img

অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জের মুখে স্টারমারের নেতৃত্ব

প্রকাশিত :  ০৯:৫১, ১০ মে ২০২৬

অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জের মুখে স্টারমারের নেতৃত্ব

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারকে ঘিরে লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ সংকট আরো গভীর হয়েছে। সম্প্রতি স্থানীয় নির্বাচনে ভরাডুবির পর এবার তার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জের হুমকি দিয়েছেন লেবার এমপি ক্যাথরিন ওয়েস্ট। 

এমপি ক্যাথরিন সতর্ক করে বলেছেন, আগামীকাল সোমবারের মধ্যে মন্ত্রিসভার সদস্যরা পদক্ষেপ না নিলে তিনি নিজেই স্টারমারের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ শুরু করবেন।

স্থানীয় সময় শনিবার রাতে ওয়েস্টের এই অবস্থান ডাউনিং স্ট্রিটে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করে।

কারণ, লেবার পার্টির স্থানীয় নির্বাচনে বড় পরাজয়ের পর দলের ভেতরে স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে ক্ষোভ দ্রুত বাড়ছে।

ইতিমধ্যে অন্তত ৩৯ জন লেবার এমপি প্রকাশ্যে স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। এবারের স্থানীয় নির্বাচনে দলটি এক হাজার ৪৯২টি কাউন্সিল আসন হারিয়েছে। যা স্টারমারের নেতৃত্বের ওপর সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করেছে।

লেবারের এক মন্ত্রী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফকে বলেছেন, ক্যাথরিন ওয়েস্ট সম্ভবত নেতৃত্ব প্রতিযোগিতা শুরু করতে প্রয়োজনীয় ৮১ জন এমপির সমর্থন জোগাড় করতে পারবেন।

ওই মন্ত্রী বলেন, ‘দলীয় এমপি এবং ভোটাররা ক্ষুব্ধ। তারা চান স্টারমার দৃঢ় অবস্থান নিন।’

সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন।

বছরের শুরুতে স্টারমারের প্রতি তাদের যে সমর্থন ছিল, এখন তা অনেকটাই কমে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে স্টারমার আগামীকাল সোমবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সেখানে তিনি তার সরকারের নতুন দিকনির্দেশনা ও রাজনৈতিক পরিকল্পনা তুলে ধরবেন বলে জানা গেছে।

এর আগে গতকাল শনিবার তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন ও ব্যারোনেস হারম্যানকে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন।

স্টারমার স্বীকার করেছেন যে তার সরকারের প্রথম দুই বছরে জনগণের মধ্যে যথেষ্ট আশার সঞ্চার করা সম্ভব হয়নি।

আগামী দিনগুলোতে তিনি তার রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা স্পষ্ট করবেন বলে জানান।

ক্যাথরিন ওয়েস্টের এই পদক্ষেপকে ব্রিটিশ রাজনীতিতে ‘স্টকিং হর্স’ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ তুলনামূলক কম পরিচিত কোনো রাজনীতিক সামনে এসে বর্তমান নেতাকে দুর্বল করে দেন, যাতে পরবর্তী সময়ে আরো শক্তিশালী কোনো প্রার্থী নেতৃত্বের লড়াইয়ে নামতে পারেন।

ওয়েস্ট অবশ্য জানিয়েছেন, তিনি শুধু প্রতীকী প্রার্থী নন। নিউ স্টেটসম্যানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘অনেক সময় স্টকিং হর্সই শেষ পর্যন্ত মূল প্রার্থী হয়ে ওঠে।’

গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামের ঘনিষ্ঠরা ওয়েস্টকে তার পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বোঝানোর চেষ্টা করছেন। কারণ বার্নহাম বর্তমানে পার্লামেন্ট সদস্য নন এবং তাই এখনই নেতৃত্বের লড়াইয়ে অংশ নিতে পারবেন না। তবে ওয়েস্ট জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এতটাই জরুরি যে অপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

লেবারের মধ্যপন্থী অংশের এক এমপি ওয়েস্টকে ‘নায়ক’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘আশা করছি এর মাধ্যমে মন্ত্রিসভা সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে এবং প্রধানমন্ত্রীকে জানাবে যে সময় শেষ হয়ে এসেছে।’

অন্যদিকে দলের কিছু নেতা ওয়েস্টের উদ্যোগকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলেও মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, স্টারমারকে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত।

ওয়েস্ট জানিয়েছেন, ডাউনিং স্ট্রিট তাকে মঙ্গলবার পর্যন্ত অপেক্ষা করার অনুরোধ জানিয়েছিল, যাতে স্টারমারের ভাষণ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কিন্তু তিনি সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন।

তিনি বিবিসি রেডিওকে বলেন, ‘মন্ত্রিসভা নিজের মধ্য থেকেই নতুন নেতৃত্ব ঠিক করুক এবং কিয়ার স্টারমারকে অন্য কোনো দায়িত্ব দেওয়া হোক।’

স্টারমারের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠেছে, কারণ ১০০ জনের বেশি লেবার কাউন্সিলর ও প্রার্থী একটি খোলা চিঠিতে তার ‘সুশৃঙ্খল পদত্যাগের’ সময়সূচি ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে সম্ভাব্য নেতৃত্বপ্রত্যাশীদের মধ্যে ওয়েস স্ট্রিটিং ও অ্যাঞ্জেলা রেইনারের নাম জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। তারা দুজনই বর্তমান এমপি হওয়ায় নেতৃত্ব প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।

