img

কোয়াড সিক্যুরিটি ডায়লগঃ বাংলাদেশকে নিয়ে চীনের মাথাব্যাথা? - ইমরান চৌধুরী

প্রকাশিত :  ২০:১৭, ২৯ মে ২০২১

কোয়াড সিক্যুরিটি ডায়লগঃ বাংলাদেশকে নিয়ে চীনের মাথাব্যাথা? - ইমরান চৌধুরী
কোয়াডল্যাট্যারাল (চতুর্ভুজাকার) নিরাপত্তা সংলাপ একটা  নতুন অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইন্ডিয়া, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে - এই চারটি দেশের কারণে এই সংলাপটির নামের আবির্ভাব। ২০০৭ সালে জাপানের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী সেঞ্জে আবে’ প্রথমে এই নতুন উদ্যোগটি নিয়ে অগ্রসর হয় তখনকার আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড এবং ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং প্রমুখদের সহায়তায়। সংলাপটির সাথে সাথে তাঁরা সমান্তরালভাবে শুরু করেন একটি যৌথ সামরিক মহড়া - ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব মহড়া - ‘\'মালাবার মহড়া।‘\'
সামরিক মহড়া এবং কূটনৈতিক সংস্থিতির ব্যাপকতা এবং আয়োজনের পরিসর দেখেই বিশেষজ্ঞরা অনুধাবন করেন  যে, এই সকল সংলাপ এবং মহড়ার প্রধান উদ্দেশ্য হল চায়নার সামরিক এবং অর্থনৈতিক পেশী সঞ্চালন রোধ করা। চায়না সরকার  সঙ্গে সঙ্গে তড়িঘড়ি করে সকল সদস্যদেরকে  আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রতিবাদ প্রেরণ করে।
অস্ট্রেলিয়ার জন হাওয়ার্ড এর নেতৃত্ব চলে গেল নতুন সরকার প্রধান কেভিন রুড এই ডায়লগ থেকে দূরে সরে যায় বিভিন্ন কারণে - তারপরেও বাকি তিন দেশ তাদের ডায়লগ চালিয়ে যেতে থাকে এবং ২০১০ সালে রুড সরকার এর পর যখন জুলিয়া গিলার্ড প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পুনরায় পুনরুজ্জীবিত হয় কোয়াড এবং এর ফলশ্রুতিতে ইউ, এস মেরিনরা অস্ট্রেলিয়ার নিকট ডারউইন দ্বীপে অবস্থান গ্রহণ করে যাতে করে মেরিনরা তিমুর সাগর এবং ল্যাম্বক প্রণালিতে নজর রাখতে পারে এবং একই সাথে পুনরায় সেই পুরানো চার দেশে মিলে মালাবার এ নৌ বাহিনীর মহড়া করতে থাকে। 
২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও চায়নার হটাৎ বৃদ্ধি প্রাপ্ত সামরিক এবং ব্যাবসায়িক প্রতিপত্তি খর্ব না করলে সামনের দিনগুলোতে অত্র অঞ্চলের সকল ক্ষমতা দখল হয়ে যেতে পারে ভেবে পুনরায় এই সংলাপ আশিয়ান ট্রিটি ভুক্ত দেশ গুলোর সম্মেলনে উৎথাপন করে এবং সংলাপ চালাতে থাকে - যা কিনা চীনকে বেশ ভাবান্বিত করে তুলে - চায়না এই নব্য উদ্যোগ কে ‘\'নতুন কোল্ড ওয়ার‘\' হিসেবে আখ্যায়িত করে। 
চায়না কোন অংশে  কম না সেও সাউথ চায়না সমুদ্র এবং পূর্ব চায়না সমুদ্রে তার পেশি প্রসার করতে থাকে - আশেপাশের দেশগুলোকে সস্তা কিস্তিতে ঋণ দিয়ে ক্রমান্বয়ে ঐ দেশগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলতে থাকে। আর ঐ ফাঁদের বেড়াজালে আস্তে আস্তে সমুদ্র - ব্যবসা - উন্নয়নের নামে চায়না তার প্রভাব বিস্তার করতে থাকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে। এখন সে সম্পূর্ণ ইন্ডিয়ান মহাসাগর - থেকে শুরু করে বে অফ বেঙ্গল রিজিওন কন্ট্রোল নেবার পায়তারা করছে। 
চায়নার এই নব্য সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবের ভয়ে দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ভিয়েতনাম ও কোয়াড প্লাস প্লান এ সংযোজিত হতে থাকে, ক্রমে ক্রমে কোয়াড সংলাপ এর ছত্রতলে আরও অনেক গুলো হুমকি প্রাপ্ত দেশ আশ্রয় নিতে থাকে চায়নার এই  নতুন আগ্রাসী বৈদেশিক নীতির ভয়ে। ইন্ডিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাজ্য সেই ১৯৯১ সালে ইন্ডিয়ার ওপেন হবার সময় থেকেই একে ওপরের সম্পূরক এক বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে থাকে এবং কোয়াড সংলাপকে আজ অনেক ভূ রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা এশিয়ান ন্যাটো হিসেবে দেখতে থাকে। 

অত্র এলাকার নিরাপত্তা এবং অর্থনীতিকে সচল রাখতে হলে চায়নার এই মোড়ল এর পোশাকে আবির্ভূত হওয়া কোন দেশই সহজ ভাবে মেনে নিতে পারছে না। মার্কিন নব্য প্রেশিডেন্ট এই বার কোভিড ১৯ এর দুর্দশা কে ব্যবহার করতঃ অত্র এলাকার দেশ গুলোর সাথে এক সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলছে যা কিনা আগামীতে এই নতুন সংলাপকে এক নতুন সামরিক - ভূ রাজনৈতিক অ্যালায়েন্সে পর্যবসিত করতে পারে এবং তার জন্য চায়নার সরকার চায়নার আশেপাশের সকল দেশ উপর এক ধরনের স্নায়ু চাপ বৃদ্ধি করতে থাকে বিভিন্ন পন্থার মাধ্যমে। বাংলাদেশের সাথে ইন্ডিয়ার ঐতিহাসিক, সংস্কৃতি, অংশীদারি সামাজিক নীতি রীতি দ্বারা সমৃক্ত সেই ৫০০০ বছর যাবত; বাংলাদেশের সবচে’ নিকটতম প্রতিবেশী- যার দ্বারা বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ঘেরা - এবং একই জলরাশি বে অফ বেঙ্গল - এরাবিয়ান সমুদ্র এবং ইন্ডিয়ান ওশান দিয়ে পরিমন্ডলে। স্বভাবত কারণেই বাংলাদেশ ইন্ডিয়ার সাথে এই নতুন স্নায়ুযুদ্ধের অংশীদার হওয়াটাই স্বাভাবিক । বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিকটতম দেশের নিকটই সংরক্ষিত দুরের এই নব্য  পেশীশক্তির পেশীর নিষ্পেষণে না যাওয়াটাই শ্রেয়। সেই কারণেই হয়ত বাংলাদেশ ইন্ডিয়ার স্বার্থ এবং বাংলাদেশের ভূমি, সৈকত, জনবলকে নিরাপদ রাখার জন্য এই সংলাপে থাকাটাই সবচে’ বুদ্ধিমান বিবেচনা। 
যদিও এখনও এই ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি - কিন্তু অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে চায়না খুবি উদ্বিগ্ন বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে - গত কয়েক মাস যাবত যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের সামরিক নেতাদের আগমন এবং বাংলাদেশের সামরিক ব্যক্তিবর্গদের বিদেশ ভ্রমন দেখে চায়না ধরে নিয়েছে যে, বাংলাদেশ হয়ত বা এই দলে যোগ দিয়েই ফেললো বুঝি । বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ এবং ভারত বাংলাদেশের সবচে পরীক্ষিত বন্ধুর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থাকাটা শ্রেয় , তাহলে অন্যদের এই ব্যাপারে কোন প্রকার নাক গলানোর অবকাশ নাই। কিন্তু, আশ্চর্য হলেও সত্য যে চায়না বাংলাদেশেকে এই সংলাপে না প্রবেশ করার জন্য বেশ তৎপর হয়ে পরেছে। কয়েকটি অতি উচ্চ শ্রেণীর হর্তা কর্তা ব্যক্তিরা অহরহ বাংলাদেশে কূটনৈতিক ভ্রমণ করছে - যাতে করে বাংলাদেশ ইন্ডিয়ার হাত ধরে - এই উদ্যোগ  এর দিকে পা’  না বাড়ায় । কিন্তু কেন ? কেন এত মাথাব্যথা এবং কেনই বা তাদের এত কুম্ভীরাশ্রু নির্গমন করার দরকার ? যে দেশ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের সকল ধরনের সাহায্য করেছিল - এই সেই বাংলা যেই বাংলার মানুষদের নির্মম ভাবে হত্যা করার জন্য চায়নিজ রাইফেল এর গুলি বানানোর ফ্যাক্টরি ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়ে তড়িঘড়ি করে চালু করেছে - যাহার  পর্দা উন্মোচন করতে তদানীন্তন চায়নিজ ডিফেন্স মিনিস্টার এসেছিল , আজ সেই দেশের জন্য এত ভালবাসা কেন? 
ব্যাবসায়িক সম্পর্ক, অস্ত্র বিক্রি, অর্থ লগ্নি, তাদের বানানো কাঁচামাল ব্যবহার করে আমাদের রফতানি বাণিজ্যে প্রসার এবং আমাদের অবকাঠামো প্রোজেক্টে সফট হারে সুদ দিয়ে সাহায্য করা -এই সব গুলোই ওরা করেছে ওদের স্বার্থে - যার জন্য বাংলাদেশ হয়তো কৃতজ্ঞ এবং সফলতার অংশীদার মনে করে; তার মানে এই নয় যে, বাংলাদেশ তাদের একটি ভ্যাসাল স্টেট বা তাবেদার রাষ্ট্র। বর্তমান পৃথিবীতে বাংলাদেশ একটি উদাহারন - বাংলাদেশ একটি রোল মডেল - বাংলাদেশকে অনুকরণ করতে সেই ১৯৭১ বর্বররাও উৎসাহী। বাংলাদেশ আজ সারা পৃথিবীতে সমাদরে সম্ভাষিত তাঁর ফেলা আসা অতীত দারিদ্রতাকে উন্নয়নের সোপানে পরিবর্তনের এবং রূপান্তরের জন্য। 
সম্প্রতি চায়নিজ  পদাতিক সামরিক এবং নৌ সেনাদের পায়তারা - হিমালয়ের চূড়ায় সৈন্য সমাবেশ, মায়ানমার এর সাথে সখ্যতা, বে অফ বেঙ্গল এ নৌসেনা জনিত পেশী সঞ্চালন, ঋণ ফাঁদ পেতে পার্শ্ববর্তী দেশের সমুদ্র বন্দর দখলে নিয়ে নেওয়া, ইন্ডিয়ান ওসোন রিজিওন এবং থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া সহ আশেপাশের সকল দেশের দিকে চাতক পাখির মত তাকানোর কারণে বাংলাদেশের ও শঙ্কা হওয়াটা স্বাভাবিক - এবং এই চাইনিজ সামরিক অক্ষের থেকে তাদের চির পরীক্ষিত বন্ধু জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারত এর সাথে হাত  মিলিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আনিত এই সংলাপ থেকে জোট যোগদান করাটা এক ধরনের নিরাপত্তা বীমা। 
আর এতে চাইনিজ অস্ত্র ও ঋণ কূটনীতি দিয়ে ভয় দেখানো বা অহেতুক বাংলাদেশকে নিয়ে মাথাব্যাথা  একান্তই অহেতুক এবং অনভিপ্রেত। 
একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে তাঁর সামরিক এবং ভূ রাজনৈতিক পার্টনার খোঁজার স্বাধীনতা একান্তই কাম্য। 

[লেখক একজন বিশ্লেষক এবং ভূ রাজনীতি বিশেষজ্ঞ]
img

জনতার নেতা, সন্তানের কাছে পরাজিত

প্রকাশিত :  ১৪:১৮, ০৭ অক্টোবর ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত

বর্তমান সমাজে নতুন প্রজন্মের সন্তানরা কীভাবে বেড়ে উঠছে, তা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। শিক্ষা, অর্থ-বিত্ত, সামাজিক মর্যাদা কিংবা প্রতিষ্ঠা—সবকিছু অর্জনের পরও একজন মানুষ জীবনের শেষ সময়ে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটি প্রত্যাশা করেন, তা হলো আপনজনের একটু ভালোবাসা, যত্ন ও নিরাপদ আশ্রয়। অথচ বাস্তবতা কখনো কখনো এত নির্মম হয়ে ওঠে যে, যাঁরা সারাজীবন মানুষের জন্য কাজ করেছেন, জনগণের ভালোবাসায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁরাই শেষ বয়সে নিজের সন্তানদের কাছেই অবহেলার শিকার হন।

এই এলাকার এমন তিনজন দাপুটে রাজনৈতিক নেতার কথা মনে পড়ে, যাঁরা নিজ নিজ সময়ে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন। মানুষের প্রত্যাশা পূরণেও তাঁরা অনেকাংশে সফল হয়েছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তিনজনের পরিণতিই যেন আমাদের সমাজ ও পারিবারিক মূল্যবোধের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে গেছে।

প্রথমজন ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে এলাকায় সংগঠক হিসেবে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর হাতে গড়া সেই সংগঠন পরবর্তীতে এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসায় ভোটের মাধ্যমে তিনিও জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

জীবনের শেষ সময়ে, মৃত্যুর মাত্র দুই-তিন মাস আগে, তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। সে সময় তাঁকে বলেছিলাম, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেছেন, আপনি আপিল করলে বা আপিল করতে গেলে স্বীকৃতি পাবেন।

আমার কথা শুনে তিনি শান্তভাবে বলেছিলেন, “আমার আর সময় নেই।”

এরপর তিনি আরেক নেতার নাম এবং সেই নেতার এক সন্তানের নাম উল্লেখ করে বলেছিলেন, তাঁর মতো সৃষ্টি করতে পারেননি এমন কেউ, যে সংগ্রাম করে, আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে আমার স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। বাকিটা উপরওয়ালা দেখবেন।

সেটিই ছিল তাঁর সঙ্গে আমার জীবনের শেষ কথা।

দ্বিতীয়জন ছিলেন একজন দাপুটে জনপ্রতিনিধি। তাঁর সরকারের আমলে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী ও পথচারী এর সুফল ভোগ করছেন। মানুষের চলাচলে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পরবর্তীতেও তিনি সরাসরি ভোটে আবার জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল, তিনি তাঁর পরিবারের সবাইকে এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন যে তা সত্যিই বিস্ময়কর। সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর আন্তরিকতারও অভাব ছিল না। অথচ শোনা যায়, জীবনের শেষ বয়সে তাঁকে অনেক কষ্ট পেয়ে পরপারে পাড়ি দিতে হয়েছে।

তৃতীয়জন ছিলেন দুর্দান্ত ও ডাকসাইটে এক নেতা। তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল এমন যে নির্বাচনী প্রচারে টাকা-পয়সা খরচ না করে শুধু পায়ে হেঁটে কয়েকজন মানুষকে সঙ্গে নিয়ে প্রচার চালিয়েই তিনি শক্তিশালী এক প্রতিদ্বন্দ্বীকে নাকানিচোবানি খাইয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সমাজে তাঁর অবদানও কম নয়। একাধারে তিনি ছিলেন সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ এবং রাজনীতির মাঠে একজন ভালো বক্তা—একজন ওরাটার। মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ও জনপ্রিয়তা তাঁকে আলাদা অবস্থান দিয়েছিল।

রাজনীতির মাঠে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়েছিলেন, জনগণের ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে পরিবারের দুই-একজন সন্তানের কাছে যেন সেই মানুষটিই হেরে গেলেন। পরিবারের অবহেলিত অন্য নেতাদের মতো তাঁর অবস্থাও খুব একটা ভিন্ন ছিল না। এলাকায় কানাঘুষা আছে, শেষ বয়সে টাকা দিতে না পারার কারণে তাঁকে সন্তানদের হাতে নাজেহাল পর্যন্ত হতে হয়েছে।

তবে এই গল্পের একটি আশাব্যঞ্জক দিকও আছে। তাঁর স্বীকৃতির জন্য তাঁর অপর এক সন্তান হাইকোর্টে রিট করে আদেশ পর্যন্ত করিয়েছেন। হয়তো সেই স্বীকৃতি পাওয়ার বাস্তবায়ন এখন সময়ের অপেক্ষা।

তিনটি জীবনের গল্প, তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়—কিন্তু শেষ অধ্যায়ে এসে যেন একই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় আমাদের।

যাঁরা জীবনের সোনালি সময়টুকু মানুষের জন্য ব্যয় করেছেন, জনগণের ভালোবাসায় জনপ্রতিনিধি হয়েছেন, সমাজ ও এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন, তাঁরাই যদি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের সন্তানদের কাছ থেকে ভালোবাসা, সম্মান ও সামান্য যত্নটুকু না পান, তাহলে আমাদের শিক্ষা ও সভ্যতার সাফল্য কোথায়?

প্রশ্নটি শুধু এই তিনজন নেতাকে ঘিরে নয়। এটি আজকের সমাজের একটি বৃহত্তর বাস্তবতার দিকেও আমাদের দৃষ্টি ফেরায়।

আজকের অসুস্থ সামাজিক বাস্তবতার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো—নতুন প্রজন্মের একটি অংশ ক্রমেই সুস্থ শিক্ষা, নৈতিকতা ও পারিবারিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তারা অনেক সময় লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে এমন কিছু মানুষের পেছনে ঘুরছে, যাঁরা সমাজে প্রভাবশালী, ক্ষমতাবান কিংবা তথাকথিত সমাজপতি হিসেবে পরিচিত। তাঁদের কথাকে আদর্শ মনে করে, তাঁদের ইঙ্গিতকে নির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করে অনেক তরুণ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে।

কখনো রাজনীতি, কখনো ক্ষমতার ছায়া, কখনো অর্থের লোভ, আবার কখনো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়—সব মিলিয়ে একটি অংশের তরুণদের সামনে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে লেখাপড়া, চরিত্র, নৈতিকতা কিংবা ভবিষ্যৎ গড়ার চেয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা এবং প্রভাবশালী কারও অনুসারী হওয়াকেই তারা সাফল্যের পথ বলে মনে করছে।

মানুষের মান-সম্মান, পারিবারিক মর্যাদা কিংবা নিজের ভবিষ্যৎ—এসব নিয়েও অনেকের মধ্যে আর আগের মতো ভাবনা নেই। কে সম্মানিত মানুষ, কার কাছ থেকে কী শেখা উচিত, কোন কাজটি সমাজের জন্য ভালো আর কোনটি অপরাধ—এই বোধটুকুও অনেকের মধ্যে ক্রমেই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই বিপথগামিতার ফল শুধু ওই তরুণকেই ভোগ করতে হয় না; এর খেসারত দিতে হয় তার পরিবারকেও। একজন সন্তান যখন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, রাজনীতির নামে বিশৃঙ্খলায় যুক্ত হয় কিংবা ভুল মানুষের অনুসরণ করতে করতে নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে, তখন তার বাবা-মায়ের ঘুম হারাম হয়। সন্তানের অপকর্মের কারণে পরিবারকে সামাজিকভাবে লজ্জিত হতে হয়, কখনো আইনি জটিলতায় পড়তে হয়, কখনো অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়।

অথচ অনেক বাবা-মা হয়তো সেই সন্তানকেই মানুষ করার জন্য জীবনের সর্বস্ব দিয়েছেন।

কেউ হয়তো নিজের জমি বিক্রি করেছেন, কেউ ধার-দেনা করেছেন, কেউ নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন। কেউ সন্তানকে উচ্চশিক্ষা দিয়েছেন, কেউ বিদেশে পাঠিয়েছেন। সন্তান যেন প্রতিষ্ঠিত হয়, ভালো মানুষ হয়—এই স্বপ্নেই বাবা-মা জীবনের সেরা সময়টুকু কাটিয়েছেন। কিন্তু সেই সন্তানই যখন ভুল পথে পা বাড়ায়, তখন বাবা-মায়ের সেই ত্যাগ, স্বপ্ন ও ভালোবাসা যেন এক মুহূর্তে প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এখানেই আমাদের সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।

বর্তমানে এমন অনেক ঘটনা শোনা যায়, যেখানে বাবা-মা জীবনের সমস্ত কষ্ট, ত্যাগ ও সঞ্চয় দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়া করান, উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেন, বড় ডিগ্রি অর্জনের পথ তৈরি করে দেন। এমনকি অনেকে সন্তানদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশেও পাঠান। সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত হয়, ভালো চাকরি পায়, অর্থ-বিত্ত অর্জন করে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে দেওয়া বাবা-মায়ের অনেকের খোঁজখবর নেওয়ার সময়টুকুও তারা আর পায় না।

কখনো কখনো পরিস্থিতি আরও নির্মম হয়ে ওঠে। পত্র-পত্রিকায় এমন ঘটনাও জানা গেছে, কোনো কোনো বাবা বা মা এক সপ্তাহ কিংবা তারও আগে মারা যাওয়ার পর প্রতিবেশীরা দুর্গন্ধ পেয়ে বিষয়টি জানতে পেরেছেন এবং পুলিশকে খবর দিয়েছেন। পরে পুলিশ এসে দেখতে পেয়েছে, ঘরের ভেতরেই পড়ে আছে মৃতদেহ। অথচ সন্তানরা জানেন না, কিংবা জানলেও দীর্ঘ সময় ধরে কোনো খোঁজ নেননি যে তাঁদের বাবা বা মা মারা গেছেন।

এমন ঘটনা অত্যন্ত করুণ, মর্মান্তিক এবং একই সঙ্গে আমাদের সামাজিক বিবেকের জন্য গভীর লজ্জার। যে সন্তানকে বাবা-মা এত কষ্ট করে মানুষ করলেন, যে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য তাঁরা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিলেন, সেই সন্তান যদি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁদের খোঁজটুকুও না রাখে, তাহলে সেই উচ্চশিক্ষা, সেই ডিগ্রি, সেই সামাজিক প্রতিষ্ঠার অর্থ কী?

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শুধু অবহেলাই নয়—কোনো কোনো পরিবারে সন্তানদের হাতে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নাজেহাল বা নির্যাতনের ঘটনাও শোনা যায়। বিশেষ করে টাকা-পয়সা দিতে না পারলে কিংবা সন্তানের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে কোনো কোনো বাবা-মা নিজেদের সন্তানদের কাছেই অপমান, দুর্ব্যবহার এমনকি নির্যাতনের শিকার হন।

একজন বৃদ্ধ বাবা, যিনি একদিন সন্তানের হাত ধরে তাকে হাঁটতে শিখিয়েছেন, জীবনের শেষ বয়সে সেই সন্তানের কাছেই যদি অর্থের জন্য অপমানিত হন—এর চেয়ে বেদনাদায়ক পরিণতি আর কী হতে পারে?

আর এই বাস্তবতার সঙ্গে যখন অসুস্থ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ যুক্ত হয়, তখন সমস্যাটি আরও গভীর হয়। রাজনীতি মানুষের কল্যাণ, অধিকার ও নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু রাজনীতির নামে যদি তরুণদের একটি অংশকে শুধু মিছিল, ক্ষমতার প্রদর্শন, প্রতিপক্ষ দমন, অর্থের লেনদেন কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রচ্ছায়ায় থাকার সংস্কৃতির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, তাহলে তার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি শুধু রাজনীতির নয়—সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।

যে তরুণের হাতে বই থাকার কথা, তার হাতে যদি অপরাধের হাতিয়ার উঠে আসে; যে তরুণের চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন থাকার কথা, সে যদি কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তির নির্দেশের অপেক্ষায় দিন কাটায়; যে তরুণের বাবা-মা তাকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখেছেন, সে যদি তাদের কথাই শুনতে না চায়—তাহলে এই অবক্ষয়ের দায় শুধু ব্যক্তির নয়, আমাদের সামগ্রিক সামাজিক পরিবেশেরও।

তবে এর অর্থ এই নয় যে রাজনীতি নিজেই তরুণদের নষ্ট করে। বরং রাজনীতির নামে যখন অনৈতিকতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অপরাধপ্রবণতা ও অন্ধ আনুগত্যকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তখনই তা তরুণদের বিপথে নেওয়ার একটি বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে।

একটি সুস্থ রাজনীতি তরুণদের মানুষের পাশে দাঁড়াতে শেখায়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শেখায়। দেশ, সমাজ ও মানুষের জন্য কাজ করতে শেখায়। কিন্তু অসুস্থ রাজনীতি তরুণদের ক্ষমতার পেছনে ছুটতে শেখায়, অন্যায়কে স্বাভাবিক করে তোলে এবং কখনো কখনো অপরাধকেও সাহসের পরিচয় হিসেবে উপস্থাপন করে।

এই পার্থক্যটি না বুঝলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।

শুধু সন্তানদের দোষ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাজনীতি—সব ক্ষেত্রেই আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। সন্তানকে যদি ছোটবেলা থেকেই শুধু ভালো ফলাফল, ভালো চাকরি, অর্থ-বিত্ত ও প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু তাকে মানবিকতা, নৈতিকতা, পারিবারিক দায়িত্ব ও কৃতজ্ঞতার শিক্ষা দেওয়া না হয়, তাহলে তার শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে শুধু নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে শেখায় না; অন্যের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখায়। বিশেষ করে বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা, সম্মান ও দায়িত্ববোধ একজন মানুষের নৈতিক শিক্ষার অন্যতম ভিত্তি হওয়া উচিত।

আজকের প্রজন্মের অনেক সন্তান উচ্চশিক্ষিত হচ্ছে। বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করছে, ভালো চাকরি করছে, অর্থ-বিত্ত ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জন করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই শিক্ষার কতটুকু তাদের মানুষ করে তুলছে?

একজন সন্তান যদি শিক্ষিত হয়েও বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে না দাঁড়ায়, তাঁদের অসহায়ত্ব না বোঝে, তাঁদের শেষ বয়সের প্রয়োজনকে বোঝা মনে করে, তাহলে সেই শিক্ষা কতটা অর্থবহ—এ প্রশ্ন আমাদের নিজেদের কাছেই রাখতে হবে।

রাষ্ট্রের আইন আছে, আদালত আছে, প্রশাসন আছে। কিন্তু আইন তো প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে দেখে না—কোনো বৃদ্ধ বাবা আজ ওষুধ পেলেন কি না, কোনো মা একাকী বসে আছেন কি না, তাঁদের সঙ্গে সন্তানরা কেমন আচরণ করছে। আইনেরও একটি সীমা আছে। একটি পরিবারের ভেতরের ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা কোনো আইন দিয়ে পুরোপুরি তৈরি করা যায় না।

তাই সন্তানকে শুধু শিক্ষিত নয়, মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব পরিবারকেই নিতে হবে। তাকে শেখাতে হবে—বাবা-মা শুধু শৈশবে সন্তানের আশ্রয় নন; একদিন সন্তানেরও বাবা-মায়ের আশ্রয় হতে হয়।

কারণ জীবনের নির্মম সত্য হলো, আজ যে বাবা সন্তানের হাত ধরে হাঁটতে শেখান, কাল সেই বাবারই হয়তো হাঁটার জন্য সন্তানের হাতের প্রয়োজন হবে। যে মা সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেন, একদিন সেই মায়ের খাবারের প্লেটটিও হয়তো সন্তানের হাতে তুলে দিতে হবে।

আর যেসব বাবা-মা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে সন্তানদের উচ্চশিক্ষা দিয়েছেন, বিদেশে পাঠিয়েছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন—তাঁদের কথা তো আরও বেশি করে মনে রাখা উচিত। সন্তানের সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের ত্যাগ যদি থাকে, তবে সেই সাফল্যের প্রথম ঋণও তাঁদের প্রতিই।

রাজনীতির মাঠে জয়ী হওয়া যায় ভোটে। প্রতিপক্ষকে হারানো যায় সংগঠন ও জনপ্রিয়তার শক্তিতে। কিন্তু জীবনের শেষ বিচারে একজন মানুষের সবচেয়ে বড় জয় হলো—তার সন্তানরা তাকে ভালোবাসে, সম্মান করে এবং শেষ দিন পর্যন্ত পাশে থাকে।

এই তিনজন নেতার জীবন আমাদের সেই কথাটিই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—মানুষের ভালোবাসা অর্জন করা বড় কথা, কিন্তু নিজের সন্তানদের হৃদয়ে একজন ভালো বাবা-মা হয়ে বেঁচে থাকা তার চেয়েও বড় অর্জন।

আজ যারা তরুণ, যারা উচ্চশিক্ষিত হচ্ছে, যারা দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তাদের প্রত্যেকের কাছে তাই একটি প্রশ্ন রেখে যেতে হয়—আপনার সাফল্যের পেছনে যে বাবা-মা নিজেদের জীবন, স্বপ্ন ও স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন, তাঁদের শেষ জীবনে আপনার অবস্থান কোথায়?

মনে রাখতে হবে, বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা কোনো দয়া নয়, কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। তাঁদের জীবনের শেষ দিনগুলো যেন একাকিত্ব, অবহেলা, অপমান কিংবা অনিশ্চয়তায় না কাটে—এ দায়িত্ব শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি একটি সুস্থ সমাজ গড়ারও অন্যতম শর্ত।

কারণ একটি সমাজ কতটা শিক্ষিত, তা শুধু তার ডিগ্রির সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। একটি সমাজ কতটা সভ্য, তা বোঝা যায় সে সমাজ তার বৃদ্ধ বাবা-মা, অসহায় মানুষ এবং আপনজনদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তা দেখেই।

জনতার নেতা হয়েও যদি কেউ সন্তানের কাছে পরাজিত হন, আর একজন সাধারণ বাবা-মা সারাজীবন সন্তানকে মানুষ করে শেষ বয়সে যদি সন্তানের কাছেই অবহেলিত হন—তাহলে সেই পরাজয় শুধু একজন মানুষের নয়; কোথাও না কোথাও সেটি আমাদের পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং মানবিকতারও পরাজয়।

তাই এখনই সময়, সন্তানদের শুধু সফল নয়—মানুষ করে গড়ে তোলার। তাদের শুধু পৃথিবী জয় করার শিক্ষা নয়, নিজের ঘর, নিজের শিকড় এবং নিজের বাবা-মাকে ভালোবাসার শিক্ষাও দিতে হবে।

নইলে একদিন হয়তো আমরা দেখব—সন্তানরা পৃথিবীর নানা প্রান্তে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু তাঁদের বৃদ্ধ বাবা-মা পড়ে আছেন একাকী ঘরে। আর সেই ঘরের দরজা খুলে প্রতিবেশীরাই হয়তো আবিষ্কার করছেন, যাঁদের সন্তান পৃথিবীর কাছে সফল, তাঁদের শেষ জীবনে পাশে থাকার মতো একজন মানুষও ছিল না।

এমন সমাজ আমরা চাই না।

আমরা এমন একটি প্রজন্ম চাই, যারা শিক্ষিত হবে, কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে মানবিকতাও ধারণ করবে; যারা রাজনীতি করবে, কিন্তু অপরাধ ও অন্ধ আনুগত্যের রাজনীতি নয়—মানুষের কল্যাণের রাজনীতি করবে; যারা সমাজের প্রভাবশালী মানুষের কাছ থেকে শুধু ক্ষমতার কৌশল নয়, নীতি ও আদর্শ শেখার চেষ্টা করবে; যারা বাবা-মায়ের ত্যাগকে কখনো ভুলবে না।

কারণ সমাজের অধঃপতন একদিনে ঘটে না। ছোট ছোট অবহেলা, ভুল আদর্শ, অন্ধ অনুসরণ, নৈতিকতার অবক্ষয় এবং পারিবারিক মূল্যবোধের ক্ষয় একসময় একটি অসুস্থ সমাজের জন্ম দেয়। আর সেই সমাজের প্রথম ও সবচেয়ে বড় শিকার হয় আমাদের সন্তানরাই—তারপর তাঁদের বাবা-মা, পরিবার এবং শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজ।

জনতার ভালোবাসায় নেতা হওয়া যায়, ভোটে জয়ী হওয়া যায়, ক্ষমতা অর্জন করা যায়। কিন্তু মানুষের জীবনের শেষ বিচারে সবচেয়ে বড় পরিচয় কোনো পদ, ক্ষমতা কিংবা জনপ্রিয়তা নয়। সবচেয়ে বড় পরিচয়—সে কেমন মানুষ ছিল, কেমন বাবা বা মা ছিল এবং তার সন্তানরা তাকে কতটা ভালোবেসে শেষ পর্যন্ত পাশে দাঁড়িয়েছিল।

সেই বিচারে জয়ী হওয়াই জীবনের সবচেয়ে বড় জয়।