img

দ্বৈত নাগরিকত্ব ও জনপ্রতিনিধিত্ব: বাংলাদেশের কি নতুন করে ভাবার সময় এসেছে?

প্রকাশিত :  ১৬:৪১, ২৯ আগষ্ট ২০২৬

দ্বৈত নাগরিকত্ব ও জনপ্রতিনিধিত্ব: বাংলাদেশের কি নতুন করে ভাবার সময় এসেছে?
নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল

প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে আমরা গর্ব করি। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি। তাঁদের বিনিয়োগ, পেশাগত সাফল্য, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, জ্ঞান ও দক্ষতা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চিকিৎসক, আইনজীবী, শিক্ষক, গবেষক, উদ্যোক্তা, প্রকৌশলী, রাজনীতিবিদ কিংবা সমাজকর্মী হিসেবে তাঁরা বাংলাদেশের পরিচয় বহন করছেন।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।

একজন জন্মসূত্রে বাংলাদেশি ব্যক্তি যদি জীবনের প্রয়োজনে বিদেশে গিয়ে আরেকটি দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, তাতে কি বাংলাদেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার তাঁর রাজনৈতিক সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিত?

প্রশ্নটি আবেগের নয়। এটি সংবিধান, নাগরিকত্ব, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, আনুগত্য এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রশ্ন।

বর্তমান সংবিধানের অবস্থান পরিষ্কার। সংবিধানের ৬৬(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিক এবং কমপক্ষে ২৫ বছর বয়সী একজন ব্যক্তি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মৌলিক যোগ্যতা রাখেন। কিন্তু ৬৬(২)(গ) বলছে, কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে কিংবা সেই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া বা সদস্য হিসেবে থাকার অযোগ্য হবেন। একই সঙ্গে ৬৬(২ক) একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমও রেখেছে: জন্মসূত্রে বাংলাদেশি কোনো ব্যক্তি দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের পর বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে সেই কারণে তাঁকে অযোগ্য বলে গণ্য করা হবে না।

অর্থাৎ বর্তমান আইনকে সরলভাবে বললে, বাংলাদেশ একজন দ্বৈত নাগরিককে তাঁর বিদেশি নাগরিকত্ব বহাল রেখে জাতীয় সংসদের সদস্য হওয়ার সুযোগ দেয় না।
এই বিধানের পেছনের যুক্তিও বোঝা কঠিন নয়।
একজন সংসদ সদস্য শুধু একটি এলাকার প্রতিনিধি নন; তিনি রাষ্ট্রের আইন প্রণেতা। জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাঁর ভূমিকা রয়েছে। ফলে রাষ্ট্র চাইতেই পারে যে সংসদ সদস্যের আনুগত্য যেন অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে আইনগতভাবে বিভক্ত না হয়।

এই উদ্বেগকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ২০২৬ সালের বৈশ্বিক বাস্তবতায় এই উদ্বেগের সমাধান কি কেবল একটি blanket prohibition হতে হবে?

এখানেই আলোচনার সুযোগ রয়েছে।

আমি নিজেও একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি। ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণের অর্থ আমার কাছে কখনো বাংলাদেশকে ত্যাগ করা ছিল না। বাংলাদেশের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা একজন মানুষের শিকড় একটি নতুন পাসপোর্ট পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় না। ভাষা বদলে যায় না। পরিবার, স্মৃতি, সংস্কৃতি কিংবা দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধও অদৃশ্য হয়ে যায় না।

এই অভিজ্ঞতা শুধু একজন ব্যক্তির নয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা লাখো বাংলাদেশির জীবনেই একই বাস্তবতা রয়েছে।

তাঁরা বিদেশে থেকে দেশের পরিবারের পাশে দাঁড়ান। দেশে বাড়ি করেন, ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা করেন, দুর্যোগে অর্থ পাঠান, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলেন। কখনো কখনো নিজেদের পেশাগত সাফল্যের মাধ্যমে তাঁরা এমন একটি বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরেন, যা রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কূটনীতির বাইরেও দেশের ভাবমূর্তি শক্তিশালী করে।

তাহলে নীতিগত প্রশ্নটি একেবারেই অযৌক্তিক নয়: রাষ্ট্র যদি তাঁদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানকে স্বাগত জানায়, তাহলে তাঁদের মধ্যে কেউ যদি বাংলাদেশের জনগণের আস্থা নিয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে চান, সেখানে দ্বিতীয় নাগরিকত্ব নিজেই কেন চূড়ান্ত বাধা হয়ে থাকবে?

এ প্রশ্ন করার অর্থ বর্তমান সংবিধান অমান্য করার আহ্বান নয়।

বরং উল্টো।
আইনের শাসনের অর্থ হলো বর্তমান আইন যতদিন বহাল আছে, তা মানতে হবে। আবার সাংবিধানিক গণতন্ত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো আইনকে প্রশ্ন করা, পর্যালোচনা করা এবং পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া।

সংবিধান কোনো মৃত দলিল নয়।

রাষ্ট্র ও সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে বহু দেশেই সংবিধান পরিবর্তিত হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানও স্বাধীনতার পর বহুবার সংশোধিত হয়েছে।

অতএব প্রশ্নটি হওয়া উচিত: দ্বৈত নাগরিকদের জনপ্রতিনিধিত্বের বর্তমান নিষেধাজ্ঞা কি বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বাস্তবতার সঙ্গে সর্বোত্তমভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

স্থানীয় সরকারেও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন

এই আলোচনায় বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থাও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এবং জেলা পরিষদের নির্বাচিত পদগুলোর যোগ্যতা ও অযোগ্যতা জাতীয় সংসদের অনুচ্ছেদ ৬৬ দিয়ে নয়, পৃথক পৃথক আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে।

স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ২৬ ধারায় চেয়ারম্যান বা সদস্য হতে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া, ন্যূনতম ২৫ বছর বয়স এবং সংশ্লিষ্ট ভোটার তালিকায় নাম থাকার শর্ত রয়েছে। একই ধারায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ বা হারানোকে অযোগ্যতার কারণ করা হয়েছে। উপজেলা পরিষদ আইনেও চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া এবং নাগরিকত্ব পরিত্যাগ বা হারানোকে অযোগ্যতার কারণ হিসেবে রাখা হয়েছে। 

একই ধরনের ভাষা পাওয়া যায় পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রেও। মেয়র ও কাউন্সিলরকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হয় এবং বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ বা হারালে তিনি অযোগ্য হন। জেলা পরিষদ আইনেও চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার শর্ত এবং নাগরিকত্ব পরিত্যাগ বা হারানোর অযোগ্যতা রয়েছে। 

এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য লক্ষণীয়।

জাতীয় সংসদের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৬৬(২)(গ) সরাসরি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জনের বিষয়টি উল্লেখ করে। কিন্তু উপরোক্ত স্থানীয় সরকার আইনগুলোর সংশ্লিষ্ট ধারায় ব্যবহৃত ভাষা মূলত বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া এবং বাংলাদেশের নাগরিকত্ব “পরিত্যাগ” বা “হারানো”কে কেন্দ্র করে।
তবে এই ভাষাগত পার্থক্য থেকে সরাসরি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নিরাপদ নয় যে, বিদেশি নাগরিকত্বধারী প্রত্যেক দ্বৈত বাংলাদেশি ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন। নাগরিকত্ব আইন, ভোটার নিবন্ধন, নির্বাচনী বিধিমালা এবং প্রযোজ্য অন্যান্য আইনি শর্তও বিবেচনায় আসতে পারে।

বরং এই পার্থক্যটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিত্বের বিভিন্ন স্তরে নাগরিকত্বের প্রশ্নে আমাদের আইনি কাঠামো কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?

এটিও ভবিষ্যৎ আইন সংস্কারের আলোচনার অংশ হতে পারে।

বরং প্রবাসীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার একটি বাস্তবসম্মত সূচনাবিন্দুও হতে পারে। একজন মানুষ যদি তাঁর জন্মস্থান, ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা কিংবা শহরের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বাস্তব সম্পর্ক বজায় রাখেন, এলাকার উন্নয়নে কাজ করেন এবং স্থানীয় জনগণ তাঁকে নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিতে চান, তাহলে তাঁর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

অবশ্যই সেখানে বাস্তব সংযোগের প্রশ্ন থাকবে। প্রয়োজনে ন্যূনতম বসবাসের সময়, সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার হওয়া, সম্পদ ও বিদেশি স্বার্থের ঘোষণা এবং স্বার্থের সংঘাতবিষয়ক কঠোর নিয়ম বিবেচনা করা যেতে পারে।

পৃথিবীতে একটিমাত্র মডেল নেই

এই আলোচনায় একটি তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিজে Westminster Parliament-এ নির্বাচিত হওয়ার স্বয়ংক্রিয় বাধা নয়। UK Parliament-এর যোগ্যতার নিয়ম অনুযায়ী ব্রিটিশ নাগরিকের পাশাপাশি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী Republic of Ireland এবং Commonwealth-এর নাগরিকও House of Commons নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য নাগরিকত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশের তুলনায় ভিন্ন একটি মডেল অনুসরণ করে। 

আর সাম্প্রতিক স্কটিশ অভিজ্ঞতা আরও আকর্ষণীয়।

স্কটল্যান্ড রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত একটি নীতি গ্রহণ করেছে। Scottish Elections (Representation and Reform) Act 2025-এর মাধ্যমে বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকদের Scottish Parliament ও Scottish local government নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত করা হয়েছে। আইনের ব্যাখ্যামূলক নথিতেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে এই সংস্কারের উদ্দেশ্য foreign nationals with leave to remain-কে candidacy rights দেওয়া। 

এর বাস্তব উদাহরণও ইতিমধ্যে দেখা গেছে। ২০২৬ সালের Scottish Parliament নির্বাচনে ভারতীয় নাগরিক Q Manivannan Scottish Greens-এর প্রার্থী হিসেবে Edinburgh & Lothians East থেকে নির্বাচিত হন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচিত হওয়ার সময় তিনি ভারতীয় নাগরিক এবং যুক্তরাজ্যে student visa-তে অবস্থান করছিলেন। 

এই উদাহরণটির তাৎপর্য অনেক।

কারণ এখানে শুধু দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্ন নয়; স্কটল্যান্ড আরও এক ধাপ এগিয়ে বৈধভাবে সেখানে বসবাসকারী একজন বিদেশি নাগরিককেও জনগণের ভোটে আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দিয়েছে।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান অনেক কঠোর। অস্ট্রেলিয়ার সংবিধানের ৪৪ ধারায় বিদেশি নাগরিকত্বের কারণে ফেডারেল পার্লামেন্টের সদস্যপদে অযোগ্যতা সৃষ্টি হতে পারে। ২০১৭ সালের বহুল আলোচিত citizenship crisis-এ একাধিক নির্বাচিত রাজনীতিক এই বিধানের কারণে সমস্যায় পড়েছিলেন।

ভারত আবার অন্য একটি মডেল অনুসরণ করে। ভারত পূর্ণ দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকার করে না। Overseas Citizen of India বা OCI মর্যাদা পূর্ণ ভারতীয় নাগরিকত্ব নয় এবং এর সঙ্গে জাতীয় রাজনৈতিক অধিকারও আসে না।
অর্থাৎ পৃথিবীতে একটিমাত্র মডেল নেই।
কোনো দেশ দ্বৈত নাগরিককে সংসদে সুযোগ দেয়।
কোনো দেশ দেয় না।
আবার কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা বৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিককেও নির্দিষ্ট আইনসভায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।

প্রতিটি রাষ্ট্র তার ইতিহাস, নিরাপত্তা, অভিবাসন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তিতে নিজস্ব ব্যবস্থা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশেরও তাই নিজের বাস্তবতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে।
আমার মত হলো, এই প্রশ্নে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা ও সম্পূর্ণ উন্মুক্ততার মাঝখানে একটি মধ্যপন্থা নিয়ে অন্তত আলোচনা হতে পারে।

প্রথমত, একজন প্রার্থীর সব নাগরিকত্ব, বিদেশি পাসপোর্ট, বিদেশে আর্থিক স্বার্থ, ব্যবসা, সম্পত্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত সম্পর্ক বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার আগে কঠোর conflict-of-interest ব্যবস্থা থাকতে পারে।
তৃতীয়ত, সংবেদনশীল জাতীয় নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট দায়িত্বের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা যাচাই বা বিশেষ বিধিনিষেধ রাখা যেতে পারে।

চতুর্থত, সংসদ সদস্য এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কিছু সাংবিধানিক পদের নিয়ম এক হওয়া আবশ্যক নয়। উদাহরণ হিসেবে রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংবিধান নিজেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার একটি শর্ত করেছে। ফলে Article 66 পরিবর্তিত হলে তার প্রভাব রাষ্ট্রপতির যোগ্যতার ওপরও পড়তে পারে। একইভাবে সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের বাইরের যে সীমিতসংখ্যক ব্যক্তিকে মন্ত্রী করা যায়, তাঁদেরও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হয়।

সুতরাং বিষয়টি শুধু সংসদ সদস্য নির্বাচন নয়; পুরো সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই কারণেই কোনো পরিবর্তন হলে তা আবেগের ভিত্তিতে নয়, গভীর সাংবিধানিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
বিরোধী যুক্তিগুলোর দিকেও তাকাতে হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আনুগত্য।

একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে দুই রাষ্ট্রের নাগরিক হলে সংকটের মুহূর্তে তাঁর আনুগত্য কোথায় থাকবে?
এ প্রশ্ন সহজ নয়।
তবে নাগরিকত্ব এবং আনুগত্য সব সময় একই জিনিসও নয়। একটি মানুষ একাধিক দেশের সঙ্গে আইনি সম্পর্ক রাখতে পারেন, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান নির্ধারিত হয় তাঁর কাজ, স্বচ্ছতা এবং দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে।

একজন একক নাগরিকত্বধারী রাজনীতিকও বিদেশি স্বার্থের প্রভাবে থাকতে পারেন।
আবার একজন দ্বৈত নাগরিক জীবনভর বাংলাদেশের স্বার্থে কাজ করতে পারেন।

তাই শুধু পাসপোর্টের সংখ্যা দিয়ে আনুগত্যের নিখুঁত পরীক্ষা করা সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নও বৈধ।
দ্বিতীয় আপত্তি হতে পারে-প্রবাসীরা দেশের দৈনন্দিন বাস্তবতা থেকে দূরে থাকেন।
এখানেও যৌক্তিকতা আছে।
যিনি বছরের পর বছর বিদেশে থেকেছেন, তাঁর বাংলাদেশের স্থানীয় সমস্যা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সীমিত হতে পারে।
কিন্তু এর সমাধানও সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নয়। বসবাসের ন্যূনতম সময়, নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে বাস্তব সম্পর্ক, দেশে কর ও সম্পদের স্বচ্ছতা কিংবা নির্দিষ্ট residency requirement নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

গণতন্ত্রে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিচারক ভোটার।
কেউ বিদেশে থেকেছেন বলেই যদি তাঁর এলাকার মানুষ তাঁকে বিশ্বাস না করেন, তাঁরা তাঁকে ভোট দেবেন না।
কিন্তু যদি এলাকার মানুষ তাঁর যোগ্যতা, সততা ও অভিজ্ঞতায় আস্থা রেখে তাঁকে নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিতে চান, তখন রাষ্ট্রের ভূমিকা কতটা সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত-এ প্রশ্নের উত্তর নতুন করে ভাবা যেতে পারে।

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসীদের দেশের উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। আমরা তাঁদের বলি দেশে বিনিয়োগ করতে। আমরা তাঁদের দক্ষতা দেশে কাজে লাগাতে চাই। আমরা চাই তাঁরা বিদেশে বাংলাদেশের পক্ষে ইতিবাচক ভূমিকা রাখুন।

তাহলে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা উঠলেই তাঁদের শুধু বিদেশি নাগরিক হিসেবে দেখা কিছুটা সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে।
একজন মানুষের হাতে ব্রিটিশ, আমেরিকান, কানাডিয়ান বা অন্য কোনো দেশের পাসপোর্ট থাকা মানেই তিনি বাংলাদেশবিরোধী-এমন ধারণা ন্যায়সংগত নয়।
একইভাবে, দ্বৈত নাগরিক বলেই কাউকে কোনো যাচাই ছাড়াই জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ দেওয়াও যথেষ্ট নয়।
দুই অবস্থানের মাঝখানেই সম্ভবত ভবিষ্যতের বাস্তবসম্মত সমাধান রয়েছে।
আমার প্রস্তাব কোনো ব্যক্তিবিশেষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য সংবিধান পরিবর্তন নয়।

এটি কোনো দলীয় প্রশ্নও নয়।
আজ একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশির ক্ষেত্রে বিষয়টি উঠতে পারে; কাল কানাডিয়ান-বাংলাদেশি, আমেরিকান-বাংলাদেশি কিংবা অস্ট্রেলিয়ান-বাংলাদেশির ক্ষেত্রেও উঠতে পারে।
এটি মূলত প্রশ্ন-বাংলাদেশ তার বৈশ্বিক নাগরিকদের কীভাবে দেখে?
শুধু রেমিট্যান্স পাঠানো মানুষ হিসেবে?

নাকি দেশের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বেরও সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে?

আমাদের প্রজন্ম এমন এক সময়ে বাস করছে, যখন মানুষ এক দেশে জন্মায়, অন্য দেশে পড়াশোনা করে, তৃতীয় দেশে কাজ করে এবং একই সঙ্গে নিজের জন্মভূমির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখে।
রাষ্ট্রের ধারণাও তাই বদলাচ্ছে।

Diaspora এখন আর কেবল বিদেশে থাকা নাগরিকদের একটি গোষ্ঠী নয়; অনেক দেশের জন্য এটি অর্থনীতি, কূটনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং soft power-এর গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
বাংলাদেশও এই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
তাই আমি মনে করি, Article 66-এর বর্তমান বিধান নিয়ে একটি শান্ত, দলনিরপেক্ষ ও বিশেষজ্ঞভিত্তিক জাতীয় আলোচনা হতে পারে।

বর্তমান আইন যতদিন আছে, অবশ্যই সেটি মানতে হবে।
কিন্তু আইন নিয়ে প্রশ্ন তোলা আইনবিরোধিতা নয়।
বরং একটি পরিণত গণতন্ত্রের লক্ষণ হলো-রাষ্ট্রের স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং নাগরিকের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মধ্যে আরও ভালো ভারসাম্য সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন করার সাহস রাখা।
একজন মানুষের হাতে দুটি পাসপোর্ট থাকতে পারে।
তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতাও দুটি দেশের হতে পারে।
কিন্তু তাঁর শিকড়, স্মৃতি কিংবা মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসাকে একটি পাসপোর্টের সংখ্যায় মাপা যায় না।
বাংলাদেশ যদি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তার মানুষদের সত্যিকার অর্থে জাতীয় সম্পদ মনে করে, তাহলে ভবিষ্যতে তাঁদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়েও নতুন করে ভাবা অযৌক্তিক হবে না।

প্রশ্নটি তাই শুধু দ্বৈত নাগরিকের অধিকার নিয়ে নয়।
প্রশ্নটি আরও বড়-একুশ শতকের বাংলাদেশ তার প্রবাসীদের শুধু দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশি হিসেবে দেখবে, নাকি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের সক্রিয় অংশীদার হিসেবেও দেখতে প্রস্তুত হবে?

নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল: লেখক, আইনবিদ, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
img

জনতার নেতা, সন্তানের কাছে পরাজিত

প্রকাশিত :  ১৪:১৮, ০৭ অক্টোবর ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত

বর্তমান সমাজে নতুন প্রজন্মের সন্তানরা কীভাবে বেড়ে উঠছে, তা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। শিক্ষা, অর্থ-বিত্ত, সামাজিক মর্যাদা কিংবা প্রতিষ্ঠা—সবকিছু অর্জনের পরও একজন মানুষ জীবনের শেষ সময়ে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটি প্রত্যাশা করেন, তা হলো আপনজনের একটু ভালোবাসা, যত্ন ও নিরাপদ আশ্রয়। অথচ বাস্তবতা কখনো কখনো এত নির্মম হয়ে ওঠে যে, যাঁরা সারাজীবন মানুষের জন্য কাজ করেছেন, জনগণের ভালোবাসায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁরাই শেষ বয়সে নিজের সন্তানদের কাছেই অবহেলার শিকার হন।

এই এলাকার এমন তিনজন দাপুটে রাজনৈতিক নেতার কথা মনে পড়ে, যাঁরা নিজ নিজ সময়ে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন। মানুষের প্রত্যাশা পূরণেও তাঁরা অনেকাংশে সফল হয়েছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তিনজনের পরিণতিই যেন আমাদের সমাজ ও পারিবারিক মূল্যবোধের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে গেছে।

প্রথমজন ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে এলাকায় সংগঠক হিসেবে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর হাতে গড়া সেই সংগঠন পরবর্তীতে এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসায় ভোটের মাধ্যমে তিনিও জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

জীবনের শেষ সময়ে, মৃত্যুর মাত্র দুই-তিন মাস আগে, তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। সে সময় তাঁকে বলেছিলাম, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেছেন, আপনি আপিল করলে বা আপিল করতে গেলে স্বীকৃতি পাবেন।

আমার কথা শুনে তিনি শান্তভাবে বলেছিলেন, “আমার আর সময় নেই।”

এরপর তিনি আরেক নেতার নাম এবং সেই নেতার এক সন্তানের নাম উল্লেখ করে বলেছিলেন, তাঁর মতো সৃষ্টি করতে পারেননি এমন কেউ, যে সংগ্রাম করে, আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে আমার স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। বাকিটা উপরওয়ালা দেখবেন।

সেটিই ছিল তাঁর সঙ্গে আমার জীবনের শেষ কথা।

দ্বিতীয়জন ছিলেন একজন দাপুটে জনপ্রতিনিধি। তাঁর সরকারের আমলে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী ও পথচারী এর সুফল ভোগ করছেন। মানুষের চলাচলে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পরবর্তীতেও তিনি সরাসরি ভোটে আবার জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল, তিনি তাঁর পরিবারের সবাইকে এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন যে তা সত্যিই বিস্ময়কর। সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর আন্তরিকতারও অভাব ছিল না। অথচ শোনা যায়, জীবনের শেষ বয়সে তাঁকে অনেক কষ্ট পেয়ে পরপারে পাড়ি দিতে হয়েছে।

তৃতীয়জন ছিলেন দুর্দান্ত ও ডাকসাইটে এক নেতা। তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল এমন যে নির্বাচনী প্রচারে টাকা-পয়সা খরচ না করে শুধু পায়ে হেঁটে কয়েকজন মানুষকে সঙ্গে নিয়ে প্রচার চালিয়েই তিনি শক্তিশালী এক প্রতিদ্বন্দ্বীকে নাকানিচোবানি খাইয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সমাজে তাঁর অবদানও কম নয়। একাধারে তিনি ছিলেন সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ এবং রাজনীতির মাঠে একজন ভালো বক্তা—একজন ওরাটার। মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ও জনপ্রিয়তা তাঁকে আলাদা অবস্থান দিয়েছিল।

রাজনীতির মাঠে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়েছিলেন, জনগণের ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে পরিবারের দুই-একজন সন্তানের কাছে যেন সেই মানুষটিই হেরে গেলেন। পরিবারের অবহেলিত অন্য নেতাদের মতো তাঁর অবস্থাও খুব একটা ভিন্ন ছিল না। এলাকায় কানাঘুষা আছে, শেষ বয়সে টাকা দিতে না পারার কারণে তাঁকে সন্তানদের হাতে নাজেহাল পর্যন্ত হতে হয়েছে।

তবে এই গল্পের একটি আশাব্যঞ্জক দিকও আছে। তাঁর স্বীকৃতির জন্য তাঁর অপর এক সন্তান হাইকোর্টে রিট করে আদেশ পর্যন্ত করিয়েছেন। হয়তো সেই স্বীকৃতি পাওয়ার বাস্তবায়ন এখন সময়ের অপেক্ষা।

তিনটি জীবনের গল্প, তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়—কিন্তু শেষ অধ্যায়ে এসে যেন একই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় আমাদের।

যাঁরা জীবনের সোনালি সময়টুকু মানুষের জন্য ব্যয় করেছেন, জনগণের ভালোবাসায় জনপ্রতিনিধি হয়েছেন, সমাজ ও এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন, তাঁরাই যদি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের সন্তানদের কাছ থেকে ভালোবাসা, সম্মান ও সামান্য যত্নটুকু না পান, তাহলে আমাদের শিক্ষা ও সভ্যতার সাফল্য কোথায়?

প্রশ্নটি শুধু এই তিনজন নেতাকে ঘিরে নয়। এটি আজকের সমাজের একটি বৃহত্তর বাস্তবতার দিকেও আমাদের দৃষ্টি ফেরায়।

আজকের অসুস্থ সামাজিক বাস্তবতার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো—নতুন প্রজন্মের একটি অংশ ক্রমেই সুস্থ শিক্ষা, নৈতিকতা ও পারিবারিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তারা অনেক সময় লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে এমন কিছু মানুষের পেছনে ঘুরছে, যাঁরা সমাজে প্রভাবশালী, ক্ষমতাবান কিংবা তথাকথিত সমাজপতি হিসেবে পরিচিত। তাঁদের কথাকে আদর্শ মনে করে, তাঁদের ইঙ্গিতকে নির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করে অনেক তরুণ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে।

কখনো রাজনীতি, কখনো ক্ষমতার ছায়া, কখনো অর্থের লোভ, আবার কখনো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়—সব মিলিয়ে একটি অংশের তরুণদের সামনে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে লেখাপড়া, চরিত্র, নৈতিকতা কিংবা ভবিষ্যৎ গড়ার চেয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা এবং প্রভাবশালী কারও অনুসারী হওয়াকেই তারা সাফল্যের পথ বলে মনে করছে।

মানুষের মান-সম্মান, পারিবারিক মর্যাদা কিংবা নিজের ভবিষ্যৎ—এসব নিয়েও অনেকের মধ্যে আর আগের মতো ভাবনা নেই। কে সম্মানিত মানুষ, কার কাছ থেকে কী শেখা উচিত, কোন কাজটি সমাজের জন্য ভালো আর কোনটি অপরাধ—এই বোধটুকুও অনেকের মধ্যে ক্রমেই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই বিপথগামিতার ফল শুধু ওই তরুণকেই ভোগ করতে হয় না; এর খেসারত দিতে হয় তার পরিবারকেও। একজন সন্তান যখন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, রাজনীতির নামে বিশৃঙ্খলায় যুক্ত হয় কিংবা ভুল মানুষের অনুসরণ করতে করতে নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে, তখন তার বাবা-মায়ের ঘুম হারাম হয়। সন্তানের অপকর্মের কারণে পরিবারকে সামাজিকভাবে লজ্জিত হতে হয়, কখনো আইনি জটিলতায় পড়তে হয়, কখনো অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়।

অথচ অনেক বাবা-মা হয়তো সেই সন্তানকেই মানুষ করার জন্য জীবনের সর্বস্ব দিয়েছেন।

কেউ হয়তো নিজের জমি বিক্রি করেছেন, কেউ ধার-দেনা করেছেন, কেউ নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন। কেউ সন্তানকে উচ্চশিক্ষা দিয়েছেন, কেউ বিদেশে পাঠিয়েছেন। সন্তান যেন প্রতিষ্ঠিত হয়, ভালো মানুষ হয়—এই স্বপ্নেই বাবা-মা জীবনের সেরা সময়টুকু কাটিয়েছেন। কিন্তু সেই সন্তানই যখন ভুল পথে পা বাড়ায়, তখন বাবা-মায়ের সেই ত্যাগ, স্বপ্ন ও ভালোবাসা যেন এক মুহূর্তে প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এখানেই আমাদের সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।

বর্তমানে এমন অনেক ঘটনা শোনা যায়, যেখানে বাবা-মা জীবনের সমস্ত কষ্ট, ত্যাগ ও সঞ্চয় দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়া করান, উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেন, বড় ডিগ্রি অর্জনের পথ তৈরি করে দেন। এমনকি অনেকে সন্তানদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশেও পাঠান। সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত হয়, ভালো চাকরি পায়, অর্থ-বিত্ত অর্জন করে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে দেওয়া বাবা-মায়ের অনেকের খোঁজখবর নেওয়ার সময়টুকুও তারা আর পায় না।

কখনো কখনো পরিস্থিতি আরও নির্মম হয়ে ওঠে। পত্র-পত্রিকায় এমন ঘটনাও জানা গেছে, কোনো কোনো বাবা বা মা এক সপ্তাহ কিংবা তারও আগে মারা যাওয়ার পর প্রতিবেশীরা দুর্গন্ধ পেয়ে বিষয়টি জানতে পেরেছেন এবং পুলিশকে খবর দিয়েছেন। পরে পুলিশ এসে দেখতে পেয়েছে, ঘরের ভেতরেই পড়ে আছে মৃতদেহ। অথচ সন্তানরা জানেন না, কিংবা জানলেও দীর্ঘ সময় ধরে কোনো খোঁজ নেননি যে তাঁদের বাবা বা মা মারা গেছেন।

এমন ঘটনা অত্যন্ত করুণ, মর্মান্তিক এবং একই সঙ্গে আমাদের সামাজিক বিবেকের জন্য গভীর লজ্জার। যে সন্তানকে বাবা-মা এত কষ্ট করে মানুষ করলেন, যে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য তাঁরা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিলেন, সেই সন্তান যদি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁদের খোঁজটুকুও না রাখে, তাহলে সেই উচ্চশিক্ষা, সেই ডিগ্রি, সেই সামাজিক প্রতিষ্ঠার অর্থ কী?

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শুধু অবহেলাই নয়—কোনো কোনো পরিবারে সন্তানদের হাতে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নাজেহাল বা নির্যাতনের ঘটনাও শোনা যায়। বিশেষ করে টাকা-পয়সা দিতে না পারলে কিংবা সন্তানের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে কোনো কোনো বাবা-মা নিজেদের সন্তানদের কাছেই অপমান, দুর্ব্যবহার এমনকি নির্যাতনের শিকার হন।

একজন বৃদ্ধ বাবা, যিনি একদিন সন্তানের হাত ধরে তাকে হাঁটতে শিখিয়েছেন, জীবনের শেষ বয়সে সেই সন্তানের কাছেই যদি অর্থের জন্য অপমানিত হন—এর চেয়ে বেদনাদায়ক পরিণতি আর কী হতে পারে?

আর এই বাস্তবতার সঙ্গে যখন অসুস্থ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ যুক্ত হয়, তখন সমস্যাটি আরও গভীর হয়। রাজনীতি মানুষের কল্যাণ, অধিকার ও নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু রাজনীতির নামে যদি তরুণদের একটি অংশকে শুধু মিছিল, ক্ষমতার প্রদর্শন, প্রতিপক্ষ দমন, অর্থের লেনদেন কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রচ্ছায়ায় থাকার সংস্কৃতির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, তাহলে তার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি শুধু রাজনীতির নয়—সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।

যে তরুণের হাতে বই থাকার কথা, তার হাতে যদি অপরাধের হাতিয়ার উঠে আসে; যে তরুণের চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন থাকার কথা, সে যদি কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তির নির্দেশের অপেক্ষায় দিন কাটায়; যে তরুণের বাবা-মা তাকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখেছেন, সে যদি তাদের কথাই শুনতে না চায়—তাহলে এই অবক্ষয়ের দায় শুধু ব্যক্তির নয়, আমাদের সামগ্রিক সামাজিক পরিবেশেরও।

তবে এর অর্থ এই নয় যে রাজনীতি নিজেই তরুণদের নষ্ট করে। বরং রাজনীতির নামে যখন অনৈতিকতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অপরাধপ্রবণতা ও অন্ধ আনুগত্যকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তখনই তা তরুণদের বিপথে নেওয়ার একটি বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে।

একটি সুস্থ রাজনীতি তরুণদের মানুষের পাশে দাঁড়াতে শেখায়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শেখায়। দেশ, সমাজ ও মানুষের জন্য কাজ করতে শেখায়। কিন্তু অসুস্থ রাজনীতি তরুণদের ক্ষমতার পেছনে ছুটতে শেখায়, অন্যায়কে স্বাভাবিক করে তোলে এবং কখনো কখনো অপরাধকেও সাহসের পরিচয় হিসেবে উপস্থাপন করে।

এই পার্থক্যটি না বুঝলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।

শুধু সন্তানদের দোষ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাজনীতি—সব ক্ষেত্রেই আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। সন্তানকে যদি ছোটবেলা থেকেই শুধু ভালো ফলাফল, ভালো চাকরি, অর্থ-বিত্ত ও প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু তাকে মানবিকতা, নৈতিকতা, পারিবারিক দায়িত্ব ও কৃতজ্ঞতার শিক্ষা দেওয়া না হয়, তাহলে তার শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে শুধু নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে শেখায় না; অন্যের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখায়। বিশেষ করে বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা, সম্মান ও দায়িত্ববোধ একজন মানুষের নৈতিক শিক্ষার অন্যতম ভিত্তি হওয়া উচিত।

আজকের প্রজন্মের অনেক সন্তান উচ্চশিক্ষিত হচ্ছে। বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করছে, ভালো চাকরি করছে, অর্থ-বিত্ত ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জন করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই শিক্ষার কতটুকু তাদের মানুষ করে তুলছে?

একজন সন্তান যদি শিক্ষিত হয়েও বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে না দাঁড়ায়, তাঁদের অসহায়ত্ব না বোঝে, তাঁদের শেষ বয়সের প্রয়োজনকে বোঝা মনে করে, তাহলে সেই শিক্ষা কতটা অর্থবহ—এ প্রশ্ন আমাদের নিজেদের কাছেই রাখতে হবে।

রাষ্ট্রের আইন আছে, আদালত আছে, প্রশাসন আছে। কিন্তু আইন তো প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে দেখে না—কোনো বৃদ্ধ বাবা আজ ওষুধ পেলেন কি না, কোনো মা একাকী বসে আছেন কি না, তাঁদের সঙ্গে সন্তানরা কেমন আচরণ করছে। আইনেরও একটি সীমা আছে। একটি পরিবারের ভেতরের ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা কোনো আইন দিয়ে পুরোপুরি তৈরি করা যায় না।

তাই সন্তানকে শুধু শিক্ষিত নয়, মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব পরিবারকেই নিতে হবে। তাকে শেখাতে হবে—বাবা-মা শুধু শৈশবে সন্তানের আশ্রয় নন; একদিন সন্তানেরও বাবা-মায়ের আশ্রয় হতে হয়।

কারণ জীবনের নির্মম সত্য হলো, আজ যে বাবা সন্তানের হাত ধরে হাঁটতে শেখান, কাল সেই বাবারই হয়তো হাঁটার জন্য সন্তানের হাতের প্রয়োজন হবে। যে মা সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেন, একদিন সেই মায়ের খাবারের প্লেটটিও হয়তো সন্তানের হাতে তুলে দিতে হবে।

আর যেসব বাবা-মা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে সন্তানদের উচ্চশিক্ষা দিয়েছেন, বিদেশে পাঠিয়েছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন—তাঁদের কথা তো আরও বেশি করে মনে রাখা উচিত। সন্তানের সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের ত্যাগ যদি থাকে, তবে সেই সাফল্যের প্রথম ঋণও তাঁদের প্রতিই।

রাজনীতির মাঠে জয়ী হওয়া যায় ভোটে। প্রতিপক্ষকে হারানো যায় সংগঠন ও জনপ্রিয়তার শক্তিতে। কিন্তু জীবনের শেষ বিচারে একজন মানুষের সবচেয়ে বড় জয় হলো—তার সন্তানরা তাকে ভালোবাসে, সম্মান করে এবং শেষ দিন পর্যন্ত পাশে থাকে।

এই তিনজন নেতার জীবন আমাদের সেই কথাটিই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—মানুষের ভালোবাসা অর্জন করা বড় কথা, কিন্তু নিজের সন্তানদের হৃদয়ে একজন ভালো বাবা-মা হয়ে বেঁচে থাকা তার চেয়েও বড় অর্জন।

আজ যারা তরুণ, যারা উচ্চশিক্ষিত হচ্ছে, যারা দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তাদের প্রত্যেকের কাছে তাই একটি প্রশ্ন রেখে যেতে হয়—আপনার সাফল্যের পেছনে যে বাবা-মা নিজেদের জীবন, স্বপ্ন ও স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন, তাঁদের শেষ জীবনে আপনার অবস্থান কোথায়?

মনে রাখতে হবে, বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা কোনো দয়া নয়, কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। তাঁদের জীবনের শেষ দিনগুলো যেন একাকিত্ব, অবহেলা, অপমান কিংবা অনিশ্চয়তায় না কাটে—এ দায়িত্ব শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি একটি সুস্থ সমাজ গড়ারও অন্যতম শর্ত।

কারণ একটি সমাজ কতটা শিক্ষিত, তা শুধু তার ডিগ্রির সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। একটি সমাজ কতটা সভ্য, তা বোঝা যায় সে সমাজ তার বৃদ্ধ বাবা-মা, অসহায় মানুষ এবং আপনজনদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তা দেখেই।

জনতার নেতা হয়েও যদি কেউ সন্তানের কাছে পরাজিত হন, আর একজন সাধারণ বাবা-মা সারাজীবন সন্তানকে মানুষ করে শেষ বয়সে যদি সন্তানের কাছেই অবহেলিত হন—তাহলে সেই পরাজয় শুধু একজন মানুষের নয়; কোথাও না কোথাও সেটি আমাদের পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং মানবিকতারও পরাজয়।

তাই এখনই সময়, সন্তানদের শুধু সফল নয়—মানুষ করে গড়ে তোলার। তাদের শুধু পৃথিবী জয় করার শিক্ষা নয়, নিজের ঘর, নিজের শিকড় এবং নিজের বাবা-মাকে ভালোবাসার শিক্ষাও দিতে হবে।

নইলে একদিন হয়তো আমরা দেখব—সন্তানরা পৃথিবীর নানা প্রান্তে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু তাঁদের বৃদ্ধ বাবা-মা পড়ে আছেন একাকী ঘরে। আর সেই ঘরের দরজা খুলে প্রতিবেশীরাই হয়তো আবিষ্কার করছেন, যাঁদের সন্তান পৃথিবীর কাছে সফল, তাঁদের শেষ জীবনে পাশে থাকার মতো একজন মানুষও ছিল না।

এমন সমাজ আমরা চাই না।

আমরা এমন একটি প্রজন্ম চাই, যারা শিক্ষিত হবে, কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে মানবিকতাও ধারণ করবে; যারা রাজনীতি করবে, কিন্তু অপরাধ ও অন্ধ আনুগত্যের রাজনীতি নয়—মানুষের কল্যাণের রাজনীতি করবে; যারা সমাজের প্রভাবশালী মানুষের কাছ থেকে শুধু ক্ষমতার কৌশল নয়, নীতি ও আদর্শ শেখার চেষ্টা করবে; যারা বাবা-মায়ের ত্যাগকে কখনো ভুলবে না।

কারণ সমাজের অধঃপতন একদিনে ঘটে না। ছোট ছোট অবহেলা, ভুল আদর্শ, অন্ধ অনুসরণ, নৈতিকতার অবক্ষয় এবং পারিবারিক মূল্যবোধের ক্ষয় একসময় একটি অসুস্থ সমাজের জন্ম দেয়। আর সেই সমাজের প্রথম ও সবচেয়ে বড় শিকার হয় আমাদের সন্তানরাই—তারপর তাঁদের বাবা-মা, পরিবার এবং শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজ।

জনতার ভালোবাসায় নেতা হওয়া যায়, ভোটে জয়ী হওয়া যায়, ক্ষমতা অর্জন করা যায়। কিন্তু মানুষের জীবনের শেষ বিচারে সবচেয়ে বড় পরিচয় কোনো পদ, ক্ষমতা কিংবা জনপ্রিয়তা নয়। সবচেয়ে বড় পরিচয়—সে কেমন মানুষ ছিল, কেমন বাবা বা মা ছিল এবং তার সন্তানরা তাকে কতটা ভালোবেসে শেষ পর্যন্ত পাশে দাঁড়িয়েছিল।

সেই বিচারে জয়ী হওয়াই জীবনের সবচেয়ে বড় জয়।