img

আমার সাংবাদিকতা শ্রীমঙ্গল থেকে নিউইয়র্ক

প্রকাশিত :  ১৯:১৭, ০১ এপ্রিল ২০২৬

আমার সাংবাদিকতা শ্রীমঙ্গল থেকে নিউইয়র্ক

শেখ শফিকুর রহমান

আমি সাংবাদিকতা শুরু করেছিলাম মফস্বল থেকে সেই ৯০ এর দশকে ঢাকা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় গেদুচাচার  সাপ্তাহিক সুগন্ধা পত্রিকায় সংবাদ  লেখার মধ্য দিয়ে। প্রথম সংবাদ ছিল মিনতির আতংক স্তম্ভিত দেবী দূর্গা।সাপ্তাহিক সুগন্ধা পত্রিকার শেষ পাতায় এক কলামে ছাপা হয়েছিল। শ্রীমঙ্গলের ইত্যাদি ফটোকপি দোকান থেকে পত্রিকাটি কিনে নিয়ে এসেছিলাম। আমার বাড়ি শ্রীমঙ্গল উপজেলার  সাতগাঁও বাজারে এসে অনেককে সংবাদটি দেখালাম। সেই সময়ে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে ডাকে নিউজ পাঠাতাম। ডাক আর ফ্যাক্স ছাড়া অন্য কোন মাধ্যম ছিলনা।আর এখন তো নিমিষেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে ইমেইল করে পাঠিয়ে দেওয়া যায়।তখন একটি সংবাদ পাঠিয়ে বেশ কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হতো সংবাদ পত্রিকায় ছাপা হওয়ার জন্য।  তখন শ্রীমঙ্গল উপজেলায় এত বেশী  সাংবাদিক ছিলেন না। হাতে গুনা কয়েক জন সাংবাদিকতায় জড়িত ছিলেন। শ্রীমঙ্গলের স্থানীয় পত্রিকা ছিল সাপ্তাহিক শ্রীমঙ্গলের চিঠি, সাপ্তাহিক শ্রীবানী,সাপ্তাহিক পুবালীবার্তা।   আমি মুলত সাংবাদিকতায় অনুপ্রাণিত হয়েছি আমার বাবার চাচাতো ভাই চাচা মোঃ আকবর আলীর মাধ্যমে তিনি তখন ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সংবাদচিত্র পত্রিকায় নিউজ পাঠাতেন। তার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে আমিও সংবাদ লিখে তা ডাক মারফত সাতগাঁও পোস্ট অফিসে গিয়ে পোস্ট করে দিতাম। পরবর্তীতে কাজ করি দৈনিক নওরোজ পত্রিকা,সাপ্তাহিক ছন্দালোক, সাপ্তাহিক বঙ্গবিচিত্রা, সাপ্তাহিক বর্তমান দিনকাল,শ্রীমঙ্গল থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক শ্রীভূমি, মৌলভীবাজারের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক পাতাকুঁড়ির দেশ পত্রিকায়। একবার ঢাকার সাপ্তাহিক ছন্দালোক পত্রিকায় ফিচার লিখেছিলাম শিরোনাম ছিল শ্রীমঙ্গলে রাউন্ড চোরাচালান সংবাদটি তখন রঙ্গিন পাতার কভারে শিরোনাম করেছিল পত্রিকা কতৃপক্ষ পাশাপাশি কভারে ছিল বাংলাদেশের পপ সম্রাট আজম খানের সাক্ষাৎকার। ১৯৯৭ সালে  মৌলভীবাজারের সাপ্তাহিক পাতাকুঁড়ির দেশ পত্রিকায় আমার এক‌টি সংবাদের সুত্র ধরে ভুনবীর ইউনিয়নের সেই সময়ের এক মেম্বারের বিরুদ্ধে ভুনবীর ইউনিয়ন অফিসে শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ভুনবীর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, মেম্বার ও এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে তদন্ত করে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে সৌদি আরবের জেদ্দা চলে যাই এবং সেখানে গিয়েও নিজেকে অনলাইন পত্রিকায় সাংবাদিকতায় নিয়োজিত করি। জেদ্দা বসবাসের সময়ে প্রথমে সিলেটের অনলাইন বিডিনিউজ, হবিগঞ্জের জনপ্রিয় অনলাইন বজ্রকণ্ঠ,নবীগঞ্জের ইউরোবাংলা,লন্ডনের অনলাইন সময়ের যাত্রী ইত্যাদি অনলাইনে অসংখ্য সংবাদ ও সমসাময়িক বিষয়ে কলাম লিখেছি। জেদ্দায় অবস্থান কালে আমার সাংবাদিক জীবনে সবচেয়ে  আলোচিত সংবাদ ছিল। মক্কায় ২০১৫ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর  দূর্ঘটনায় পতিত  হাজীদের নিহতের খবর সর্বপ্রথম বেকিং নিউজ করি ফেইসবুকে ও পরে বাংলাদেশের বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকায়। এই বিষয়ে সপ্তাহব্যাপী জুড়ে ধারাবাহিক ভাবে বিস্তারিত খবরাখবর বিভিন্ন অনলাইনে প্রেরণ করি।সেই দুর্ঘটনায় ৭১৭ জন হাজী নিহত ও ৮৬০ জন হাজী  আহত হয়েছিলেন।পরবর্তীতে বাংলাদেশে ফিরে আসি এবং কিছুদিন বসাবাস করি সেইসাথে আবারও হবিগঞ্জের জনপ্রিয়  অনলাইন  বজ্রকণ্ঠ পত্রিকায় জড়িত হয়ে লেখালেখি চালিয়ে যাই। আবারও স্থায়ী বসবাসের জন্য ইমিগ্যান্ট হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে চলে আসি এবং ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টারে বসবাস করছি।আবারও নিউইয়র্কের কঠিন জীবন যাপনের ভিতরে সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়ি।অনলাইন পত্রিকা ইউএসবাংলা টুয়েন্টিফোরে সাংবাদিকতা দিয়ে শুরু করে এখন নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস থেকে প্রকাশিত শ্রদ্ধেয় ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন ভাইয়ের সম্পাদনায় জনপ্রিয় প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সাথে জড়িত হয়ে লেখালেখি করে যাচ্ছি নিয়মিতভাবে।যদিও আমি স্বশরীর অনেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারি না কাজের চাপে তথাপি ও নিয়মিত সংবাদ লেখার চেষ্টা করছি।ইতোমধ্যে নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সদস্য হয়েছি।আর এটাই আমার দীর্ঘ সাংবাদিকতার জীবনে কোন প্রেসক্লাবের আনুষ্ঠানিকভাবে জড়ানো।এই জন্য আমাদের প্রেসক্লাবের সভাপতি মনোয়ারুল ইসলাম ভাই ও সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ ইলিয়াস খসরু ভাই কে অবশ্যই ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে হয়।সাংবাদিকতা একটি মহৎ পেশা এই পেশায় মানুষের কল্যাণে কাজ করার সুযোগ অনেক বেশী। এই মাধ্যমে  টাকা পয়সা অর্জনের খুব বেশী সুযোগ না হলেও সমাজে সুনাম অর্জনের সীমাহীন সুযোগ। আবার এখানে সুষ্ঠু  সাংবাদিকতা ও অপসাংবাদিকতা দুইই আছে। যারা সুষ্ঠু সাংবাদিকতায় নিয়োজিত তারাই কেবল খ্যাতি অর্জন করে গেছেন। আমাকে এখন পর্যন্ত কোন কালিমার ছোঁয়া স্পর্শ করতে পারেনি এটাই মনে করি আমার এই পর্যন্ত বিরাট সফলতা। আমি এই বিশাল সফলতা কে আমার ভবিষ্যৎ জীবনে ধরে রেখে দেশ ও জাতির কল্যাণে আমৃত্যু লিখে যেতে চাই সফলতার সাথে।

