img

পুঁজিবাজারের প্রাণশক্তি ফিরিয়ে আনতে একজন 'হিরো'র প্রয়োজন

প্রকাশিত :  ১৯:৪৬, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:৪৮, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

​সম্পাদকীয়

পুঁজিবাজারের প্রাণশক্তি ফিরিয়ে আনতে একজন 'হিরো'র প্রয়োজন

​পুঁজিবাজার আসলে শুধু সূচক, লেনদেন কিংবা কিছু সংখ্যার সমষ্টি নয়। এর ভেতরে জড়িয়ে থাকে লাখো বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশা, সঞ্চয়, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। একটি প্রাণবন্ত বাজার গড়ে তুলতে হলে দরকার এমন কিছু মানুষ, যাঁদের চিন্তা, সময় ও আগ্রহ গভীরভাবে এই বাজারকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।

​এই প্রসঙ্গেই উঠে আসে পুঁজিবাজারের বহুল আলোচিত নাম আবুল খায়ের, বাজারে যিনি পরিচিত 'হিরো' নামে। তাঁকে নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে, বিতর্কও থাকতে পারে; তবে একটি সত্য অস্বীকারের উপায় নেই, বাজারের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের আগ্রহ ও সক্রিয় উপস্থিতি আলোচনায় একটি আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।

​এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, একজন সক্রিয় বাজারসংশ্লিষ্ট মানুষকে আমরা আসলে কোন দৃষ্টিতে দেখছি? তাঁকে দূরে ঠেলে রাখার সংস্কৃতি কি বাজারকে সত্যিই শক্তিশালী করবে, নাকি নিয়মকানুনের সীমার মধ্যে থেকে তাঁর মতো সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের শক্তিকে কাজে লাগানোই বেশি ফলদায়ক হবে?

​সক্রিয় বিনিয়োগকারী যত বাড়ে, বাজার নিয়ে আলোচনা যত জমে ওঠে, কোম্পানির মৌলভিত্তি নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণে আগ্রহ যত বাড়ে, বাজারও ততই প্রাণবন্ত হওয়ার সুযোগ পায়। কেউ যদি প্রতিদিন বাজার নিয়ে ভাবেন, কোম্পানির পারফরম্যান্স অনুসরণ করেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেন, তাহলে মূল আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত, সেই আগ্রহকে কীভাবে গঠনমূলক দিকে চালিত করা যায়।

​আমরা মনে করি, কোনো সক্রিয় অংশগ্রহণকারীকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের মাপকাঠিতে নয়, বরং বাজারের নিয়ম, স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার কাঠামোর ভেতরেই মূল্যায়ন করা উচিত। নিয়ম হবে সবার জন্য সমান; কিন্তু যাঁরা সেই নিয়ম মেনে বাজারে সক্রিয় থাকেন, তাঁদের অবদানও স্বীকৃতি পাওয়া উচিত।

​আবুল খায়েরকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও বাজারসংশ্লিষ্ট অনেকেই তাঁর সক্রিয়তার কথা জানেন। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব কাউকে ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করা নয়, বরং যেকোনো ইতিবাচক দিক তুলে ধরা এবং বাজারের স্বার্থে জরুরি প্রশ্নগুলো সামনে আনা।

​এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কোনো প্রতিবেদন বা সম্পাদকীয়তে কারও ইতিবাচক ভূমিকা তুলে ধরা মানেই এই নয় যে তার বিনিময়ে কোনো সুবিধা নেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা দাঁড়িয়ে থাকে স্বাধীনতা, দায়িত্বশীলতা এবং তথ্যনির্ভরতার ওপর। আমাদের অর্থনীতিবিষয়ক প্রতিবেদনেও এই নীতি সমানভাবে অনুসৃত হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন বা বাণিজ্যিক সম্পর্ককে সংবাদ বা সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়।

​বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে আমরা সবসময় অগ্রাধিকার দিই। কারণ শক্তিশালী পুঁজিবাজার মানে শুধু কিছু কোম্পানির শেয়ারদর বেড়ে যাওয়া নয়; এর অর্থ বাজারে আস্থা তৈরি হওয়া, অংশগ্রহণ বাড়া, ভালো কোম্পানির যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগসংস্কৃতি গড়ে ওঠা।

​এই প্রেক্ষাপটে আবুল খায়েরের মতো সক্রিয় অংশগ্রহণকারীর ভূমিকা নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। তাঁর উপস্থিতি নিয়ে কারও ভিন্নমত থাকতেই পারে, কিন্তু তাঁকে ঘিরে যে আগ্রহ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও সমীচীন নয়।

