দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ

img

ইরান চুক্তি: ট্রাম্পের অতি উচ্চাশার পরিণতি যেমন হলো

প্রকাশিত :  ১৩:৩৬, ১৮ জুন ২০২৬

ইরান চুক্তি: ট্রাম্পের অতি উচ্চাশার পরিণতি যেমন হলো

একটি প্রচলিত সামরিক প্রবাদে বলা হয়, ‘শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার পর কোনো যুদ্ধপরিকল্পনাই আর আগের মতো থাকে না।’ ইরানকে ঘিরে ডোনাল্ড ট্রাম্পও উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নিয়ে অভিযান শুরু করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া এবং হিজবুল্লাহ ও হামাসসহ আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থন বন্ধ করা।

এখন যে চুক্তির (সমঝোতা স্মারক) দোহাই দিয়ে ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন, সেখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে লিখিত শর্ত নেই। ইরান কেবল পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে তেহরানের চাপে চুক্তিতে লেবাননকেও যুক্ত করা হয়েছে। যেটিকে বড় জয় হিসেবে দেখছে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ।

যুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা ছিল হরমুজ প্রণালি। এই জলপথ পুনরায় খুলতে গিয়েই ট্রাম্প প্রশাসন তাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের লক্ষ্যগুলো থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। ট্রাম্পের ভাষায়, এটি না করলে বিশ্ববাসী মন্দার পরিণতি ভোগ করতো।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ফেলো ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বারবারা লিফ বলছেন, ওয়াশিংটন ইরান সম্পর্কে খুবই অবাস্তব মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে যুদ্ধে নেমেছিল। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিতে হামলার জন্য ইরান কতটুকু প্রস্তুত তা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা একেবারে ভুল ছিল।

বারবারা বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র দ্রুতই বিষয়টি বুঝতে পারে। আমেরিকান ভোক্তাদের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রভাব ছড়িয়ে পড়ায় এই যুদ্ধ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে গেছে।

এখন ট্রাম্প একটি জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন লিফ। তিনি বলেন, যুদ্ধ যদি প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহেই শেষ হতো, তাহলে ট্রাম্পের হাতে অনেক বেশি প্রভাব ও কূটনৈতিক চাপ তৈরির সুযোগ থাকতো। এখন তিনি সেগুলোর অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছেন।

বর্তমানে ট্রাম্পের নিজের রাজনৈতিক দলের নেতারাই এই চুক্তিকে মানতে পারছেন না। এরইমধ্যে লুইজিয়ানার বিদায়ী সিনেটর বিল ক্যাসিডি চুক্তিকে ‘কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বাজে কূটনীতি’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘কবরে শুয়ে রিগানও (রোনাল্ড রিগান) এ নিয়ে অস্বস্তিতে পড়বেন।’ রিগান যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও রিপাবলিকান পার্টির নেতা ছিলেন।

বিল ক্যাসিডি বলছেন, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। তারা হরমুজ প্রণালির কার্যকারিতাও বুঝে গেছে। ভবিষ্যতে নিঃসন্দেহে এই কৌশল কাজে লাগাবে। পাশাপশি এই চুক্তির আওতায় ইরান নতুন অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ পাবে। উত্তর ক্যারোলিনার রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিসের কাছেও এটি ভালো চুক্তি বলে মনে হয়নি।

ট্রাম্প বহু বছর ধরে ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ বা জেসিপিওএ নিয়ে সমালোচনা করে আসছেন। তাঁর অভিযোগ, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ঠেকাতে ইরানকে ঘুষ দিয়েছিলেন। কিন্তু নতুন চুক্তি দেখাচ্ছে, এতে ইরানকে আরও বেশি অর্থ দেওয়ার সম্ভাবনা আছে। 

চুক্তির বিভিন্ন দফার মধ্যে আছে- আর্থিক প্রণোদনা, লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতিতে সমর্থন এবং হরমুজ প্রণালি পরিচালনার ভবিষ্যৎ ঠিক করতে ওমান ও ইরানকে যৌথভাবে কাজের সুযোগ দেওয়া।

সমঝোতা স্মারকের নথি হাতে মাসুদ পেজেশকিয়ান (বাঁয়ে) ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

সমঝোতা স্মারকের নথি হাতে মাসুদ পেজেশকিয়ান (বাঁয়ে) ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

চুক্তিতে উল্লেখ থাকা ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ছাড়ের বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘এটা আমাদের অর্থ নয়, এটা তাদের অর্থ। আমরা একটি নির্দিষ্ট সময়ে এটি আটকে দিয়েছিলাম। আমাদের এটি ফিরিয়ে দিতে হবে।’ পাশাপাশি তাঁর বক্তব্যে ইরানের কথার প্রতিধ্বনিও আছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরবের কাছে যদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকতে পারে, তাহলে ইরানেরও সে দাবি করার যুক্তি আছে।

ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সম্ভাবনা নিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘অন্যদের কাছে এটি আছে, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর কাছেও এটি আছে। এ অবস্থায় তাদের (ইরান) বিদ্যুৎ উৎপাদন সংক্রান্ত কাজে এটি (ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ) ব্যবহার করতে না দিলে বিষয়টা খুব কঠোর হয়ে যায়। এখানে কিছুটা কমন সেন্স ব্যবহার করতে হবে।’

শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এই সমঝোতা স্মারক একটি বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত। যেটির লক্ষ্য ছিল- রাজনৈতিক মূল্য দিতে হলেও সংঘাত যত দ্রুত সম্ভব শেষ করতে হবে। বারবারা লিফ বলছেন, একটি অযৌক্তিক যুদ্ধ শেষ হতে দেখাটা স্বস্তির। তবে পরে যে আবার যুদ্ধ শুরু হবে না- চুক্তিতে সে নিশ্চয়তা বেশ কম। 

মতামত এর আরও খবর

img

পুঁজিবাজারের প্রাণশক্তি ফিরিয়ে আনতে একজন 'হিরো'র প্রয়োজন

প্রকাশিত :  ১৯:৪৬, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:৪৮, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

​সম্পাদকীয়

​পুঁজিবাজার আসলে শুধু সূচক, লেনদেন কিংবা কিছু সংখ্যার সমষ্টি নয়। এর ভেতরে জড়িয়ে থাকে লাখো বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশা, সঞ্চয়, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। একটি প্রাণবন্ত বাজার গড়ে তুলতে হলে দরকার এমন কিছু মানুষ, যাঁদের চিন্তা, সময় ও আগ্রহ গভীরভাবে এই বাজারকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।

​এই প্রসঙ্গেই উঠে আসে পুঁজিবাজারের বহুল আলোচিত নাম আবুল খায়ের, বাজারে যিনি পরিচিত 'হিরো' নামে। তাঁকে নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে, বিতর্কও থাকতে পারে; তবে একটি সত্য অস্বীকারের উপায় নেই, বাজারের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের আগ্রহ ও সক্রিয় উপস্থিতি আলোচনায় একটি আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।

​এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, একজন সক্রিয় বাজারসংশ্লিষ্ট মানুষকে আমরা আসলে কোন দৃষ্টিতে দেখছি? তাঁকে দূরে ঠেলে রাখার সংস্কৃতি কি বাজারকে সত্যিই শক্তিশালী করবে, নাকি নিয়মকানুনের সীমার মধ্যে থেকে তাঁর মতো সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের শক্তিকে কাজে লাগানোই বেশি ফলদায়ক হবে?

​সক্রিয় বিনিয়োগকারী যত বাড়ে, বাজার নিয়ে আলোচনা যত জমে ওঠে, কোম্পানির মৌলভিত্তি নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণে আগ্রহ যত বাড়ে, বাজারও ততই প্রাণবন্ত হওয়ার সুযোগ পায়। কেউ যদি প্রতিদিন বাজার নিয়ে ভাবেন, কোম্পানির পারফরম্যান্স অনুসরণ করেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেন, তাহলে মূল আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত, সেই আগ্রহকে কীভাবে গঠনমূলক দিকে চালিত করা যায়।

​আমরা মনে করি, কোনো সক্রিয় অংশগ্রহণকারীকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের মাপকাঠিতে নয়, বরং বাজারের নিয়ম, স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার কাঠামোর ভেতরেই মূল্যায়ন করা উচিত। নিয়ম হবে সবার জন্য সমান; কিন্তু যাঁরা সেই নিয়ম মেনে বাজারে সক্রিয় থাকেন, তাঁদের অবদানও স্বীকৃতি পাওয়া উচিত।

