img

আবদুল হাই শিকদারের বই ও আমার বই

প্রকাশিত :  ১০:২৫, ১৮ জুলাই ২০২৬

আবদুল হাই শিকদারের বই ও আমার বই

আবদুল হামিদ মাহবুব

আমরা যারা লেখক, গবেষক কিংবা বইসংগ্রাহক, তাদের কাছে বই শুধু কাগজের মলাট নয়। বই আমাদের জীবনের অংশ। অনেক সময় মনে হয়, বই নাড়াচাড়া না করলে যেন বেঁচে থাকাই অসম্পূর্ণ। জানি, কেনা সব বই পড়া হবে না। তবু বই কিনি। প্রয়োজন নেই, তবু কিনি। গাঁটের টাকা খরচ করেও কিনি। বইয়ের দোকানে ঢুকলেই হাত বাড়িয়ে দিই। এ এক অদ্ভুত নেশা। একসময় সংগ্রহ শত ছাড়ায়। কারও হাজার। কারও হাজার হাজার।

তেমনই একজন কবি আবদুল হাই শিকদার। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে রয়েছে প্রায় ১০ হাজার বই। আনন্দের খবর, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন তাঁর এই সংগ্রহ সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নামে একটি বিশেষ কর্নার হবে। বইগুলো তালিকাভুক্ত হবে। ধীরে ধীরে ডিজিটাল আর্কাইভও তৈরি হবে। এই উদ্যোগ সত্যিই আশাব্যঞ্জক। এমন দৃষ্টান্ত আরও তৈরি হোক। আবদুল হাই শিকদার স্বনামধন্য মানুষ। রাজধানীতে থাকেন। তাই তাঁর সংগ্রহের একটি সুন্দর গন্তব্য তৈরি হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মতো মফস্বলের মানুষদের কথা কে ভাববে?

আমার নিজের কথাই বলি। বাসা বদল করেছি কয়েকবার। কয়েক দফা বন্যায় ঘরে পানি উঠেছে। সেই পানিতে কয়েক হাজার বই নষ্ট হয়েছে। তবুও এখনো আমার সংগ্রহে তিন থেকে চার হাজার বই আছে। কিছু বই রিডিং রুমে যত্ন করে সাজানো। অনেকগুলো আবার গাড়ির গ্যারেজে স্তূপ হয়ে পড়ে আছে। জায়গার অভাব। সময়ের অভাব। তবু বইগুলো ছেড়ে দিতে মন চায় না। আমি জানি, আমার মৃত্যুর পর এই বইগুলোর খবর কেউ নাও নিতে পারে।

আমার স্ত্রী লেখালেখি করেন। তাঁরও কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সংসারের বাস্তবতায় মাঝে মাঝে তাকেও দেখি আমার এলোমেলো বইয়ের স্তূপে বিরক্ত হতে। তখন মনে হয়, আমার কাছে যে সম্পদ, অন্যের কাছে তা হয়তো শুধু জায়গা দখল করে থাকা কাগজ। আমার একমাত্র ছেলে বই ভালোবাসে। কিন্তু তার আগ্রহ পদার্থবিজ্ঞানে। এখন সে বিদেশে। ভবিষ্যতে সেখানেই হয়তো স্থায়ী হবে। আমার পুত্রবধূও পদার্থবিজ্ঞানের মানুষ। তবে শেষবার বাসা বদলের সময় সে যে আন্তরিকতার সঙ্গে বইগুলো গুছিয়ে দিয়েছিল, তা আজও মনে আছে। শ্বশুরের বইয়ের প্রতি তার সেই মমতা আমাকে স্পর্শ করেছিল। তবু বাস্তবতা তো বাস্তবতাই। তারা হয়তো আর দেশে ফিরবে না। তখন এই হাজার হাজার বইয়ের কী হবে? এই প্রশ্ন আমাকে প্রায়ই তাড়া করে। ভয় হয়, একদিন হয়তো কেজি দরে বিক্রি হয়ে যাবে। যেমন হারিয়ে গেছে অনেক মূল্যবান ব্যক্তিগত গ্রন্থসংগ্রহ। যেমন অবহেলায় নষ্ট হয়েছে অসংখ্য দুর্লভ বই।

স্থানীয় লাইব্রেরিতে দেওয়ার কথাও ভেবেছি। কিন্তু দীর্ঘদিন সেই লাইব্রেরির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে জানি, সেখানে বই সংরক্ষণের পরিবেশ খুব ভালো নয়। যে বইগুলো আছে, সেগুলোরও যথাযথ যত্ন হয় না। পাঠকও খুব কম। একসময় লাইব্রেরিটি প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। আমরা কয়েকজন উদ্যোগ নিয়ে আবার চালু করেছি। কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো সংশয় কাটে না। তাই চাই, আমার বইগুলো এমন কোথাও যাক, যেখানে পাঠক আছে। গবেষণা হয়। বইয়ের মূল্য বোঝে এমন মানুষ আছে। যেখানে আগামী প্রজন্ম বইগুলো হাতে তুলে নেবে।

আমার নিজের লেখা প্রায় চল্লিশটি বইও রয়েছে। সব কপিই আমার কাছে নেই। যেগুলো আছে, দেশের বিভিন্ন লাইব্রেরি নিতে চাইলে আমি নিজের খরচে পৌঁছে দিতে প্রস্তুত। অন্তত কিছু পাঠক বইগুলো হাতে নেবে। পড়ুক বা না পড়ুক, বইগুলো বেঁচে থাকুক। লেখালেখি করে কী অর্জন করেছি, জানি না। তবে এটুকু জানি, লেখালেখির বাইরে আর কিছু শিখিনি। বই আর লেখাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

তাই আবদুল হাই শিকদারের বই সংরক্ষণের উদ্যোগের খবর পড়ে নিজের কথাগুলো লিখতে ইচ্ছে হলো। যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়, কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কোনো দায়িত্বশীল গ্রন্থাগার কিংবা কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিগত গ্রন্থসংগ্রহ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়, তবে আমাদের মতো আরও অনেকের আজীবনের সাধনার সম্পদও বেঁচে থাকবে।

ইউজিসি বলেছে, ব্যক্তিগত গ্রন্থসংগ্রহ শুধু সংরক্ষণ নয়, ডিজিটাল আর্কাইভও তৈরি করা হবে। এই চিন্তাকে আমি আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। আশা করি, এই উদ্যোগ শুধু একজনকে ঘিরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ব্যক্তিগত গ্রন্থভাণ্ডারও একদিন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণের সুযোগ পাবে।

শেষে আরেকটি কথা। কিছুদিন আগে জানলাম, শাহবাগের জাতীয় গ্রন্থাগারের বই সংরক্ষণের জন্য ভবন ভাড়া বাবদ কয়েক কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। নিশ্চয়ই এর বাস্তব কারণ রয়েছে। হয়তো নতুন ভবনের কাজ চলছে বলেই এমন ব্যবস্থা করতে হয়েছে। তবে সাধারণ একজন বইপ্রেমী হিসেবে মনে প্রশ্ন জাগে; দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় যদি স্থায়ী অবকাঠামো আরও আগে গড়ে তোলা যেত, তাহলে হয়তো এই বিপুল অর্থ অন্যভাবেও দেশের গ্রন্থাগার ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যয় করা সম্ভব হতো।

বই কেবল ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। বই একটি জাতির স্মৃতি। একটি সভ্যতার উত্তরাধিকার। তাই ব্যক্তিগত গ্রন্থসংগ্রহ রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বাড়ুক। যাতে কোনো লেখকের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আজীবনের সাধনাও কেজি দরে বিক্রি না হয়ে যায়। আবদুল হাই শিকদারের জন্য আন্তরিক শুভকামনা। তাঁর উদ্যোগ সফল হোক। আর সেই সঙ্গে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ব্যক্তিগত গ্রন্থভাণ্ডারও যেন একদিন নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পায়।


লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব  ও  যুগ্ম সাধারণ  সম্পাদক, মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল। মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪, ই-মেইল:  [email protected]

মতামত এর আরও খবর

img

দুই সপ্তাহের মধ্যে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে : রিজভী

প্রকাশিত :  ১৯:০৪, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সম্পাদকীয় কলাম

দুই সপ্তাহ তথা সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।

রিজভী বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনে বিএনপি আজকে ক্ষমতায় এসেছে। ক্ষমতায় এসেই জনগণের কাছে প্রদত্ত অঙ্গীকার রক্ষায় তারেক রহমান নিরলস পরিশ্রম করছেন, দিন-রাত কাজ করছেন।

দলের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চ্যালেঞ্জ না থাকলে সেটি মোকাবিলা করে ভালো কিছু করার মধ্যে তো কোনো কৃতিত্ব নেই! নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ আছে, ষড়যন্ত্র আছে, চক্রান্ত আছে, কিন্তু সেগুলোকে মোকাবিলা করেই তারেক রহমান সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, কাজ করে যাচ্ছেন এবং তার অঙ্গীকারগুলো—ফার্মারস কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিনের ভাতা, প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে কাজ করে যাচ্ছেন।

বিদ্যুৎ-জ্বালানির সংকটে বিএনপি বা সরকার দায়ী নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই সংকট একটি বৈশ্বিক সংকট। আমেরিকা-ইরানের যুদ্ধ...হরমুজ প্রণালি জাহাজ আসতে পারছে না। জ্বালানি আসতে পারছে না। দুএকটা জাহাজ যখন আসার চেষ্টা করেছে, সেখানে বোম পড়েছে। তারপরেও তো তিনি (তারেক রহমান) বসে নেই! জ্বালানি-বিদ্যুতের বাজেটের উপরে ৪০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে তিনি গ্যাসের সংকট সমাধান করছেন।’

মহেশখালীতে এফএসআরইউর কারিগরি ত্রুটি মেরামত সম্পন্ন হয়েছে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, ‘এখন রিগ্যাসিফিকেশন শুরু হয়েছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম অথবা দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত থাকবে এবং বিদ্যুৎ থাকবে। তার কিছু আলামত আমরা দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং সব সংকট মোকাবিলা করে তারেক রহমান দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, এগিয়ে নিয়ে যাবেন।’

দল ও সরকার দুটি পৃথক সত্তা, অথচ সরকার চালাতে গিয়ে দল হিসেবে বিএনপি পৃথক থাকতে পারছে না—গণমাধ্যমকর্মীরা এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘এটি একটি ভেক টার্ম।’

রিজভী বলেন, ‘জনগণ পার্টিকে ভোট দিয়েছে, পার্টি সরকার গঠন করেছে। সরকারের মন্ত্রীরা সব বিএনপির নেতা। অধিকাংশই বিএনপির নেতা। তাহলে পার্টিকে যখন ভোট দিয়েছে, নির্বাচিত করেছে, পার্টির লোকরাই তো সরকার পরিচালনা করবে! এটার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।’

‘আমরা বারবার বলেছি, তৃণমূলের সদস্য থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিএনপির সমস্ত নেতাকর্মী সরকারের অংশ। সরকারের সব কর্মসূচি, যেটা জনকল্যাণে-জনস্বার্থে বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেগুলো আমাদের নেতাকর্মীরা ভালো করে জনগণকে অবহিত করবে। এর মধ্যে কোনো বৈসাদৃশ্য নেই, কোনো বৈশব্দ নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘পার্টি পার্টির জায়গায় আছে, সরকার সরকারের জায়গায় আছে। কিন্তু সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আছে বিএনপি এবং বিএনপির লোক। সুতরাং দলের লোকরাই তো মন্ত্রী হবে, চিফ হুইপ হবে। চিফ হুইপ ভাইস চেয়ারম্যান কাকে করবে? অন্য দেশ থেকে ধার করে আনবে, না অন্য পার্টি থেকে ধার করে আনবে? দলের লোকরাই হবে।’

‘এটা (দল ও সরকার দুটি পৃথক সত্তা) একটা কথা ছুড়ে দিয়েছে, এটা একটা ভেক টার্ম। এটার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নাই। পার্টিতে যারা দায়িত্ব পালন করছেন, তারা পার্টির দায়িত্ব পালন করবেন এবং সরকারেও যারা মন্ত্রী আছেন, তারা মন্ত্রিত্বের ফাঁকে পার্টির যে দায়িত্ব তাদের ওপর আছে, তার পদ অনুযায়ী সেই দায়িত্ব পালন করবেন,’ বলেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব।