img

ক্ষমতা নয়, জবাবদিহিতাই গণতন্ত্রের শক্তি: ব্রিটিশ সংসদীয় নৈতিকতার পাঠ

প্রকাশিত :  ১৯:০২, ০৯ জুলাই ২০২৬

ক্ষমতা নয়, জবাবদিহিতাই গণতন্ত্রের শক্তি: ব্রিটিশ সংসদীয় নৈতিকতার পাঠ

নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল

গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় তখন, যখন একজন জনপ্রিয় নেতাকেও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।

কারণ প্রকৃত গণতন্ত্র শুধু জনগণের ভোটে ক্ষমতায় যাওয়ার নাম নয়; বরং ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা কতটা স্বচ্ছতা, নৈতিকতা এবং জবাবদিহিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, সেটিই একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার প্রকৃত মাপকাঠি।

যুক্তরাজ্যের সংসদীয় সংস্কৃতি এই দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এখানে কোনো রাজনীতিবিদ যত জনপ্রিয়ই হোন না কেন, তাঁর আর্থিক স্বচ্ছতা, আচরণ এবং দায়িত্ব পালনের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে নাইজেল ফারাজকে ঘিরে রাজনৈতিক অর্থায়ন ও সংসদীয় নৈতিকতা নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটি আবারও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে।

গণতন্ত্রে জনপ্রিয়তা কি জবাবদিহির বিকল্প হতে পারে?

একজন আইনবিদ হিসেবে আমার উত্তর স্পষ্ট-না।

জনপ্রিয়তা একজন রাজনীতিবিদকে জনগণের সমর্থন দিতে পারে, কিন্তু আইনের শাসনের বাইরে কোনো বিশেষ অধিকার দিতে পারে না।

অভিযোগ, তদন্ত ও প্রমাণ: আইনের মৌলিক শিক্ষা

আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোর একটি হলো-অভিযোগ এবং অপরাধ এক বিষয় নয়।

কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে পারে। তদন্ত হতে পারে। গণমাধ্যমে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা ন্যায়বিচারের মূলনীতির পরিপন্থী।

যুক্তরাজ্যের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির শক্তি এখানেই। এখানে তদন্ত একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার নয়।

একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, জনআস্থা রক্ষার জন্য ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

ব্রিটিশ সংসদীয় নৈতিকতার ভিত্তি:

যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্সের সংসদ সদস্যদের জন্য “Code of Conduct for Members of Parliament” রয়েছে। এই নীতিমালার উদ্দেশ্য হলো সংসদ সদস্যদের আচরণে সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের আস্থা বজায় রাখা।

এই নৈতিক কাঠামোর পেছনে রয়েছে বিখ্যাত Nolan Principles:

Selflessness (নিঃস্বার্থতা), Integrity (সততা), Objectivity (নিরপেক্ষতা),Accountability (জবাবদিহিতা), Openness (স্বচ্ছতা),Honesty (সততা),Leadership (নৈতিক নেতৃত্ব)

এই নীতিগুলো শুধু কাগজে লেখা কিছু নিয়ম নয়; এগুলো ব্রিটিশ জনজীবনের নৈতিক ভিত্তি।

সংসদ সদস্যরা কীভাবে জবাবদিহির আওতায় থাকেন?

যুক্তরাজ্যে সংসদ সদস্যদের নির্দিষ্ট আর্থিক স্বার্থ, উপহার এবং বাইরের আয়ের বিষয় প্রকাশ করতে হয়।

এর উদ্দেশ্য হলো জনগণ যেন জানতে পারেন, কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি এমন কোনো আর্থিক সম্পর্কের মধ্যে আছেন কি না যা তাঁর দায়িত্ব পালনে প্রভাব ফেলতে পারে।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন-স্বচ্ছতা দাবি করা মানেই কাউকে অপরাধী বলা নয়।

বরং স্বচ্ছতা এমন একটি ব্যবস্থা, যা অপ্রয়োজনীয় সন্দেহ কমায় এবং জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করে।