​আবুল খায়েরকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও বাজারসংশ্লিষ্ট অনেকেই তাঁর সক্রিয়তার কথা জানেন। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব কাউকে ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করা নয়, বরং যেকোনো ইতিবাচক দিক তুলে ধরা এবং বাজারের স্বার্থে জরুরি প্রশ্নগুলো সামনে আনা।

​এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কোনো প্রতিবেদন বা সম্পাদকীয়তে কারও ইতিবাচক ভূমিকা তুলে ধরা মানেই এই নয় যে তার বিনিময়ে কোনো সুবিধা নেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা দাঁড়িয়ে থাকে স্বাধীনতা, দায়িত্বশীলতা এবং তথ্যনির্ভরতার ওপর। আমাদের অর্থনীতিবিষয়ক প্রতিবেদনেও এই নীতি সমানভাবে অনুসৃত হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন বা বাণিজ্যিক সম্পর্ককে সংবাদ বা সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়।

​বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে আমরা সবসময় অগ্রাধিকার দিই। কারণ শক্তিশালী পুঁজিবাজার মানে শুধু কিছু কোম্পানির শেয়ারদর বেড়ে যাওয়া নয়; এর অর্থ বাজারে আস্থা তৈরি হওয়া, অংশগ্রহণ বাড়া, ভালো কোম্পানির যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগসংস্কৃতি গড়ে ওঠা।

​এই প্রেক্ষাপটে আবুল খায়েরের মতো সক্রিয় অংশগ্রহণকারীর ভূমিকা নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। তাঁর উপস্থিতি নিয়ে কারও ভিন্নমত থাকতেই পারে, কিন্তু তাঁকে ঘিরে যে আগ্রহ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও সমীচীন নয়।

​বাজারে প্রাণ ফেরাতে দরকার আস্থা, স্বচ্ছতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ। দরকার এমন একটি পরিবেশ, যেখানে বিনিয়োগকারী নির্দ্বিধায় মত প্রকাশ করতে পারেন, বাজার নিয়ে ভাবতে পারেন এবং নিয়ম মেনে অংশ নিতে পারেন। কাউকে অকারণে দমিয়ে রাখার বদলে নিয়মের ভেতরে থেকে ইতিবাচক শক্তিকে কাজে লাগানোই হতে পারে একটি পরিণত পুঁজিবাজারের বৈশিষ্ট্য।

​কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে কেন এত কথা? উত্তরটা সহজ, ভালো কিছু চোখে পড়লে সেটি ভালো বলাই স্বাভাবিক। যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বাজারের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখেন, তাঁদের সেই দিক আলোচনায় আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

​আজকের পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আস্থা। বিনিয়োগকারীরা চান প্রাণবন্ত, স্বচ্ছ ও সুযোগসমৃদ্ধ একটি বাজার, যেখানে ভালো কোম্পানি প্রাপ্য মূল্যায়ন পায়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী উৎসাহ পান এবং ইতিবাচক অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ে।

​তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত কে বাজারে আছেন, তা নয়; বরং বাজারকে আরও কার্যকর করার উপায় কী, সেটিই।

​আবুল খায়ের যদি সত্যিই দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজার নিয়ে ভাবেন, কাজ করেন এবং সক্রিয় থাকেন, তবে তাঁর সেই আগ্রহকে বাজারের ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তরের সুযোগ আছে কি না, সেটিই এখন খতিয়ে দেখা দরকার।

​কারণ পুঁজিবাজারকে প্রাণবন্ত করতে শুধু নীতিমালাই যথেষ্ট নয়; দরকার মানুষ, দরকার অংশগ্রহণ, দরকার আস্থা, আর দরকার বাজারকে ভালোবাসে এমন সক্রিয় মানুষ।

​হিরো নিছক একজন ব্যক্তি। কিন্তু তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া আলোচনা আমাদের একটি বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আমরা কি সক্রিয় বাজার অংশগ্রহণকারীদের দূরে সরিয়ে রাখব, নাকি নিয়মের কাঠামোর ভেতরে রেখে তাঁদের ইতিবাচক শক্তিকে কাজে লাগাব?

​শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব একটি পুঁজিবাজার গড়তে দ্বিতীয় পথটিই বিবেচনার যোগ্য।