​বাজারে প্রাণ ফেরাতে দরকার আস্থা, স্বচ্ছতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ। দরকার এমন একটি পরিবেশ, যেখানে বিনিয়োগকারী নির্দ্বিধায় মত প্রকাশ করতে পারেন, বাজার নিয়ে ভাবতে পারেন এবং নিয়ম মেনে অংশ নিতে পারেন। কাউকে অকারণে দমিয়ে রাখার বদলে নিয়মের ভেতরে থেকে ইতিবাচক শক্তিকে কাজে লাগানোই হতে পারে একটি পরিণত পুঁজিবাজারের বৈশিষ্ট্য।

​কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে কেন এত কথা? উত্তরটা সহজ, ভালো কিছু চোখে পড়লে সেটি ভালো বলাই স্বাভাবিক। যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বাজারের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখেন, তাঁদের সেই দিক আলোচনায় আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

​আজকের পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আস্থা। বিনিয়োগকারীরা চান প্রাণবন্ত, স্বচ্ছ ও সুযোগসমৃদ্ধ একটি বাজার, যেখানে ভালো কোম্পানি প্রাপ্য মূল্যায়ন পায়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী উৎসাহ পান এবং ইতিবাচক অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ে।

​তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত কে বাজারে আছেন, তা নয়; বরং বাজারকে আরও কার্যকর করার উপায় কী, সেটিই।

​আবুল খায়ের যদি সত্যিই দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজার নিয়ে ভাবেন, কাজ করেন এবং সক্রিয় থাকেন, তবে তাঁর সেই আগ্রহকে বাজারের ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তরের সুযোগ আছে কি না, সেটিই এখন খতিয়ে দেখা দরকার।

​কারণ পুঁজিবাজারকে প্রাণবন্ত করতে শুধু নীতিমালাই যথেষ্ট নয়; দরকার মানুষ, দরকার অংশগ্রহণ, দরকার আস্থা, আর দরকার বাজারকে ভালোবাসে এমন সক্রিয় মানুষ।

​হিরো নিছক একজন ব্যক্তি। কিন্তু তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া আলোচনা আমাদের একটি বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আমরা কি সক্রিয় বাজার অংশগ্রহণকারীদের দূরে সরিয়ে রাখব, নাকি নিয়মের কাঠামোর ভেতরে রেখে তাঁদের ইতিবাচক শক্তিকে কাজে লাগাব?

​শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব একটি পুঁজিবাজার গড়তে দ্বিতীয় পথটিই বিবেচনার যোগ্য।

img

সিলেটের রেলপথে আটকে থাকা প্রতিশ্রুতি: ৩ সেপ্টেম্বরও পেরোল, টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস কোথায়?

প্রকাশিত :  ১৫:৫৯, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত

সিলেটবাসীর কাছে রেল এখন যেন প্রতিশ্রুতির আরেক নাম। কখনো নতুন আন্তনগর ট্রেন চালুর ঘোষণা, কখনো ডাবল লাইন নির্মাণের আশ্বাস, আবার কখনো সিলেট–জাফলং রেলসড়ক কিংবা ময়মনসিংহ–সিলেট সরাসরি রেল যোগাযোগের পরিকল্পনা—বছরের পর বছর ধরে এসব কথা শুনে আসছেন এই অঞ্চলের মানুষ। কিন্তু ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব যেন ক্রমেই বাড়ছে।

সর্বশেষ আলোচনায় ছিল ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’। সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল, এই ট্রেন ঢাকার সঙ্গে সিলেটের রেল যোগাযোগকে আরও দ্রুত ও আধুনিক করবে। সিলেট-৬ আসনের এমপি এমরান আহমদ চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে সংসদে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সিলেট–ঢাকা রেলপথে ‘টাঙ্গুয়া’ নামে নতুন একটি ট্রেন চালু হবে।

কথা ছিল মে ও জুন মাসে। নির্ধারিত ৩ সেপ্টেম্বরও পেরিয়ে গেছে। কিন্তু ট্রেন চালুর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকেও নতুন ট্রেন চালুর বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—সংসদে নির্দিষ্ট তারিখ দিয়ে যে ট্রেন চালুর কথা বলা হয়েছিল, সেই টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস কোথায়?
সিলেট-৬ আসনের এমপি এমরান আহমদ চৌধুরী জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি আবার সংসদে তুলবেন।

সিলেটের রেল যোগাযোগের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতাগুলোর একটি হলো একক রেললাইন। ২০১৯ সালে আখাউড়া–সিলেট রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করার প্রকল্পের ঘোষণা সিলেটবাসীর মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করেছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা ও সিলেটের মধ্যে রেলযাত্রা আরও দ্রুত, নিরাপদ ও আধুনিক হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু অর্থসংকটের কারণে প্রকল্পটি স্থগিত রয়েছে। ফলে সিলেটের সঙ্গে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও যোগাযোগকেন্দ্রগুলোর রেলসংযোগের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নও থমকে আছে।

এই রেলপথ শুধু ঢাকা–সিলেট যাতায়াতের বিষয় নয়। এর সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ভারতের আগরতলার সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের বিষয়টিও যুক্ত। ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত না হওয়ায় আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

ময়মনসিংহ ও সিলেটের মানুষের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক। দুই অঞ্চলের মানুষের আত্মীয়তা যেমন গভীর, তেমনি পণ্যবাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগও রয়েছে।

তবু দুই বিভাগকে সরাসরি রেলপথে যুক্ত করা যায়নি।

২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহে এক জনসভায় তৎকালীন ধর্মমন্ত্রী প্রিন্সিপাল মতিউর রহমান বলেছিলেন, “ময়মনসিংহ–সিলেট রেলপথে শিগগিরই আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হবে।”

এরপর ২০১৯ সালে সিলেট–চট্টগ্রাম এবং ময়মনসিংহ–সিলেট রুটে নতুন দুটি আন্তনগর ট্রেন চালুর পরিকল্পনার কথা জানায় রেলওয়ে। ওই সময় ইন্দোনেশিয়ার PT INKA থেকে আধুনিক কোচও আমদানি করা হয়। এসব কোচের একটি অংশ ওই রুটে ব্যবহারের কথা ছিল।

কিন্তু ঘোষণার পর বছর পেরিয়েছে। ট্রেন আর চালু হয়নি।

২০২১ সালের ৯ অক্টোবর রাজধানীর বেইলি রোডের অফিসার্স ক্লাবে বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমন্বয় পরিষদের বার্ষিক সম্মেলনে তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জানিয়েছিলেন, ময়মনসিংহের সঙ্গে সিলেটের সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনে জরিপ চলছে।

তিনি আরও বলেছিলেন, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ থেকে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার উড়ালসড়ক নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। হাওরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
কিন্তু এসব ঘোষণার পরও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

বর্তমানে সিলেট থেকে ময়মনসিংহ যেতে যাত্রীদের ঘুরপথে যেতে হয়। কখনো ঢাকা, কখনো ভৈরব হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে সময় লাগে প্রায় ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা।
অথচ সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু করা গেলে এই যাত্রা প্রায় ৭ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব হতো।
অর্থাৎ একটি রেললাইন শুধু দুই শহরের দূরত্ব কমাত না; কমাত সময়, পরিবহন ব্যয় এবং মানুষের দুর্ভোগও। একই সঙ্গে ময়মনসিংহ ও সিলেটের ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও সামাজিক যোগাযোগ আরও গতিশীল হতে পারত।

সিলেটের রেল যোগাযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক হতাশার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’।
২০২৩ সালে অনুমোদন পাওয়া এই ট্রেনকে ঘিরে সিলেটবাসীর প্রত্যাশা ছিল অনেক। আধুনিক, ননস্টপ ও আন্তর্জাতিক মানের সেবা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ঢাকার সঙ্গে সিলেটের দ্রুত রেল যোগাযোগে এটি নতুন দিগন্ত খুলবে—এমন আশাই করেছিলেন যাত্রীরা।
কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা, ইঞ্জিনের স্বল্পতা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে ট্রেনটি চালু হয়নি।

এরপর মে ও জুন মাসে বিষয়টি আবার সামনে আসে। সিলেট-৬ আসনের এমপি এমরান আহমদ চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী সংসদে জানান, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সিলেট–ঢাকা রেলপথে ‘টাঙ্গুয়া’ নামে নতুন ট্রেন চালু হবে।
কিন্তু ৩ সেপ্টেম্বর পেরিয়ে গেলেও টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেসের কোনো দেখা নেই।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টও নতুন ট্রেন চালুর বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেনি। ফলে সংসদে ঘোষিত নির্দিষ্ট তারিখও যখন পার হয়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—ঘোষণাটি কি কেবল ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

শুধু নতুন ট্রেন নয়, বিদ্যমান আন্তনগর ট্রেনের সেবাও নিয়ে সিলেটবাসীর অভিযোগের শেষ নেই।
সিলেট থেকে ঢাকাগামী আন্তনগর ট্রেনগুলোতে পথে বিভিন্ন স্টেশনে ব্যাপক যাত্রী ওঠানামার কারণে অনেক সময় ট্রেনের ভেতরে চলাচলের জায়গা থাকে না। আশুগঞ্জ, ভৈরব বাজার, নরসিংদীসহ বিভিন্ন স্টেশন থেকে যাত্রী ওঠায় সিলেট থেকে যাত্রা করা অনেক যাত্রীকে দীর্ঘ পথ দাঁড়িয়ে যেতে হয়—এমন অভিযোগ রয়েছে।
এ নিয়ে সম্প্রতি সিলেটবাসী মানববন্ধনও করেছেন। তাঁদের দাবি, ঢাকা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের দিকে যাওয়ার পথে আন্তনগর ট্রেনের স্টপেজ কমানো হোক, যাতে দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রীরা তুলনামূলক স্বস্তিতে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।

সিলেটবাসীর বক্তব্য, আন্তনগর ট্রেনের মূল বৈশিষ্ট্যই হলো দ্রুত ও তুলনামূলক আরামদায়ক যাত্রা। কিন্তু পথে অতিরিক্ত স্টপেজ ও যাত্রী ওঠানামার কারণে সেই সুবিধা অনেকটাই নষ্ট হচ্ছে।

সিলেট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা শ্রীমঙ্গল। চা-বাগান, পাহাড়, বনাঞ্চল, হাওর ও বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে শ্রীমঙ্গল দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য।

প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা রয়েছে এখানে। রাধানগরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্র। পাশাপাশি লেবু, আনারস, কাঁঠাল ও চা-বাগানের বিস্তৃত চাষাবাদকে ঘিরে গড়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতি। এসব খাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শত শত মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন।
ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাধানগরের নামও। ১৭৮ বিঘা জমির ডলুছড়া পাহাড় ব্রিটিশ শাসনামলে শ্রীমঙ্গলের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও দানবীর রাধা নাথ দেব চৌধুরী কিনেছিলেন। পরে তিনি জমিটি তাঁর চার সন্তানের মধ্যে বণ্টন করেন। তাঁদের কেউ কেউ জমি বিক্রি করেন, আর অবশিষ্ট জমির একটি অংশ সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন কারণে হাতছাড়া হয়ে যায়। তাঁর নাম থেকেই গড়ে ওঠে ‘রাধানগর’, যা বর্তমানে সিলেট বিভাগের অন্যতম উন্নত ও সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে পরিচিত।

এত সম্ভাবনার পরও শ্রীমঙ্গলসহ সিলেট বিভাগের পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে ঘিরে আধুনিক রেলসেবা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবাসী ও অর্থনৈতিক অঞ্চল। বিপুল প্রবাসী আয়, চা শিল্প, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং পর্যটন—সব মিলিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে এ অঞ্চলের গুরুত্ব উল্লেখযোগ্য।
জাফলং, রাতারগুল, বিছানাকান্দি, লালাখান কিংবা শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান—প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রই দেশের পর্যটন খাতকে আরও বড় করার সম্ভাবনা রাখে। কিন্তু আধুনিক ও দ্রুত রেল যোগাযোগের অভাব সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর পথে একটি বড় সীমাবদ্ধতা।
ঢাকা থেকে সিলেটগামী ট্রেনগুলোর অনেকগুলো এখনো পুরোনো ইঞ্জিননির্ভর। কোথাও কোথাও রেলের গতিবেগ ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটারের নিচে নেমে আসে। ফলে সড়কপথের যানজট ও দীর্ঘ যাত্রার বিকল্প হিসেবে যে রেলকে আরও কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, সেটিও অনেক ক্ষেত্রে সময়সাশ্রয়ী বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।

২০১৭ থেকে শুরু করে পরবর্তী বছরগুলোতে সিলেটের রেল যোগাযোগ নিয়ে একের পর এক ঘোষণা এসেছে। নতুন ট্রেন, ডাবল লাইন, সরাসরি ময়মনসিংহ–সিলেট রেল যোগাযোগ, সিলেট–জাফলং রেলসড়ক—প্রতিটি উদ্যোগই মানুষের মনে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
কিন্তু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবায়নের দূরত্ব দিন দিন স্পষ্ট হয়েছে।

সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষ মানববন্ধন, মিছিল, সভা ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে রেল যোগাযোগ উন্নয়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের বক্তব্য এখন অনেকটা অভিন্ন—আর ঘোষণা নয়, এবার তাঁরা বাস্তব কাজ দেখতে চান।
কারণ একটি ট্রেন শুধু কয়েকশ যাত্রীকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায় না। একটি কার্যকর রেলপথের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের সময়, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, কর্মসংস্থান এবং একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতি।

৩ সেপ্টেম্বর পেরিয়ে গেছে। সংসদে ঘোষিত তারিখও এখন অতীত। অথচ সিলেটবাসীর অপেক্ষা শেষ হয়নি।
তাঁরা আর নতুন কোনো তারিখ শুনতে চান না। তাঁরা দেখতে চান ট্রেন। দেখতে চান আধুনিক রেললাইন। চান দ্রুতগামী ও নির্ভরযোগ্য রেলসেবা।
সিলেটের রেলপথ যেন আর প্রতিশ্রুতির স্টেশনে দাঁড়িয়ে না থাকে—এটাই এখন এই অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা।