img

আমার সাংবাদিকতা শ্রীমঙ্গল থেকে নিউইয়র্ক

প্রকাশিত :  ১৯:১৭, ০১ এপ্রিল ২০২৬

আমার সাংবাদিকতা শ্রীমঙ্গল থেকে নিউইয়র্ক

শেখ শফিকুর রহমান

আমি সাংবাদিকতা শুরু করেছিলাম মফস্বল থেকে সেই ৯০ এর দশকে ঢাকা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় গেদুচাচার  সাপ্তাহিক সুগন্ধা পত্রিকায় সংবাদ  লেখার মধ্য দিয়ে। প্রথম সংবাদ ছিল মিনতির আতংক স্তম্ভিত দেবী দূর্গা।সাপ্তাহিক সুগন্ধা পত্রিকার শেষ পাতায় এক কলামে ছাপা হয়েছিল। শ্রীমঙ্গলের ইত্যাদি ফটোকপি দোকান থেকে পত্রিকাটি কিনে নিয়ে এসেছিলাম। আমার বাড়ি শ্রীমঙ্গল উপজেলার  সাতগাঁও বাজারে এসে অনেককে সংবাদটি দেখালাম। সেই সময়ে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে ডাকে নিউজ পাঠাতাম। ডাক আর ফ্যাক্স ছাড়া অন্য কোন মাধ্যম ছিলনা।আর এখন তো নিমিষেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে ইমেইল করে পাঠিয়ে দেওয়া যায়।তখন একটি সংবাদ পাঠিয়ে বেশ কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হতো সংবাদ পত্রিকায় ছাপা হওয়ার জন্য।  তখন শ্রীমঙ্গল উপজেলায় এত বেশী  সাংবাদিক ছিলেন না। হাতে গুনা কয়েক জন সাংবাদিকতায় জড়িত ছিলেন। শ্রীমঙ্গলের স্থানীয় পত্রিকা ছিল সাপ্তাহিক শ্রীমঙ্গলের চিঠি, সাপ্তাহিক শ্রীবানী,সাপ্তাহিক পুবালীবার্তা।   আমি মুলত সাংবাদিকতায় অনুপ্রাণিত হয়েছি আমার বাবার চাচাতো ভাই চাচা মোঃ আকবর আলীর মাধ্যমে তিনি তখন ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সংবাদচিত্র পত্রিকায় নিউজ পাঠাতেন। তার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে আমিও সংবাদ লিখে তা ডাক মারফত সাতগাঁও পোস্ট অফিসে গিয়ে পোস্ট করে দিতাম। পরবর্তীতে কাজ করি দৈনিক নওরোজ পত্রিকা,সাপ্তাহিক ছন্দালোক, সাপ্তাহিক বঙ্গবিচিত্রা, সাপ্তাহিক বর্তমান দিনকাল,শ্রীমঙ্গল থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক শ্রীভূমি, মৌলভীবাজারের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক পাতাকুঁড়ির দেশ পত্রিকায়। একবার ঢাকার সাপ্তাহিক ছন্দালোক পত্রিকায় ফিচার লিখেছিলাম শিরোনাম ছিল শ্রীমঙ্গলে রাউন্ড চোরাচালান সংবাদটি তখন রঙ্গিন পাতার কভারে শিরোনাম করেছিল পত্রিকা কতৃপক্ষ পাশাপাশি কভারে ছিল বাংলাদেশের পপ সম্রাট আজম খানের সাক্ষাৎকার। ১৯৯৭ সালে  মৌলভীবাজারের সাপ্তাহিক পাতাকুঁড়ির দেশ পত্রিকায় আমার এক‌টি সংবাদের সুত্র ধরে ভুনবীর ইউনিয়নের সেই সময়ের এক মেম্বারের বিরুদ্ধে ভুনবীর ইউনিয়ন অফিসে শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ভুনবীর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, মেম্বার ও এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে তদন্ত করে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে সৌদি আরবের জেদ্দা চলে যাই এবং সেখানে গিয়েও নিজেকে অনলাইন