img

কোয়াড সিক্যুরিটি ডায়লগঃ বাংলাদেশকে নিয়ে চীনের মাথাব্যাথা? - ইমরান চৌধুরী

প্রকাশিত :  ২০:১৭, ২৯ মে ২০২১

কোয়াড সিক্যুরিটি ডায়লগঃ বাংলাদেশকে নিয়ে চীনের মাথাব্যাথা? - ইমরান চৌধুরী
কোয়াডল্যাট্যারাল (চতুর্ভুজাকার) নিরাপত্তা সংলাপ একটা  নতুন অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইন্ডিয়া, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে - এই চারটি দেশের কারণে এই সংলাপটির নামের আবির্ভাব। ২০০৭ সালে জাপানের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী সেঞ্জে আবে’ প্রথমে এই নতুন উদ্যোগটি নিয়ে অগ্রসর হয় তখনকার আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড এবং ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং প্রমুখদের সহায়তায়। সংলাপটির সাথে সাথে তাঁরা সমান্তরালভাবে শুরু করেন একটি যৌথ সামরিক মহড়া - ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব মহড়া - ‘\'মালাবার মহড়া।‘\'
সামরিক মহড়া এবং কূটনৈতিক সংস্থিতির ব্যাপকতা এবং আয়োজনের পরিসর দেখেই বিশেষজ্ঞরা অনুধাবন করেন  যে, এই সকল সংলাপ এবং মহড়ার প্রধান উদ্দেশ্য হল চায়নার সামরিক এবং অর্থনৈতিক পেশী সঞ্চালন রোধ করা। চায়না সরকার  সঙ্গে সঙ্গে তড়িঘড়ি করে সকল সদস্যদেরকে  আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রতিবাদ প্রেরণ করে।
অস্ট্রেলিয়ার জন হাওয়ার্ড এর নেতৃত্ব চলে গেল নতুন সরকার প্রধান কেভিন রুড এই ডায়লগ থেকে দূরে সরে যায় বিভিন্ন কারণে - তারপরেও বাকি তিন দেশ তাদের ডায়লগ চালিয়ে যেতে থাকে এবং ২০১০ সালে রুড সরকার এর পর যখন জুলিয়া গিলার্ড প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পুনরায় পুনরুজ্জীবিত হয় কোয়াড এবং এর ফলশ্রুতিতে ইউ, এস মেরিনরা অস্ট্রেলিয়ার নিকট ডারউইন দ্বীপে অবস্থান গ্রহণ করে যাতে করে মেরিনরা তিমুর সাগর এবং ল্যাম্বক প্রণালিতে নজর রাখতে পারে এবং একই সাথে পুনরায় সেই পুরানো চার দেশে মিলে মালাবার এ নৌ বাহিনীর মহড়া করতে থাকে। 
২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও চায়নার হটাৎ বৃদ্ধি প্রাপ্ত সামরিক এবং ব্যাবসায়িক প্রতিপত্তি খর্ব না করলে সামনের দিনগুলোতে অত্র অঞ্চলের সকল ক্ষমতা দখল হয়ে যেতে পারে ভেবে পুনরায় এই সংলাপ আশিয়ান ট্রিটি ভুক্ত দেশ গুলোর সম্মেলনে উৎথাপন করে এবং সংলাপ চালাতে থাকে - যা কিনা চীনকে বেশ ভাবান্বিত করে তুলে - চায়না এই নব্য উদ্যোগ কে ‘\'নতুন কোল্ড ওয়ার‘\' হিসেবে আখ্যায়িত করে। 
চায়না কোন অংশে  কম না সেও সাউথ চায়না সমুদ্র এবং পূর্ব চায়না সমুদ্রে তার পেশি প্রসার করতে থাকে - আশেপাশের দেশগুলোকে সস্তা কিস্তিতে ঋণ দিয়ে ক্রমান্বয়ে ঐ দেশগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলতে থাকে। আর ঐ ফাঁদের বেড়াজালে আস্তে আস্তে সমুদ্র - ব্যবসা - উন্নয়নের নামে চায়না তার প্রভাব বিস্তার করতে থাকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে। এখন সে সম্পূর্ণ ইন্ডিয়ান মহাসাগর - থেকে শুরু করে বে অফ বেঙ্গল রিজিওন কন্ট্রোল নেবার পায়তারা করছে। 
চায়নার এই নব্য সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবের ভয়ে দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ভিয়েতনাম ও কোয়াড প্লাস প্লান এ সংযোজিত হতে থাকে, ক্রমে ক্রমে কোয়াড সংলাপ এর ছত্রতলে আরও অনেক গুলো হুমকি প্রাপ্ত দেশ আশ্রয় নিতে থাকে চায়নার এই  নতুন আগ্রাসী বৈদেশিক নীতির ভয়ে। ইন্ডিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাজ্য সেই ১৯৯১ সালে ইন্ডিয়ার ওপেন হবার সময় থেকেই একে ওপরের সম্পূরক এক বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে থাকে এবং কোয়াড সংলাপকে আজ অনেক ভূ রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা এশিয়ান ন্যাটো হিসেবে দেখতে থাকে। 

