img

বদলে যাওয়া সাংবাদিকতা: আশির দশকের সংবাদ সংগ্রহ থেকে আজকের বাস্তবতা

প্রকাশিত :  ১৫:৪৩, ২১ আগষ্ট ২০২৬

বদলে যাওয়া সাংবাদিকতা: আশির দশকের সংবাদ সংগ্রহ থেকে আজকের বাস্তবতা

সংগ্রাম দত্ত: আশির দশকের শেষ দিক। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের এক-দুই বছর আগের সময়। তখন শহর তো বটেই, গ্রামাঞ্চল এমনকি আরও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে তা সংবাদপত্রে পাঠানো ছিল একেবারেই ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা। আজকের মতো হাতের মুঠোয় মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, কম্পিউটার কিংবা মুহূর্তে সংবাদ পাঠানোর প্রযুক্তি তখন ছিল না। একজন সাংবাদিককে সংবাদ সংগ্রহ থেকে প্রকাশ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপই নিজের হাতে সম্পন্ন করতে হতো।

গ্রাম, শহর কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে খবর সংগ্রহ করে ফিরে এসে নিউজপ্রিন্টের কাগজে হাতে লিখে সংবাদ তৈরি করা হতো। এরপর তা ডাকযোগে পাঠানো ছিল সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি। মাঝেমধ্যে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেও সংবাদ পাঠানো হতো। তবে তখন কুরিয়ার খরচও কম ছিল না—প্রায় ১০ টাকা। সেই সময়ের হিসাবে এটিও ছিল যথেষ্ট ব্যয়বহুল। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডাকযোগেই সংবাদ পাঠানো হতো।

তবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংবাদ দ্রুত পাঠানোর প্রয়োজন হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে যেত। তখন মৌলভীবাজার শহরে গিয়ে টেলিগ্রামের মাধ্যমে সংবাদ পাঠাতে হতো। শ্রীমঙ্গল শহরেও টেলিফোনে যোগাযোগের একটি ব্যবস্থা ছিল। পাবলিক টেলিফোন ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনের সময় লাইন পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। দিনের পর দিন চেষ্টা করেও সংযোগ মিলত না। হঠাৎ কখনো এক-দুবার লাইন পাওয়া গেলে সেটিই ছিল সৌভাগ্যের ব্যাপার।

ফলে একজন সাংবাদিকের কাছে একটি সংবাদ প্রকাশের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া মানেই কাজ শেষ হয়ে যাওয়া ছিল না। খবর সংগ্রহ করতে হতো মাঠে গিয়ে, ফিরে এসে সেটি লিখতে হতো হাতে, তারপর ডাকঘর কিংবা কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠাতে হতো। জরুরি সংবাদ হলে আবার ছুটতে হতো মৌলভীবাজারে টেলিগ্রাম করতে।

ইংরেজি পত্রিকায় কাজের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা ছিল। সংবাদ ইংরেজিতে লিখে হাতে তৈরি করে ডাকযোগে কিংবা কুরিয়ারে পাঠানো হতো। সংবাদ লেখার জন্য কম্পিউটার তো দূরের কথা, তখন সবার কাছে টাইপরাইটারও ছিল না। তাই হাতে লেখা সংবাদই ছিল সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান অবলম্বন।

আজকের প্রজন্মের কাছে বিষয়টি হয়তো অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু সেই সময় সাংবাদিকতা ছিল মূলত শ্রম, ধৈর্য, মেধা এবং দায়িত্ববোধের পেশা। সংবাদ প্রকাশের প্রতিটি ধাপেই সময় ও পরিশ্রম দিতে হতো। একটি সংবাদ পাঠাতে যেখানে আজ কয়েক সেকেন্ডই যথেষ্ট, তখন সেখানে লেগে যেত ঘণ্টা, কখনো এক দিন বা তারও বেশি।

সাংবাদিকের সংখ্যাও তখনকার সময়ে তুলনামূলকভাবে কম ছিল। কিন্তু সংখ্যায় কম হলেও তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, প্রতিভাবান এবং প্রকৃত জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ। তাঁরা সাংবাদিকতাকে শুধু একটি পেশা হিসেবে দেখতেন না; সংবাদকে সত্য, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরাকে দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচনা করতেন।

সেই সময়ের সাংবাদিকদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন বিভিন্ন বড় রাজনৈতিক দলের নেতাও। এমনকি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকা অবস্থায় দু-তিনজন জনপ্রতিনিধি হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন।

শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক নেতা রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ১৯৮৩ সালে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতা কমলেশ ভট্টাচার্য দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শ্রীমঙ্গল পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি শুধু রাজনীতিবিদই ছিলেন না, সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বিপুল রঞ্জন চৌধুরীও শ্রীমঙ্গল পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনিও সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিকতা করার সময় তাঁদের মধ্যে দলীয় পক্ষপাতিত্ব দেখা যেত না। তাঁরা ছিলেন নিরপেক্ষ, আদর্শনিষ্ঠ ও বস্তুনিষ্ঠ। সংবাদ পরিবেশনে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা ছিল সর্বজনীন। রাজনৈতিকভাবে তাঁরা বিভিন্ন দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সাংবাদিক হিসেবে তাঁদের ভূমিকা নিয়ে কখনো কেউ প্রশ্ন তোলেনি।

এমনকি রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও তাঁদের মধ্যে ছিল পারস্পরিক রাজনৈতিক শিষ্টাচার। সাংবাদিকতা ও রাজনীতিকে তাঁরা এক করে ফেলেননি। সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয়কে সংবাদ পরিবেশনের ওপর প্রভাব ফেলতে দেননি

শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাব গঠনের ক্ষেত্রেও এই সাংবাদিকদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শুরু থেকেই যাঁরা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন, তাঁদের নেতৃত্বে ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রেসক্লাবের খাজনা নিজেরাই পরিশোধ করেছেন। প্রেসক্লাবের খাজনা তাঁরা কখনো বকেয়া রাখেননি।

এরশাদ সাহেবের আমলে একবার একজন মন্ত্রী প্রেসক্লাবের নামে কিছু অর্থ বরাদ্দ করেছিলেন। তবে তৎকালীন সময়ের বিবেচনায় সেই অর্থের পরিমাণ ছিল যৎসামান্য। প্রেসক্লাব পরিচালনা কিংবা এর দায়-দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সেই সামান্য সরকারি সহায়তার ওপর তাঁরা নির্ভরশীল ছিলেন না। নিজেদের সামর্থ্য ও দায়িত্ববোধ থেকেই তাঁরা প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রেখেছিলেন।

সেই সময়ের সাংবাদিকতা ছিল প্রযুক্তিবিহীন, কিন্তু দায়িত্ববোধে সমৃদ্ধ। যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা ছিল, সংবাদ পাঠানো ছিল কষ্টসাধ্য, তথ্য সংগ্রহে ছিল নানা ঝুঁকি ও প্রতিবন্ধকতা। তবু সাংবাদিকেরা সংবাদ সংগ্রহ করতেন, যাচাই করতেন, হাতে লিখতেন এবং নানা কষ্ট করে তা পত্রিকা অফিসে পৌঁছে দিতেন।

আজ প্রযুক্তি সাংবাদিকতার কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে ছবি, ভিডিও, সংবাদ কিংবা সরাসরি সম্প্রচার পাঠানো সম্ভব। তথ্যের প্রবাহ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত। কিন্তু প্রযুক্তির এই বিপুল সুবিধার সঙ্গে সাংবাদিকতার মান, দায়িত্ববোধ ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নটিও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আর বর্তমান সময়ের সাংবাদিকতার নানা চিত্রের কথা শুনলে অনেক সময় সত্যিই গা শিউরে ওঠে। সংবাদপেশার প্রতি মানুষের যে আস্থা একসময় ছিল, নানা কারণে সেই আস্থায় এখন ভাটা পড়েছে। সাংবাদিকতার সঙ্গে যখন ব্যক্তিস্বার্থ, রাজনৈতিক পক্ষপাত, বাণিজ্যিক চাপ কিংবা নানা অনিয়মের অভিযোগ জড়িয়ে পড়ে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন সাংবাদিকের বিশ্বাসযোগ্যতা নয়—পুরো পেশাটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এ কারণেই আজ মানুষের একটি বড় অংশ সাংবাদিকতার প্রতি আগের মতো আস্থা রাখতে পারছে না। অথচ সাংবাদিকতার মূল শক্তি প্রযুক্তি নয়, সংবাদমাধ্যমের ভবন নয়, কিংবা বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ও নয়। এর মূল শক্তি হলো বিশ্বাস।

আশির দশকের সেই সাংবাদিকদের হাতে ছিল না আধুনিক প্রযুক্তি, ছিল না দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ। ছিল শুধু কলম, কাগজ, তথ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সত্য প্রকাশের অঙ্গীকার। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাঁরা যে আস্থা তৈরি করেছিলেন, সেটিই ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড় অর্জন।

