img

ক্ষনজন্মা সাধক কবি রাধারমন দত্ত

প্রকাশিত :  ১৬:২৩, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২২

ক্ষনজন্মা সাধক কবি রাধারমন দত্ত

|| মোঃ চন্দন মিয়া ||

রাধারমন দত্ত উনিশ শতকের এক বিস্ময়কর প্রতিভাবান ক্ষনজন্মা সাধন কবি। তাঁর জন্ম ১৮৩৪ সালে (মতান্তরে) সুনামগঞ্জ জেলাধীন জগন্নাথপুর থানার কেশবপুর গ্রামে। রাধারমন দত্ত ঈশ্বর ভক্তি ও মানবপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে অসংখ্য গান রচনা করেছেন, যার গানের মর্মার্থ অত্যন্ত গভীর। আধ্যাত্ম সাধনই ছিল তাঁর সংগীতের মুল উৎস। তাঁর বহু গানে স্রস্টার প্রতি ভক্তি ও মানবপ্রেমের বানী লক্ষণীয়। 

সিলেটে রাধারমনের গানের জনপ্রিয়তা অসীম। তাঁর গানের বিস্তার আজও সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। এই লোকজ সাধক কবির গানে গ্রামীণ জীবন বোধ, প্রেম, বিরহ, বিচ্ছেদ, সৃস্টিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, পরমতত্ত্ব, অনুরাগ ও বিরাগের রূপপ্রকাশ পায় অতিমাত্রায়। লালন-হাছনের পর রাধারমনের গান একটি নিজস্ব আঙ্গিক ও ঘরনা তৈরী করতে পেরেছে, যার জন্য তাঁর গানের একটি নিজস্ব স্বকীয়তা ও সস্বাতন্ত্র্যবোধ রয়েছে।

সুনামগঞ্জের স্থানীয় ধামাইল গানের প্রতিষ্ঠাতা এই মরমী সাধক কবি রাধারমন। নৃত্যের তালে রাধা রমনের গানে মুখরিত হয়ে উঠতো বিয়ে বাড়ির উৎসব, হবু বরকে সম্ভাষনে রমনীকূলের সুরেলা কন্ঠে রাধারমনের গীতির ছন্দে কম্পিত হতো বিয়ে বাড়ির পরিবেশ। রাধারমনের গানে বৈষ্ণব প্রভাব লক্ষণীয়। তাঁর গানের মধ্যে যার বিশেষ প্রমান পরিলক্ষিত হয়। রাধারমন বাউল ছিলেন না বলে অভিমত ব্যক্ত করেন রাধারমন -গবেষক নন্দলাল শর্মা ও মোহাম্মদ সুবাস উদ্দীন। তবে দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, সুধীরচন্দ্র পাল ও জ্যোতিন্দ্রনাথ চৌধুরী তাঁকে বাউল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তপন বাগচী সম্পাদিত রাধারমনের গানের বইয়ে যার উল্লেখ রয়েছে।

একাধিক গানে রাধারমন নিজকে বাউল বলে উল্লেখ করেছেন—

“দীনহীন বাউলে কয় কথা মিচে নয়

চন্দ্রাবলীর কুঞ্জে তুমি গেছিলা নিশ্চয়

রাধারমন বাউলে বলে আমার সবের আশা পূর্ণ হইল না।”

অতএব রাধারমন নিজেই তাঁকে বাউল বলে রায় দিয়েছেন।

এই বাউল কবির গানে লোকজ জীবনের অনুষঙ্গ ও গ্রামীন জীবন বোধের ধারা খুঁজে পাওয়া যায়। বৈষ্ণব প্রভাবেই কবি হয়তো শেষ জীবনে একটি আশ্রমে চলে গিয়েছিলেন সংগীত সাধনার জন্য, যা সংসার ধর্মের প্রতি বিরাগ প্রকাশ পায়। রাধা কৃষ্ণের প্রেমলীলায় মুগ্ধ বলে কবি অসংখ্য গানে কৃষ্ণ সেজে রাধাকে খুঁজেছেন, আবার রাঁধার বিরহে করেছেন মাতম। রাধা কৃষ্ণের বিরাগ অনুরাগ, প্রেম বিরহের বন্ধনা ছিল তাঁর গানের আরেকটি উপজীব্য বিষয়।

লালন শাহ, হাসন রাজা ও শাহ আব্দুল করিম যেভাবে মূল সংগীতে স্থান পেয়েছেন সেভাবে মূলধারায় রাধারমন উঠে আসতে পারেননি। তার কারণ বহুবিদ। সাহিত্যিক, গবেষক, চলচ্চিত্র নির্মাতারা লালন-হাসন ও করিমের গানকে মূল সংগীতের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন বলে ঐ কবি বাউলরা জাতীয় পরিসরে তাদের নাম বিস্তার লাভ করেছে। কিন্তু  রাধা রমনের গানের বিস্তারটা সেভাবে হয়নি। অনেক জনপ্রিয় শিল্পী লালন -হাসন ও করিমের  গান গেয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন এবং সাথে সাথে বাউলদেরও জনপ্রিয়তা অর্জিত হয়েছে। কিন্তু রাধারমনের গান জনপ্রিয় শিল্পীরা তাদের পছন্দের তালিকায় নেন নি। তাই রাধা রমনের গান আঞ্চলিক সীমা  অতিক্রম করতে পারেনি। এই বিষয়ে গবেষকদের একটি ব্যর্থতা ও সীমাদ্ধতা রয়েছে।

সব সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতাকে দূরে টেলে রাধারমনের গান সারা দেশে একদিন ছড়িয়ে পড়বে। সব গবেষক, লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতারা এগিয়ে আসবেন বলে আমার বিশ্বাস। রাধারমনের গানের মর্মবানী ও চেতনাকে যদি আমরা মূলবিবেচনায় নেই তাহলে তাঁর গান সত্যিই একদিন সমাদৃত হবে সর্ব মহলে। সব বাধা ও সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে রাধারমনএ কদিন জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করবেন।

রাধারমনের  ভক্তরা আজও মুখে মুখে আওড়ায় তাঁর লেখা অসংখ্য গানের কলি। এই সাধক কবি অগনীত ভক্তের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন দীর্ঘ কাল।

লন্ডন, ২০/০২/২০২২


মতামত এর আরও খবর

img

আইনশৃঙ্খলার ভাঙন ও বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়া

প্রকাশিত :  ২০:০৫, ১২ মে ২০২৬

মু. সায়েম আহমাদ 

একটা দেশ তখনই সুখী দেশ বলা যায়। যেখানে দেশের মানুষ স্বাচ্ছন্দে চলাফেরা করতে পারে, নিজের জীবন পরিচালনায় স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আজ চরম উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিদিনের খবরের কাগজ খুললেই চোখে পড়ছে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, গণপিটুনি, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতার হৃদয়বিদারক ঘটনা। এসব ঘটনা আর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং তা একটি গভীর সামাজিক ব্যাধির লক্ষণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। 

সম্প্রতি গাজীপুরে ঘটে যাওয়া একটি নৃশংস ঘটনা দেশবাসীকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত সহিংসতা, কখনো মিটফোর্ড এলাকায় প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড, কখনো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীর প্রাণহানি, আবার কখনো গ্রামে সালিশের নামে নারীর ওপর অমানবিক নির্যাতন। এসব কিছু একই সূত্রে গাঁথা। 

অপরাধ ঘটে, কিছুদিন আলোচনা হয়, ত‌দন্ত কমিটি গঠন হয়, তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু চাপা পড়ে যায়।

আইনের প্রতি চরম অবজ্ঞা এবং অপরাধীদের নির্ভীক আচরণ প্রমাণ করে যে, অপরাধীরা আর আইনকে ভয় পায় না। কারণ তারা জানে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শাস্তি নিশ্চিত নয়। অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে বিচারিক কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। যার নাম বিচারহীনতার সংস্কৃতি। 

বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি শুধু অপরাধ বাড়াচ্ছে না, সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও ভেঙে দিচ্ছে। যখন একজন সাধারণ মানুষ দেখে, অপরাধ করেও কেউ পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন তার মধ্যেও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ক্ষয় হতে থাকে। ফলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে, তৈরি হয় গণপিটুনি ও প্রতিশোধের রাজনীতি। এটি একটি বিপজ্জনক চক্র, যা রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক হুমকি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা কমে যাওয়াও একটি বড় সংকেত। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহলের চাপে তদন্ত দুর্বল হয়, সাক্ষীরা নিরাপত্তাহীনতায় মুখ খুলতে চান না। বিচার যদি শক্তিশালী না হয়, তাহলে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন বিচার ব্যবস্থার সংস্কার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। অপরাধী যে-ই হোক, তার পরিচয় বা ক্ষমতা বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারবে না। এই বার্তাটি স্পষ্টভাবে দিতে হবে এবং কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। দেশের মানুষ নিরাপত্তা চায়, ন্যায়বিচার চায়। হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হলে বিচারহীনতার এই অন্ধকার অধ্যায়ের ইতি টানতেই হবে। নইলে আজ গাজীপুর হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে, কাল অন্য কোনো জেলায় ঘটবে না তারই-বা নিশ্চয়তা কী ! এভাবেই দীর্ঘ হবে লাশের মিছিল, আর প্রশ্নবিদ্ধ হবে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি। সুতরাং, এখনই সময় বিচার ব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা শক্তিশালী করা।


মু. সায়েম আহমাদ
তরুণ কলাম লেখক ও সংগঠক

মতামত এর আরও খবর