পত্রিকায় সাংবাদিকতায় নিয়োজিত করি। জেদ্দা বসবাসের সময়ে প্রথমে সিলেটের অনলাইন বিডিনিউজ, হবিগঞ্জের জনপ্রিয় অনলাইন বজ্রকণ্ঠ,নবীগঞ্জের ইউরোবাংলা,লন্ডনের অনলাইন সময়ের যাত্রী ইত্যাদি অনলাইনে অসংখ্য সংবাদ ও সমসাময়িক বিষয়ে কলাম লিখেছি। জেদ্দায় অবস্থান কালে আমার সাংবাদিক জীবনে সবচেয়ে  আলোচিত সংবাদ ছিল। মক্কায় ২০১৫ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর  দূর্ঘটনায় পতিত  হাজীদের নিহতের খবর সর্বপ্রথম বেকিং নিউজ করি ফেইসবুকে ও পরে বাংলাদেশের বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকায়। এই বিষয়ে সপ্তাহব্যাপী জুড়ে ধারাবাহিক ভাবে বিস্তারিত খবরাখবর বিভিন্ন অনলাইনে প্রেরণ করি।সেই দুর্ঘটনায় ৭১৭ জন হাজী নিহত ও ৮৬০ জন হাজী  আহত হয়েছিলেন।পরবর্তীতে বাংলাদেশে ফিরে আসি এবং কিছুদিন বসাবাস করি সেইসাথে আবারও হবিগঞ্জের জনপ্রিয়  অনলাইন  বজ্রকণ্ঠ পত্রিকায় জড়িত হয়ে লেখালেখি চালিয়ে যাই। আবারও স্থায়ী বসবাসের জন্য ইমিগ্যান্ট হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে চলে আসি এবং ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টারে বসবাস করছি।আবারও নিউইয়র্কের কঠিন জীবন যাপনের ভিতরে সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়ি।অনলাইন পত্রিকা ইউএসবাংলা টুয়েন্টিফোরে সাংবাদিকতা দিয়ে শুরু করে এখন নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস থেকে প্রকাশিত শ্রদ্ধেয় ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন ভাইয়ের সম্পাদনায় জনপ্রিয় প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সাথে জড়িত হয়ে লেখালেখি করে যাচ্ছি নিয়মিতভাবে।যদিও আমি স্বশরীর অনেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারি না কাজের চাপে তথাপি ও নিয়মিত সংবাদ লেখার চেষ্টা করছি।ইতোমধ্যে নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সদস্য হয়েছি।আর এটাই আমার দীর্ঘ সাংবাদিকতার জীবনে কোন প্রেসক্লাবের আনুষ্ঠানিকভাবে জড়ানো।এই জন্য আমাদের প্রেসক্লাবের সভাপতি মনোয়ারুল ইসলাম ভাই ও সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ ইলিয়াস খসরু ভাই কে অবশ্যই ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে হয়।সাংবাদিকতা একটি মহৎ পেশা এই পেশায় মানুষের কল্যাণে কাজ করার সুযোগ অনেক বেশী। এই মাধ্যমে  টাকা পয়সা অর্জনের খুব বেশী সুযোগ না হলেও সমাজে সুনাম অর্জনের সীমাহীন সুযোগ। আবার এখানে সুষ্ঠু  সাংবাদিকতা ও অপসাংবাদিকতা দুইই আছে। যারা সুষ্ঠু সাংবাদিকতায় নিয়োজিত তারাই কেবল খ্যাতি অর্জন করে গেছেন। আমাকে এখন পর্যন্ত কোন কালিমার ছোঁয়া স্পর্শ করতে পারেনি এটাই মনে করি আমার এই পর্যন্ত বিরাট সফলতা। আমি এই বিশাল সফলতা কে আমার ভবিষ্যৎ জীবনে ধরে রেখে দেশ ও জাতির কল্যাণে আমৃত্যু লিখে যেতে চাই সফলতার সাথে।

শেখ শফিকুর রহমান: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা, ব্রঙ্কস, নিউইয়র্ক।
img

শিক্ষকেরও কি আনন্দ করার অধিকার নেই?

প্রকাশিত :  ১৩:৫৮, ২৬ জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৪:১০, ২৬ জুলাই ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা আমাদের সমাজ সম্পর্কে বেশ কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। প্রশ্নটি খুব সরল: একজন শিক্ষক কি শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি একজন মানুষও থাকতে পারবেন?

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পালের একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়েছিল। ভিডিওতে তাঁকে হালকা বাতাসে আঁচল উড়িয়ে, বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’–এর সঙ্গে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটতে দেখা যায়। কয়েক সেকেন্ডের সেই ভিডিওই হয়ে ওঠে সমালোচনা, কটাক্ষ ও সামাজিক বিচারের বিষয়।

কিন্তু সেই সমালোচনার প্রতিক্রিয়ায় যা ঘটেছে, তা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। গত দুই দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা একই গান ব্যবহার করে রিলস তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। কেউ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে, কেউ কর্মস্থলে, কেউ ব্যক্তিগত পরিবেশে ভিডিও করেছেন। তাঁদের বক্তব্য একটাই—একজন শিক্ষক বা একজন নারীকে তাঁর ব্যক্তিগত আনন্দ, পোশাক, হাসি, গান কিংবা স্বাভাবিক অভিব্যক্তির জন্য হেনস্তা করা হলে তার প্রতিবাদ হওয়া দরকার।

একটি রোমান্টিক গান এভাবে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠবে—সম্ভবত গানটির গীতিকার ও সুরকার আশরাফ বাবুও ১৯৮৭ সালের এক শ্রাবণে খুলনায় বসে গানটি লেখার সময় তা ভাবেননি। কিন্তু সময় কখনো কখনো শিল্পকে নতুন অর্থ দেয়। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি এই শ্রাবণে হয়ে উঠেছে সামাজিক বিচারপ্রবণতার বিরুদ্ধে এক ধরনের সম্মিলিত প্রতিবাদের প্রতীক।

শিক্ষিকা সামিয়া শিকদার লিখেছেন, ‘বিউটি রানী পাল ম্যাডামকে হেনস্তার চেষ্টা সফল হয়নি। আজ প্রতিটি সাহসী শিক্ষকই একেকজন বিউটি রানী পাল। আমরা মাথা নত করব না, সম্মান নিয়ে এগিয়ে যাব।’

কুমিল্লার শিক্ষিকা লায়লা নূর পিংকি লিখেছেন, ‘আজ কেনো মন উদাসী হয়ে’ গানের ভিডিও নিয়ে কটাক্ষের প্রসঙ্গ টেনে, শিক্ষকদের এই প্রতিবাদের ফলে মানুষ অন্তত কিছু সময়ের জন্য অন্য কিছু নিয়ে কথা বলছে। তাঁর ভাষায়, ডিজিটাল এই প্রতিবাদ দেখিয়ে দিয়েছে, অন্যায় হলে শিক্ষকেরাও ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানাতে পারেন।

পঞ্চগড়ের শিক্ষিকা ফেরদৌস লিখেছেন, ‘এরপর শাড়ি পরেই দিব শিক্ষকের সেই ভাইরাল নাচ!’ আর চট্টগ্রামের মতলব বাজারের শিক্ষিকা জয়ন্তী ভৌমিকের প্রশ্নটি আরও সরাসরি: ‘শিক্ষক যদি হাসেন, সমস্যা! সাজেন, সমস্যা! পরিপাটি থাকেন, সমস্যা! ভ্রমণে যান, সমস্যা! ছবি পোস্ট করেন, সমস্যা! তাহলে কি শিক্ষক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হওয়ার অধিকারটাও জমা দিতে হবে?’

এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজেদেরই খুঁজে নিতে হবে।

একজন শিক্ষক অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর কাছ থেকে দায়িত্বশীলতা, শালীনতা, পেশাগত সততা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত। কোনো শিক্ষক আইন ভঙ্গ করলে, শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করলে, প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা লঙ্ঘন করলে বা দায়িত্বে অবহেলা করলে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। শিক্ষকও আইনের ঊর্ধ্বে নন।

কিন্তু একটি ব্যক্তিগত ভিডিওতে কাউকে গান করতে, হাঁটতে, হাসতে বা আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা গেলেই তাঁর চরিত্র, সততা কিংবা পেশাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কি ন্যায়সংগত?

এখানেই মূল সমস্যাটি।

আমরা শিক্ষকদের কাছ থেকে এমন এক ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করি, যা অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছেও প্রত্যাশা করি না। শিক্ষক যেন সব সময় গম্ভীর থাকবেন, সব সময় সংযত থাকবেন, ব্যক্তিগত আনন্দ প্রকাশ করবেন না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করবেন না—এমন একটি অলিখিত সামাজিক বিধি যেন তৈরি হয়ে গেছে।

কিন্তু শিক্ষক কি কেবল শ্রেণিকক্ষের মানুষ?

বিদ্যালয়ের দরজা দিয়ে ঢোকার পর তিনি শিক্ষক—এটি সত্য। কিন্তু বিদ্যালয়ের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসার পর তিনি কি মানুষ নন?

একজন শিক্ষকেরও পরিবার আছে, বন্ধুত্ব আছে, পছন্দ-অপছন্দ আছে, সংস্কৃতিচর্চা আছে, আনন্দ আছে, ক্লান্তি আছে। তিনি গান শুনতে পারেন, ভ্রমণে যেতে পারেন, ছবি তুলতে পারেন, সাজতে পারেন, হাসতে পারেন। এসবের কোনোটিই তাঁকে কম দায়িত্বশীল শিক্ষক বানায় না।

বরং বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে শেখাতে হলে শুধু পাঠ্যবইয়ের তথ্য জানলেই হয় না। গান, অভিনয়, গল্প, আবৃত্তি, নৃত্য ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড শিশুর কল্পনাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক বোধ গড়ে তোলে।

আমরা যখন একজন শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গান গাইতে বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দেখি, তখন সেটিকে শিক্ষার অংশ হিসেবে স্বাগত জানাই। কিন্তু একই শিক্ষক বিদ্যালয়ের বাইরে নিজের ব্যক্তিগত পরিসরে একটি গান বা নাচের ভিডিও প্রকাশ করলে তাঁর চরিত্র বা পেশাগত মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করি।

এই দ্বৈত মানসিকতা কেন?

একজন শিক্ষক যদি সংস্কৃতির মূল্য বোঝেন, সৃজনশীলতার চর্চা করেন এবং জীবনে আনন্দের জায়গা রাখেন, তাহলে তিনি শিক্ষার্থীদেরও আরও মানবিক, আত্মবিশ্বাসী ও মুক্তচিন্তার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন। একজন আনন্দহীন মানুষই যে ভালো শিক্ষক হবেন—এমন কোনো প্রমাণ নেই।

এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সামাজিক বিচার অনেক সময় আরও কঠোর হয়ে ওঠে।

একজন পুরুষ শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান করলে বা আনন্দের ভিডিও প্রকাশ করলে সেটিকে অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে দেখা হয়। কিন্তু একজন নারী শিক্ষক একই কাজ করলে তাঁর পোশাক, চুল, হাঁটা, হাসি কিংবা শরীরী ভাষা নিয়ে শুরু হয় নৈতিকতার আলোচনা।

নারীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সমাজের এই অতিরিক্ত আগ্রহ নতুন নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু সেই প্রবণতাকে আরও দ্রুত, আরও প্রকাশ্য এবং আরও নিষ্ঠুর করে তুলেছে।

একটি ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর শুরু হয় মন্তব্য, কটাক্ষ, চরিত্রহনন, এমনকি চাকরি হারানোর দাবি। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি পোস্ট কখনোই পুরো সমাজের মতামতকে প্রতিনিধিত্ব করে না।

কোনো সংবাদে যদি বলা হয়, ‘অভিভাবকদের ক্ষোভ’, ‘জনগণের দাবি’ বা ‘সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ’, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—সত্যিই কি সংশ্লিষ্ট অভিভাবকেরা অভিযোগ করেছেন? লিখিত কোনো অভিযোগ আছে কি? অভিযোগের প্রকৃতি কী? নাকি কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট ধীরে ধীরে ‘জনমত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে?

সমালোচনার অধিকার সবার আছে। কেউ মনে করতেই পারেন, কোনো নির্দিষ্ট আচরণ একজন শিক্ষকের পেশাগত ভূমিকার সঙ্গে মানানসই নয়। সেই মত প্রকাশের অধিকারও তাঁর আছে। কিন্তু মতের সঙ্গে ব্যক্তিগত অপমান, চরিত্রহনন বা ধর্মীয় বিদ্বেষ যুক্ত হলে তা আর সুস্থ সমালোচনা থাকে না।

বিউটি রাণী পাল হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন নারী। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে কোনো বৈষম্য বা বিদ্বেষ হয়েছে কি না, সেটি প্রমাণ ও তদন্তের বিষয়। প্রমাণ ছাড়া কাউকে ধর্মীয় বিদ্বেষের জন্য অভিযুক্ত করা যেমন অনুচিত, তেমনি কারও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তিনি সামাজিক বা পেশাগত চাপের মুখে পড়ছেন কি না, সেটিও উপেক্ষা করা যায় না।

একই সঙ্গে প্রতিবাদের ভাষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যারা একজন নারী শিক্ষককে অপমান করেছেন, তাঁদের সমালোচনা করতে গিয়ে যদি পাল্টা কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠীকে একইভাবে অপমান করা হয়, তাহলে সমস্যার সমাধান হয় না। এক ধরনের অসহিষ্ণুতার জবাব আরেক ধরনের অসহিষ্ণুতা দিয়ে দেওয়া যায় না।

প্রতিবাদ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রতিবাদ যেন আরেকটি নিপীড়নের ভাষা না হয়ে ওঠে।

‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানে শিক্ষিকাদের এই সম্মিলিত ভিডিও প্রকাশের ঘটনা তাই শুধু একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রবণতা নয়। এর মধ্যে এক ধরনের সামাজিক বার্তাও আছে। একজনকে হেনস্তা করার চেষ্টা যখন হাজারো মানুষকে একই প্রতীকের অধীনে দাঁড় করিয়ে দেয়, তখন সেটি নিছক বিনোদন থাকে না; তা প্রতিবাদের রূপ নেয়।

তবে এই প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এখানেই যে, বহু শিক্ষক ও শিক্ষিকা নিজেদের স্বাভাবিক প্রকাশের জায়গাটি নতুন করে দাবি করেছেন।

লায়লা নূর পিংকির কথায়, ‘যেসব শিক্ষকেরা কোনো দিন লজ্জায় ভিডিও দিতেন না, তাদের প্রতিভাও বিকশিত করে দিলেন।’ কথাটির মধ্যে রসিকতা আছে, কিন্তু সামাজিক বাস্তবতাও আছে। আমরা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছি, যেখানে অনেক মানুষ স্বাভাবিকভাবে আনন্দ প্রকাশ করার আগেও ভাবেন—কেউ কি তাঁকে বিচার করবে?

এটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়।

একজন শিক্ষককে তাঁর পেশাগত কাজের জন্য মূল্যায়ন করা উচিত। তিনি শ্রেণিকক্ষে কেমন পড়ান, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন, দায়িত্ব কতটা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন, বিদ্যালয়ে তাঁর অবদান কী—এসব হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড।

একটি ভিডিও দিয়ে একজন মানুষের সমগ্র পরিচয় নির্ধারণ করা ন্যায়সংগত নয়।

আরও বড় কথা, শিক্ষকদের ব্যক্তিগত মুহূর্তকে সামাজিক নজরদারির বস্তুতে পরিণত করা হলে শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে পড়ে যায়। শিক্ষক সংকট, শিক্ষার মান, অবকাঠামোর ঘাটতি, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, নিরাপদ শিক্ষাপরিবেশ ও মানসিক স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা করার বদলে আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি—কে কী পোশাক পরলেন, কীভাবে হাঁটলেন, কোন গানের সঙ্গে ভিডিও করলেন।

এটি কেবল একজন শিক্ষক বা একটি ভিডিওর সমস্যা নয়। এটি আমাদের সামাজিক অগ্রাধিকারেরও প্রশ্ন।

আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের বাইরে নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রকাশ করতে ভয় পাবেন?

আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে নারীর হাসি, পোশাক, চুল, সাজসজ্জা কিংবা আনন্দের মুহূর্তও জনসমক্ষে নৈতিক বিচারের বিষয় হয়ে উঠবে?

যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।

একজন শিক্ষককে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে। কিন্তু দায়িত্বশীলতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা পরস্পরের বিরোধী নয়। পেশাগত দায়িত্বের জন্য একজন শিক্ষককে জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের জন্য তাঁকে সমাজের অনুমতি নিতে হবে—এমন কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারণা থাকতে পারে না।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন সবার আছে, তেমনি অন্যের মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্বও সবার।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই ভারসাম্য: স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু দায়িত্বও থাকবে; সমালোচনা থাকবে, কিন্তু অপমান নয়; মতভেদ থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ নয়।

বিউটি রাণী পালকে ঘিরে বিতর্কের শেষ কথা তাই কোনো পক্ষের জয় বা পরাজয় নয়। মূল প্রশ্নটি আরও বড়।

একজন শিক্ষক কি শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি একজন মানুষও থাকতে পারবেন?

উত্তরটি হওয়া উচিত—অবশ্যই।

শিক্ষকেরও হাসার অধিকার আছে। আনন্দ করার অধিকার আছে। গান শোনার অধিকার আছে। সংস্কৃতিচর্চার অধিকার আছে। নিজের ব্যক্তিগত পরিসরে বাঁচার অধিকার আছে।

একজন শিক্ষককে তাঁর কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও দিয়ে নয়, তাঁর দীর্ঘদিনের কাজ দিয়ে মূল্যায়ন করা হোক।

একজন নারীকে তাঁর পোশাক, হাসি, চুল বা আনন্দের মুহূর্তের জন্য সামাজিক বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আগে আমরা অন্তত একবার নিজেদের দিকে তাকাই।

কারণ শিক্ষকরা রোবট নন।

নারীরাও নন।

তাঁরা মানুষ।

আর একটি মানবিক সমাজের প্রথম শর্তই হলো—মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা।


মতামত এর আরও খবর