্বলে আরেকজন কাজ করতেন। উনার নামের সাথে নজরুল ছিল। এতো বছর পর উনার পুরো নামটা ভুলে গেছি। সম্ভবত: সানাউল্লাহ নূরী ছিলেন পত্রিকার সম্পাদক। বার্তা সম্পাদক বোরহান আহমেদ। সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন কবি হেলাল হাফিজ।

পত্রিকার মালিক ছিলেন এরশাদের মন্ত্রী মাইদুল ইসলাম। বোরহান আহমদ, হেলাল হাফিজ ও রোজী ফেরদৌসী একটা রুমে বসতেন। রোজী ফেরদৌসী পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করতেন। সম্ভবত শিশু পাতাটাও তিনি দেখতে। আমার অনেক ছড়া শিশু পাতায় ছাপা হয়েছে।

এই তিনজন বসতেন সেই সেগুনবাগিচার বাসার মতো বানানো পুরনো বিল্ডিংয়ে ঢোকার হাতের বাম পাশের প্রথম রুমটায়। সেগুনবাগিচার সেই ভবন ও ভূমি ছিল  সরকারের পরিত্যক্ত সম্পত্তি। কাঠের সিঁড়ি ভেঙ্গে দোতালায় উঠতে হতো। ওখানে একটি রুমে সম্পাদক বসতেন। সাপ্তাহিক বিপ্লব নামে একটি ম্যাগাজিন বের হতো। ওইটার সম্পাদক ছিলেন কবি সিকদার আমিনুল হক। তিনিও দোতলার একটি রুমে বসতেন। ক্ষমতার জোরে মাইদুল ইসলাম সে বাড়ি ও ভূমি দখল করে রেখেছিলেন। ‘দৈনিক দেশ’ প্রকাশনা বন্ধ হওয়ার বেশ পরে সেই সম্পত্তিতেই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কার্যক্রম শুরু হয়েছিলো। জাদুঘর দেখতে আমি কয়েকবার ওখানে গিয়েছি।

তো যে কথা বলছিলাম, সম্ভবত হেলাল হাফিজের সাথে কথা বলতেই আমি বোরহান আহমেদের ওই রুমে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম বোরহান ভাই কথা বলছেন রোজী ফেরদৌসীর সাথে। বিষয় সামনে পহেলা বৈশাখ। সেই বৈশাখের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রমনা পার্কের অনুষ্ঠান স্থলের বটতলে হাজার হাজার মানুষ সমাগম হয়। বোরহান আহমেদ প্রস্তাব করলেন ওখানে একটি পান্তা ভাতের দোকান দিলে ভালো ব্যবসা হবে। বিষয়টি লুফে নিলেন রোজী ফেরদৌসী। জিন্সের টাইট প্যান্ট পরা গায়েও জিন্সের শার্ট কবি হেলাল হাফিজ সবসময়ই একটু গম্ভীর থাকতেন। খুব একটা কথা বলতেন না। তার টান থাকতো প্রেসক্লাবের প্রতি। তিনি হাতের কাজ সেরেই কিভাবে প্রেসক্লাবে চলে যাবেন সেই চিন্তায় যেনো একটা ঘোরের মধ্যে থাকতেন। প্রেসক্লাবর প্রতি টান থাকার কারণ, ওখানে গিয়ে তিনি জুয়া খেলতেন। কিন্তু তিনিও ওই আলোচনায় ঢুকে গেলেন। তিনি বললেন পান্তা ভাতের সাথে ইলিশ ভাজি রাখলে আরো ভালো হবে। একজন হাবাগোবা মফস্বলের মানুষ হিসেবে তাদের সকল কথা শুনেই গেছি।  হেলাল হাফিজের টেবিলের সামনে একটিভ চেয়ারে বসে থেকে তাদের পরিকল্পনাগুলো শুনছিলাম, আর শুনছিলাম। পেয়াজ, কাঁচা মরিচ, ভর্তা আরো কি কি তারা বলছিলেন!

কথা বাড়তে বাড়তে এক সময় সিদ্ধান্ত হয়ে গেলো।  পান্তাভাতের একটি দোকান দেওয়াই হবে। সাথে থাকবে ইলিশ ভাজা। পান্তাভাত বানানোর দায়িত্ব পড়লো রোজী ফেরদৌসীর উপর। ইলিশ কেনার দায়িত্ব নিলেন বোরহান আহমেদ। সেই ঘটনার সাক্ষী থেকে গেলাম আমি, মফস্বলের একজন সাংবাদিক। শেষ পর্যন্ত রোজী ফেরদৌসী এই কর্মের সাথে যুক্ত ছিলেন কিনা আমি বলতে পারব না।

আমি এই পর্যন্ত তাদের কথাবার্তা শুনে ওখান থেকে চলে এসেছিলাম। মফস্বল বিভাগে এসে জুবেরী ভাইয়ের সাথে টুকটাক কথা সেরে চলে আসলাম। সেই বৈশাখে পান্তা স্টলের ছবিসহ রিপোর্টও এক দুটি পত্রিকায় বেরিয়েছিলো।

নোট: পুরোটাই স্মৃতি থেকে লিখেছি। একটু এদিক-সেদিক হতে পারে। তবে নিশ্চিত করছি, কাহিনী ঠিক আছে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব। সাংবাদিকতা বিষয়ক প্রকাশিত গ্রন্থ: ‘গণমাধ্যম সাংবাদিকতা দেশ দশের আমার কথা’।


আবদুল হামিদ মাহবুব: ‘কমলকুঞ্জ’. মৌলভীবাজার-৩২০০ ।
মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪

মতামত এর আরও খবর