img

জরিপের রাজনীতি

প্রকাশিত :  ১৬:৫২, ১০ ডিসেম্বর ২০২৫

জরিপের রাজনীতি

সাইফুল খান 

জরিপ আজ কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি ক্ষমতা–নীতিনির্ধারণ–জনমত নির্মাণের এক নীরব প্রযুক্তি। মানুষের ধারণা, রাজনৈতিক আবহ, ভোটার আচরণ, এমনকি আন্তর্জাতিক কূটনীতিক বার্তা সবকিছুতেই জরিপ হয়ে উঠেছে একধরনের “অদৃশ্য ভাষা”। এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে স্পন্সরশিপ, রাজনৈতিক স্বার্থ, প্রশ্ন তৈরির কাঠামোগত প্রতারণা এবং “জনগণ যা ভাবছে” এর কৃত্রিম নির্মাণ। ফলে জরিপ অনেক সময় সত্যের প্রতিবিম্ব নয়, বরং সত্যকে নিয়ন্ত্রণের শিল্প।

জরিপের রাজনৈতিক ভিত্তি: জনমত কি আদৌ ‘জনতার’?

২০শ শতকের রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ওয়াল্টার লিপম্যান তাঁর ক্ল্যাসিক বই Public Opinion (1922)-এ বলেন জনগণের মতামত বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়ে থাকে না; বরং অভিপ্রায়, প্রচারণা, প্রভাব ও তথ্যপ্রবাহের ওপর দাঁড়ায়। লিপম্যান এটাকে বলেন “pictures in our heads” মাথার ভেতর তৈরি হওয়া কল্পিত বাস্তবতা। জরিপ সেই কল্পিত বাস্তবতাকে সংখ্যার ছকে পরিণত করে, এবং জনগণ ভুলভাবে ধরে নেয় “এটাই সত্য।”

একই ভাবনার বিস্তৃত রূপ পাওয়া যায় Noam Chomsky ও Edward S. Herman–এর Manufacturing Consent (1988)বইয়ে। এখানে দেখানো হয়েছে গণমাধ্যম, কর্পোরেট শক্তি ও রাজনৈতিক ক্ষমতা এমনভাবে তথ্য বেছে নেয় যে জনমত মূলত উৎপাদিত (manufactured)। জরিপ সেই উৎপাদনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার কারণ এটি বিজ্ঞানের মুখোশ পরে থাকে।

সামাজিক জরিপের রাজনীতি বিশ্লেষণ করেছেন Pierre Bourdieu, তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ Public Opinion Does Not Exist (1973)-এ। বোর্দিও দেখিয়েছেন, জরিপ প্রশ্ন বানানোর সময়ই একটি “সম্ভাব্য মতামত” তৈরি করে দেওয়া হয়।স্যাম্পলিংয়ের মাধ্যমে বাস্তব সমাজকে সংকুচিত করা হয় এবং প্রতিবেদন লেখার সময় তা রাজনৈতিক অর্থ পায়। তাঁর মূল বক্তব্য: “জরিপ জনমত মাপে না বরং জনমতকে বানায়।”

অধুনিক গবেষণায় জরিপকে বলা হয় “opinion technology” মতামত গঠনের প্রযুক্তি। এর ভেতরে স্পন্সরের অর্থ, মিডিয়ার ভাষা, রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল এবং মনস্তত্ত্ব মিলেমিশে বিশেষ ধরনের “সত্য” তৈরি করে।

জরিপে প্রতারণার চারটি প্রধান স্তর

১. স্যাম্পলিং প্রতারণা

নির্দিষ্ট এলাকা, গোষ্ঠী, বয়স বা শ্রেণিকে অতিরিক্ত প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হয়। গ্রামীণ ভোটার বাদ রেখে শহুরে জনগোষ্ঠী বেশি নিলে সরকারবিরোধী “মুড” বেশি দেখাবে। অনলাইন জরিপে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের মতামতই বেশি উঠে আসে, যা গরিবদের বাস্তবতা প্রতিফলিত করে না।

২. প্রশ্নের ভাষায় রাজনৈতিক ফাঁদ

প্রশ্ন যদি হয় “আপনি কি মনে করেন দেশে দুর্নীতি বেড়েছে?” উত্তর নির্দিষ্ট দিকেই যাবে।

কিন্তু প্রশ্ন যদি হয় “গত ৫ বছরে কোন খাতের উন্নয়ন বেশি চোখে পড়েছে?” তাহলে সরকার সমর্থক ভাবনা উঠে আসবে।নিরীহ প্রশ্নই কখনো কখনো মত গঠনের কৌশল।