সময়ের সঙ্গে সাংবাদিকতার প্রযুক্তি বদলেছে, সংবাদ পাঠানোর পদ্ধতি বদলেছে, সংবাদমাধ্যমের কাঠামো বদলেছে। কিন্তু সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তটি বদলায়নি—সত্য, নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং মানুষের আস্থা।

সেই জায়গাটিতেই হয়তো আজকের সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।


img

চুপ্পুর পদত্যাগ নিয়ে কিছু কথা

প্রকাশিত :  ০৯:৩৪, ০৪ আগষ্ট ২০২৬

আবদুল হামিদ মাহবুব

মো. শাহাবুদ্দিন চুপ্পু অবশেষে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। অনেক দিন ধরেই এই পদত্যাগ নিয়ে আলোচনা চলছিল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকেই তার পদে থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং আন্দোলনকারীদের একটি অংশ মনে করতেন, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার এই পদে থাকা উচিত নয়। আবার অন্যরা বলেছিলেন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করাও জরুরি। এই দুই অবস্থানের টানাপোড়েনের মধ্যেই তিনি দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

তার পদত্যাগপত্র প্রকাশের পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ তিনি শুধু পদত্যাগ করেননি। দীর্ঘ একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। সেখানে তিনি নিজের দায়িত্ব পালনের মূল্যায়ন করেছেন। সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলায় নিজের ভূমিকার কথাও বলেছেন। একই সঙ্গে নিজের গুরুতর অসুস্থতার বর্ণনাও দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, একটি পদত্যাগপত্রে এত কিছু বলার প্রয়োজন ছিল কি?

রাষ্ট্রপতির পদ একটি সাংবিধানিক পদ। এই পদে থাকা ব্যক্তি শুধু একজন ব্যক্তি নন। তিনি রাষ্ট্রের একটি প্রতীকও। তাই তার প্রতিটি বক্তব্য গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে বিদায়ের সময় লেখা একটি চিঠি ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। সেই কারণে তার প্রতিটি শব্দ নিয়েও আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক।

তিনি লিখেছেন, তিনি নিষ্ঠা, সততা এবং সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। এটি তার নিজের মূল্যায়ন। কিন্তু একজন রাষ্ট্রপতির কাজের প্রকৃত মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত জনগণ, ইতিহাস এবং গবেষকরাই করবেন। নিজের কর্মের প্রশংসা নিজে করলে সেটি সব সময় সবাই গ্রহণ করবেন, এমন নয়। তিনি আরও বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনার পর দেশে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছিল। সেই সংকট থেকে বের হতে তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত নেন। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেন। তিনি এটাও বলেছেন, তার ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।

এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেবে। কারণ সেই সময়ের ঘটনাকে সবাই একইভাবে দেখেন না। কেউ মনে করেন রাষ্ট্রপতি প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। আবার কেউ মনে করেন, তিনি পরিস্থিতির চাপে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আরও অনেকে বলেন, তার আগে নেওয়া নানা সিদ্ধান্তের কারণেই তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ফলে তার নিজের ভূমিকার এমন প্রশংসা বিতর্ককে আরও বাড়াতে পারে।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তার অসুস্থতার বর্ণনা। তিনি লিখেছেন, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা এবং অটোনোমিক নিউরোপ্যাথিতে তিনি ভুগছেন। তিনি বলেছেন, মাঝে মাঝে তিনি অচেতন হয়ে যান। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসারও প্রয়োজন রয়েছে।

অসুস্থতার কারণে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়; এটি একটি গ্রহণযোগ্য কারণ। যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা প্রয়োজন। একজন রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন তিনি আর সেই দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না, তাহলে পদত্যাগ করাই যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন উঠে আসে। যদি মূল কারণ অসুস্থতা হয়, তাহলে এত দীর্ঘ ব্যাখ্যার প্রয়োজন ছিল কেন? তিনি চাইলে খুব সংক্ষিপ্ত ভাষায় বলতে পারতেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা আর সম্ভব নয়। তাই সংবিধান অনুযায়ী আমি পদত্যাগ করছি। এতটুকুই যথেষ্ট হতো। এতে কোনো বিতর্কও তৈরি হতো না।