তবে স্টারমার এখনো পদত্যাগের কোনো ইঙ্গিত দেননি। তিনি বলেছেন, নির্বাচনের ফল ‘খুব কঠিন’ হলেও তিনি দায়িত্ব ছাড়বেন না। বরং সোমবারের ভাষণের মাধ্যমে তিনি নতুন আশার বার্তা দিতে চান।

বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় নির্বাচনের ভরাডুবির পর লেবার পার্টি এখন বড় ধরনের নেতৃত্বসংকটে পড়েছে। আগামী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহই নির্ধারণ করবে, কিয়ার স্টারমার পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন নাকি দল তাকে সরিয়ে নতুন নেতৃত্বের পথে হাঁটবে।

ইংলিশ চ্যানেলে নৌকা ডুবে শিশুসহ নিহত ৫ | JANOMOT | জনমত

img

স্টারমারকে ঘিরে বাড়ছে জল্পনা, ব্রিটেন কি ফের রাজনৈতিক পালাবদলের দ্বারপ্রান্তে?

প্রকাশিত :  ১৭:৩৮, ২৪ জুন ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত
এক সময় বিশ্বের কাছে সংসদীয় গণতন্ত্রের আদর্শ ছিল ব্রিটেন। ওয়েস্টমিনস্টারের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দীর্ঘমেয়াদি নীতি এবং স্থিতিশীল নেতৃত্বকে অনুসরণ করেছে অসংখ্য দেশ। কিন্তু গত এক দশকের ব্রিটেন যেন সেই পরিচিত ছবির সম্পূর্ণ বিপরীত এক বাস্তবতার মুখোমুখি।

প্রধানমন্ত্রী বদল এখন আর বিরল ঘটনা নয়, বরং প্রায় নিয়মিত রাজনৈতিক অধ্যায়। ডেভিড ক্যামেরন থেকে থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক হয়ে আজ কিয়ার স্টারমার—নেতৃত্বের এই দ্রুত পালাবদল ব্রিটিশ রাজনীতির গভীরে জমে থাকা অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে আবারও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব কি চাপের মুখে? লেবার পার্টি-র অন্দরমহলে কি নতুন নেতৃত্বের আলোচনা শুরু হয়েছে? যদিও দলীয় নেতৃত্ব এ ধরনের জল্পনাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ, তবুও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, অর্থনৈতিক বাস্তবতা যদি দ্রুত না বদলায়, তাহলে স্টারমারের জন্য পথ সহজ হবে না।

আসলে ব্রিটেনের বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনীতি। ব্রেক্সিটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, কোভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের ধাক্কা, ইউক্রেন যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকট এবং দীর্ঘ সময়ের উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনে বড় চাপ তৈরি করেছে। বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল, খাদ্যদ্রব্যের দাম থেকে শুরু করে দৈনন্দিন যাতায়াতের খরচ—সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে। ফলে ‘জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট’ এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক সংকটেও পরিণত হয়েছে।

অর্থনীতির পাশাপাশি অভিবাসন প্রশ্নও ব্রিটিশ রাজনীতির অন্যতম বিস্ফোরক ইস্যু হয়ে উঠেছে। ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশ, আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মেরুকরণও তীব্র হচ্ছে।

এই আবহেই নতুন করে আলোচনায় উঠে আসছে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের প্রভাবশালী নেতা অ্যান্ডি বার্নহামের নাম। যদিও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নেতৃত্বের দৌড়ে নেই, তবুও লেবার পার্টি-র ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনায় তাঁর উপস্থিতি ক্রমশ দৃশ্যমান। স্বাস্থ্যসেবা, আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে তাঁর অবস্থান তাঁকে দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুখে পরিণত করেছে।

অন্যদিকে, ব্রিটিশ রাজনীতির প্রচলিত সমীকরণকে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন নাইজেল ফারাজ। তাঁর নেতৃত্বে রিফর্ম ইউকে অভিবাসন, জাতীয় পরিচয় এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের প্রতি অসন্তোষকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। এক সময় যে ক্ষোভ মূলত কনজারভেটিভ পার্টি-র ভোটব্যাঙ্কে সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ছে।

ফলে আজ লেবার পার্টি এবং কনজারভেটিভ পার্টি—দুই প্রধান দলই এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। ভোটারদের একটি অংশ গ্রীন পার্টি, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস কিংবা রিফর্ম ইউকে-এর মতো বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকছে। ঐতিহ্যগত দুই-দলীয় রাজনীতির ভিত্তি আগের তুলনায় অনেকটাই নড়বড়ে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

তবে এই মুহূর্তে একটি বিষয় স্পষ্ট—ব্রিটেনের সংকট কেবল কোনও এক নেতা বা এক দলের সংকট নয়। এটি অর্থনৈতিক স্থবিরতা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অভিবাসন বিতর্ক, রাজনৈতিক বিভাজন এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার প্রতি ক্রমবর্ধমান অনাস্থার সম্মিলিত ফল।

সেই কারণেই কিয়ার স্টারমারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ককে শুধু ব্যক্তিগত নেতৃত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে একটি বড় সত্য—ব্রিটেন আজ নতুন রাজনৈতিক পরিচয় খুঁজছে। আর সেই সন্ধানের পথ কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তার উত্তর এখনও ওয়েস্টমিনস্টারের করিডরেও স্পষ্ট নয়।


যুক্তরাজ্য এর আরও খবর