অত্র এলাকার নিরাপত্তা এবং অর্থনীতিকে সচল রাখতে হলে চায়নার এই মোড়ল এর পোশাকে আবির্ভূত হওয়া কোন দেশই সহজ ভাবে মেনে নিতে পারছে না। মার্কিন নব্য প্রেশিডেন্ট এই বার কোভিড ১৯ এর দুর্দশা কে ব্যবহার করতঃ অত্র এলাকার দেশ গুলোর সাথে এক সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলছে যা কিনা আগামীতে এই নতুন সংলাপকে এক নতুন সামরিক - ভূ রাজনৈতিক অ্যালায়েন্সে পর্যবসিত করতে পারে এবং তার জন্য চায়নার সরকার চায়নার আশেপাশের সকল দেশ উপর এক ধরনের স্নায়ু চাপ বৃদ্ধি করতে থাকে বিভিন্ন পন্থার মাধ্যমে। বাংলাদেশের সাথে ইন্ডিয়ার ঐতিহাসিক, সংস্কৃতি, অংশীদারি সামাজিক নীতি রীতি দ্বারা সমৃক্ত সেই ৫০০০ বছর যাবত; বাংলাদেশের সবচে’ নিকটতম প্রতিবেশী- যার দ্বারা বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ঘেরা - এবং একই জলরাশি বে অফ বেঙ্গল - এরাবিয়ান সমুদ্র এবং ইন্ডিয়ান ওশান দিয়ে পরিমন্ডলে। স্বভাবত কারণেই বাংলাদেশ ইন্ডিয়ার সাথে এই নতুন স্নায়ুযুদ্ধের অংশীদার হওয়াটাই স্বাভাবিক । বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিকটতম দেশের নিকটই সংরক্ষিত দুরের এই নব্য  পেশীশক্তির পেশীর নিষ্পেষণে না যাওয়াটাই শ্রেয়। সেই কারণেই হয়ত বাংলাদেশ ইন্ডিয়ার স্বার্থ এবং বাংলাদেশের ভূমি, সৈকত, জনবলকে নিরাপদ রাখার জন্য এই সংলাপে থাকাটাই সবচে’ বুদ্ধিমান বিবেচনা। 
যদিও এখনও এই ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি - কিন্তু অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে চায়না খুবি উদ্বিগ্ন বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে - গত কয়েক মাস যাবত যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের সামরিক নেতাদের আগমন এবং বাংলাদেশের সামরিক ব্যক্তিবর্গদের বিদেশ ভ্রমন দেখে চায়না ধরে নিয়েছে যে, বাংলাদেশ হয়ত বা এই দলে যোগ দিয়েই ফেললো বুঝি । বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ এবং ভারত বাংলাদেশের সবচে পরীক্ষিত বন্ধুর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থাকাটা শ্রেয় , তাহলে অন্যদের এই ব্যাপারে কোন প্রকার নাক গলানোর অবকাশ নাই। কিন্তু, আশ্চর্য হলেও সত্য যে চায়না বাংলাদেশেকে এই সংলাপে না প্রবেশ করার জন্য বেশ তৎপর হয়ে পরেছে। কয়েকটি অতি উচ্চ শ্রেণীর হর্তা কর্তা ব্যক্তিরা অহরহ বাংলাদেশে কূটনৈতিক ভ্রমণ করছে - যাতে