বরং দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি যেন নিজের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ভূমিকার একটি ব্যাখ্যা রেখে যেতে চেয়েছেন। অনেকের কাছে সেটি আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা বলেও মনে হতে পারে। কারণ পদত্যাগপত্র সাধারণত নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার জায়গা নয়। এটি মূলত দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার একটি আনুষ্ঠানিক নথি।

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে বিতর্ক ছিল। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ শুরু থেকেই তার অপসারণ দাবি করেছিল। রাষ্ট্রপতি ভবন ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচিও হয়েছিল। তখন যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তাকে সরালে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতে পারে। তাই তাকে পদে রাখা হয়। সেই সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না ভুল ছিল, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু এটাও সত্য, সেই সময় দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রশ্নটি সামনে ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে কঠিন বাস্তবতা ছিল। তাই তারা কোন যুক্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেটিও আলোচনার বিষয়।

এখন তিনি বিদায় নেওয়ার সময় নিজের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। এতে যারা এত দিন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার যুক্তি দিয়েছিলেন, তাদের অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠতেই পারে। কারণ রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যকে অনেকেই রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখবেন।আরেকটি প্রশ্ন এখন জনমনে ঘুরছে। তিনি কি ভবিষ্যতে আইনের আওতায় আসবেন? এ প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তিনি আইনি দায়ে দোষী হয়ে যান না। অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত হতে হবে। প্রমাণ থাকলে বিচার হবে। আদালতই শেষ কথা বলবেন।

তার অতীত ভূমিকা নিয়ে নানা সময়ে রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা হয়েছে। দুদকে দায়িত্ব পালন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে নেওয়া সিদ্ধান্ত এবং অন্যান্য দায়িত্ব নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ও বিতর্ক রয়েছে। আবার এসব অভিযোগের অনেকগুলোর বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায়ও নেই। তাই আইন ও সংবিধানের পথেই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার স্বাক্ষরে তৎকালীন সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়েছে। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত বা ফৌজদারি দায়—এই দুটি বিষয় এক নয়। যদি কেউ মনে করেন তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বা আইনের লঙ্ঘন করেছেন, তাহলে তারও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিচার হতে হবে। আবেগ নয়, প্রমাণই সেখানে প্রধান বিষয়।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড়।কোনো ব্যক্তি আজ ক্ষমতায় থাকবেন, কাল থাকবেন না। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকবে। তাই প্রতিটি সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির উচিত এমনভাবে দায়িত্ব পালন করা, যাতে তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে। কারণ রাষ্ট্রপতির প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হলে রাষ্ট্রের মর্যাদাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

চুপ্পুর পদত্যাগ একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। কিন্তু এর মাধ্যমে অনেক প্রশ্নের শেষ হয়নি। বরং নতুন করে অনেক প্রশ্ন সামনে এসেছে। কেন তিনি এত দিন পদে ছিলেন? কেন বিদায়ের সময় এত ব্যাখ্যা দিলেন? তার ভূমিকার প্রকৃত মূল্যায়ন কী হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।

ইতিহাস খুব ধৈর্য নিয়ে বিচার করে। ইতিহাস কারও আত্মপ্রশংসা দেখে সিদ্ধান্ত দেয় না। আবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগ শুনেও সিদ্ধান্ত দেয় না। ইতিহাস দলিল দেখে। ঘটনা দেখে। মানুষের অভিজ্ঞতা দেখে। এরপর রায় দেয়।

চুপ্পুর পদত্যাগপত্র হয়তো একদিন গবেষণার বিষয় হবে। সেখানে তার দাবি যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে সমালোচনাও। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তখন বিচার করবে, তিনি সত্যিই সাংবিধানিক সংকট রক্ষা করেছিলেন, নাকি কেবল নিজের ভূমিকার পক্ষে একটি ব্যাখ্যা রেখে গেছেন।

সবশেষে একটি কথাই বলা যায়। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। পদও স্থায়ী নয়। কিন্তু মানুষের কর্ম ইতিহাসে থেকে যায়। তাই বিদায়ের সময় সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত বিনয়। সবচেয়ে বড় ভাষা হওয়া উচিত সংযম। আর সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত জবাবদিহি। একটি সংক্ষিপ্ত ও মর্যাদাপূর্ণ পদত্যাগপত্র হয়তো আরও কম বিতর্ক তৈরি করত। কিন্তু দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি নিজের বিদায়কেই আবারও নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব  ও  যুগ্ম সাধারণ  সম্পাদক, মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল। মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪
ই-মেইল: [email protected]

মতামত এর আরও খবর