রাজনৈতিক অর্থায়ন: গণতন্ত্রের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

রাজনৈতিক দল পরিচালনার জন্য অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু অর্থের উৎস যদি অস্পষ্ট হয়, তাহলে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

এই কারণেই যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক অনুদান ও অর্থায়নের ওপর নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে।

গণতন্ত্রে জনগণের অধিকার শুধু ভোট দেওয়া নয়; বরং তারা জানার অধিকার রাখেন-তাদের প্রতিনিধিদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কীভাবে অর্থায়িত হচ্ছে।

কারণ অর্থ এবং ক্ষমতার সম্পর্ক সবসময়ই জনস্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

গণমাধ্যম ও আইনের ভারসাম্য:

একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যম গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে,নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহির মধ্যে রাখে এবং জনগণের সামনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে।

তবে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মূলনীতি হলো-প্রমাণের আগে রায় নয়।

একজন সাংবাদিক প্রশ্ন তুলতে পারেন, বিশ্লেষণ করতে পারেন, তথ্য প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু আদালতের ভূমিকা পালন করতে পারেন না।

এই ভারসাম্যই একটি সুস্থ গণতন্ত্রের পরিচয়।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে রাজনৈতিক বিতর্কে একটি সমস্যা দেখা যায়-অভিযোগ উঠলেই মানুষ রাজনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী বিভক্ত হয়ে যায়।

এক পক্ষ অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য মনে করে।

অন্য পক্ষ কোনো যাচাই ছাড়াই সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু একটি পরিণত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এর চেয়ে ভিন্ন।

সেখানে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে আবেগ নয়, প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে জনপ্রিয়তা নয়, আইনের শাসন শেষ কথা।

পরিশেষে বলতে হয়,ক্ষমতা মানুষকে সাময়িকভাবে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু জবাবদিহিতাই একটি গণতন্ত্রকে দীর্ঘস্থায়ী করে।

একজন প্রধানমন্ত্রী, একজন সংসদ সদস্য কিংবা একজন জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা কেউই জনগণের আস্থা এবং আইনের শাসনের ঊর্ধ্বে নন।

ব্রিটিশ সংসদীয় সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, গণতন্ত্র শুধু কে ক্ষমতায় যাবে সেই প্রশ্ন নয়; বরং ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা কতটা নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার নেতাদের জনপ্রিয়তায় নয়, বরং তার প্রতিষ্ঠানগুলোর সততা, স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতিতে।


নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল: আইনবিদ, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
img

জনতার নেতা, সন্তানের কাছে পরাজিত

প্রকাশিত :  ১৪:১৮, ০৭ অক্টোবর ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত

বর্তমান সমাজে নতুন প্রজন্মের সন্তানরা কীভাবে বেড়ে উঠছে, তা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। শিক্ষা, অর্থ-বিত্ত, সামাজিক মর্যাদা কিংবা প্রতিষ্ঠা—সবকিছু অর্জনের পরও একজন মানুষ জীবনের শেষ সময়ে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটি প্রত্যাশা করেন, তা হলো আপনজনের একটু ভালোবাসা, যত্ন ও নিরাপদ আশ্রয়। অথচ বাস্তবতা কখনো কখনো এত নির্মম হয়ে ওঠে যে, যাঁরা সারাজীবন মানুষের জন্য কাজ করেছেন, জনগণের ভালোবাসায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁরাই শেষ বয়সে নিজের সন্তানদের কাছেই অবহেলার শিকার হন।

এই এলাকার এমন তিনজন দাপুটে রাজনৈতিক নেতার কথা মনে পড়ে, যাঁরা নিজ নিজ সময়ে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন। মানুষের প্রত্যাশা পূরণেও তাঁরা অনেকাংশে সফল হয়েছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তিনজনের পরিণতিই যেন আমাদের সমাজ ও পারিবারিক মূল্যবোধের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে গেছে।

প্রথমজন ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে এলাকায় সংগঠক হিসেবে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর হাতে গড়া সেই সংগঠন পরবর্তীতে এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসায় ভোটের মাধ্যমে তিনিও জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