শেখ শফিকুর রহমান: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা, ব্রঙ্কস, নিউইয়র্ক।
img

বৈশাখে পান্তা-ইলিশ যেভাবে এলো

প্রকাশিত :  ১৪:৫৬, ২১ এপ্রিল ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৫:০১, ২১ এপ্রিল ২০২৬

আবদুল হামিদ মাহবুব

বাংলা নববর্ষের (পহেলা বৈশাখ) প্রথম দিনে সকল বাঙালির ঘরেই যার যার সাধ্যমত ভালো-মন্দ খাওয়ার একটা রেওয়াজ চালু ছিল। কিন্তু সেই রেওয়াজ পান্তা-ইলিশে গড়ালো কিভাবে? প্রশ্নটা অনেকের মাথায় আসে। কিন্তু ঘটনা ক্রমে আমি ‘আবদুল হামিদ মাহবুব’ সেই কাহিনী কিছুটা জানি।

পান্তা-ইলিশের প্রচলনটা শুরু হয়েছে, ঢাকার বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। আমি তখন পত্রিকার কাজে ঢাকায় ছিলাম। মাসটা ছিল এপ্রিল। সম্ভবত ১৯৮২ অথবা ১৯৮৩ সাল। দৈনিক দেশ-এ আমি কাজ করতাম ‘মৌলভীবাজারের নিজস্ব সংবাদদাতা’ হিসেবে। আমার সাথে সখ্যতা ছিল দৈনিক দেশ-এর মফস্বলের দায়িত্বে থাকা আবু সাঈদ জুবেরীর। মফস্বলে আরেকজন কাজ করতেন। উনার নামের সাথে নজরুল ছিল। এতো বছর পর উনার পুরো নামটা ভুলে গেছি। সম্ভবত: সানাউল্লাহ নূরী ছিলেন পত্রিকার সম্পাদক। বার্তা সম্পাদক বোরহান আহমেদ। সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন কবি হেলাল হাফিজ।

