img

ফিলাডেলফিয়ার গৃহহীন আর নেশাগ্রস্ত মানুষের কথা

প্রকাশিত :  ০৮:৩১, ১৬ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:২১, ১৬ মে ২০২৬

ফিলাডেলফিয়ার গৃহহীন আর নেশাগ্রস্ত মানুষের কথা
ফিলাডেলফিয়ার কেনসিংটনে সড়কের পাশে থাকা গৃহহীন নেশাগ্রস্ত কয়েকজন।

আবদুল হামিদ মাহবুব

আমি বাংলাদেশের মানুষ। আমার একমাত্র সন্তান টেম্পল ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছে। সেই সুবাদে আমাকে যুক্তরাষ্ট্র আসতে হয়। আমার থাকা হয় ছেলের সাথেই, ফিলাডেলফিয়া শহরে। বাংলাদেশে আমি একজন পেশাদার সাংবাদিক ছিলাম। ৪৪ বছর সাংবাদিকতা করেছি। বর্তমানে রিপোটিং পেশা থেকে অবসর নিয়েছি। তবে দেশের সংবাদপত্রে মাঝেমধ্যে কলাম লিখি। সেই কারণে এই লেখার অবতারণা।

আমার প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র সফর ছিল ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে। যদিও আমি আনুষ্ঠানিক ভাবে সাংবাদিকতা থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছি, তথাপি লেখালেখি ছাড়তে পারিনি। তাই ওই সময়ে প্রথম লেখাটি লিখেছিলাম দেশের প্রধানতম সংবাদপত্র 'ইত্তেফাক'-এ। শিরোনাম ছিল 'উন্নত দেশের হালচাল'। সেই লেখা ছাপা হয়েছিল ২০২৪ সালের ২৩ নভেম্বর। লেখার মূল বিষয় ছিল, গৃহহীন ও মাদকাসক্ত নেশাগ্রস্তদের কথা। সেই লেখা বেরোনোর পর বাঙালি কমিউনিটির কেউ কেউ আমাকে ব্যাঙ্গ করেছিলেন। এবার এসে যখন ফেসবুক স্ক্রল করছি, সামনে আসলো ফিলাডেলফিয়া মেয়র শেরেল পার্কারের বক্তব্য। তার সেই বক্তব্য থেকে এই সিটিতে হোমলেস ও নেশাগ্রস্ত মানুষ সম্পর্কে অনেক তথ্য পেয়ে গেলাম। এই ডিজিটাল যুগে গুগল সার্চ করায় আরো কিছু তথ্য সামনে আসলো। তাই আবারও সেই একই বিষয় নিয়েই লিখছি।

চারদিন আগে দেওয়া মেয়র শেরেল পার্কারের বক্তব্য থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের  ফিলাডেলফিয়া শহরটি আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। নগরীর রাজপথ, রেলস্টেশন, পার্ক কিংবা সেতুর নিচে বসবাসকারী মানুষদের উপস্থিতি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো দৃশ্য নয়; বরং এটি শহরের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া একটি বড় নগর সংকট।

এই প্রেক্ষাপটে ফিলাডেলফিয়া সিটি কর্তৃপক্ষ হোটেল কক্ষের ওপর কর বৃদ্ধি করে সেই অর্থ গৃহহীন মানুষের সহায়তায় ব্যয় করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা শুধু একটি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়; বরং এটি নগর প্রশাসনের সামাজিক দায়বদ্ধতারও বহিঃপ্রকাশ।

মেয়র প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই কর বৃদ্ধির মাধ্যমে বছরে প্রায় ২ কোটি ডলার রাজস্ব আসবে। ২০০ ডলারের একটি হোটেল কক্ষের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৪ ডলার কর দিতে হবে। শুনতে সামান্য মনে হলেও, এই অর্থ দিয়ে নতুন আশ্রয়কেন্দ্র, পুনর্বাসন সেবা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং রাস্তার মানুষের কাছে পৌঁছানোর কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া সিটি মেয়র শেরেল পার্কার গৃহহীন ও নেশাগ্রস্তদের পুন:বাসন বিষয়ে বক্তব্য রাখছেন। 

ফিলাডেলফিয়ার বাস্তবতা বোঝার জন্য শহরটির সামগ্রিক চিত্র জানা জরুরি। মার্কিন আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শহরটির জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৫ লাখ ৭৪ হাজার। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ বৃহত্তম শহর। শহরের আয়তন প্রায় ১৪২ বর্গমাইল বা ৩৬৭ বর্গকিলোমিটার। 

এই বিশাল নগরীতে রয়েছে লাখ লাখ আবাসিক ইউনিট। শহরের মোট হাউজিং ইউনিটের সংখ্যা প্রায় সাত লাখের কাছাকাছি। এর মধ্যে প্রায় ৫২ শতাংশ মানুষ নিজেদের মালিকানাধীন ঘরে বসবাস করেন। বাকিরা ভাড়াটিয়া। তবে আবাসন ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকায় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য শহরে টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠছে। 

ফিলাডেলফিয়ার অর্থনীতি ঐতিহাসিকভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন এবং ছোট ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। “দ্য পিউ চ্যারিটেবল ট্রাস্টস এবং স্টেট অব দ্য সিটি টুয়েন্টি টোয়েন্টি-ফাইভ” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরের মোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ৯২ শতাংশই ছোট ব্যবসা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাত শহরের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের উৎস। 

কিন্তু এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি শহরে বৈষম্যও স্পষ্ট। কয়েক বছর আগেও ফিলাডেলফিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দরিদ্র বড় শহর বলা হতো। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দারিদ্র্যের হার কিছুটা কমেছে, তারপরও শহরের প্রায় প্রতি পাঁচজনের একজন এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন। 

এই দারিদ্র্য, উচ্চ ভাড়া, মাদকাসক্তি এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংকট মিলেই গৃহহীনতার সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেছে। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, শহরে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ৫ হাজার ৫০০–এর বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ মানুষ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকলেও বাকিরা এখনো রাজপথে, অস্থায়ী তাঁবুতে বা অনিরাপদ স্থানে জীবন কাটাচ্ছেন। 

ফিলাডেলফিয়ার কেনসিংটন এলাকার পরিস্থিতি বিশেষভাবে আলোচিত। মাদক সংকট, বেকারত্ব এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে গৃহহীন মানুষের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায়ই অভিযোগ করেন; রাস্তায় মাদক সেবন, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং অনিরাপত্তা তাদের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করছে। অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, শুধু উচ্ছেদ নয়; প্রয়োজন স্থায়ী পুনর্বাসন এবং চিকিৎসা সহায়তা। 

এখানেই সিটি প্রশাসনের নতুন করনীতির গুরুত্ব। শহর কর্তৃপক্ষ মনে করছে, পর্যটন খাত থেকে সামান্য অতিরিক্ত কর নিয়ে সেই অর্থ সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করা হলে পুরো নগরই লাভবান হবে। কারণ গৃহহীনতা কেবল মানবিক সমস্যা নয়; এটি জননিরাপত্তা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

তবে এই নীতির সমালোচনাও রয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, অতিরিক্ত হোটেল কর পর্যটন খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। পর্যটকরা অন্য শহর বেছে নিতে পারেন। বিশেষ করে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি কিংবা বোস্টনের মতো শহরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় থাকা ফিলাডেলফিয়ার জন্য এটি একটি ঝুঁকি।

কিন্তু পাল্টা যুক্তিও শক্তিশালী। যদি অতিরিক্ত ৪ ডলার কর দিয়ে রাজপথে বসবাসকারী একজন মানুষকে আশ্রয়, চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া যায়, তাহলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে শহরের জন্য অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক হতে পারে। কারণ গৃহহীনতা কমলে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়, আইনশৃঙ্খলা ব্যয় এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিও কমে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো; গৃহহীনতা শুধু বাসস্থান না থাকা নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি মানসিক অসুস্থতা, পারিবারিক সহিংসতা, চাকরি হারানো, আসক্তি কিংবা স্বাস্থ্য সংকটের ফল। ফলে শুধু আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সমন্বিত নগরনীতি।

ফিলাডেলফিয়া প্রশাসন বর্তমানে আশ্রয়কেন্দ্রের শয্যা বাড়ানো, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। মেয়র শেরেল পার্কার প্রশাসন ইতোমধ্যে নতুন রিকভারি সেন্টার চালু করেছে, যেখানে শতাধিক মানুষের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকবে। 

বিশ্বের বড় শহরগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, গৃহহীনতা মোকাবিলায় 'আগে বাসস্থান' নীতি কার্যকর হতে পারে। অর্থাৎ একজন মানুষকে আগে নিরাপদ বাসস্থানে নিয়ে আসতে হবে; এরপর তার চিকিৎসা, কর্মসংস্থান কিংবা পুনর্বাসনের পরিকল্পনা সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

ফিলাডেলফিয়ার নতুন করনীতি সেই পথেই একটি পদক্ষেপ হতে পারে। যদিও এটি পুরো সমস্যার সমাধান নয়, তবে নগর প্রশাসনের একটি স্পষ্ট বার্তা রয়েছে; রাজপথে মানুষ পড়ে থাকবে আর শহর চোখ বন্ধ করে থাকবে, সেই সময় শেষ হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের নগরীগুলোর জন্যও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার বিষয় হতে পারে। ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা সিলেটেও গৃহহীন ও ভাসমান মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু অধিকাংশ সময় বিষয়টি দান-খয়রাত বা মৌসুমি শীতবস্ত্র বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনায় গৃহহীন মানুষের জন্য আবাসন, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং কর্মসংস্থান অন্তর্ভুক্ত হয় না।

ফিলাডেলফিয়ার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, একটি শহর যদি সত্যিই মানবিক হতে চায়, তাহলে তাকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ভেতরেও সামাজিক ন্যায়বিচারের জায়গা তৈরি করতে হবে। শহরের হোটেল, ব্যবসা, পর্যটন এবং উন্নয়ন; সবকিছু তখনই অর্থবহ, যখন সেই শহরে কোনো মানুষকে ফুটপাথে রাত কাটাতে না হয়।

পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ নগরী শুধু উন্নত অবকাঠামো দিয়ে তৈরি হয় না; বরং এটি তৈরি হয় নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত করার মাধ্যমে। আর সেই কারণেই ফিলাডেলফিয়ার নতুন করনীতি এখন শুধু একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং নগর সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।



লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব।

[email protected]











img

বদলে যাওয়া সাংবাদিকতা: আশির দশকের সংবাদ সংগ্রহ থেকে আজকের বাস্তবতা

প্রকাশিত :  ১৫:৪৩, ২১ আগষ্ট ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: আশির দশকের শেষ দিক। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের এক-দুই বছর আগের সময়। তখন শহর তো বটেই, গ্রামাঞ্চল এমনকি আরও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে তা সংবাদপত্রে পাঠানো ছিল একেবারেই ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা। আজকের মতো হাতের মুঠোয় মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, কম্পিউটার কিংবা মুহূর্তে সংবাদ পাঠানোর প্রযুক্তি তখন ছিল না। একজন সাংবাদিককে সংবাদ সংগ্রহ থেকে প্রকাশ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপই নিজের হাতে সম্পন্ন করতে হতো।

গ্রাম, শহর কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে খবর সংগ্রহ করে ফিরে এসে নিউজপ্রিন্টের কাগজে হাতে লিখে সংবাদ তৈরি করা হতো। এরপর তা ডাকযোগে পাঠানো ছিল সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি। মাঝেমধ্যে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেও সংবাদ পাঠানো হতো। তবে তখন কুরিয়ার খরচও কম ছিল না—প্রায় ১০ টাকা। সেই সময়ের হিসাবে এটিও ছিল যথেষ্ট ব্যয়বহুল। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডাকযোগেই সংবাদ পাঠানো হতো।

তবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংবাদ দ্রুত পাঠানোর প্রয়োজন হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে যেত। তখন মৌলভীবাজার শহরে গিয়ে টেলিগ্রামের মাধ্যমে সংবাদ পাঠাতে হতো। শ্রীমঙ্গল শহরেও টেলিফোনে যোগাযোগের একটি ব্যবস্থা ছিল। পাবলিক টেলিফোন ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনের সময় লাইন পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। দিনের পর দিন চেষ্টা করেও সংযোগ মিলত না। হঠাৎ কখনো এক-দুবার লাইন পাওয়া গেলে সেটিই ছিল সৌভাগ্যের ব্যাপার।

ফলে একজন সাংবাদিকের কাছে একটি সংবাদ প্রকাশের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া মানেই কাজ শেষ হয়ে যাওয়া ছিল না। খবর সংগ্রহ করতে হতো মাঠে গিয়ে, ফিরে এসে সেটি লিখতে হতো হাতে, তারপর ডাকঘর কিংবা কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠাতে হতো। জরুরি সংবাদ হলে আবার ছুটতে হতো মৌলভীবাজারে টেলিগ্রাম করতে।

ইংরেজি পত্রিকায় কাজের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা ছিল। সংবাদ ইংরেজিতে লিখে হাতে তৈরি করে ডাকযোগে কিংবা কুরিয়ারে পাঠানো হতো। সংবাদ লেখার জন্য কম্পিউটার তো দূরের কথা, তখন সবার কাছে টাইপরাইটারও ছিল না। তাই হাতে লেখা সংবাদই ছিল সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান অবলম্বন।

আজকের প্রজন্মের কাছে বিষয়টি হয়তো অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু সেই সময় সাংবাদিকতা ছিল মূলত শ্রম, ধৈর্য, মেধা এবং দায়িত্ববোধের পেশা। সংবাদ প্রকাশের প্রতিটি ধাপেই সময় ও পরিশ্রম দিতে হতো। একটি সংবাদ পাঠাতে যেখানে আজ কয়েক সেকেন্ডই যথেষ্ট, তখন সেখানে লেগে যেত ঘণ্টা, কখনো এক দিন বা তারও বেশি।

সাংবাদিকের সংখ্যাও তখনকার সময়ে তুলনামূলকভাবে কম ছিল। কিন্তু সংখ্যায় কম হলেও তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, প্রতিভাবান এবং প্রকৃত জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ। তাঁরা সাংবাদিকতাকে শুধু একটি পেশা হিসেবে দেখতেন না; সংবাদকে সত্য, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরাকে দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচনা করতেন।

সেই সময়ের সাংবাদিকদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন বিভিন্ন বড় রাজনৈতিক দলের নেতাও। এমনকি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকা অবস্থায় দু-তিনজন জনপ্রতিনিধি হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন।

শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক নেতা রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ১৯৮৩ সালে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতা কমলেশ ভট্টাচার্য দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শ্রীমঙ্গল পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি শুধু রাজনীতিবিদই ছিলেন না, সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বিপুল রঞ্জন চৌধুরীও শ্রীমঙ্গল পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনিও সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিকতা করার সময় তাঁদের মধ্যে দলীয় পক্ষপাতিত্ব দেখা যেত না। তাঁরা ছিলেন নিরপেক্ষ, আদর্শনিষ্ঠ ও বস্তুনিষ্ঠ। সংবাদ পরিবেশনে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা ছিল সর্বজনীন। রাজনৈতিকভাবে তাঁরা বিভিন্ন দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সাংবাদিক হিসেবে তাঁদের ভূমিকা নিয়ে কখনো কেউ প্রশ্ন তোলেনি।

এমনকি রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও তাঁদের মধ্যে ছিল পারস্পরিক রাজনৈতিক শিষ্টাচার। সাংবাদিকতা ও রাজনীতিকে তাঁরা এক করে ফেলেননি। সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয়কে সংবাদ পরিবেশনের ওপর প্রভাব ফেলতে দেননি

শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাব গঠনের ক্ষেত্রেও এই সাংবাদিকদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শুরু থেকেই যাঁরা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন, তাঁদের নেতৃত্বে ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রেসক্লাবের খাজনা নিজেরাই পরিশোধ করেছেন। প্রেসক্লাবের খাজনা তাঁরা কখনো বকেয়া রাখেননি।

এরশাদ সাহেবের আমলে একবার একজন মন্ত্রী প্রেসক্লাবের নামে কিছু অর্থ বরাদ্দ করেছিলেন। তবে তৎকালীন সময়ের বিবেচনায় সেই অর্থের পরিমাণ ছিল যৎসামান্য। প্রেসক্লাব পরিচালনা কিংবা এর দায়-দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সেই সামান্য সরকারি সহায়তার ওপর তাঁরা নির্ভরশীল ছিলেন না। নিজেদের সামর্থ্য ও দায়িত্ববোধ থেকেই তাঁরা প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রেখেছিলেন।

সেই সময়ের সাংবাদিকতা ছিল প্রযুক্তিবিহীন, কিন্তু দায়িত্ববোধে সমৃদ্ধ। যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা ছিল, সংবাদ পাঠানো ছিল কষ্টসাধ্য, তথ্য সংগ্রহে ছিল নানা ঝুঁকি ও প্রতিবন্ধকতা। তবু সাংবাদিকেরা সংবাদ সংগ্রহ করতেন, যাচাই করতেন, হাতে লিখতেন এবং নানা কষ্ট করে তা পত্রিকা অফিসে পৌঁছে দিতেন।

আজ প্রযুক্তি সাংবাদিকতার কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে ছবি, ভিডিও, সংবাদ কিংবা সরাসরি সম্প্রচার পাঠানো সম্ভব। তথ্যের প্রবাহ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত। কিন্তু প্রযুক্তির এই বিপুল সুবিধার সঙ্গে সাংবাদিকতার মান, দায়িত্ববোধ ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নটিও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আর বর্তমান সময়ের সাংবাদিকতার নানা চিত্রের কথা শুনলে অনেক সময় সত্যিই গা শিউরে ওঠে। সংবাদপেশার প্রতি মানুষের যে আস্থা একসময় ছিল, নানা কারণে সেই আস্থায় এখন ভাটা পড়েছে। সাংবাদিকতার সঙ্গে যখন ব্যক্তিস্বার্থ, রাজনৈতিক পক্ষপাত, বাণিজ্যিক চাপ কিংবা নানা অনিয়মের অভিযোগ জড়িয়ে পড়ে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন সাংবাদিকের বিশ্বাসযোগ্যতা নয়—পুরো পেশাটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এ কারণেই আজ মানুষের একটি বড় অংশ সাংবাদিকতার প্রতি আগের মতো আস্থা রাখতে পারছে না। অথচ সাংবাদিকতার মূল শক্তি প্রযুক্তি নয়, সংবাদমাধ্যমের ভবন নয়, কিংবা বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ও নয়। এর মূল শক্তি হলো বিশ্বাস।

আশির দশকের সেই সাংবাদিকদের হাতে ছিল না আধুনিক প্রযুক্তি, ছিল না দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ। ছিল শুধু কলম, কাগজ, তথ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সত্য প্রকাশের অঙ্গীকার। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাঁরা যে আস্থা তৈরি করেছিলেন, সেটিই ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড় অর্জন।

সময়ের সঙ্গে সাংবাদিকতার প্রযুক্তি বদলেছে, সংবাদ পাঠানোর পদ্ধতি বদলেছে, সংবাদমাধ্যমের কাঠামো বদলেছে। কিন্তু সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তটি বদলায়নি—সত্য, নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং মানুষের আস্থা।

সেই জায়গাটিতেই হয়তো আজকের সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।


মতামত এর আরও খবর