img

গাজায় ইসরায়েলি নিষ্ঠুরতা ও ভারতের নীরবতা: সোনিয়া গান্ধী

প্রকাশিত :  ০৬:৫১, ০১ জুলাই ২০২৬

গাজায় ইসরায়েলি নিষ্ঠুরতা ও ভারতের নীরবতা: সোনিয়া গান্ধী

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন অভিযোগ করেছিল, গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। ২০২৬ সালের জুনে একই কমিশন, যার নেতৃত্বে বর্তমানে ভারতের সাবেক বিচারপতি এস মুরলীধর রয়েছেন, আবারও দাবি করেছে যে গাজার শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার চেষ্টা করছে ইসরায়েল।

৯৪ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনটি পড়া সত্যিই এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। ইসরায়েল গাজায় যে চরম ধ্বংসযজ্ঞ ও পরিকল্পিত গণহত্যা চালাচ্ছে, তার রোমহর্ষ বিবরণ রয়েছে এতে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত ২০ হাজার শিশু নিহত এবং আরও ৪৪ হাজার শিশু আহত হয়েছে, যাদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছে। শিশুদের ওপর এই হামলা কোনো দুর্ঘটনাবশত ঘটনা নয়, এটি একটি পরিকল্পিত কৌশল। হতাহত ব্যক্তিদের শতকরা ২৭ ভাগই শিশু। নিহত অনেক ছেলের মাথায় ও ঘাড়ে গুলির ক্ষত পাওয়া গেছে।

গাজার ৯৭ শতাংশ স্কুল ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। শিশু হাসপাতালসহ স্বাস্থ্য অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ায় গর্ভপাত এবং সন্তান প্রসবজনিত জটিলতা ৩০০ শতাংশ বেড়েছে।

হামাস কর্তৃক ইসরায়েলের ওপর চালানো হামলার পর আড়াই বছর পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাল্টা জবাব ছিল চরম নিষ্ঠুর ও বর্বরতায় ভরা। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু থেকে শুরু করে তাঁর মন্ত্রিসভার শীর্ষ সদস্যরা গাজাকে ‘সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ’ ও ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করার ডাক দিয়েছেন। তাঁরা ফিলিস্তিনিদের ‘পশু’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন যে তাদের ‘বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই’। এমনকি গাজা থেকে ‘লাখ লাখ মানুষের পালিয়ে যাওয়াকেই’ তাঁরা নিজেদের সাফল্য হিসেবে দেখছেন।

এমন স্পষ্ট গণহত্যামূলক অভিপ্রায় থাকা সত্ত্বেও, ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অকুণ্ঠ সমর্থন ইসরায়েলকে এই নিষ্ঠুর অভিযান চালিয়ে যেতে সাহায্য করছে। তবে বিশ্বের বাকি দেশগুলোর বিবেক এবার জেগে উঠেছে।

আমেরিকার ভেটো ও বাধার কারণে জাতিসংঘ কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে না পারলেও, এর সংস্থাগুলো ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধের নথিপত্র তৈরিতে চমৎকার ভূমিকা পালন করেছে। পশ্চিমা ব্লকের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত শীর্ষ দেশগুলো—যেমন ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া—ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, অথচ কয়েক দশক ধরে তারা ফিলিস্তিন ইস্যুতে উদাসীন ছিল। 

দক্ষিণ আফ্রিকা, যার সঙ্গে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের সংহতির ইতিহাস রয়েছে, তারা ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের দায়ে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আদালতে দাঁড় করিয়েছে। ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ ইসরায়েলে অস্ত্র বিক্রি সীমিত করেছে এবং লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশ সম্পর্ক ছিন্ন বা সীমিত করেছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এমনকি ইসরায়েলি রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছেন। ভারতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এমন বহু দেশ গাজায় ইসরায়েলের এই কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।

মোদি সরকারের এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা শুধু নৈতিকভাবেই ভুল নয়, বরং ভারতের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের দিক থেকেও এর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই। আমরা এমন এক সময়ে ইসরায়েলের কৌশলগত বলয়ের দিকে আরও ঝুঁকে পড়ছি, যখন সারা বিশ্ব তাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান জনরোষ এবং গাজায় চালানো এই বর্বরতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের মাঝেও ভারত কেবলই নীরব। বিচারপতি মুরলীধরের এই প্রতিবেদন, যা বিশ্বজুড়ে গাজা গণহত্যার বিরুদ্ধে নতুন করে আলোচনা ও আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে, তা নিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকার সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। অবশ্য এটি মোটেও অবাক হওয়ার মতো বিষয় নয়। মনে রাখা দরকার, ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার আগে বিজেপির নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশ কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন বিচারপতি মুরলীধর। এর পরপরই তাঁকে দিল্লি হাইকোর্ট থেকে বদলি করা হয়েছিল।

ভারত ঐতিহাসিকভাবে উপনিবেশবাদ-বিরোধী সংহতি, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক শান্তির পক্ষে এক অনন্য কণ্ঠস্বর ছিল। কিন্তু আজ বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত নিয়মকানুনের লঙ্ঘন, গ্লোবাল সাউথের মানুষের কষ্ট এবং গাজা ও পশ্চিম তীরে মানবতাবোধের চরম অবমাননার পরও ভারতের এই নীরবতা সত্যিই এক ব্যতিক্রমী ও দুঃখজনক ঘটনা।

পাঁচ বছরের শিশু হিন্দ রজবের করুণ গল্পটি গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার এক নির্মম প্রতীক। গাজা শহর থেকে পরিবারের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাদের গাড়ি লক্ষ্য করে ইসরায়েলি বাহিনী ৩৩৫টি গুলি চালায়। এতে তার পরিবারের ছয় সদস্যই নিহত হন। উদ্ধারকারীদের আসার অপেক্ষায় হিন্দ ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ির ভেতরে স্বজনদের লাশের মাঝে আটকে ছিল। শেষ পর্যন্ত দুই উদ্ধারকর্মীসহ তাকেও হত্যা করা হয়।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের নাগরিকদের মতো ভারতের নাগরিকদেরও হিন্দ রজব এবং গাজার অসংখ্য শিশুর এই গল্প জানার অধিকার আছে। অথচ, ইসরায়েলের অনুভূতিতে যাতে আঘাত না লাগে, সে জন্য এই বিষয়ক একটি চলচ্চিত্র ভারতে মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়েছিল। অবশেষে জনগণের তীব্র চাপের মুখে তা প্রদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

মোদি সরকারের এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা শুধু নৈতিকভাবেই ভুল নয়, বরং ভারতের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের দিক থেকেও এর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই। আমরা এমন এক সময়ে ইসরায়েলের কৌশলগত বলয়ের দিকে আরও ঝুঁকে পড়ছি, যখন সারা বিশ্ব তাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

এই যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে এবং ইরানের ওপর ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে হত্যার মাত্র কয়েক দিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ইসরায়েল সফর ইতিহাসে একটি বিভ্রান্তিকর কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হবে। এর ফলে ফিলিস্তিন, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ঐতিহাসিক বন্ধুদের কাছ থেকে আমরা নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছি।

আমরা বিশ্বজনমত থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। আর এই সুযোগে পাকিস্তানের মতো একটি দেশ, যারা নিজেরা সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য পরিচিত, তারা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে এগিয়ে এসেছে—যে ভূমিকার দাবিদার ঐতিহাসিকভাবে সবার বন্ধু হিসেবে ভারতেরই হওয়ার কথা ছিল। নিজেদের নৈতিকতা ও কৌশলগত স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে আমরা কেবল প্রধানমন্ত্রী মোদি ও প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর মধ্যকার বন্ধুত্বটুকুই পেয়েছি। অথচ সেই নেতানিয়াহু আজ খোদ আমেরিকাসহ পুরো বিশ্বেই সমালোচিত।

ভারতের জাতীয়তাবোধের চেতনা দাবি করে যে আমরা যেন আমাদের ফিলিস্তিনি ভাইবোনদের পক্ষে কথা বলি, যাঁদের সন্তানদের এভাবে নির্মমভাবে টার্গেট করা হচ্ছে। দেশের জাতীয় স্বার্থের জন্যও ইসরায়েলি গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড এবং পশ্চিম তীরে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি পরিবারকে উচ্ছেদ করার বিরুদ্ধে যে বিশ্বজনমত তৈরি হয়েছে, ভারত যেন তার সঙ্গে সুর মেলায়। মোদি সরকারের এই অনড় নীরবতার কোনো যৌক্তিক বা নৈতিক ব্যাখ্যা নেই।

সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির চেয়ারপারসন
img

বদলে যাওয়া সাংবাদিকতা: আশির দশকের সংবাদ সংগ্রহ থেকে আজকের বাস্তবতা

প্রকাশিত :  ১৫:৪৩, ২১ আগষ্ট ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: আশির দশকের শেষ দিক। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের এক-দুই বছর আগের সময়। তখন শহর তো বটেই, গ্রামাঞ্চল এমনকি আরও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে তা সংবাদপত্রে পাঠানো ছিল একেবারেই ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা। আজকের মতো হাতের মুঠোয় মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, কম্পিউটার কিংবা মুহূর্তে সংবাদ পাঠানোর প্রযুক্তি তখন ছিল না। একজন সাংবাদিককে সংবাদ সংগ্রহ থেকে প্রকাশ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপই নিজের হাতে সম্পন্ন করতে হতো।

গ্রাম, শহর কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে খবর সংগ্রহ করে ফিরে এসে নিউজপ্রিন্টের কাগজে হাতে লিখে সংবাদ তৈরি করা হতো। এরপর তা ডাকযোগে পাঠানো ছিল সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি। মাঝেমধ্যে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেও সংবাদ পাঠানো হতো। তবে তখন কুরিয়ার খরচও কম ছিল না—প্রায় ১০ টাকা। সেই সময়ের হিসাবে এটিও ছিল যথেষ্ট ব্যয়বহুল। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডাকযোগেই সংবাদ পাঠানো হতো।

তবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংবাদ দ্রুত পাঠানোর প্রয়োজন হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে যেত। তখন মৌলভীবাজার শহরে গিয়ে টেলিগ্রামের মাধ্যমে সংবাদ পাঠাতে হতো। শ্রীমঙ্গল শহরেও টেলিফোনে যোগাযোগের একটি ব্যবস্থা ছিল। পাবলিক টেলিফোন ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনের সময় লাইন পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। দিনের পর দিন চেষ্টা করেও সংযোগ মিলত না। হঠাৎ কখনো এক-দুবার লাইন পাওয়া গেলে সেটিই ছিল সৌভাগ্যের ব্যাপার।

ফলে একজন সাংবাদিকের কাছে একটি সংবাদ প্রকাশের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া মানেই কাজ শেষ হয়ে যাওয়া ছিল না। খবর সংগ্রহ করতে হতো মাঠে গিয়ে, ফিরে এসে সেটি লিখতে হতো হাতে, তারপর ডাকঘর কিংবা কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠাতে হতো। জরুরি সংবাদ হলে আবার ছুটতে হতো মৌলভীবাজারে টেলিগ্রাম করতে।

ইংরেজি পত্রিকায় কাজের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা ছিল। সংবাদ ইংরেজিতে লিখে হাতে তৈরি করে ডাকযোগে কিংবা কুরিয়ারে পাঠানো হতো। সংবাদ লেখার জন্য কম্পিউটার তো দূরের কথা, তখন সবার কাছে টাইপরাইটারও ছিল না। তাই হাতে লেখা সংবাদই ছিল সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান অবলম্বন।

আজকের প্রজন্মের কাছে বিষয়টি হয়তো অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু সেই সময় সাংবাদিকতা ছিল মূলত শ্রম, ধৈর্য, মেধা এবং দায়িত্ববোধের পেশা। সংবাদ প্রকাশের প্রতিটি ধাপেই সময় ও পরিশ্রম দিতে হতো। একটি সংবাদ পাঠাতে যেখানে আজ কয়েক সেকেন্ডই যথেষ্ট, তখন সেখানে লেগে যেত ঘণ্টা, কখনো এক দিন বা তারও বেশি।

সাংবাদিকের সংখ্যাও তখনকার সময়ে তুলনামূলকভাবে কম ছিল। কিন্তু সংখ্যায় কম হলেও তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, প্রতিভাবান এবং প্রকৃত জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ। তাঁরা সাংবাদিকতাকে শুধু একটি পেশা হিসেবে দেখতেন না; সংবাদকে সত্য, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরাকে দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচনা করতেন।

সেই সময়ের সাংবাদিকদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন বিভিন্ন বড় রাজনৈতিক দলের নেতাও। এমনকি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকা অবস্থায় দু-তিনজন জনপ্রতিনিধি হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন।

শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক নেতা রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ১৯৮৩ সালে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতা কমলেশ ভট্টাচার্য দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শ্রীমঙ্গল পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি শুধু রাজনীতিবিদই ছিলেন না, সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বিপুল রঞ্জন চৌধুরীও শ্রীমঙ্গল পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনিও সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিকতা করার সময় তাঁদের মধ্যে দলীয় পক্ষপাতিত্ব দেখা যেত না। তাঁরা ছিলেন নিরপেক্ষ, আদর্শনিষ্ঠ ও বস্তুনিষ্ঠ। সংবাদ পরিবেশনে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা ছিল সর্বজনীন। রাজনৈতিকভাবে তাঁরা বিভিন্ন দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সাংবাদিক হিসেবে তাঁদের ভূমিকা নিয়ে কখনো কেউ প্রশ্ন তোলেনি।

এমনকি রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও তাঁদের মধ্যে ছিল পারস্পরিক রাজনৈতিক শিষ্টাচার। সাংবাদিকতা ও রাজনীতিকে তাঁরা এক করে ফেলেননি। সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয়কে সংবাদ পরিবেশনের ওপর প্রভাব ফেলতে দেননি

শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাব গঠনের ক্ষেত্রেও এই সাংবাদিকদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শুরু থেকেই যাঁরা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন, তাঁদের নেতৃত্বে ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রেসক্লাবের খাজনা নিজেরাই পরিশোধ করেছেন। প্রেসক্লাবের খাজনা তাঁরা কখনো বকেয়া রাখেননি।

এরশাদ সাহেবের আমলে একবার একজন মন্ত্রী প্রেসক্লাবের নামে কিছু অর্থ বরাদ্দ করেছিলেন। তবে তৎকালীন সময়ের বিবেচনায় সেই অর্থের পরিমাণ ছিল যৎসামান্য। প্রেসক্লাব পরিচালনা কিংবা এর দায়-দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সেই সামান্য সরকারি সহায়তার ওপর তাঁরা নির্ভরশীল ছিলেন না। নিজেদের সামর্থ্য ও দায়িত্ববোধ থেকেই তাঁরা প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রেখেছিলেন।

সেই সময়ের সাংবাদিকতা ছিল প্রযুক্তিবিহীন, কিন্তু দায়িত্ববোধে সমৃদ্ধ। যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা ছিল, সংবাদ পাঠানো ছিল কষ্টসাধ্য, তথ্য সংগ্রহে ছিল নানা ঝুঁকি ও প্রতিবন্ধকতা। তবু সাংবাদিকেরা সংবাদ সংগ্রহ করতেন, যাচাই করতেন, হাতে লিখতেন এবং নানা কষ্ট করে তা পত্রিকা অফিসে পৌঁছে দিতেন।

আজ প্রযুক্তি সাংবাদিকতার কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে ছবি, ভিডিও, সংবাদ কিংবা সরাসরি সম্প্রচার পাঠানো সম্ভব। তথ্যের প্রবাহ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত। কিন্তু প্রযুক্তির এই বিপুল সুবিধার সঙ্গে সাংবাদিকতার মান, দায়িত্ববোধ ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নটিও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আর বর্তমান সময়ের সাংবাদিকতার নানা চিত্রের কথা শুনলে অনেক সময় সত্যিই গা শিউরে ওঠে। সংবাদপেশার প্রতি মানুষের যে আস্থা একসময় ছিল, নানা কারণে সেই আস্থায় এখন ভাটা পড়েছে। সাংবাদিকতার সঙ্গে যখন ব্যক্তিস্বার্থ, রাজনৈতিক পক্ষপাত, বাণিজ্যিক চাপ কিংবা নানা অনিয়মের অভিযোগ জড়িয়ে পড়ে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন সাংবাদিকের বিশ্বাসযোগ্যতা নয়—পুরো পেশাটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এ কারণেই আজ মানুষের একটি বড় অংশ সাংবাদিকতার প্রতি আগের মতো আস্থা রাখতে পারছে না। অথচ সাংবাদিকতার মূল শক্তি প্রযুক্তি নয়, সংবাদমাধ্যমের ভবন নয়, কিংবা বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ও নয়। এর মূল শক্তি হলো বিশ্বাস।

আশির দশকের সেই সাংবাদিকদের হাতে ছিল না আধুনিক প্রযুক্তি, ছিল না দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ। ছিল শুধু কলম, কাগজ, তথ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সত্য প্রকাশের অঙ্গীকার। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাঁরা যে আস্থা তৈরি করেছিলেন, সেটিই ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড় অর্জন।

সময়ের সঙ্গে সাংবাদিকতার প্রযুক্তি বদলেছে, সংবাদ পাঠানোর পদ্ধতি বদলেছে, সংবাদমাধ্যমের কাঠামো বদলেছে। কিন্তু সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তটি বদলায়নি—সত্য, নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং মানুষের আস্থা।

সেই জায়গাটিতেই হয়তো আজকের সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।


মতামত এর আরও খবর