img

ফিলাডেলফিয়ার গৃহহীন আর নেশাগ্রস্ত মানুষের কথা

প্রকাশিত :  ০৮:৩১, ১৬ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:২১, ১৬ মে ২০২৬

ফিলাডেলফিয়ার গৃহহীন আর নেশাগ্রস্ত মানুষের কথা
ফিলাডেলফিয়ার কেনসিংটনে সড়কের পাশে থাকা গৃহহীন নেশাগ্রস্ত কয়েকজন।

আবদুল হামিদ মাহবুব

আমি বাংলাদেশের মানুষ। আমার একমাত্র সন্তান টেম্পল ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছে। সেই সুবাদে আমাকে যুক্তরাষ্ট্র আসতে হয়। আমার থাকা হয় ছেলের সাথেই, ফিলাডেলফিয়া শহরে। বাংলাদেশে আমি একজন পেশাদার সাংবাদিক ছিলাম। ৪৪ বছর সাংবাদিকতা করেছি। বর্তমানে রিপোটিং পেশা থেকে অবসর নিয়েছি। তবে দেশের সংবাদপত্রে মাঝেমধ্যে কলাম লিখি। সেই কারণে এই লেখার অবতারণা।

আমার প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র সফর ছিল ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে। যদিও আমি আনুষ্ঠানিক ভাবে সাংবাদিকতা থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছি, তথাপি লেখালেখি ছাড়তে পারিনি। তাই ওই সময়ে প্রথম লেখাটি লিখেছিলাম দেশের প্রধানতম সংবাদপত্র 'ইত্তেফাক'-এ। শিরোনাম ছিল 'উন্নত দেশের হালচাল'। সেই লেখা ছাপা হয়েছিল ২০২৪ সালের ২৩ নভেম্বর। লেখার মূল বিষয় ছিল, গৃহহীন ও মাদকাসক্ত নেশাগ্রস্তদের কথা। সেই লেখা বেরোনোর পর বাঙালি কমিউনিটির কেউ কেউ আমাকে ব্যাঙ্গ করেছিলেন। এবার এসে যখন ফেসবুক স্ক্রল করছি, সামনে আসলো ফিলাডেলফিয়া মেয়র শেরেল পার্কারের বক্তব্য। তার সেই বক্তব্য থেকে এই সিটিতে হোমলেস ও নেশাগ্রস্ত মানুষ সম্পর্কে অনেক তথ্য পেয়ে গেলাম। এই ডিজিটাল যুগে গুগল সার্চ করায় আরো কিছু তথ্য সামনে আসলো। তাই আবারও সেই একই বিষয় নিয়েই লিখছি।

চারদিন আগে দেওয়া মেয়র শেরেল পার্কারের বক্তব্য থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের  ফিলাডেলফিয়া শহরটি আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। নগরীর রাজপথ, রেলস্টেশন, পার্ক কিংবা সেতুর নিচে বসবাসকারী মানুষদের উপস্থিতি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো দৃশ্য নয়; বরং এটি শহরের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া একটি বড় নগর সংকট।

এই প্রেক্ষাপটে ফিলাডেলফিয়া সিটি কর্তৃপক্ষ হোটেল কক্ষের ওপর কর বৃদ্ধি করে সেই অর্থ গৃহহীন মানুষের সহায়তায় ব্যয় করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা শুধু একটি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়; বরং এটি নগর প্রশাসনের সামাজিক দায়বদ্ধতারও বহিঃপ্রকাশ।

মেয়র প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই কর বৃদ্ধির মাধ্যমে বছরে প্রায় ২ কোটি ডলার রাজস্ব আসবে। ২০০ ডলারের একটি হোটেল কক্ষের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৪ ডলার কর দিতে হবে। শুনতে সামান্য মনে হলেও, এই অর্থ দিয়ে নতুন আশ্রয়কেন্দ্র, পুনর্বাসন সেবা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং রাস্তার মানুষের কাছে পৌঁছানোর কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া সিটি মেয়র শেরেল পার্কার গৃহহীন ও নেশাগ্রস্তদের পুন:বাসন বিষয়ে বক্তব্য রাখছেন। 

ফিলাডেলফিয়ার বাস্তবতা বোঝার জন্য শহরটির সামগ্রিক চিত্র জানা জরুরি। মার্কিন আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শহরটির জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৫ লাখ ৭৪ হাজার। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ বৃহত্তম শহর। শহরের আয়তন প্রায় ১৪২ বর্গমাইল বা ৩৬৭ বর্গকিলোমিটার। 

এই বিশাল নগরীতে রয়েছে লাখ লাখ আবাসিক ইউনিট। শহরের মোট হাউজিং ইউনিটের সংখ্যা প্রায় সাত লাখের কাছাকাছি। এর মধ্যে প্রায় ৫২ শতাংশ মানুষ নিজেদের মালিকানাধীন ঘরে বসবাস করেন। বাকিরা ভাড়াটিয়া। তবে আবাসন ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকায় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য শহরে টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠছে। 