৩. স্পন্সরশিপ ও অর্থের রাজনীতি

কর্পোরেট কোম্পানি নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে “জনমত” দেখায়। আন্তর্জাতিক সংস্থা উন্নয়ন প্রকল্প বৈধ করতে জরিপ ব্যবহার করে। রাজনৈতিক দল নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে “প্রী-পোল স্টাডি” বানায়। এগুলোই বোর্দিওর ভাষায় “প্রতিষ্ঠানগত মতামত-উৎপাদন”।

৪. ফল প্রকাশের মিডিয়া কৌশল

মিডিয়া সবচেয়ে আলোড়ন তোলা সংখ্যা শিরোনামে রাখে।  “৭০% মানুষ অমুক নেতাকে চান” এই বাক্যটি মানে হয়তো মাত্র ১২০০ জনের মধ্যে ৮৪০ জন। কিন্তু মানুষের মনে এটি দাঁড়িয়ে যায় “দেশের ৭০% জনগণ” হিসেবে। সংখ্যা এভাবেই রাজনৈতিক অস্ত্র হয়।

জরিপ বনাম বাস্তবতা: চাঞ্চল্যকর অমিলের আন্তর্জাতিক উদাহরণ

উদাহরণ ১: ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট গণভোট

ব্রিটিশ অধিকাংশ জরিপই দেখাচ্ছিল “Remain” জিতবে। রেফারেন্স: The Guardian Poll Tracker, 2016  কিন্তু বাস্তবে “Leave” জিতে যায়।

কারণ—

ফোনে জরিপে অংশ নেয়া মানুষরা নিজের মতামত গোপন রেখেছিল। সামাজিক চাপে অনেকেই সত্য বলেনি। জরিপ প্রতিষ্ঠানগুলো শহুরে, তরুণ ভোটার বেশি ধরেছিল।

এটি “Shy voter effect” এর এক ক্লাসিক উদাহরণ।

উদাহরণ ২: ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্প বনাম হিলারি

মার্কিন প্রধান জরিপগুলো দেখাচ্ছিল হিলারি ক্লিনটন জিতবেন। রেফারেন্স: Nate Silver, FiveThirtyEight Election Model (2016)

বাস্তবে ট্রাম্প জিতে যায়।

কারণ—

জরিপগুলো ‘working class’ শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের যথেষ্ট অন্তর্ভুক্ত করেনি। ‘Shy Trump voter’ রা বাস্তব মত প্রকাশ করেনি।

মিডিয়া জরিপকে ‘মুড’ তৈরির অস্ত্র বানিয়েছিল।

উদাহরণ ৩: ২০১৯ সালের ভারত নির্বাচন

অনেক আগাম জরিপে বিজেপি কম আসন পাবে বলা হয়েছিল। রেফারেন্স: CSDS-Lokniti Pre-poll Survey, 2019

কিন্তু বাস্তবে বিজেপি একতরফা জয় পায়।

কারণ—

গ্রামীণ হিন্দু ভোটার স্যাম্পলে কম ছিল। অনেক প্রশ্ন সূক্ষ্মভাবে বিজেপি-বিরোধী বর্ণনা তৈরি করেছিল। সামাজিক চাপের কারণে হিন্দুত্ববাদী সমর্থক ভোটার নিজেদের মতামত প্রকাশ করেনি।

উদাহরণ ৪: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে “Crime Perception Study”

জরিপে দেখা গেছে ৭৮% আমেরিকান মনে করে “দেশে অপরাধ বাড়ছে।” কিন্তু FBI রিপোর্টে দেখা গেছে অপরাধ ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

রেফারেন্স:

– Gallup Crime Survey 2022

– FBI Uniform Crime Reports

এখানে মিডিয়া বর্ণনা জনমতের ওপর এমন প্রভাব ফেলেছে যে বাস্তবতার সম্পূর্ণ উল্টো ধারণা জনগণের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

জরিপ কেন বাস্তবতার প্রতিফলন নয়, বরং বাস্তবতার নির্মাতা।জরিপকে সাধারণ মানুষ “তথ্য” মনে করলেও বাস্তবে জরিপ হলো একটি রাজনৈতিক ভাষা।

এটি তিনভাবে বাস্তবতা তৈরি করে:

১. Bandwagon Effect

যখন বলা হয় “৬০% মানুষ অমুক নীতিকে সমর্থন করে”। ৫% মানুষও কখনো কখনো সেই দিকে সরে যায়।জরিপ বাস্তবতা নয়, বাস্তবতা নির্মাণের প্রক্রিয়া।

