img

উৎসব আমেজে সহজ-কঠিন আবৃত্তি প্রসঙ্গ

প্রকাশিত :  ১৭:২৮, ৩০ মার্চ ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৭:৩১, ৩০ মার্চ ২০২৬

উৎসব আমেজে সহজ-কঠিন আবৃত্তি প্রসঙ্গ
আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

গত ২১ মার্চ ২০২৬ (শনিবার) ছিল ঈদুল ফিতর। দেশে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক পরিবেশে এবার  মানুষ ঈদ উদযাপন করেছে। ঈদের উৎসব আমেজ এখনো বিরাজমান। আমার বাসার বেলকনিতে বসে দেখছি, শিশু কিশোররা রংবেরঙের পোশাক পরে আজও (যখন এই লেখাটা লিখছি) এদিক ওদিক যাচ্ছে। আমার বাসার কাছটায়ই ‘বর্ষিজোড়া  ইকোপার্ক’। সামনে খানিক এগোলে ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি বিনোদন পার্ক আছে। সে কারণেই আমার বাসার সামনে দিয়ে হরদম যানবাহন ও লোকজনের আনাগোনা লেগেই থাকে। আর এই ঈদের আমেজে সেটা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। আরও এক দুদিন পর উৎসবের এই আমেজ শেষ হয়ে আসবে। আবারো জীবনের বাস্তবতায় সবাই যার যার কাজে ফিরে যাবেন। তবে ঈদ উৎসবের আমেজ পুরোপুরি শেষ হবার আগেই এবার ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসও আমরা পাচ্ছি।

উৎসব আমেজের মধ্যেই কত বিষয় আমার মনোজগতকে তাড়িত করেছে। লেখালেখির মানুষ, সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও পদচারণা করেছি, এই কারণে অনেক কিছু মেনে নিতে পারি না, মানিয়েও নিতে পারি না। যখন যেটা ভাবায় সেটা বলে ফেলি। এটা আমার দোষ হতে পারে, কেউ কেউ গুণ হিসাবেও দেখেন। তবে কারো ভাবাভাবিতে আমার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। আমি আমার মনের আনন্দে কিংবা মনের বিষাদে এই কাজগুলো করি।

এই লেখায় আমি কবিতা আবৃত্তি প্রসঙ্গ নিয়ে সহজ-কঠিন করে কিছু কথা লিখে ফেলতে মনস্থির করেছি। সেই কারণে এই লেখার শিরোনাম; উৎসব আমেজে সহজ-কঠিন আবৃত্তি প্রসঙ্গ! আবৃত্তি প্রসঙ্গ মানে আমি ‘কবিতা আবৃত্তি’র  প্রসঙ্গেই আমার যাবতীয় কথা এখানে লিখব।

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ফেসবুকের কল্যাণে অনেক নতুন নতুন আবৃত্তিকার পাচ্ছি। কিন্তু আবৃত্তির মধ্যে নতুনত্ব পাচ্ছিনা! অন্যরা যে স্টাইলে (ঢঙে) আবৃত্তি করে ফেলেছেন, এরাও দেখি সেই স্টাইলই ফলো করেন! এইসব আবৃত্তি আমাকে টানে না। মনে হয় অন্য কোন আবৃত্তিকারের কণ্ঠ নকল করার চেষ্টা করছে। এদের আবৃত্তিতে কোন ‘ভেরিয়েশন’ (বৈচিত্র) নেই!

কাউকে কাউকে দেখি এইসব ফেসবুক আবৃত্তিকারদের নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে। এই আবৃত্তিকারের কেউ কেউ ফেসবুকে অন্যদের কবিতা একটু গলা কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে কণ্ঠ উঠানামা করে পড়ে টাকাও কামাই করছেন। অনেক কবি তাদেরকে টাকা পরিশোধ করেন, তারা যেন সেই কবির কোন একটি কবিতা আবৃত্তি করে ফেসবুকে আপলোড করে দেন।  

কেবল এই ফেসবুকের কথাই বলি কেন? আমাদের রেডিও টেলিভিশন ইউটিউব-সহ প্রচার মাধ্যমের সকল ক্ষেত্রের কথাই বলা যায়, সেগুলোতে আবৃত্তির নামে আমরা যা শুনছি, আসলেই কি এগুলো আবৃত্তি হচ্ছে?

এইতো ঈদে আমাদের টেলিভিশনগুলোতে লম্বা বিশেষ বিশেষ প্রোগ্রাম হলো। অনেক টেলিভিশনেই ঈদের কবিতার আবৃত্তির অনুষ্ঠান ছিলো। সেগুলো শুনলেও আমরা কি আবৃত্তির স্বাদটা পেয়েছি? কবি কণ্ঠে কবিতার পাঠ যদি হয়, সেগুলো ভিন্ন বিষয়। কবিতা পাঠ নিয়ে আমার কোন কথা নেই। এই লেখার সকল কথা আবৃত্তির নামে যা শুনছি সেগুলো নিয়ে। ২৬ শে মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস, ২১ ফেব্রয়ারি শহীদ দিবস, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস, পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ। এই দিবসগুলো কেন্দ্র করেও আবৃত্তির অনুষ্ঠান থাকে, আগামীতেও থাকবে। কিন্তু সত্যিকারের আবৃত্তি কি খুব একটা পাই?  

মন্দ-ভালোর আবৃত্তি এখন জীবিকা নির্বাহের পথ হচ্ছে। এটাকে আমি অবশ্য মন্দ ভাবে দেখছিনা। কবিতা পাঠ কিংবা আবৃত্তি যাই বলি, এমন করেও যদি দুই-চার জনের জীবিকা নির্বাহ হয় সেটা অবশ্যই সুখের বিষয়। কিন্তু বহুল পঠিত কিংবা বহুল আবৃত্তি হওয়া কবিতা যখন এরা আবৃত্তি করেন (সকল নয়), তারা পূর্বের আবৃত্তিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেন না। ছাড়িয়ে যেতে না পারায় তখন তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়। আবৃত্তিকার এই অভিধার অবনমন ঘটে। আমাদের কালজয়ী আবৃত্তিকার গোলাম মোস্তফা, আসাদুজ্জামান নূর প্রমূখদের সাথে অবিচার হয়। তাই আমি বিষয়টি নিয়ে এত কথা বলছি।

সেই বিখ্যাত আবৃত্তিকার এবং খ্যাতিমান সেই কবিদের কবিতার অবমূল্যায়ন করে প্রচার মাধ্যমে আবৃত্তি করার অধিকার আপনাকে কেউ দেয়নি। আপনি আবৃত্তিকার নাম নিয়ে, এমন করতে পারেন না। তাই আমি এই নতুন আবৃত্তিকারদের পরামর্শ দিতে চাই; আপনারা কপি করে অন্য আবৃত্তিকারের আবৃত্তিটা নিচে নামাবেন না। নতুন কবিদের কবিতা অর্থের বিনিময়েই পাঠ করে সেগুলো রেকর্ড করে ছাড়–ন এতে নতুন লিখিয়ে কবি যেমন উৎসাহিত হবেন, আপনারও কিছু আর্থিক স্বচ্ছলতা আসবে।

কিন্তু খ্যাতিমান কবিদের কবিতাগুলোর আর বারোটা বাজাবেন না। কাজী সব্যসাচী, কাজী আরিফ, শফি কামাল, প্রজ্ঞা লাবনী, এমনকি শিমুল মুস্তফা যে কবিতা কন্ঠে ধারণ করেছেন ওইগুলো আপনারা আবার চর্বিতচর্বণ করে নিচে নামিয়ে দিবেন না। আমি বলবো আহকাম উল্লাহও যে আবৃত্তি করেছে, সেটাও কেউ আবৃত্তি না করাই শ্রেয় হবে।

আবৃত্তি আর পাঠের মধ্যে ফারাক অনেক। আবৃত্তি হচ্ছে শিল্প। পাঠ কোন শিল্প নয়। এটা কেবলই কাউকে শোনানো। আবৃত্তি শুনে শত শত হাজার হাজার জন। আর পাঠ শুনে হাতে গোনা এক দুজন। আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতে আবৃত্তিকারকে তারা নতুন নাম দিয়েছে ‘বাচিক শিল্পী’ হিসেবে।

আসলেইতো একজন কবি কবিতা লিখেই খালাস। কবির কবিতার ভাব, ছন্দ, তাল, চিত্রকল্প-সহ আরো আরো গোপন বিষয়-আশয় থাকে। সেসব ধরে ধরে নিজের মধ্যে আত্মস্থ করে সেই কবিতাটাকে কন্ঠের মাধ্যমে যিনি শিল্পে পরিণত করে দর্শক কিংবা শ্রোতার কাছে উপস্থাপন করেন তিনি তো একজন ‘শিল্পী’ই। আর সেটা তিনি করছেন তার কণ্ঠ ও বাচনভঙির মাধ্যমে। তাই তিনি অবশ্যই ‘বাচিক শিল্পী’ অভিধা পেতেই পারেন।  

আমাদের যারা এই যেনতেন ভাবে ভাঙাভাঙা আর কাঁপাকাঁপা গলায় কন্ঠ কখনো উঁচু কখনো নিচু করে কিছু পড়ে ফেললেই সেটা আবৃত্তি হয়ে যায় না। আবৃত্তি একটা শিল্প। শিল্পকে ভাঙতে হয়, গড়তে হয়। তারপর হয়তো সেটা নতুন রূপ পায়। একটা নতুন কিছু করাই হচ্ছে শিল্প। তাও সেটা শিল্পিত ভাবে হতে হবে।

নিজের বাসা বাড়ি বানানো কিংবা সাজানোতেও শিল্পবোধের কাজ প্রকাশ পায়। আমরা নিজেদের কাজ নিজেরা দেখিনা এবং সেভাবে ভাবিও না বলে ওই শিল্পটা দেখতে পাই না। বাবুই পাখি যেমন তার বাসা নৈপুণ্যের সাথে বানায়। আবৃত্তি শিল্পীকেও সবকিছু ধারণ করে নৈপুণ্য দিয়ে সেটা নতুনভাবে তৈরি করতে হবে। একটি সার্থক কবিতার প্রতিটি শব্দকে মর্মে উপলব্ধি করতে হবে, স্থান কালের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে, কবি কোন মেজাজে, কি প্রকাশে; এই কবিতায় কি মেসেজ (বলতে চাওয়া) দিতে চেয়েছেন? সেটা পুরোপুরি বোঝে তারপরে ছন্দ লয় তাল চিত্রকল্প সবকিছু বোধ বুদ্ধিতে নিয়ে আবৃত্তির রূপ দিলে সেটা একটা সার্থক আবৃত্তি হতে পারে।

আবৃত্তির ক্ষেত্রে প্রতিটি শব্দের স্পষ্ট উচ্চারণ একটা বিষয়। তবে কেবল স্পষ্ট উচ্চারণেই আবৃত্তি হবে না। এর সাথে উপরে বলা কবিতার সকল বিষয় তো থাকবেই, আবৃত্তিকারের আবেগ যুক্ত হতে হবে। সেই আবেগটা কোথায় কতটুকু প্রয়োগ হবে, সেটা আবৃত্তিকারকে অবিরাম চর্চার মাধ্যমে নির্মাণ করতে হবে। কোন একজন একটা কবিতা আবৃত্তিকারের হাতে ধরিয়ে দিল আর তিনি সেটা পট্ পট্ করে পড়ে ফেললেন। এটাকে কি আবৃত্তি বলা যাবে? নিশ্চয়ই না। এটা একটা পাঠ। আবৃত্তিকার কবির কবিতা পাঠ করে শুনিয়েছেন। আজকাল এই পাঠটাকে আবৃত্তি বলে চালানো হচ্ছে, যা আমার কাছে দৃষ্টি ও শ্রুতিকটু লাগছে।

এই লেখার পুরো বক্তব্যই একান্ত আমার। অন্যদের এ বিষয়ে ভিন্নমত থাকতেই পারে। ভিন্নমত থাকাটাই স্বাভাবিক বলে আমি ধরে নিই। এই মত এবং ভিন্নমত প্রকাশ করা এটাই হচ্ছে আমাদের বাকস্বাধীনতা। আমি চাইবো আমার এই বক্তব্য খারিজ করে দিয়ে কিংবা পর্যালোচনা করে অন্য কেউ এ বিষয়ে তার বক্তব্য নিয়ে হাজির হবেন।

আবৃত্তিকার ভাই-বোনদের বলছি, আপনারা যদি নিবেদিত হয়ে আবৃত্তিকে শিল্পের মানে নিয়ে কারো কবিতা আবৃত্তি করতে পারেন, তাহলে বহুল পঠিত কিংবা বহুল আবৃত্তি হওয়া কবিতাগুলো আবৃত্তির চেষ্টা করবেন। নতুবা না। না, মানে একদম না। যদি আবৃত্তি মাধ্যমে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে না পারেন, তবে অর্থের বিনিময়ে যেই অকবিতাগুলো কবিতার মতো করে পড়ছেন, সেটাই করতে থাকুন। বিনীত অনুরোধ আবৃত্তির মর্যাদাটা রক্ষা করুন। সে কারণেই আমার এই কঠিন ভাবে ‘না’ শব্দটা বলা।