করে বাংলাদেশ ইন্ডিয়ার হাত ধরে - এই উদ্যোগ  এর দিকে পা’  না বাড়ায় । কিন্তু কেন ? কেন এত মাথাব্যথা এবং কেনই বা তাদের এত কুম্ভীরাশ্রু নির্গমন করার দরকার ? যে দেশ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের সকল ধরনের সাহায্য করেছিল - এই সেই বাংলা যেই বাংলার মানুষদের নির্মম ভাবে হত্যা করার জন্য চায়নিজ রাইফেল এর গুলি বানানোর ফ্যাক্টরি ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়ে তড়িঘড়ি করে চালু করেছে - যাহার  পর্দা উন্মোচন করতে তদানীন্তন চায়নিজ ডিফেন্স মিনিস্টার এসেছিল , আজ সেই দেশের জন্য এত ভালবাসা কেন? 
ব্যাবসায়িক সম্পর্ক, অস্ত্র বিক্রি, অর্থ লগ্নি, তাদের বানানো কাঁচামাল ব্যবহার করে আমাদের রফতানি বাণিজ্যে প্রসার এবং আমাদের অবকাঠামো প্রোজেক্টে সফট হারে সুদ দিয়ে সাহায্য করা -এই সব গুলোই ওরা করেছে ওদের স্বার্থে - যার জন্য বাংলাদেশ হয়তো কৃতজ্ঞ এবং সফলতার অংশীদার মনে করে; তার মানে এই নয় যে, বাংলাদেশ তাদের একটি ভ্যাসাল স্টেট বা তাবেদার রাষ্ট্র। বর্তমান পৃথিবীতে বাংলাদেশ একটি উদাহারন - বাংলাদেশ একটি রোল মডেল - বাংলাদেশকে অনুকরণ করতে সেই ১৯৭১ বর্বররাও উৎসাহী। বাংলাদেশ আজ সারা পৃথিবীতে সমাদরে সম্ভাষিত তাঁর ফেলা আসা অতীত দারিদ্রতাকে উন্নয়নের সোপানে পরিবর্তনের এবং রূপান্তরের জন্য। 
সম্প্রতি চায়নিজ  পদাতিক সামরিক এবং নৌ সেনাদের পায়তারা - হিমালয়ের চূড়ায় সৈন্য সমাবেশ, মায়ানমার এর সাথে সখ্যতা, বে অফ বেঙ্গল এ নৌসেনা জনিত পেশী সঞ্চালন, ঋণ ফাঁদ পেতে পার্শ্ববর্তী দেশের সমুদ্র বন্দর দখলে নিয়ে নেওয়া, ইন্ডিয়ান ওসোন রিজিওন এবং থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া সহ আশেপাশের সকল দেশের দিকে চাতক পাখির মত তাকানোর কারণে বাংলাদেশের ও শঙ্কা হওয়াটা স্বাভাবিক - এবং এই চাইনিজ সামরিক অক্ষের থেকে তাদের চির পরীক্ষিত বন্ধু জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারত এর সাথে হাত  মিলিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আনিত এই সংলাপ থেকে জোট যোগদান করাটা এক ধরনের নিরাপত্তা বীমা। 
আর এতে চাইনিজ অস্ত্র ও ঋণ কূটনীতি দিয়ে ভয় দেখানো বা অহেতুক বাংলাদেশকে নিয়ে মাথাব্যাথা  একান্তই অহেতুক এবং অনভিপ্রেত। 
একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে তাঁর সামরিক এবং ভূ রাজনৈতিক পার্টনার খোঁজার স্বাধীনতা একান্তই কাম্য। 

[লেখক একজন বিশ্লেষক এবং ভূ রাজনীতি বিশেষজ্ঞ]
img

চুপ্পুর পদত্যাগ নিয়ে কিছু কথা

প্রকাশিত :  ০৯:৩৪, ০৪ আগষ্ট ২০২৬

আবদুল হামিদ মাহবুব

মো. শাহাবুদ্দিন চুপ্পু অবশেষে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। অনেক দিন ধরেই এই পদত্যাগ নিয়ে আলোচনা চলছিল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকেই তার পদে থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং আন্দোলনকারীদের একটি অংশ মনে করতেন, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার এই পদে থাকা উচিত নয়। আবার অন্যরা বলেছিলেন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করাও জরুরি। এই দুই অবস্থানের টানাপোড়েনের মধ্যেই তিনি দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

তার পদত্যাগপত্র প্রকাশের পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ তিনি শুধু পদত্যাগ করেননি। দীর্ঘ একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। সেখানে তিনি নিজের দায়িত্ব পালনের মূল্যায়ন করেছেন। সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলায় নিজের ভূমিকার কথাও বলেছেন। একই সঙ্গে নিজের গুরুতর অসুস্থতার বর্ণনাও দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, একটি পদত্যাগপত্রে এত কিছু বলার প্রয়োজন ছিল কি?

রাষ্ট্রপতির পদ একটি সাংবিধানিক পদ। এই পদে থাকা ব্যক্তি শুধু একজন ব্যক্তি নন। তিনি রাষ্ট্রের একটি প্রতীকও। তাই তার প্রতিটি বক্তব্য গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে বিদায়ের সময় লেখা একটি চিঠি ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। সেই কারণে তার প্রতিটি শব্দ নিয়েও আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক।

তিনি লিখেছেন, তিনি নিষ্ঠা, সততা এবং সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। এটি তার নিজের মূল্যায়ন। কিন্তু একজন রাষ্ট্রপতির কাজের প্রকৃত মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত জনগণ, ইতিহাস এবং গবেষকরাই করবেন। নিজের কর্মের প্রশংসা নিজে করলে সেটি সব সময় সবাই গ্রহণ করবেন, এমন নয়। তিনি আরও বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনার পর দেশে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছিল। সেই সংকট থেকে বের হতে তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত নেন। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেন। তিনি এটাও বলেছেন, তার ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।

এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেবে। কারণ সেই সময়ের ঘটনাকে সবাই একইভাবে দেখেন না। কেউ মনে করেন রাষ্ট্রপতি প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। আবার কেউ মনে করেন, তিনি পরিস্থিতির চাপে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আরও অনেকে বলেন, তার আগে নেওয়া নানা সিদ্ধান্তের কারণেই তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ফলে তার নিজের ভূমিকার এমন প্রশংসা বিতর্ককে আরও বাড়াতে পারে।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তার অসুস্থতার বর্ণনা। তিনি লিখেছেন, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা এবং অটোনোমিক নিউরোপ্যাথিতে তিনি ভুগছেন। তিনি বলেছেন, মাঝে মাঝে তিনি অচেতন হয়ে যান। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসারও প্রয়োজন রয়েছে।

অসুস্থতার কারণে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়; এটি একটি গ্রহণযোগ্য কারণ। যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা প্রয়োজন। একজন রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন তিনি আর সেই দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না, তাহলে পদত্যাগ করাই যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন উঠে আসে। যদি মূল কারণ অসুস্থতা হয়, তাহলে এত দীর্ঘ ব্যাখ্যার প্রয়োজন ছিল কেন? তিনি চাইলে খুব সংক্ষিপ্ত ভাষায় বলতে পারতেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা আর সম্ভব নয়। তাই সংবিধান অনুযায়ী আমি পদত্যাগ করছি। এতটুকুই যথেষ্ট হতো। এতে কোনো বিতর্কও তৈরি হতো না।

বরং দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি যেন নিজের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ভূমিকার একটি ব্যাখ্যা রেখে যেতে চেয়েছেন। অনেকের কাছে সেটি আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা বলেও মনে হতে পারে। কারণ পদত্যাগপত্র সাধারণত নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার জায়গা নয়। এটি মূলত দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার একটি আনুষ্ঠানিক নথি।

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে বিতর্ক ছিল। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ শুরু থেকেই তার অপসারণ দাবি করেছিল। রাষ্ট্রপতি ভবন ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচিও হয়েছিল। তখন যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তাকে সরালে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতে পারে। তাই তাকে পদে রাখা হয়। সেই সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না ভুল ছিল, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু এটাও সত্য, সেই সময় দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রশ্নটি সামনে ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে কঠিন বাস্তবতা ছিল। তাই তারা কোন যুক্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেটিও আলোচনার বিষয়।

এখন তিনি বিদায় নেওয়ার সময় নিজের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। এতে যারা এত দিন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার যুক্তি দিয়েছিলেন, তাদের অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠতেই পারে। কারণ রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যকে অনেকেই রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখবেন।আরেকটি প্রশ্ন এখন জনমনে ঘুরছে। তিনি কি ভবিষ্যতে আইনের আওতায় আসবেন? এ প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তিনি আইনি দায়ে দোষী হয়ে যান না। অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত হতে হবে। প্রমাণ থাকলে বিচার হবে। আদালতই শেষ কথা বলবেন।

তার অতীত ভূমিকা নিয়ে নানা সময়ে রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা হয়েছে। দুদকে দায়িত্ব পালন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে নেওয়া সিদ্ধান্ত এবং অন্যান্য দায়িত্ব নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ও বিতর্ক রয়েছে। আবার এসব অভিযোগের অনেকগুলোর বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায়ও নেই। তাই আইন ও সংবিধানের পথেই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার স্বাক্ষরে তৎকালীন সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়েছে। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত বা ফৌজদারি দায়—এই দুটি বিষয় এক নয়। যদি কেউ মনে করেন তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বা আইনের লঙ্ঘন করেছেন, তাহলে তারও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিচার হতে হবে। আবেগ নয়, প্রমাণই সেখানে প্রধান বিষয়।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড়।কোনো ব্যক্তি আজ ক্ষমতায় থাকবেন, কাল থাকবেন না। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকবে। তাই প্রতিটি সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির উচিত এমনভাবে দায়িত্ব পালন করা, যাতে তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে। কারণ রাষ্ট্রপতির প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হলে রাষ্ট্রের মর্যাদাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

চুপ্পুর পদত্যাগ একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। কিন্তু এর মাধ্যমে অনেক প্রশ্নের শেষ হয়নি। বরং নতুন করে অনেক প্রশ্ন সামনে এসেছে। কেন তিনি এত দিন পদে ছিলেন? কেন বিদায়ের সময় এত ব্যাখ্যা দিলেন? তার ভূমিকার প্রকৃত মূল্যায়ন কী হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।

ইতিহাস খুব ধৈর্য নিয়ে বিচার করে। ইতিহাস কারও আত্মপ্রশংসা দেখে সিদ্ধান্ত দেয় না। আবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগ শুনেও সিদ্ধান্ত দেয় না। ইতিহাস দলিল দেখে। ঘটনা দেখে। মানুষের অভিজ্ঞতা দেখে। এরপর রায় দেয়।

চুপ্পুর পদত্যাগপত্র হয়তো একদিন গবেষণার বিষয় হবে। সেখানে তার দাবি যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে সমালোচনাও। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তখন বিচার করবে, তিনি সত্যিই সাংবিধানিক সংকট রক্ষা করেছিলেন, নাকি কেবল নিজের ভূমিকার পক্ষে একটি ব্যাখ্যা রেখে গেছেন।

সবশেষে একটি কথাই বলা যায়। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। পদও স্থায়ী নয়। কিন্তু মানুষের কর্ম ইতিহাসে থেকে যায়। তাই বিদায়ের সময় সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত বিনয়। সবচেয়ে বড় ভাষা হওয়া উচিত সংযম। আর সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত জবাবদিহি। একটি সংক্ষিপ্ত ও মর্যাদাপূর্ণ পদত্যাগপত্র হয়তো আরও কম বিতর্ক তৈরি করত। কিন্তু দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি নিজের বিদায়কেই আবারও নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব  ও  যুগ্ম সাধারণ  সম্পাদক, মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল। মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪
ই-মেইল: [email protected]

মতামত এর আরও খবর