জীবনের শেষ সময়ে, মৃত্যুর মাত্র দুই-তিন মাস আগে, তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। সে সময় তাঁকে বলেছিলাম, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেছেন, আপনি আপিল করলে বা আপিল করতে গেলে স্বীকৃতি পাবেন।

আমার কথা শুনে তিনি শান্তভাবে বলেছিলেন, “আমার আর সময় নেই।”

এরপর তিনি আরেক নেতার নাম এবং সেই নেতার এক সন্তানের নাম উল্লেখ করে বলেছিলেন, তাঁর মতো সৃষ্টি করতে পারেননি এমন কেউ, যে সংগ্রাম করে, আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে আমার স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। বাকিটা উপরওয়ালা দেখবেন।

সেটিই ছিল তাঁর সঙ্গে আমার জীবনের শেষ কথা।

দ্বিতীয়জন ছিলেন একজন দাপুটে জনপ্রতিনিধি। তাঁর সরকারের আমলে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী ও পথচারী এর সুফল ভোগ করছেন। মানুষের চলাচলে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পরবর্তীতেও তিনি সরাসরি ভোটে আবার জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল, তিনি তাঁর পরিবারের সবাইকে এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন যে তা সত্যিই বিস্ময়কর। সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর আন্তরিকতারও অভাব ছিল না। অথচ শোনা যায়, জীবনের শেষ বয়সে তাঁকে অনেক কষ্ট পেয়ে পরপারে পাড়ি দিতে হয়েছে।

তৃতীয়জন ছিলেন দুর্দান্ত ও ডাকসাইটে এক নেতা। তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল এমন যে নির্বাচনী প্রচারে টাকা-পয়সা খরচ না করে শুধু পায়ে হেঁটে কয়েকজন মানুষকে সঙ্গে নিয়ে প্রচার চালিয়েই তিনি শক্তিশালী এক প্রতিদ্বন্দ্বীকে নাকানিচোবানি খাইয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সমাজে তাঁর অবদানও কম নয়। একাধারে তিনি ছিলেন সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ এবং রাজনীতির মাঠে একজন ভালো বক্তা—একজন ওরাটার। মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ও জনপ্রিয়তা তাঁকে আলাদা অবস্থান দিয়েছিল।

রাজনীতির মাঠে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়েছিলেন, জনগণের ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে পরিবারের দুই-একজন সন্তানের কাছে যেন সেই মানুষটিই হেরে গেলেন। পরিবারের অবহেলিত অন্য নেতাদের মতো তাঁর অবস্থাও খুব একটা ভিন্ন ছিল না। এলাকায় কানাঘুষা আছে, শেষ বয়সে টাকা দিতে না পারার কারণে তাঁকে সন্তানদের হাতে নাজেহাল পর্যন্ত হতে হয়েছে।

তবে এই গল্পের একটি আশাব্যঞ্জক দিকও আছে। তাঁর স্বীকৃতির জন্য তাঁর অপর এক সন্তান হাইকোর্টে রিট করে আদেশ পর্যন্ত করিয়েছেন। হয়তো সেই স্বীকৃতি পাওয়ার বাস্তবায়ন এখন সময়ের অপেক্ষা।

তিনটি জীবনের গল্প, তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়—কিন্তু শেষ অধ্যায়ে এসে যেন একই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় আমাদের।

যাঁরা জীবনের সোনালি সময়টুকু মানুষের জন্য ব্যয় করেছেন, জনগণের ভালোবাসায় জনপ্রতিনিধি হয়েছেন, সমাজ ও এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন, তাঁরাই যদি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের সন্তানদের কাছ থেকে ভালোবাসা, সম্মান ও সামান্য যত্নটুকু না পান, তাহলে আমাদের শিক্ষা ও সভ্যতার সাফল্য কোথায়?

