শিল্পপতি জহুরুল ইসলাম—নির্মাণশিল্পের নীরব স্থপতি, মানবকল্যাণের এক আলোকবর্তিকা
সংগ্রাম দত্ত: বাংলাদেশের শিল্পোন্নয়ন, নির্মাণখাত ও প্রবাসে কর্মসংস্থানের ইতিহাসে কিছু নাম সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। তেমনই এক নাম জহুরুল ইসলাম—যিনি রাজনৈতিক ক্ষমতার মোহে না পড়ে কেবল সততা, দূরদৃষ্টি ও কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পপতি হিসেবে।
১৯২৮ সালের ১ আগস্ট কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার ভাগলপুর গ্রামে এক ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা আলহাজ আফতাব উদ্দিন আহম্মদ ছিলেন স্থানীয় সমাজজীবনে সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব ও পৌর চেয়ারম্যান। পারিবারিক ঐতিহ্যের শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত—মোঘল আমলে আগত পূর্বপুরুষদের নামানুসারেই এ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি স্থানের নামকরণ হয়েছে বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
শৈশবে “সোনা” নামে পরিচিত জহুরুল ইসলাম পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠেন সবার “জহুর ভাই” এবং ব্যবসায়িক অঙ্গনে সম্মানিত “চেয়ারম্যান সাহেব”। শিক্ষাজীবনে নানা প্রতিকূলতা থাকলেও জ্ঞানার্জনের প্রতি তাঁর আগ্রহ কখনো ম্লান হয়নি। কলকাতার রিপন হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে উচ্চশিক্ষায় এগোলেও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টানতে হয় অকালেই। তবে পরবর্তীকালে শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদানই প্রমাণ করে—শিক্ষার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার ছিল গভীর ও আন্তরিক।
কর্মজীবনের সূচনা ১৯৪৮ সালে, মাত্র ৮০ টাকা বেতনে সি অ্যান্ড বি বিভাগে ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। সেখানেই নির্মাণশিল্পের হাতেখড়ি। মাত্র তিন বছরের মধ্যে চাকরি ছেড়ে শুরু করেন ঠিকাদারি ব্যবসা। ছোট কাজ দিয়ে শুরু হলেও দ্রুতই নিজের দক্ষতা ও সততার জোরে তিনি হয়ে ওঠেন প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার।
ঢাকার গুলিস্তান-টিকাটুলি সড়ক নির্মাণসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কাজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা পান নির্মাণ খাতে। আর্থিক সচ্ছলতা অর্জনের পর তিনি পরিবারকে ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং দীর্ঘদিন একটি বৃহৎ একান্নবর্তী পরিবার পরিচালনা করেন—যা তাঁর সামাজিক মূল্যবোধের এক অনন্য উদাহরণ।
১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন Eastern Housing Limited, যা পরবর্তীকালে দেশের অন্যতম বৃহৎ রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পায়। ১৯৭৫ সালে গড়ে তোলেন Bengal Development Corporation (বিডিসি), যা বাংলাদেশের নির্মাণখাতকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পৌঁছে দেয়। তাঁর প্রতিষ্ঠানের হাত ধরেই প্রথমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি নির্মাণ কোম্পানি প্রতিযোগিতামূলকভাবে কাজের সুযোগ পায়।
জাতীয় সংসদ ভবনের আঙ্গিনা, বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন, হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট কমপ্লেক্সসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণে তাঁর প্রতিষ্ঠানের অবদান রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে আবুধাবিতে প্রায় পাঁচ হাজার বাড়ি নির্মাণ, ইরাক ও ইয়েমেনে উপশহর গড়ে তোলার মতো প্রকল্প শুধু তাঁর ব্যবসায়িক সাফল্যই নয়, হাজারো বাংলাদেশির বিদেশে কর্মসংস্থানের পথও খুলে দেয়। এ ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন পথিকৃৎ।
ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৫৬ সালে সুরাইয়া বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। দাম্পত্য জীবনে এক ছেলে ও চার কন্যার জনক জহুরুল ইসলাম পরিবারকে সবসময় গুরুত্ব দিয়েছেন এবং মানবিক মূল্যবোধে সন্তানদের গড়ে তুলেছেন।
সমাজসেবায়ও তিনি ছিলেন অগ্রণী। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে কিশোরগঞ্জে প্রায় ২০০টি লঙ্গরখানা চালু করে কয়েক মাস ধরে দরিদ্র মানুষের খাদ্যের ব্যবস্থা করেন। ১৯৮৯ সালে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন Zahurul Islam Medical College, যা গ্রামীণ অঞ্চলে চিকিৎসা শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
মুক্তিযুদ্ধের সময় লন্ডনে অবস্থান করে ছদ্মনামে অর্থ সহায়তা প্রদান, ভাষা আন্দোলন ও আগরতলা মামলায় সহযোগিতা—সব মিলিয়ে দেশের ক্রান্তিকালে তাঁর ভূমিকা ছিল নীরব কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর এই অবদান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর লেখাতেও উঠে এসেছে।
ক্রীড়াক্ষেত্রেও ছিল তাঁর সম্পৃক্ততা। মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং নাভানা ক্রিকেট টুর্নামেন্টে পৃষ্ঠপোষকতা তাঁর বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বেরই প্রতিফলন।
১৯৯৫ সালের ১৮ অক্টোবর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু রেখে যান এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার—যেখানে শিল্পায়ন, মানবকল্যাণ ও দেশপ্রেম একসূত্রে গাঁথা।
জহুরুল ইসলাম প্রমাণ করে গেছেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছাড়াও একজন মানুষ কেবল কর্ম, সততা ও দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে একটি জাতির অগ্রযাত্রায় গভীর ছাপ রেখে যেতে পারেন। তাঁর জীবন কেবল সাফল্যের গল্প নয়, বরং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার স্থায়ী উৎস।



