আমি কোন ছন্দ বিশারদ নই। আবৃত্তি ক্লাসের কোন শিক্ষকও নয়। তবে একটা বয়সে কবিতা-ছড়ার পাশাপাশি আবৃত্তি নিয়েও অনেক ঘাটাঘাটি করেছি। মঞ্চে উঠে দাপাদাপি করেছি। কিন্তু না, কারো চোখে পড়ার মতো কিছু করতে পারিনি। এইসব আনাড়িপনা করেছি বলে কোন কোন সময় বাচ্চাদের আবৃত্তির বিচারক হিসেবেও বসিয়ে দিয়েছে। যখন বোধে আসলো আমার আক্কেল দিয়ে যেসব বাচ্চাদের আবৃত্তির বিচার করছি সেগুলো অবিচারের শামিল, তখন চুপচাপ ঐ ক্ষেত্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি।

এখনো আমাকে বিশেষজ্ঞ মনে করে কোন কোন সময় কেউ কেউ ডেকে বসেন। ভাবটা ঠিক রেখে কেবল পাশ কাটিয়ে যাই। বুঝতে দিই না, আমিও যে ওসবের কিছুই বুঝিনা। পাছে নিজের অবস্থান তাদের কাছে ছোট হয়ে যায়। আমাদের এই সমাজে প্রায় সকলেই একটা ভাব ধরে থাকে। যে যে ক্ষেত্রে আছেন, সেখানে তিনিই ভাবেন সেরা। আমিও তার ব্যতিক্রম হব কেন? তাই ভাবটা ধরেই থাকি। কিন্তু নিজে নিজেকে যখন মূল্যায়ন করি তখন তো বুঝতে পারি আমি যে আস্ত একটা লবডঙ্কা! কিন্তু বাইরে ভাবটা ধরেই রাখি।

এইখানিক আমার কথা বলে ফেললাম। কথাগুলো আমার হলেও আমাদের এই অঙ্গনের সকলের ক্ষেত্রেই এমন প্রযোজ্য। বুঝতে পারি কে কতটুকু জানে! আর কে কতটুকু বুঝেন! যারা পন্ডিত্যের ভাব ধরে থাকেন তাদেরকে একবার দু’বার বাজালেই আসলটা বেরিয়ে আসে। তারপরও কথা একটা আছে, ‘বাধা ঝাঁপি লাখ টাকা’। সেই লাখ টাকার ঝাঁপিটা আমরা খুলে দেখি না। যিনি বোঝেন তিনিও ঝাঁপির মুখ বন্ধ করে রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

পুরো সমাজটাই চলছে এভাবে। যে যেটাতে যোগ্য না, সে সেটাই দখল করে বসে যায়! তাকিয়ে দেখুন; আমাদের বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, এমনকি নজরুল ইনস্টিটিউটের মত প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে। আমি কেবল ঢাকার কথা বলছি না। সারাদেশে যাদের শাখা আছে। সেখানে যারা বড় বড় পদ দখল করে আছে, প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নিয়ে আছেন, প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগও নিয়েছেন, তাদের কার কতটুকু ব্যুৎপত্তি আছে সেই বিষয়ে উপর?

এসব নিয়ে প্রশ্ন তুললে শত্রু হয়ে যাব। কিন্তু কাউকে না কাউকে তো কথা বলতেই হবে। সবাই যদি সবকিছু কেবল মানিয়েই নেই, তবে এই সমাজ এগোবে কিভাবে? যখন বিবেক আছে, বিবেকের তাড়নায় আমি অনেক বিষয়ে বলে ফেলি।

হয়তো এখন একটু বয়স বেড়েছে, সে কারণে সবকিছুতে বেশি কথা বলি, নাক গলাই। কিন্তু এই যে বলে ফেললাম, এতে আমার নিজের ভেতরটা অনেক হালকা হয়েছে বলে অনুভব করছি। নিজেতো নিজেকে এই বলে সান্ত¦না দিতে পারব, যে আমি অন্তত এই প্রসঙ্গটা উত্থাপন করেছিলাম। আমার কথা কেউ তলিয়ে দেখবে, আমি সেটা আশা করি না। কিন্তু নিজের ভেতর যে একটা যন্ত্রণা ছিল, এই বলে ফেলায়, সেই যন্ত্রণা থেকে আমি কিছুটা হলেও নিষ্কৃতি পেলাম।