প্রশ্নটি শুধু এই তিনজন নেতাকে ঘিরে নয়। এটি আজকের সমাজের একটি বৃহত্তর বাস্তবতার দিকেও আমাদের দৃষ্টি ফেরায়।

আজকের অসুস্থ সামাজিক বাস্তবতার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো—নতুন প্রজন্মের একটি অংশ ক্রমেই সুস্থ শিক্ষা, নৈতিকতা ও পারিবারিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তারা অনেক সময় লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে এমন কিছু মানুষের পেছনে ঘুরছে, যাঁরা সমাজে প্রভাবশালী, ক্ষমতাবান কিংবা তথাকথিত সমাজপতি হিসেবে পরিচিত। তাঁদের কথাকে আদর্শ মনে করে, তাঁদের ইঙ্গিতকে নির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করে অনেক তরুণ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে।

কখনো রাজনীতি, কখনো ক্ষমতার ছায়া, কখনো অর্থের লোভ, আবার কখনো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়—সব মিলিয়ে একটি অংশের তরুণদের সামনে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে লেখাপড়া, চরিত্র, নৈতিকতা কিংবা ভবিষ্যৎ গড়ার চেয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা এবং প্রভাবশালী কারও অনুসারী হওয়াকেই তারা সাফল্যের পথ বলে মনে করছে।

মানুষের মান-সম্মান, পারিবারিক মর্যাদা কিংবা নিজের ভবিষ্যৎ—এসব নিয়েও অনেকের মধ্যে আর আগের মতো ভাবনা নেই। কে সম্মানিত মানুষ, কার কাছ থেকে কী শেখা উচিত, কোন কাজটি সমাজের জন্য ভালো আর কোনটি অপরাধ—এই বোধটুকুও অনেকের মধ্যে ক্রমেই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই বিপথগামিতার ফল শুধু ওই তরুণকেই ভোগ করতে হয় না; এর খেসারত দিতে হয় তার পরিবারকেও। একজন সন্তান যখন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, রাজনীতির নামে বিশৃঙ্খলায় যুক্ত হয় কিংবা ভুল মানুষের অনুসরণ করতে করতে নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে, তখন তার বাবা-মায়ের ঘুম হারাম হয়। সন্তানের অপকর্মের কারণে পরিবারকে সামাজিকভাবে লজ্জিত হতে হয়, কখনো আইনি জটিলতায় পড়তে হয়, কখনো অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়।

অথচ অনেক বাবা-মা হয়তো সেই সন্তানকেই মানুষ করার জন্য জীবনের সর্বস্ব দিয়েছেন।

কেউ হয়তো নিজের জমি বিক্রি করেছেন, কেউ ধার-দেনা করেছেন, কেউ নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন। কেউ সন্তানকে উচ্চশিক্ষা দিয়েছেন, কেউ বিদেশে পাঠিয়েছেন। সন্তান যেন প্রতিষ্ঠিত হয়, ভালো মানুষ হয়—এই স্বপ্নেই বাবা-মা জীবনের সেরা সময়টুকু কাটিয়েছেন। কিন্তু সেই সন্তানই যখন ভুল পথে পা বাড়ায়, তখন বাবা-মায়ের সেই ত্যাগ, স্বপ্ন ও ভালোবাসা যেন এক মুহূর্তে প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এখানেই আমাদের সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।

বর্তমানে এমন অনেক ঘটনা শোনা যায়, যেখানে বাবা-মা জীবনের সমস্ত কষ্ট, ত্যাগ ও সঞ্চয় দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়া করান, উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেন, বড় ডিগ্রি অর্জনের পথ তৈরি করে দেন। এমনকি অনেকে সন্তানদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশেও পাঠান। সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত হয়, ভালো চাকরি পায়, অর্থ-বিত্ত অর্জন করে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে দেওয়া বাবা-মায়ের অনেকের খোঁজখবর নেওয়ার সময়টুকুও তারা আর পায় না।

কখনো কখনো পরিস্থিতি আরও নির্মম হয়ে ওঠে। পত্র-পত্রিকায় এমন ঘটনাও জানা গেছে, কোনো কোনো বাবা বা মা এক সপ্তাহ কিংবা তারও আগে মারা যাওয়ার পর প্রতিবেশীরা দুর্গন্ধ পেয়ে বিষয়টি জানতে পেরেছেন এবং পুলিশকে খবর দিয়েছেন। পরে পুলিশ এসে দেখতে পেয়েছে, ঘরের ভেতরেই পড়ে আছে মৃতদেহ। অথচ সন্তানরা জানেন না, কিংবা জানলেও দীর্ঘ সময় ধরে কোনো খোঁজ নেননি যে তাঁদের বাবা বা মা মারা গেছেন।

এমন ঘটনা অত্যন্ত করুণ, মর্মান্তিক এবং একই সঙ্গে আমাদের সামাজিক বিবেকের জন্য গভীর লজ্জার। যে সন্তানকে বাবা-মা এত কষ্ট করে মানুষ করলেন, যে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য তাঁরা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিলেন, সেই সন্তান যদি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁদের খোঁজটুকুও না রাখে, তাহলে সেই উচ্চশিক্ষা, সেই ডিগ্রি, সেই সামাজিক প্রতিষ্ঠার অর্থ কী?

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শুধু অবহেলাই নয়—কোনো কোনো পরিবারে সন্তানদের হাতে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নাজেহাল বা নির্যাতনের ঘটনাও শোনা যায়। বিশেষ করে টাকা-পয়সা দিতে না পারলে কিংবা সন্তানের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে কোনো কোনো বাবা-মা নিজেদের সন্তানদের কাছেই অপমান, দুর্ব্যবহার এমনকি নির্যাতনের শিকার হন।

একজন বৃদ্ধ বাবা, যিনি একদিন সন্তানের হাত ধরে তাকে হাঁটতে শিখিয়েছেন, জীবনের শেষ বয়সে সেই সন্তানের কাছেই যদি অর্থের জন্য অপমানিত হন—এর চেয়ে বেদনাদায়ক পরিণতি আর কী হতে পারে?

আর এই বাস্তবতার সঙ্গে যখন অসুস্থ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ যুক্ত হয়, তখন সমস্যাটি আরও গভীর হয়। রাজনীতি মানুষের কল্যাণ, অধিকার ও নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু রাজনীতির নামে যদি তরুণদের একটি অংশকে শুধু মিছিল, ক্ষমতার প্রদর্শন, প্রতিপক্ষ দমন, অর্থের লেনদেন কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রচ্ছায়ায় থাকার সংস্কৃতির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, তাহলে তার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি শুধু রাজনীতির নয়—সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।

যে তরুণের হাতে বই থাকার কথা, তার হাতে যদি অপরাধের হাতিয়ার উঠে আসে; যে তরুণের চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন থাকার কথা, সে যদি কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তির নির্দেশের অপেক্ষায় দিন কাটায়; যে তরুণের বাবা-মা তাকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখেছেন, সে যদি তাদের কথাই শুনতে না চায়—তাহলে এই অবক্ষয়ের দায় শুধু ব্যক্তির নয়, আমাদের সামগ্রিক সামাজিক পরিবেশেরও।

তবে এর অর্থ এই নয় যে রাজনীতি নিজেই তরুণদের নষ্ট করে। বরং রাজনীতির নামে যখন অনৈতিকতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অপরাধপ্রবণতা ও অন্ধ আনুগত্যকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তখনই তা তরুণদের বিপথে নেওয়ার একটি বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে।

একটি সুস্থ রাজনীতি তরুণদের মানুষের পাশে দাঁড়াতে শেখায়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শেখায়। দেশ, সমাজ ও মানুষের জন্য কাজ করতে শেখায়। কিন্তু অসুস্থ রাজনীতি তরুণদের ক্ষমতার পেছনে ছুটতে শেখায়, অন্যায়কে স্বাভাবিক করে তোলে এবং কখনো কখনো অপরাধকেও সাহসের পরিচয় হিসেবে উপস্থাপন করে।

এই পার্থক্যটি না বুঝলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।

শুধু সন্তানদের দোষ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাজনীতি—সব ক্ষেত্রেই আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। সন্তানকে যদি ছোটবেলা থেকেই শুধু ভালো ফলাফল, ভালো চাকরি, অর্থ-বিত্ত ও প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু তাকে মানবিকতা, নৈতিকতা, পারিবারিক দায়িত্ব ও কৃতজ্ঞতার শিক্ষা দেওয়া না হয়, তাহলে তার শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে শুধু নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে শেখায় না; অন্যের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখায়। বিশেষ করে বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা, সম্মান ও দায়িত্ববোধ একজন মানুষের নৈতিক শিক্ষার অন্যতম ভিত্তি হওয়া উচিত।

আজকের প্রজন্মের অনেক সন্তান উচ্চশিক্ষিত হচ্ছে। বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করছে, ভালো চাকরি করছে, অর্থ-বিত্ত ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জন করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই শিক্ষার কতটুকু তাদের মানুষ করে তুলছে?

একজন সন্তান যদি শিক্ষিত হয়েও বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে না দাঁড়ায়, তাঁদের অসহায়ত্ব না বোঝে, তাঁদের শেষ বয়সের প্রয়োজনকে বোঝা মনে করে, তাহলে সেই শিক্ষা কতটা অর্থবহ—এ প্রশ্ন আমাদের নিজেদের কাছেই রাখতে হবে।

রাষ্ট্রের আইন আছে, আদালত আছে, প্রশাসন আছে। কিন্তু আইন তো প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে দেখে না—কোনো বৃদ্ধ বাবা আজ ওষুধ পেলেন কি না, কোনো মা একাকী বসে আছেন কি না, তাঁদের সঙ্গে সন্তানরা কেমন আচরণ করছে। আইনেরও একটি সীমা আছে। একটি পরিবারের ভেতরের ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা কোনো আইন দিয়ে পুরোপুরি তৈরি করা যায় না।

তাই সন্তানকে শুধু শিক্ষিত নয়, মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব পরিবারকেই নিতে হবে। তাকে শেখাতে হবে—বাবা-মা শুধু শৈশবে সন্তানের আশ্রয় নন; একদিন সন্তানেরও বাবা-মায়ের আশ্রয় হতে হয়।

কারণ জীবনের নির্মম সত্য হলো, আজ যে বাবা সন্তানের হাত ধরে হাঁটতে শেখান, কাল সেই বাবারই হয়তো হাঁটার জন্য সন্তানের হাতের প্রয়োজন হবে। যে মা সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেন, একদিন সেই মায়ের খাবারের প্লেটটিও হয়তো সন্তানের হাতে তুলে দিতে হবে।

আর যেসব বাবা-মা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে সন্তানদের উচ্চশিক্ষা দিয়েছেন, বিদেশে পাঠিয়েছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন—তাঁদের কথা তো আরও বেশি করে মনে রাখা উচিত। সন্তানের সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের ত্যাগ যদি থাকে, তবে সেই সাফল্যের প্রথম ঋণও তাঁদের প্রতিই।

রাজনীতির মাঠে জয়ী হওয়া যায় ভোটে। প্রতিপক্ষকে হারানো যায় সংগঠন ও জনপ্রিয়তার শক্তিতে। কিন্তু জীবনের শেষ বিচারে একজন মানুষের সবচেয়ে বড় জয় হলো—তার সন্তানরা তাকে ভালোবাসে, সম্মান করে এবং শেষ দিন পর্যন্ত পাশে থাকে।

এই তিনজন নেতার জীবন আমাদের সেই কথাটিই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—মানুষের ভালোবাসা অর্জন করা বড় কথা, কিন্তু নিজের সন্তানদের হৃদয়ে একজন ভালো বাবা-মা হয়ে বেঁচে থাকা তার চেয়েও বড় অর্জন।

আজ যারা তরুণ, যারা উচ্চশিক্ষিত হচ্ছে, যারা দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তাদের প্রত্যেকের কাছে তাই একটি প্রশ্ন রেখে যেতে হয়—আপনার সাফল্যের পেছনে যে বাবা-মা নিজেদের জীবন, স্বপ্ন ও স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন, তাঁদের শেষ জীবনে আপনার অবস্থান কোথায়?

মনে রাখতে হবে, বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা কোনো দয়া নয়, কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। তাঁদের জীবনের শেষ দিনগুলো যেন একাকিত্ব, অবহেলা, অপমান কিংবা অনিশ্চয়তায় না কাটে—এ দায়িত্ব শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি একটি সুস্থ সমাজ গড়ারও অন্যতম শর্ত।

কারণ একটি সমাজ কতটা শিক্ষিত, তা শুধু তার ডিগ্রির সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। একটি সমাজ কতটা সভ্য, তা বোঝা যায় সে সমাজ তার বৃদ্ধ বাবা-মা, অসহায় মানুষ এবং আপনজনদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তা দেখেই।

জনতার নেতা হয়েও যদি কেউ সন্তানের কাছে পরাজিত হন, আর একজন সাধারণ বাবা-মা সারাজীবন সন্তানকে মানুষ করে শেষ বয়সে যদি সন্তানের কাছেই অবহেলিত হন—তাহলে সেই পরাজয় শুধু একজন মানুষের নয়; কোথাও না কোথাও সেটি আমাদের পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং মানবিকতারও পরাজয়।

তাই এখনই সময়, সন্তানদের শুধু সফল নয়—মানুষ করে গড়ে তোলার। তাদের শুধু পৃথিবী জয় করার শিক্ষা নয়, নিজের ঘর, নিজের শিকড় এবং নিজের বাবা-মাকে ভালোবাসার শিক্ষাও দিতে হবে।

নইলে একদিন হয়তো আমরা দেখব—সন্তানরা পৃথিবীর নানা প্রান্তে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু তাঁদের বৃদ্ধ বাবা-মা পড়ে আছেন একাকী ঘরে। আর সেই ঘরের দরজা খুলে প্রতিবেশীরাই হয়তো আবিষ্কার করছেন, যাঁদের সন্তান পৃথিবীর কাছে সফল, তাঁদের শেষ জীবনে পাশে থাকার মতো একজন মানুষও ছিল না।

এমন সমাজ আমরা চাই না।

আমরা এমন একটি প্রজন্ম চাই, যারা শিক্ষিত হবে, কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে মানবিকতাও ধারণ করবে; যারা রাজনীতি করবে, কিন্তু অপরাধ ও অন্ধ আনুগত্যের রাজনীতি নয়—মানুষের কল্যাণের রাজনীতি করবে; যারা সমাজের প্রভাবশালী মানুষের কাছ থেকে শুধু ক্ষমতার কৌশল নয়, নীতি ও আদর্শ শেখার চেষ্টা করবে; যারা বাবা-মায়ের ত্যাগকে কখনো ভুলবে না।

কারণ সমাজের অধঃপতন একদিনে ঘটে না। ছোট ছোট অবহেলা, ভুল আদর্শ, অন্ধ অনুসরণ, নৈতিকতার অবক্ষয় এবং পারিবারিক মূল্যবোধের ক্ষয় একসময় একটি অসুস্থ সমাজের জন্ম দেয়। আর সেই সমাজের প্রথম ও সবচেয়ে বড় শিকার হয় আমাদের সন্তানরাই—তারপর তাঁদের বাবা-মা, পরিবার এবং শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজ।

জনতার ভালোবাসায় নেতা হওয়া যায়, ভোটে জয়ী হওয়া যায়, ক্ষমতা অর্জন করা যায়। কিন্তু মানুষের জীবনের শেষ বিচারে সবচেয়ে বড় পরিচয় কোনো পদ, ক্ষমতা কিংবা জনপ্রিয়তা নয়। সবচেয়ে বড় পরিচয়—সে কেমন মানুষ ছিল, কেমন বাবা বা মা ছিল এবং তার সন্তানরা তাকে কতটা ভালোবেসে শেষ পর্যন্ত পাশে দাঁড়িয়েছিল।

সেই বিচারে জয়ী হওয়াই জীবনের সবচেয়ে বড় জয়।