img

মুহম্মদ জাফর ইকবাল দুবছর কই ছিলেন?

প্রকাশিত :  ১৫:৪২, ২৫ জুলাই ২০২৬

মুহম্মদ জাফর ইকবাল দুবছর কই ছিলেন?

আবদুল হামিদ মাহবুব

বাংলাদেশের সাহিত্য, বিজ্ঞানচর্চা ও শিশু-কিশোর সাহিত্যের জগতে মুহম্মদ জাফর ইকবাল একটি অত্যন্ত পরিচিত নাম। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি অসংখ্য তরুণ-তরুণীকে বই পড়তে শিখিয়েছেন, বিজ্ঞানমনস্ক হতে উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সাহিত্যের ভাষায় তুলে ধরেছেন। ঠিক এই কারণেই তার প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তও সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে একটি অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি এবং সেখানে দেওয়া বক্তব্য নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হচ্ছে; গত দুই বছর তিনি কোথায় ছিলেন?

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মুহম্মদ জাফর ইকবালকে আর দেশের জনপরিসরে এক্কেবারেই দেখা যায়নি। এরপরও দীর্ঘ সময় তিনি প্রকাশ্যে ছিলেন না। হঠাৎ করেই ২০২৬ সালের  ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে এক অনুষ্ঠানে তাকে দেখা গেল। সেখানে তিনি নিজেই বলেন, তারা গত দুই বছর ধরে ‘নির্বাসনে’ আছেন। এই একটি শব্দই জনমনে নতুন কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। কারণ ‘নির্বাসন’ সাধারণত এমন একটি অবস্থা বোঝায়, যেখানে রাষ্ট্র কাউকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে অথবা দেশে ফিরে আসার সুযোগ সীমিত করে। কিন্তু মুহম্মদ জাফর ইকবালের ক্ষেত্রে এমন কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত বা প্রজ্ঞাপনের তথ্য এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।

এই কারণেই প্রশ্ন উঠছে, তিনি কি স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়েছেন, নাকি এমন কোনো বাস্তবতা ছিল যা তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছে? যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তাহলে সেটি কী? আবার যদি তিনি নিজ সিদ্ধান্তে বিদেশে অবস্থান করে থাকেন, তাহলে তাকে ‘নির্বাসিত’ বলা কতটা যথাযথ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় তার একটি সংক্ষিপ্ত লেখা বিশেষ বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। সেখানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের একটি স্লোগানের অংশবিশেষ উল্লেখ করে লিখেছিলেন, \"ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার বিশ্ববিদ্যালয়, আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়। তবে আমি মনে হয় আর কোনোদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চাইব না। ছাত্র-ছাত্রীদের দেখলেই মনে হবে, এরাই হয়তো সেই \'রাজাকার\'। আর যে কয়দিন বেঁচে আছি, আমি কোনো রাজাকারের মুখ দেখতে চাই না। একটাই তো জীবন। সেই জীবনে আবার কেন নতুন করে রাজাকারদের দেখতে হবে?\" তার এই মন্তব্য অনেকের কাছে অত্যন্ত আপত্তিকর মনে হয়েছে। কারণ আন্দোলনের স্লোগান ছিল, \"তুমি কে? আমি কে? রাজাকার রাজাকার।\" পরের অংশ ছিল; \"কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার স্বৈরাচার।\" তিনি শিক্ষার্থীদের স্লোগানের প্রথম অংশ নিয়ে সমালোচনা করে শিক্ষার্থীদের কাছে বিরাগভাজন হন। কিন্তু দ্বিতীয় অংশ স্বৈরাচারের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার পেছনে কি রহস্য ছিল? যা তিনি কোন সময়েই খোলাসা করেননি। তার সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি তখনকার সরকারের অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই বক্তব্য দিয়েছিলেন।

এরপর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। আন্দোলনে বহু মানুষের মৃত্যু হয়, রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে এবং শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারান। কিন্তু এই পুরো সময়ে মুহম্মদ জাফর ইকবালের কাছ থেকে সেই হত্যাকাণ্ড, রক্তপাত কিংবা পরবর্তী বাস্তবতা নিয়ে তেমন কোনো প্রকাশ্য মন্তব্য শোনা যায়নি। অনেকেই মনে করেন, তার নীরবতা ছিল বিস্ময়কর। আবার অন্যদের মতে, তিনি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা অন্য কোনো কারণে প্রকাশ্যে আসেননি। কোন ব্যাখ্যাটি সত্য, সেটি একমাত্র তিনিই স্পষ্ট করতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বাংলাদেশ একদিন আবার একাত্তরের আদর্শে ফিরে যাবে। তিনি আরও বলেন, ইতিহাসকে ‘রিসেট বাটন’ টিপে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তার এই বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার দীর্ঘদিনের অবস্থানই প্রতিফলিত হয়েছে। কারণ তার সাহিত্যজীবনের বড় একটি অংশজুড়েই মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন ছিল।

কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে। যে মানুষটি শিশু-কিশোরদের দেশপ্রেমের শিক্ষা দিয়েছেন, তিনি কেন এমন একটি সময়ে দেশ ছেড়ে গেলেন, যখন দেশ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল? যদি তিনি সত্যিই নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করে থাকেন, তাহলে সেই অভিজ্ঞতার কথা খোলাখুলিভাবে বলা কি উচিত নয়? আর যদি তিনি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে বিদেশে থাকেন, তাহলে সেটিও স্পষ্ট করে জানানো দরকার। কারণ জনপরিসরের একজন মানুষের নীরবতা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় জল্পনা-কল্পনার জন্ম দেয়।

আরেকটি বিষয় জনমনে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে কোন আইনি মর্যাদায় অবস্থান করছেন? তিনি কি পর্যটক ভিসায় আছেন, কোনো দীর্ঘমেয়াদি ভিসায় আছেন, স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে আছেন, নাকি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক? এ বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য প্রকাশ্যে নেই। ফলে বিভিন্ন ধরনের গুঞ্জন শোনা গেলেও সেগুলোকে তথ্য হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। তার ঘনিষ্ঠজন কিংবা তিনি নিজেই যদি এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দেন, তাহলে এই বিতর্কের অবসান হতে পারে।

একইভাবে বহুদিন ধরেই একটি প্রশ্ন আলোচনায় রয়েছে; মুহম্মদ জাফর ইকবাল কি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন? তিনি দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা ও কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু নাগরিকত্ব নিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ্যে নেই। তাই এটি নিয়ে অনুমান করার চেয়ে তথ্যের অপেক্ষা করাই যুক্তিযুক্ত।

নিউ জার্সির অনুষ্ঠানে তার স্ত্রী অধ্যাপক ইয়াসমিন হকও বলেন, তারা ‘দেশহীন’ অবস্থায় আছেন। এই বক্তব্যও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ ‘দেশহীন’ শব্দটির একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক ও আইনি অর্থ রয়েছে। তারা কি সেই অর্থে দেশহীন, নাকি এটি কেবল মানসিক বেদনার প্রকাশ?সেটিও স্পষ্ট নয়। একইভাবে ‘নির্বাসন’ শব্দটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, নাকি আইনি বাস্তবতা বোঝাতে; সেটিও ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

মুহম্মদ জাফর ইকবালের সমালোচনা করা যেমন একজন নাগরিকের অধিকার, তেমনি তার দীর্ঘ সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিষয়ক অবদান অস্বীকার করাও ন্যায়সঙ্গত হবে না। তিনি এমন একজন লেখক, যার বই পড়ে বহু তরুণ বিজ্ঞানকে ভালোবেসেছে, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জেনেছে এবং যুক্তিবাদী চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। সেই কারণেই তার কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। একজন জনপ্রিয় লেখকের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাখ্যার দাবি তৈরি করে।

আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি রাজনৈতিক নয়, ব্যক্তিগতও নয়; বরং জনস্বার্থের। দুই বছর তিনি কোথায় ছিলেন? কী পরিস্থিতিতে দেশ ছাড়লেন? বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে কী স্ট্যাটাসে আছেন? তিনি কি আবার বাংলাদেশে ফিরবেন? যদি ফিরতে চান, তাহলে কবে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানার আগ্রহ অস্বাভাবিক নয়। কারণ তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের অন্যতম পরিচিত মুখ।

বিতর্কের চেয়ে স্বচ্ছতা সবসময় বেশি শক্তিশালী। মুহম্মদ জাফর ইকবাল যদি নিজেই এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেন, তাহলে হয়তো অনেক বিতর্কের অবসান হবে। কারণ গুজবের চেয়ে সত্য সবসময় বেশি গ্রহণযোগ্য। একজন লেখকের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ভাষা, আর সেই ভাষায় নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে বলার সাহসও তারই থাকা উচিত।

আজকের বাংলাদেশে মতের ভিন্নতা থাকবে, রাজনৈতিক অবস্থানও ভিন্ন হবে। কিন্তু একজন লেখক, একজন শিক্ষক এবং একজন জনবুদ্ধিজীবী হিসেবে মুহম্মদ জাফর ইকবালের কাছে মানুষ যে জবাবদিহির প্রত্যাশা করবে, সেটিও অস্বাভাবিক নয়। প্রশ্ন করা গণতন্ত্রের অংশ, আবার সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াও জনজীবনের অংশ। এখন অপেক্ষা শুধু একটাই; তিনি কি নিজেই এই নীরবতার অবসান ঘটাবেন?


লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব  ও  যুগ্ম সাধারণ  সম্পাদক, মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল। মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪, ই-মেইল:  [email protected]

img

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: ফুটবলে গার্হস্থ্য সহিংসতা, লুকানো সংকট ও নীতিগত করণীয়

প্রকাশিত :  ১৪:০০, ২০ জুলাই ২০২৬

॥ হুসনা খান হাসি ॥

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রীড়া আয়োজন। এই প্রতিযোগিতা কেবল শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়, বরং জাতীয় পরিচয়, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক সংহতির এক অনন্য প্রতীক। কোটি কোটি দর্শকের আবেগ, গণমাধ্যমের বিপুল উপস্থিতি এবং খেলোয়াড়দের অসাধারণ জনপ্রিয়তা ফুটবলকে শুধু একটি খেলা নয়, একটি শক্তিশালী সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু এই আলো ঝলমলে বাস্তবতার আড়ালে এমন কিছু জটিল সামাজিক সংকট রয়েছে, যেগুলো নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে সীমিত। গার্হস্থ্য সহিংসতা তার অন্যতম।

গার্হস্থ্য সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সংকট, যা পরিবার, শিশু, কর্মক্ষেত্র এবং বৃহত্তর সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা যায়, ক্ষমতার অসমতা, মানসিক চাপ, রাগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং জবাবদিহির অভাব একত্রে সহিংস আচরণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। পেশাদার খেলাধুলার পরিবেশে এই ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয় উচ্চমাত্রার প্রতিযোগিতা, চরম পারফরম্যান্সের চাপ, জনসমালোচনার ভয়, দীর্ঘ ভ্রমণ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সংকোচন এবং কখনও কখনও খ্যাতিজনিত বিশেষ সুবিধা।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণা ইঙ্গিত করে যে ক্রীড়া তারকা হওয়া নিজেই গার্হস্থ্য সহিংসতার কারণ নয়। বরং কিছু কাঠামোগত ও মনস্তাত্ত্বিক ঝুঁকির কারণে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সহিংসতার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেতে পারে। অর্থাৎ সমস্যার মূল খেলাধুলা নয়, বরং ক্ষমতার অপব্যবহার, অপর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি।

এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো “তারকাখ্যাতির সংস্কৃতি”। জনপ্রিয় খেলোয়াড়দের ঘিরে গড়ে ওঠা সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ অনেক সময় অভিযোগকে গুরুত্বহীন করে তোলে। সমর্থক, স্পন্সর, ক্লাব কিংবা গণমাধ্যমের একটি অংশ কখনও কখনও মাঠের সাফল্যকে ব্যক্তিগত আচরণের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়। এর ফলে ভুক্তভোগীরা বিচারের পরিবর্তে সামাজিক অবিশ্বাস, চরিত্রহনন এবং মানসিক চাপে পড়েন। এই সংস্কৃতি অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধকে দুর্বল করে।

মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়ায় মানসিক সুস্থতা শারীরিক সক্ষমতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বহু পেশাদার খেলোয়াড় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করেন, কারণ এখনো অনেক ক্ষেত্রে এটিকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। ফলস্বরূপ, উদ্বেগ, হতাশা, রাগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা কিংবা সম্পর্কগত সংকট দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থেকে যায়। তাই মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে ঐচ্ছিক সুবিধা নয়, বরং পেশাদার ক্রীড়া ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

ফিফা বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসর কেবল খেলোয়াড়দের দক্ষতার নয়, ক্রীড়া প্রশাসনের নৈতিক মানদণ্ডেরও পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা, জাতীয় ফেডারেশন এবং ক্লাবগুলোর উচিত গার্হস্থ্য সহিংসতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নীতি গ্রহণ করা, যেখানে অভিযোগ তদন্তের স্বাধীন ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ শাস্তিমূলক প্রক্রিয়া এবং ভুক্তভোগী সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা থাকবে। একই সঙ্গে খেলোয়াড়, কোচ এবং কর্মকর্তাদের জন্য বাধ্যতামূলক আচরণবিধি, লিঙ্গসমতা, সম্মানজনক সম্পর্ক এবং সহিংসতা প্রতিরোধ বিষয়ক প্রশিক্ষণ চালু করা সময়ের দাবি।

গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে খেলোয়াড়ের জনপ্রিয়তা বা ক্রীড়া সাফল্যকে কেন্দ্র করে ঘটনাকে আড়াল না করে মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক দায়িত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একইভাবে সমর্থকদেরও উপলব্ধি করতে হবে যে একজন খেলোয়াড়ের অসাধারণ পারফরম্যান্স কখনোই তার ব্যক্তিগত জীবনের সহিংস আচরণের নৈতিক বৈধতা তৈরি করতে পারে না।

বিশ্বকাপ আমাদের শিখিয়েছে, ফুটবল মানুষকে একত্রিত করতে পারে। সেই ঐক্যের শক্তিকে যদি মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় ব্যবহার করা যায়, তবে খেলাধুলা সামাজিক পরিবর্তনেরও একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। তাই ফুটবলের ভবিষ্যৎ শুধু নতুন কৌশল, উন্নত প্রযুক্তি কিংবা রেকর্ড ভাঙার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করে এমন একটি ক্রীড়া সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর, যেখানে সম্মান, জবাবদিহি, লিঙ্গসমতা এবং মানবাধিকার সমানভাবে মূল্যায়িত হবে।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়। আমরা কি শুধু সেরা গোল এবং সেরা খেলোয়াড়কে উদযাপন করব, নাকি এমন একটি ফুটবল সংস্কৃতি গড়ে তুলব যেখানে মাঠের বাইরেও ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং নিরাপত্তা সমান গুরুত্ব পাবে? যদি ফুটবল সত্যিই বিশ্বের খেলা হয়, তবে এর সবচেয়ে বড় জয় হবে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে প্রতিটি মানুষ সহিংসতামুক্ত, মর্যাদাপূর্ণ এবং নিরাপদ জীবনের অধিকার ভোগ করবে।

লন্ডন, যুক্তরাজ্য
১৯/০৭২০২৬

মতামত এর আরও খবর