পত্রিকার মালিক ছিলেন এরশাদের মন্ত্রী মাইদুল ইসলাম। বোরহান আহমদ, হেলাল হাফিজ ও রোজী ফেরদৌসী একটা রুমে বসতেন। রোজী ফেরদৌসী পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করতেন। সম্ভবত শিশু পাতাটাও তিনি দেখতে। আমার অনেক ছড়া শিশু পাতায় ছাপা হয়েছে।

এই তিনজন বসতেন সেই সেগুনবাগিচার বাসার মতো বানানো পুরনো বিল্ডিংয়ে ঢোকার হাতের বাম পাশের প্রথম রুমটায়। সেগুনবাগিচার সেই ভবন ও ভূমি ছিল  সরকারের পরিত্যক্ত সম্পত্তি। কাঠের সিঁড়ি ভেঙ্গে দোতালায় উঠতে হতো। ওখানে একটি রুমে সম্পাদক বসতেন। সাপ্তাহিক বিপ্লব নামে একটি ম্যাগাজিন বের হতো। ওইটার সম্পাদক ছিলেন কবি সিকদার আমিনুল হক। তিনিও দোতলার একটি রুমে বসতেন। ক্ষমতার জোরে মাইদুল ইসলাম সে বাড়ি ও ভূমি দখল করে রেখেছিলেন। ‘দৈনিক দেশ’ প্রকাশনা বন্ধ হওয়ার বেশ পরে সেই সম্পত্তিতেই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কার্যক্রম শুরু হয়েছিলো। জাদুঘর দেখতে আমি কয়েকবার ওখানে গিয়েছি।

তো যে কথা বলছিলাম, সম্ভবত হেলাল হাফিজের সাথে কথা বলতেই আমি বোরহান আহমেদের ওই রুমে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম বোরহান ভাই কথা বলছেন রোজী ফেরদৌসীর সাথে। বিষয় সামনে পহেলা বৈশাখ। সেই বৈশাখের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রমনা পার্কের অনুষ্ঠান স্থলের বটতলে হাজার হাজার মানুষ সমাগম হয়। বোরহান আহমেদ প্রস্তাব করলেন ওখানে একটি পান্তা ভাতের দোকান দিলে ভালো ব্যবসা হবে। বিষয়টি লুফে নিলেন রোজী ফেরদৌসী। জিন্সের টাইট প্যান্ট পরা গায়েও জিন্সের শার্ট কবি হেলাল হাফিজ সবসময়ই একটু গম্ভীর থাকতেন। খুব একটা কথা বলতেন না। তার টান থাকতো প্রেসক্লাবের প্রতি। তিনি হাতের কাজ সেরেই কিভাবে প্রেসক্লাবে চলে যাবেন সেই চিন্তায় যেনো একটা ঘোরের মধ্যে থাকতেন। প্রেসক্লাবর প্রতি টান থাকার কারণ, ওখানে গিয়ে তিনি জুয়া খেলতেন। কিন্তু তিনিও ওই আলোচনায় ঢুকে গেলেন। তিনি বললেন পান্তা ভাতের সাথে ইলিশ ভাজি রাখলে আরো ভালো হবে। একজন হাবাগোবা মফস্বলের মানুষ হিসেবে তাদের সকল কথা শুনেই গেছি।  হেলাল হাফিজের টেবিলের সামনে একটিভ চেয়ারে বসে থেকে তাদের পরিকল্পনাগুলো শুনছিলাম, আর শুনছিলাম। পেয়াজ, কাঁচা মরিচ, ভর্তা আরো কি কি তারা বলছিলেন!

কথা বাড়তে বাড়তে এক সময় সিদ্ধান্ত হয়ে গেলো।  পান্তাভাতের একটি দোকান দেওয়াই হবে। সাথে থাকবে ইলিশ ভাজা। পান্তাভাত বানানোর দায়িত্ব পড়লো রোজী ফেরদৌসীর উপর। ইলিশ কেনার দায়িত্ব নিলেন বোরহান আহমেদ। সেই ঘটনার সাক্ষী থেকে গেলাম আমি, মফস্বলের একজন সাংবাদিক। শেষ পর্যন্ত রোজী ফেরদৌসী এই কর্মের সাথে যুক্ত ছিলেন কিনা আমি বলতে পারব না।

আমি এই পর্যন্ত তাদের কথাবার্তা শুনে ওখান থেকে চলে এসেছিলাম। মফস্বল বিভাগে এসে জুবেরী ভাইয়ের সাথে টুকটাক কথা সেরে চলে আসলাম। সেই বৈশাখে পান্তা স্টলের ছবিসহ রিপোর্টও এক দুটি পত্রিকায় বেরিয়েছিলো।

নোট: পুরোটাই স্মৃতি থেকে লিখেছি। একটু এদিক-সেদিক হতে পারে। তবে নিশ্চিত করছি, কাহিনী ঠিক আছে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব। সাংবাদিকতা বিষয়ক প্রকাশিত গ্রন্থ: ‘গণমাধ্যম সাংবাদিকতা দেশ দশের আমার কথা’।


আবদুল হামিদ মাহবুব: ‘কমলকুঞ্জ’. মৌলভীবাজার-৩২০০ ।
মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪

মতামত এর আরও খবর