জানি আমার এই লেখাটা পড়ে অনেকই ক্ষ্যাপে উঠবে। আমাকে গালাগাল মন্দ-সন্দ অনেক কিছু বলবেন। কিন্তু আমি আমার বক্তব্যে অটল। ইচ্ছে হলে কেউ গ্রহণ করবেন, যাদের ক্ষোভ জন্মাবে তারা চোখ ফিরিয়ে নেবেন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব। সাংবাদিকতা বিষয়ক প্রকাশিত গ্রন্থ: ‘গণমাধ্যম সাংবাদিকতা দেশ দশের আমার কথা’।

মতামত এর আরও খবর

img

বিভক্তির রাজনীতি নয়, এখন সময় এসেছে বাংলাদেশকে নিয়ে একসঙ্গে ভাবার

প্রকাশিত :  ১৩:৩৪, ২২ মে ২০২৬

আবদুল হামিদ মাহবুব

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের রাজনীতি বহু বছর ধরেই যেন এক দীর্ঘ মেরুকরণের গল্প। এখানে মতের চেয়ে পরিচয় বড় হয়ে উঠেছে, যুক্তির চেয়ে উচ্চকণ্ঠের স্লোগান বেশি শোনা গেছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্টেছে ভাষা, বদলেছে প্রতিশ্রুতি, কিন্তু সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা একই থেকেছে—একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ।

এই দেশের মানুষ রাজনীতির কাছে খুব জটিল কিছু চায় না। তারা চায় এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে একজন তরুণ তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পাবে, একজন কৃষক ন্যায্য মূল্য পাবে, একজন মা তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন। মানুষ এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি চায়, যেখানে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করাই মূল লক্ষ্য নয়; বরং ভিন্নমতকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার মানসিকতা থাকবে।

সময়ের সঙ্গে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে। এখন মানুষ কেবল বক্তৃতা শোনে না, তারা আচরণও দেখে। নেতার ভাষা, সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি—এসবও আজ রাজনৈতিক মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সেই জায়গা থেকেই সাম্প্রতিক সময়ে অনেক মানুষের ভেতরে নতুন এক প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে তারেক রহমানকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং একটি তুলনামূলকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ভাষার প্রত্যাশাও কাজ করছে।

মানুষ আসলে এমন নেতৃত্ব খোঁজে, যা বিভক্তির দেয়ালকে আরও উঁচু না করে বরং সেতুবন্ধন তৈরি করতে চায়। কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার রাজনীতি প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে না দেখে তাকে গণতান্ত্রিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখতে শেখে। জাতীয় অগ্রগতি কখনো কোনো এক দলের একার অর্জন নয়; এটি সমষ্টিগত সহযোগিতা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধের ফল।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই—আমরা এখনও অনেক সময় দেশকে নয়, দলকে আগে ভাবি। রাজনৈতিক আনুগত্য এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে নাগরিক পরিচয় আড়ালে পড়ে যায়। অথচ রাষ্ট্র কোনো দলের সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্র মানে কোটি মানুষের শ্রম, স্বপ্ন, সংগ্রাম ও ভবিষ্যতের সম্মিলিত নাম। তাই মতভেদ থাকবে, সমালোচনাও থাকবে; কিন্তু সেই সমালোচনা যদি ধ্বংসের বদলে সংশোধনের পথ দেখায়, তবেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়।

বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। বিশ্ব অর্থনীতি বদলাচ্ছে, প্রযুক্তি নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে, তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক সংঘাতের পুরোনো ধারা ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন। এখন প্রয়োজন এমন এক জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানবসম্পদ, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে সমান গুরুত্ব দেবে।

তরুণদের কর্মসংস্থান, শিক্ষার আধুনিকায়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি এবং সহনশীল সমাজব্যবস্থা—এসব অর্জনের জন্য জাতীয় ঐক্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। কারণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রের অংশ হতে পারে, কিন্তু স্থায়ী বিভাজন কখনো উন্নয়নের ভিত্তি হতে পারে না।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যে জাতি সংকীর্ণতার দেয়াল ভেঙে বৃহত্তর স্বার্থে এক হতে পেরেছে, তারাই টেকসই অগ্রগতির পথে এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষ—তাদের পরিশ্রম, অভিযোজনক্ষমতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা।

এখন সময় এসেছে সেই শক্তিকে বিভক্তির রাজনীতিতে ক্ষয় না করে উন্নয়নের শক্তিতে রূপান্তর করার। কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস তাদেরই মনে রাখে, যারা মানুষকে ভাঙার নয়, এক করার কথা বলেছে; যারা ক্ষমতার নয়, দেশের ভবিষ্যতের কথা ভেবেছে।

মতামত এর আরও খবর