ফিলাডেলফিয়ার অর্থনীতি ঐতিহাসিকভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন এবং ছোট ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। “দ্য পিউ চ্যারিটেবল ট্রাস্টস এবং স্টেট অব দ্য সিটি টুয়েন্টি টোয়েন্টি-ফাইভ” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরের মোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ৯২ শতাংশই ছোট ব্যবসা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাত শহরের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের উৎস। 

কিন্তু এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি শহরে বৈষম্যও স্পষ্ট। কয়েক বছর আগেও ফিলাডেলফিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দরিদ্র বড় শহর বলা হতো। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দারিদ্র্যের হার কিছুটা কমেছে, তারপরও শহরের প্রায় প্রতি পাঁচজনের একজন এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন। 

এই দারিদ্র্য, উচ্চ ভাড়া, মাদকাসক্তি এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংকট মিলেই গৃহহীনতার সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেছে। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, শহরে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ৫ হাজার ৫০০–এর বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ মানুষ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকলেও বাকিরা এখনো রাজপথে, অস্থায়ী তাঁবুতে বা অনিরাপদ স্থানে জীবন কাটাচ্ছেন। 

ফিলাডেলফিয়ার কেনসিংটন এলাকার পরিস্থিতি বিশেষভাবে আলোচিত। মাদক সংকট, বেকারত্ব এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে গৃহহীন মানুষের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায়ই অভিযোগ করেন; রাস্তায় মাদক সেবন, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং অনিরাপত্তা তাদের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করছে। অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, শুধু উচ্ছেদ নয়; প্রয়োজন স্থায়ী পুনর্বাসন এবং চিকিৎসা সহায়তা। 

এখানেই সিটি প্রশাসনের নতুন করনীতির গুরুত্ব। শহর কর্তৃপক্ষ মনে করছে, পর্যটন খাত থেকে সামান্য অতিরিক্ত কর নিয়ে সেই অর্থ সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করা হলে পুরো নগরই লাভবান হবে। কারণ গৃহহীনতা কেবল মানবিক সমস্যা নয়; এটি জননিরাপত্তা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

তবে এই নীতির সমালোচনাও রয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, অতিরিক্ত হোটেল কর পর্যটন খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। পর্যটকরা অন্য শহর বেছে নিতে পারেন। বিশেষ করে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি কিংবা বোস্টনের মতো শহরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় থাকা ফিলাডেলফিয়ার জন্য এটি একটি ঝুঁকি।

কিন্তু পাল্টা যুক্তিও শক্তিশালী। যদি অতিরিক্ত ৪ ডলার কর দিয়ে রাজপথে বসবাসকারী একজন মানুষকে আশ্রয়, চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া যায়, তাহলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে শহরের জন্য অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক হতে পারে। কারণ গৃহহীনতা কমলে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়, আইনশৃঙ্খলা ব্যয় এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিও কমে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো; গৃহহীনতা শুধু বাসস্থান না থাকা নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি মানসিক অসুস্থতা, পারিবারিক সহিংসতা, চাকরি হারানো, আসক্তি কিংবা স্বাস্থ্য সংকটের ফল। ফলে শুধু আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সমন্বিত নগরনীতি।

ফিলাডেলফিয়া প্রশাসন বর্তমানে আশ্রয়কেন্দ্রের শয্যা বাড়ানো, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। মেয়র শেরেল পার্কার প্রশাসন ইতোমধ্যে নতুন রিকভারি সেন্টার চালু করেছে, যেখানে শতাধিক মানুষের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকবে। 

বিশ্বের বড় শহরগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, গৃহহীনতা মোকাবিলায় 'আগে বাসস্থান' নীতি কার্যকর হতে পারে। অর্থাৎ একজন মানুষকে আগে নিরাপদ বাসস্থানে নিয়ে আসতে হবে; এরপর তার চিকিৎসা, কর্মসংস্থান কিংবা পুনর্বাসনের পরিকল্পনা সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

ফিলাডেলফিয়ার নতুন করনীতি সেই পথেই একটি পদক্ষেপ হতে পারে। যদিও এটি পুরো সমস্যার সমাধান নয়, তবে নগর প্রশাসনের একটি স্পষ্ট বার্তা রয়েছে; রাজপথে মানুষ পড়ে থাকবে আর শহর চোখ বন্ধ করে থাকবে, সেই সময় শেষ হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের নগরীগুলোর জন্যও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার বিষয় হতে পারে। ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা সিলেটেও গৃহহীন ও ভাসমান মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু অধিকাংশ সময় বিষয়টি দান-খয়রাত বা মৌসুমি শীতবস্ত্র বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনায় গৃহহীন মানুষের জন্য আবাসন, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং কর্মসংস্থান অন্তর্ভুক্ত হয় না।

ফিলাডেলফিয়ার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, একটি শহর যদি সত্যিই মানবিক হতে চায়, তাহলে তাকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ভেতরেও সামাজিক ন্যায়বিচারের জায়গা তৈরি করতে হবে। শহরের হোটেল, ব্যবসা, পর্যটন এবং উন্নয়ন; সবকিছু তখনই অর্থবহ, যখন সেই শহরে কোনো মানুষকে ফুটপাথে রাত কাটাতে না হয়।

পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ নগরী শুধু উন্নত অবকাঠামো দিয়ে তৈরি হয় না; বরং এটি তৈরি হয় নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত করার মাধ্যমে। আর সেই কারণেই ফিলাডেলফিয়ার নতুন করনীতি এখন শুধু একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং নগর সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।



লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব।

[email protected]











img

গাজায় ইসরায়েলি নিষ্ঠুরতা ও ভারতের নীরবতা: সোনিয়া গান্ধী

প্রকাশিত :  ০৬:৫১, ০১ জুলাই ২০২৬

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন অভিযোগ করেছিল, গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। ২০২৬ সালের জুনে একই কমিশন, যার নেতৃত্বে বর্তমানে ভারতের সাবেক বিচারপতি এস মুরলীধর রয়েছেন, আবারও দাবি করেছে যে গাজার শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার চেষ্টা করছে ইসরায়েল।

৯৪ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনটি পড়া সত্যিই এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। ইসরায়েল গাজায় যে চরম ধ্বংসযজ্ঞ ও পরিকল্পিত গণহত্যা চালাচ্ছে, তার রোমহর্ষ বিবরণ রয়েছে এতে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত ২০ হাজার শিশু নিহত এবং আরও ৪৪ হাজার শিশু আহত হয়েছে, যাদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছে। শিশুদের ওপর এই হামলা কোনো দুর্ঘটনাবশত ঘটনা নয়, এটি একটি পরিকল্পিত কৌশল। হতাহত ব্যক্তিদের শতকরা ২৭ ভাগই শিশু। নিহত অনেক ছেলের মাথায় ও ঘাড়ে গুলির ক্ষত পাওয়া গেছে।

গাজার ৯৭ শতাংশ স্কুল ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। শিশু হাসপাতালসহ স্বাস্থ্য অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ায় গর্ভপাত এবং সন্তান প্রসবজনিত জটিলতা ৩০০ শতাংশ বেড়েছে।

হামাস কর্তৃক ইসরায়েলের ওপর চালানো হামলার পর আড়াই বছর পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাল্টা জবাব ছিল চরম নিষ্ঠুর ও বর্বরতায় ভরা। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু থেকে শুরু করে তাঁর মন্ত্রিসভার শীর্ষ সদস্যরা গাজাকে ‘সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ’ ও ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করার ডাক দিয়েছেন। তাঁরা ফিলিস্তিনিদের ‘পশু’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন যে তাদের ‘বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই’। এমনকি গাজা থেকে ‘লাখ লাখ মানুষের পালিয়ে যাওয়াকেই’ তাঁরা নিজেদের সাফল্য হিসেবে দেখছেন।

এমন স্পষ্ট গণহত্যামূলক অভিপ্রায় থাকা সত্ত্বেও, ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অকুণ্ঠ সমর্থন ইসরায়েলকে এই নিষ্ঠুর অভিযান চালিয়ে যেতে সাহায্য করছে। তবে বিশ্বের বাকি দেশগুলোর বিবেক এবার জেগে উঠেছে।

আমেরিকার ভেটো ও বাধার কারণে জাতিসংঘ কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে না পারলেও, এর সংস্থাগুলো ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধের নথিপত্র তৈরিতে চমৎকার ভূমিকা পালন করেছে। পশ্চিমা ব্লকের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত শীর্ষ দেশগুলো—যেমন ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া—ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, অথচ কয়েক দশক ধরে তারা ফিলিস্তিন ইস্যুতে উদাসীন ছিল। 

দক্ষিণ আফ্রিকা, যার সঙ্গে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের সংহতির ইতিহাস রয়েছে, তারা ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের দায়ে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আদালতে দাঁড় করিয়েছে। ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ ইসরায়েলে অস্ত্র বিক্রি সীমিত করেছে এবং লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশ সম্পর্ক ছিন্ন বা সীমিত করেছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এমনকি ইসরায়েলি রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছেন। ভারতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এমন বহু দেশ গাজায় ইসরায়েলের এই কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।

মোদি সরকারের এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা শুধু নৈতিকভাবেই ভুল নয়, বরং ভারতের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের দিক থেকেও এর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই। আমরা এমন এক সময়ে ইসরায়েলের কৌশলগত বলয়ের দিকে আরও ঝুঁকে পড়ছি, যখন সারা বিশ্ব তাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান জনরোষ এবং গাজায় চালানো এই বর্বরতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের মাঝেও ভারত কেবলই নীরব। বিচারপতি মুরলীধরের এই প্রতিবেদন, যা বিশ্বজুড়ে গাজা গণহত্যার বিরুদ্ধে নতুন করে আলোচনা ও আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে, তা নিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকার সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। অবশ্য এটি মোটেও অবাক হওয়ার মতো বিষয় নয়। মনে রাখা দরকার, ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার আগে বিজেপির নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশ কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন বিচারপতি মুরলীধর। এর পরপরই তাঁকে দিল্লি হাইকোর্ট থেকে বদলি করা হয়েছিল।

ভারত ঐতিহাসিকভাবে উপনিবেশবাদ-বিরোধী সংহতি, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক শান্তির পক্ষে এক অনন্য কণ্ঠস্বর ছিল। কিন্তু আজ বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত নিয়মকানুনের লঙ্ঘন, গ্লোবাল সাউথের মানুষের কষ্ট এবং গাজা ও পশ্চিম তীরে মানবতাবোধের চরম অবমাননার পরও ভারতের এই নীরবতা সত্যিই এক ব্যতিক্রমী ও দুঃখজনক ঘটনা।

পাঁচ বছরের শিশু হিন্দ রজবের করুণ গল্পটি গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার এক নির্মম প্রতীক। গাজা শহর থেকে পরিবারের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাদের গাড়ি লক্ষ্য করে ইসরায়েলি বাহিনী ৩৩৫টি গুলি চালায়। এতে তার পরিবারের ছয় সদস্যই নিহত হন। উদ্ধারকারীদের আসার অপেক্ষায় হিন্দ ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ির ভেতরে স্বজনদের লাশের মাঝে আটকে ছিল। শেষ পর্যন্ত দুই উদ্ধারকর্মীসহ তাকেও হত্যা করা হয়।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের নাগরিকদের মতো ভারতের নাগরিকদেরও হিন্দ রজব এবং গাজার অসংখ্য শিশুর এই গল্প জানার অধিকার আছে। অথচ, ইসরায়েলের অনুভূতিতে যাতে আঘাত না লাগে, সে জন্য এই বিষয়ক একটি চলচ্চিত্র ভারতে মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়েছিল। অবশেষে জনগণের তীব্র চাপের মুখে তা প্রদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

মোদি সরকারের এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা শুধু নৈতিকভাবেই ভুল নয়, বরং ভারতের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের দিক থেকেও এর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই। আমরা এমন এক সময়ে ইসরায়েলের কৌশলগত বলয়ের দিকে আরও ঝুঁকে পড়ছি, যখন সারা বিশ্ব তাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

এই যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে এবং ইরানের ওপর ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে হত্যার মাত্র কয়েক দিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ইসরায়েল সফর ইতিহাসে একটি বিভ্রান্তিকর কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হবে। এর ফলে ফিলিস্তিন, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ঐতিহাসিক বন্ধুদের কাছ থেকে আমরা নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছি।

আমরা বিশ্বজনমত থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। আর এই সুযোগে পাকিস্তানের মতো একটি দেশ, যারা নিজেরা সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য পরিচিত, তারা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে এগিয়ে এসেছে—যে ভূমিকার দাবিদার ঐতিহাসিকভাবে সবার বন্ধু হিসেবে ভারতেরই হওয়ার কথা ছিল। নিজেদের নৈতিকতা ও কৌশলগত স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে আমরা কেবল প্রধানমন্ত্রী মোদি ও প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর মধ্যকার বন্ধুত্বটুকুই পেয়েছি। অথচ সেই নেতানিয়াহু আজ খোদ আমেরিকাসহ পুরো বিশ্বেই সমালোচিত।

ভারতের জাতীয়তাবোধের চেতনা দাবি করে যে আমরা যেন আমাদের ফিলিস্তিনি ভাইবোনদের পক্ষে কথা বলি, যাঁদের সন্তানদের এভাবে নির্মমভাবে টার্গেট করা হচ্ছে। দেশের জাতীয় স্বার্থের জন্যও ইসরায়েলি গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড এবং পশ্চিম তীরে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি পরিবারকে উচ্ছেদ করার বিরুদ্ধে যে বিশ্বজনমত তৈরি হয়েছে, ভারত যেন তার সঙ্গে সুর মেলায়। মোদি সরকারের এই অনড় নীরবতার কোনো যৌক্তিক বা নৈতিক ব্যাখ্যা নেই।

সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির চেয়ারপারসন