২. Framing Effect

কিভাবে প্রশ্ন করা হলো সেটিই বাস্তবতা নির্ধারণ করে। যদি জিজ্ঞেস করা হয়—

“দেশে দুর্নীতি আছে কি নেই?” দুর্নীতি ‘আছে’ বলা হবে। ফলে মিডিয়া এটি ব্যবহার করে সমালোচনার জোয়ার তৈরি করে।

৩. Authority Effect

সংখ্যা ও গ্রাফ দেখে মানুষ মনে করে “এটা তো বিজ্ঞান”। এভাবে জরিপ সত্যের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। বস্তুত জরিপ একধরনের সফট পাওয়ার, যা নির্বাচনের আগে এবং পরে মানুষের মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করে।

একাডেমিক রেফারেন্স

1. Walter Lippmann, Public Opinion, 1922

2. Pierre Bourdieu, “Public Opinion Does Not Exist”, Communication and Class Struggle, 1973

3. Noam Chomsky & Edward S. Herman, Manufacturing Consent, 1988

4. George Gallup, The Pulse of Democracy, 1940

5. Herbert Asher, Polling and the Public: What Every Citizen Should Know, 2017

6. FiveThirtyEight Polling Analysis Archives (Nate Silver)

7. CSDS–Lokniti: National Election Studies

8. Gallup Crime Surveys, various years

9. FBI Uniform Crime Reports

শেষকথা

জরিপকে বোঝা মানে সংখ্যাকে বোঝা নয়। বরং সংখ্যার রাজনীতি বোঝা।কে প্রশ্ন করলো? কারা উত্তর দিল? ফল প্রকাশ করলো কারা? কাদের স্বার্থ এতে রক্ষা পেল? এগুলো না দেখলে জরিপ দেখতে পাবেন, কিন্তু সত্য দেখতে পারবেন না।

জরিপ হলো আধুনিক বিশ্বের এক নীরব ক্ষমতা, যা সংখ্যার নামে মানুষের মনের উপর রাজত্ব করে।


লেখক- ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক।
img

সিলেটের রেলপথে আটকে থাকা প্রতিশ্রুতি: ৩ সেপ্টেম্বরও পেরোল, টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস কোথায়?

প্রকাশিত :  ১৫:৫৯, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত

সিলেটবাসীর কাছে রেল এখন যেন প্রতিশ্রুতির আরেক নাম। কখনো নতুন আন্তনগর ট্রেন চালুর ঘোষণা, কখনো ডাবল লাইন নির্মাণের আশ্বাস, আবার কখনো সিলেট–জাফলং রেলসড়ক কিংবা ময়মনসিংহ–সিলেট সরাসরি রেল যোগাযোগের পরিকল্পনা—বছরের পর বছর ধরে এসব কথা শুনে আসছেন এই অঞ্চলের মানুষ। কিন্তু ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব যেন ক্রমেই বাড়ছে।

সর্বশেষ আলোচনায় ছিল ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’। সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল, এই ট্রেন ঢাকার সঙ্গে সিলেটের রেল যোগাযোগকে আরও দ্রুত ও আধুনিক করবে। সিলেট-৬ আসনের এমপি এমরান আহমদ চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে সংসদে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সিলেট–ঢাকা রেলপথে ‘টাঙ্গুয়া’ নামে নতুন একটি ট্রেন চালু হবে।

কথা ছিল মে ও জুন মাসে। নির্ধারিত ৩ সেপ্টেম্বরও পেরিয়ে গেছে। কিন্তু ট্রেন চালুর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকেও নতুন ট্রেন চালুর বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—সংসদে নির্দিষ্ট তারিখ দিয়ে যে ট্রেন চালুর কথা বলা হয়েছিল, সেই টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস কোথায়?
সিলেট-৬ আসনের এমপি এমরান আহমদ চৌধুরী জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি আবার সংসদে তুলবেন।

সিলেটের রেল যোগাযোগের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতাগুলোর একটি হলো একক রেললাইন। ২০১৯ সালে আখাউড়া–সিলেট রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করার প্রকল্পের ঘোষণা সিলেটবাসীর মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করেছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা ও সিলেটের মধ্যে রেলযাত্রা আরও দ্রুত, নিরাপদ ও আধুনিক হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু অর্থসংকটের কারণে প্রকল্পটি স্থগিত রয়েছে। ফলে সিলেটের সঙ্গে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও যোগাযোগকেন্দ্রগুলোর রেলসংযোগের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নও থমকে আছে।

এই রেলপথ শুধু ঢাকা–সিলেট যাতায়াতের বিষয় নয়। এর সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ভারতের আগরতলার সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের বিষয়টিও যুক্ত। ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত না হওয়ায় আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

ময়মনসিংহ ও সিলেটের মানুষের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক। দুই অঞ্চলের মানুষের আত্মীয়তা যেমন গভীর, তেমনি পণ্যবাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগও রয়েছে।

তবু দুই বিভাগকে সরাসরি রেলপথে যুক্ত করা যায়নি।

২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহে এক জনসভায় তৎকালীন ধর্মমন্ত্রী প্রিন্সিপাল মতিউর রহমান বলেছিলেন, “ময়মনসিংহ–সিলেট রেলপথে শিগগিরই আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হবে।”

এরপর ২০১৯ সালে সিলেট–চট্টগ্রাম এবং ময়মনসিংহ–সিলেট রুটে নতুন দুটি আন্তনগর ট্রেন চালুর পরিকল্পনার কথা জানায় রেলওয়ে। ওই সময় ইন্দোনেশিয়ার PT INKA থেকে আধুনিক কোচও আমদানি করা হয়। এসব কোচের একটি অংশ ওই রুটে ব্যবহারের কথা ছিল।

কিন্তু ঘোষণার পর বছর পেরিয়েছে। ট্রেন আর চালু হয়নি।

২০২১ সালের ৯ অক্টোবর রাজধানীর বেইলি রোডের অফিসার্স ক্লাবে বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমন্বয় পরিষদের বার্ষিক সম্মেলনে তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জানিয়েছিলেন, ময়মনসিংহের সঙ্গে সিলেটের সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনে জরিপ চলছে।

তিনি আরও বলেছিলেন, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ থেকে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার উড়ালসড়ক নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। হাওরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
কিন্তু এসব ঘোষণার পরও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

বর্তমানে সিলেট থেকে ময়মনসিংহ যেতে যাত্রীদের ঘুরপথে যেতে হয়। কখনো ঢাকা, কখনো ভৈরব হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে সময় লাগে প্রায় ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা।
অথচ সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু করা গেলে এই যাত্রা প্রায় ৭ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব হতো।
অর্থাৎ একটি রেললাইন শুধু দুই শহরের দূরত্ব কমাত না; কমাত সময়, পরিবহন ব্যয় এবং মানুষের দুর্ভোগও। একই সঙ্গে ময়মনসিংহ ও সিলেটের ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও সামাজিক যোগাযোগ আরও গতিশীল হতে পারত।

সিলেটের রেল যোগাযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক হতাশার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’।
২০২৩ সালে অনুমোদন পাওয়া এই ট্রেনকে ঘিরে সিলেটবাসীর প্রত্যাশা ছিল অনেক। আধুনিক, ননস্টপ ও আন্তর্জাতিক মানের সেবা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ঢাকার সঙ্গে সিলেটের দ্রুত রেল যোগাযোগে এটি নতুন দিগন্ত খুলবে—এমন আশাই করেছিলেন যাত্রীরা।
কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা, ইঞ্জিনের স্বল্পতা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে ট্রেনটি চালু হয়নি।

এরপর মে ও জুন মাসে বিষয়টি আবার সামনে আসে। সিলেট-৬ আসনের এমপি এমরান আহমদ চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী সংসদে জানান, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সিলেট–ঢাকা রেলপথে ‘টাঙ্গুয়া’ নামে নতুন ট্রেন চালু হবে।
কিন্তু ৩ সেপ্টেম্বর পেরিয়ে গেলেও টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেসের কোনো দেখা নেই।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টও নতুন ট্রেন চালুর বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেনি। ফলে সংসদে ঘোষিত নির্দিষ্ট তারিখও যখন পার হয়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—ঘোষণাটি কি কেবল ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

শুধু নতুন ট্রেন নয়, বিদ্যমান আন্তনগর ট্রেনের সেবাও নিয়ে সিলেটবাসীর অভিযোগের শেষ নেই।
সিলেট থেকে ঢাকাগামী আন্তনগর ট্রেনগুলোতে পথে বিভিন্ন স্টেশনে ব্যাপক যাত্রী ওঠানামার কারণে অনেক সময় ট্রেনের ভেতরে চলাচলের জায়গা থাকে না। আশুগঞ্জ, ভৈরব বাজার, নরসিংদীসহ বিভিন্ন স্টেশন থেকে যাত্রী ওঠায় সিলেট থেকে যাত্রা করা অনেক যাত্রীকে দীর্ঘ পথ দাঁড়িয়ে যেতে হয়—এমন অভিযোগ রয়েছে।
এ নিয়ে সম্প্রতি সিলেটবাসী মানববন্ধনও করেছেন। তাঁদের দাবি, ঢাকা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের দিকে যাওয়ার পথে আন্তনগর ট্রেনের স্টপেজ কমানো হোক, যাতে দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রীরা তুলনামূলক স্বস্তিতে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।

সিলেটবাসীর বক্তব্য, আন্তনগর ট্রেনের মূল বৈশিষ্ট্যই হলো দ্রুত ও তুলনামূলক আরামদায়ক যাত্রা। কিন্তু পথে অতিরিক্ত স্টপেজ ও যাত্রী ওঠানামার কারণে সেই সুবিধা অনেকটাই নষ্ট হচ্ছে।

সিলেট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা শ্রীমঙ্গল। চা-বাগান, পাহাড়, বনাঞ্চল, হাওর ও বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে শ্রীমঙ্গল দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য।

প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা রয়েছে এখানে। রাধানগরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্র। পাশাপাশি লেবু, আনারস, কাঁঠাল ও চা-বাগানের বিস্তৃত চাষাবাদকে ঘিরে গড়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতি। এসব খাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শত শত মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন।
ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাধানগরের নামও। ১৭৮ বিঘা জমির ডলুছড়া পাহাড় ব্রিটিশ শাসনামলে শ্রীমঙ্গলের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও দানবীর রাধা নাথ দেব চৌধুরী কিনেছিলেন। পরে তিনি জমিটি তাঁর চার সন্তানের মধ্যে বণ্টন করেন। তাঁদের কেউ কেউ জমি বিক্রি করেন, আর অবশিষ্ট জমির একটি অংশ সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন কারণে হাতছাড়া হয়ে যায়। তাঁর নাম থেকেই গড়ে ওঠে ‘রাধানগর’, যা বর্তমানে সিলেট বিভাগের অন্যতম উন্নত ও সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে পরিচিত।

এত সম্ভাবনার পরও শ্রীমঙ্গলসহ সিলেট বিভাগের পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে ঘিরে আধুনিক রেলসেবা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবাসী ও অর্থনৈতিক অঞ্চল। বিপুল প্রবাসী আয়, চা শিল্প, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং পর্যটন—সব মিলিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে এ অঞ্চলের গুরুত্ব উল্লেখযোগ্য।
জাফলং, রাতারগুল, বিছানাকান্দি, লালাখান কিংবা শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান—প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রই দেশের পর্যটন খাতকে আরও বড় করার সম্ভাবনা রাখে। কিন্তু আধুনিক ও দ্রুত রেল যোগাযোগের অভাব সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর পথে একটি বড় সীমাবদ্ধতা।
ঢাকা থেকে সিলেটগামী ট্রেনগুলোর অনেকগুলো এখনো পুরোনো ইঞ্জিননির্ভর। কোথাও কোথাও রেলের গতিবেগ ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটারের নিচে নেমে আসে। ফলে সড়কপথের যানজট ও দীর্ঘ যাত্রার বিকল্প হিসেবে যে রেলকে আরও কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, সেটিও অনেক ক্ষেত্রে সময়সাশ্রয়ী বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।

২০১৭ থেকে শুরু করে পরবর্তী বছরগুলোতে সিলেটের রেল যোগাযোগ নিয়ে একের পর এক ঘোষণা এসেছে। নতুন ট্রেন, ডাবল লাইন, সরাসরি ময়মনসিংহ–সিলেট রেল যোগাযোগ, সিলেট–জাফলং রেলসড়ক—প্রতিটি উদ্যোগই মানুষের মনে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
কিন্তু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবায়নের দূরত্ব দিন দিন স্পষ্ট হয়েছে।

সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষ মানববন্ধন, মিছিল, সভা ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে রেল যোগাযোগ উন্নয়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের বক্তব্য এখন অনেকটা অভিন্ন—আর ঘোষণা নয়, এবার তাঁরা বাস্তব কাজ দেখতে চান।
কারণ একটি ট্রেন শুধু কয়েকশ যাত্রীকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায় না। একটি কার্যকর রেলপথের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের সময়, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, কর্মসংস্থান এবং একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতি।

৩ সেপ্টেম্বর পেরিয়ে গেছে। সংসদে ঘোষিত তারিখও এখন অতীত। অথচ সিলেটবাসীর অপেক্ষা শেষ হয়নি।
তাঁরা আর নতুন কোনো তারিখ শুনতে চান না। তাঁরা দেখতে চান ট্রেন। দেখতে চান আধুনিক রেললাইন। চান দ্রুতগামী ও নির্ভরযোগ্য রেলসেবা।
সিলেটের রেলপথ যেন আর প্রতিশ্রুতির স্টেশনে দাঁড়িয়ে না থাকে—এটাই এখন এই অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা।