img

দ্বৈত নাগরিকত্ব ও জনপ্রতিনিধিত্ব: বাংলাদেশের কি নতুন করে ভাবার সময় এসেছে?

প্রকাশিত :  ১৬:৪১, ২৯ আগষ্ট ২০২৬

দ্বৈত নাগরিকত্ব ও জনপ্রতিনিধিত্ব: বাংলাদেশের কি নতুন করে ভাবার সময় এসেছে?
নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল

প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে আমরা গর্ব করি। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি। তাঁদের বিনিয়োগ, পেশাগত সাফল্য, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, জ্ঞান ও দক্ষতা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চিকিৎসক, আইনজীবী, শিক্ষক, গবেষক, উদ্যোক্তা, প্রকৌশলী, রাজনীতিবিদ কিংবা সমাজকর্মী হিসেবে তাঁরা বাংলাদেশের পরিচয় বহন করছেন।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।

একজন জন্মসূত্রে বাংলাদেশি ব্যক্তি যদি জীবনের প্রয়োজনে বিদেশে গিয়ে আরেকটি দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, তাতে কি বাংলাদেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার তাঁর রাজনৈতিক সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিত?

প্রশ্নটি আবেগের নয়। এটি সংবিধান, নাগরিকত্ব, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, আনুগত্য এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রশ্ন।

বর্তমান সংবিধানের অবস্থান পরিষ্কার। সংবিধানের ৬৬(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিক এবং কমপক্ষে ২৫ বছর বয়সী একজন ব্যক্তি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মৌলিক যোগ্যতা রাখেন। কিন্তু ৬৬(২)(গ) বলছে, কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে কিংবা সেই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া বা সদস্য হিসেবে থাকার অযোগ্য হবেন। একই সঙ্গে ৬৬(২ক) একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমও রেখেছে: জন্মসূত্রে বাংলাদেশি কোনো ব্যক্তি দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের পর বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে সেই কারণে তাঁকে অযোগ্য বলে গণ্য করা হবে না।

অর্থাৎ বর্তমান আইনকে সরলভাবে বললে, বাংলাদেশ একজন দ্বৈত নাগরিককে তাঁর বিদেশি নাগরিকত্ব বহাল রেখে জাতীয় সংসদের সদস্য হওয়ার সুযোগ দেয় না।
এই বিধানের পেছনের যুক্তিও বোঝা কঠিন নয়।
একজন সংসদ সদস্য শুধু একটি এলাকার প্রতিনিধি নন; তিনি রাষ্ট্রের আইন প্রণেতা। জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাঁর ভূমিকা রয়েছে। ফলে রাষ্ট্র চাইতেই পারে যে সংসদ সদস্যের আনুগত্য যেন অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে আইনগতভাবে বিভক্ত না হয়।

এই উদ্বেগকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ২০২৬ সালের বৈশ্বিক বাস্তবতায় এই উদ্বেগের সমাধান কি কেবল একটি blanket prohibition হতে হবে?

এখানেই আলোচনার সুযোগ রয়েছে।

আমি নিজেও একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি। ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণের অর্থ আমার কাছে কখনো বাংলাদেশকে ত্যাগ করা ছিল না। বাংলাদেশের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা একজন মানুষের শিকড় একটি নতুন পাসপোর্ট পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় না। ভাষা বদলে যায় না। পরিবার, স্মৃতি, সংস্কৃতি কিংবা দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধও অদৃশ্য হয়ে যায় না।

এই অভিজ্ঞতা শুধু একজন ব্যক্তির নয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা লাখো বাংলাদেশির জীবনেই একই বাস্তবতা রয়েছে।

তাঁরা বিদেশে থেকে দেশের পরিবারের পাশে দাঁড়ান। দেশে বাড়ি করেন, ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা করেন, দুর্যোগে অর্থ পাঠান, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলেন। কখনো কখনো নিজেদের পেশাগত সাফল্যের মাধ্যমে তাঁরা এমন একটি বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরেন, যা রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কূটনীতির বাইরেও দেশের ভাবমূর্তি শক্তিশালী করে।

তাহলে নীতিগত প্রশ্নটি একেবারেই অযৌক্তিক নয়: রাষ্ট্র যদি তাঁদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানকে স্বাগত জানায়, তাহলে তাঁদের মধ্যে কেউ যদি বাংলাদেশের জনগণের আস্থা নিয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে চান, সেখানে দ্বিতীয় নাগরিকত্ব নিজেই কেন চূড়ান্ত বাধা হয়ে থাকবে?

এ প্রশ্ন করার অর্থ বর্তমান সংবিধান অমান্য করার আহ্বান নয়।

বরং উল্টো।
আইনের শাসনের অর্থ হলো বর্তমান আইন যতদিন বহাল আছে, তা মানতে হবে। আবার সাংবিধানিক গণতন্ত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো আইনকে প্রশ্ন করা, পর্যালোচনা করা এবং পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া।

সংবিধান কোনো মৃত দলিল নয়।

রাষ্ট্র ও সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে বহু দেশেই সংবিধান পরিবর্তিত হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানও স্বাধীনতার পর বহুবার সংশোধিত হয়েছে।

অতএব প্রশ্নটি হওয়া উচিত: দ্বৈত নাগরিকদের জনপ্রতিনিধিত্বের বর্তমান নিষেধাজ্ঞা কি বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বাস্তবতার সঙ্গে সর্বোত্তমভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

স্থানীয় সরকারেও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন

এই আলোচনায় বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থাও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এবং জেলা পরিষদের নির্বাচিত পদগুলোর যোগ্যতা ও অযোগ্যতা জাতীয় সংসদের অনুচ্ছেদ ৬৬ দিয়ে নয়, পৃথক পৃথক আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে।

স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ২৬ ধারায় চেয়ারম্যান বা সদস্য হতে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া, ন্যূনতম ২৫ বছর বয়স এবং সংশ্লিষ্ট ভোটার তালিকায় নাম থাকার শর্ত রয়েছে। একই ধারায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ বা হারানোকে অযোগ্যতার কারণ করা হয়েছে। উপজেলা পরিষদ আইনেও চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া এবং নাগরিকত্ব পরিত্যাগ বা হারানোকে অযোগ্যতার কারণ হিসেবে রাখা হয়েছে। 

একই ধরনের ভাষা পাওয়া যায় পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রেও। মেয়র ও কাউন্সিলরকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হয় এবং বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ বা হারালে তিনি অযোগ্য হন। জেলা পরিষদ আইনেও চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার শর্ত এবং নাগরিকত্ব পরিত্যাগ বা হারানোর অযোগ্যতা রয়েছে। 

এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য লক্ষণীয়।

জাতীয় সংসদের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৬৬(২)(গ) সরাসরি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জনের বিষয়টি উল্লেখ করে। কিন্তু উপরোক্ত স্থানীয় সরকার আইনগুলোর সংশ্লিষ্ট ধারায় ব্যবহৃত ভাষা মূলত বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া এবং বাংলাদেশের নাগরিকত্ব “পরিত্যাগ” বা “হারানো”কে কেন্দ্র করে।
তবে এই ভাষাগত পার্থক্য থেকে সরাসরি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নিরাপদ নয় যে, বিদেশি নাগরিকত্বধারী প্রত্যেক দ্বৈত বাংলাদেশি ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন। নাগরিকত্ব আইন, ভোটার নিবন্ধন, নির্বাচনী বিধিমালা এবং প্রযোজ্য অন্যান্য আইনি শর্তও বিবেচনায় আসতে পারে।

বরং এই পার্থক্যটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিত্বের বিভিন্ন স্তরে নাগরিকত্বের প্রশ্নে আমাদের আইনি কাঠামো কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?

এটিও ভবিষ্যৎ আইন সংস্কারের আলোচনার অংশ হতে পারে।

বরং প্রবাসীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার একটি বাস্তবসম্মত সূচনাবিন্দুও হতে পারে। একজন মানুষ যদি তাঁর জন্মস্থান, ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা কিংবা শহরের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বাস্তব সম্পর্ক বজায় রাখেন, এলাকার উন্নয়নে কাজ করেন এবং স্থানীয় জনগণ তাঁকে নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিতে চান, তাহলে তাঁর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

অবশ্যই সেখানে বাস্তব সংযোগের প্রশ্ন থাকবে। প্রয়োজনে ন্যূনতম বসবাসের সময়, সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার হওয়া, সম্পদ ও বিদেশি স্বার্থের ঘোষণা এবং স্বার্থের সংঘাতবিষয়ক কঠোর নিয়ম বিবেচনা করা যেতে পারে।

পৃথিবীতে একটিমাত্র মডেল নেই

এই আলোচনায় একটি তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিজে Westminster Parliament-এ নির্বাচিত হওয়ার স্বয়ংক্রিয় বাধা নয়। UK Parliament-এর যোগ্যতার নিয়ম অনুযায়ী ব্রিটিশ নাগরিকের পাশাপাশি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী Republic of Ireland এবং Commonwealth-এর নাগরিকও House of Commons নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য নাগরিকত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশের তুলনায় ভিন্ন একটি মডেল অনুসরণ করে। 

আর সাম্প্রতিক স্কটিশ অভিজ্ঞতা আরও আকর্ষণীয়।

স্কটল্যান্ড রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত একটি নীতি গ্রহণ করেছে। Scottish Elections (Representation and Reform) Act 2025-এর মাধ্যমে বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকদের Scottish Parliament ও Scottish local government নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত করা হয়েছে। আইনের ব্যাখ্যামূলক নথিতেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে এই সংস্কারের উদ্দেশ্য foreign nationals with leave to remain-কে candidacy rights দেওয়া। 

এর বাস্তব উদাহরণও ইতিমধ্যে দেখা গেছে। ২০২৬ সালের Scottish Parliament নির্বাচনে ভারতীয় নাগরিক Q Manivannan Scottish Greens-এর প্রার্থী হিসেবে Edinburgh & Lothians East থেকে নির্বাচিত হন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচিত হওয়ার সময় তিনি ভারতীয় নাগরিক এবং যুক্তরাজ্যে student visa-তে অবস্থান করছিলেন। 

এই উদাহরণটির তাৎপর্য অনেক।

কারণ এখানে শুধু দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্ন নয়; স্কটল্যান্ড আরও এক ধাপ এগিয়ে বৈধভাবে সেখানে বসবাসকারী একজন বিদেশি নাগরিককেও জনগণের ভোটে আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দিয়েছে।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান অনেক কঠোর। অস্ট্রেলিয়ার সংবিধানের ৪৪ ধারায় বিদেশি নাগরিকত্বের কারণে ফেডারেল পার্লামেন্টের সদস্যপদে অযোগ্যতা সৃষ্টি হতে পারে। ২০১৭ সালের বহুল আলোচিত citizenship crisis-এ একাধিক নির্বাচিত রাজনীতিক এই বিধানের কারণে সমস্যায় পড়েছিলেন।

ভারত আবার অন্য একটি মডেল অনুসরণ করে। ভারত পূর্ণ দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকার করে না। Overseas Citizen of India বা OCI মর্যাদা পূর্ণ ভারতীয় নাগরিকত্ব নয় এবং এর সঙ্গে জাতীয় রাজনৈতিক অধিকারও আসে না।
অর্থাৎ পৃথিবীতে একটিমাত্র মডেল নেই।
কোনো দেশ দ্বৈত নাগরিককে সংসদে সুযোগ দেয়।
কোনো দেশ দেয় না।
আবার কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা বৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিককেও নির্দিষ্ট আইনসভায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।

প্রতিটি রাষ্ট্র তার ইতিহাস, নিরাপত্তা, অভিবাসন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তিতে নিজস্ব ব্যবস্থা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশেরও তাই নিজের বাস্তবতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে।
আমার মত হলো, এই প্রশ্নে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা ও সম্পূর্ণ উন্মুক্ততার মাঝখানে একটি মধ্যপন্থা নিয়ে অন্তত আলোচনা হতে পারে।

প্রথমত, একজন প্রার্থীর সব নাগরিকত্ব, বিদেশি পাসপোর্ট, বিদেশে আর্থিক স্বার্থ, ব্যবসা, সম্পত্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত সম্পর্ক বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার আগে কঠোর conflict-of-interest ব্যবস্থা থাকতে পারে।
তৃতীয়ত, সংবেদনশীল জাতীয় নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট দায়িত্বের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা যাচাই বা বিশেষ বিধিনিষেধ রাখা যেতে পারে।

চতুর্থত, সংসদ সদস্য এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কিছু সাংবিধানিক পদের নিয়ম এক হওয়া আবশ্যক নয়। উদাহরণ হিসেবে রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংবিধান নিজেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার একটি শর্ত করেছে। ফলে Article 66 পরিবর্তিত হলে তার প্রভাব রাষ্ট্রপতির যোগ্যতার ওপরও পড়তে পারে। একইভাবে সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের বাইরের যে সীমিতসংখ্যক ব্যক্তিকে মন্ত্রী করা যায়, তাঁদেরও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হয়।

সুতরাং বিষয়টি শুধু সংসদ সদস্য নির্বাচন নয়; পুরো সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই কারণেই কোনো পরিবর্তন হলে তা আবেগের ভিত্তিতে নয়, গভীর সাংবিধানিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
বিরোধী যুক্তিগুলোর দিকেও তাকাতে হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আনুগত্য।

একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে দুই রাষ্ট্রের নাগরিক হলে সংকটের মুহূর্তে তাঁর আনুগত্য কোথায় থাকবে?
এ প্রশ্ন সহজ নয়।
তবে নাগরিকত্ব এবং আনুগত্য সব সময় একই জিনিসও নয়। একটি মানুষ একাধিক দেশের সঙ্গে আইনি সম্পর্ক রাখতে পারেন, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান নির্ধারিত হয় তাঁর কাজ, স্বচ্ছতা এবং দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে।

একজন একক নাগরিকত্বধারী রাজনীতিকও বিদেশি স্বার্থের প্রভাবে থাকতে পারেন।
আবার একজন দ্বৈত নাগরিক জীবনভর বাংলাদেশের স্বার্থে কাজ করতে পারেন।

তাই শুধু পাসপোর্টের সংখ্যা দিয়ে আনুগত্যের নিখুঁত পরীক্ষা করা সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নও বৈধ।
দ্বিতীয় আপত্তি হতে পারে-প্রবাসীরা দেশের দৈনন্দিন বাস্তবতা থেকে দূরে থাকেন।
এখানেও যৌক্তিকতা আছে।
যিনি বছরের পর বছর বিদেশে থেকেছেন, তাঁর বাংলাদেশের স্থানীয় সমস্যা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সীমিত হতে পারে।
কিন্তু এর সমাধানও সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নয়। বসবাসের ন্যূনতম সময়, নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে বাস্তব সম্পর্ক, দেশে কর ও সম্পদের স্বচ্ছতা কিংবা নির্দিষ্ট residency requirement নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

গণতন্ত্রে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিচারক ভোটার।
কেউ বিদেশে থেকেছেন বলেই যদি তাঁর এলাকার মানুষ তাঁকে বিশ্বাস না করেন, তাঁরা তাঁকে ভোট দেবেন না।
কিন্তু যদি এলাকার মানুষ তাঁর যোগ্যতা, সততা ও অভিজ্ঞতায় আস্থা রেখে তাঁকে নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিতে চান, তখন রাষ্ট্রের ভূমিকা কতটা সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত-এ প্রশ্নের উত্তর নতুন করে ভাবা যেতে পারে।

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসীদের দেশের উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। আমরা তাঁদের বলি দেশে বিনিয়োগ করতে। আমরা তাঁদের দক্ষতা দেশে কাজে লাগাতে চাই। আমরা চাই তাঁরা বিদেশে বাংলাদেশের পক্ষে ইতিবাচক ভূমিকা রাখুন।

তাহলে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা উঠলেই তাঁদের শুধু বিদেশি নাগরিক হিসেবে দেখা কিছুটা সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে।
একজন মানুষের হাতে ব্রিটিশ, আমেরিকান, কানাডিয়ান বা অন্য কোনো দেশের পাসপোর্ট থাকা মানেই তিনি বাংলাদেশবিরোধী-এমন ধারণা ন্যায়সংগত নয়।
একইভাবে, দ্বৈত নাগরিক বলেই কাউকে কোনো যাচাই ছাড়াই জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ দেওয়াও যথেষ্ট নয়।
দুই অবস্থানের মাঝখানেই সম্ভবত ভবিষ্যতের বাস্তবসম্মত সমাধান রয়েছে।
আমার প্রস্তাব কোনো ব্যক্তিবিশেষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য সংবিধান পরিবর্তন নয়।

এটি কোনো দলীয় প্রশ্নও নয়।
আজ একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশির ক্ষেত্রে বিষয়টি উঠতে পারে; কাল কানাডিয়ান-বাংলাদেশি, আমেরিকান-বাংলাদেশি কিংবা অস্ট্রেলিয়ান-বাংলাদেশির ক্ষেত্রেও উঠতে পারে।
এটি মূলত প্রশ্ন-বাংলাদেশ তার বৈশ্বিক নাগরিকদের কীভাবে দেখে?
শুধু রেমিট্যান্স পাঠানো মানুষ হিসেবে?

নাকি দেশের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বেরও সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে?

আমাদের প্রজন্ম এমন এক সময়ে বাস করছে, যখন মানুষ এক দেশে জন্মায়, অন্য দেশে পড়াশোনা করে, তৃতীয় দেশে কাজ করে এবং একই সঙ্গে নিজের জন্মভূমির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখে।
রাষ্ট্রের ধারণাও তাই বদলাচ্ছে।

Diaspora এখন আর কেবল বিদেশে থাকা নাগরিকদের একটি গোষ্ঠী নয়; অনেক দেশের জন্য এটি অর্থনীতি, কূটনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং soft power-এর গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
বাংলাদেশও এই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
তাই আমি মনে করি, Article 66-এর বর্তমান বিধান নিয়ে একটি শান্ত, দলনিরপেক্ষ ও বিশেষজ্ঞভিত্তিক জাতীয় আলোচনা হতে পারে।

বর্তমান আইন যতদিন আছে, অবশ্যই সেটি মানতে হবে।
কিন্তু আইন নিয়ে প্রশ্ন তোলা আইনবিরোধিতা নয়।
বরং একটি পরিণত গণতন্ত্রের লক্ষণ হলো-রাষ্ট্রের স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং নাগরিকের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মধ্যে আরও ভালো ভারসাম্য সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন করার সাহস রাখা।
একজন মানুষের হাতে দুটি পাসপোর্ট থাকতে পারে।
তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতাও দুটি দেশের হতে পারে।
কিন্তু তাঁর শিকড়, স্মৃতি কিংবা মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসাকে একটি পাসপোর্টের সংখ্যায় মাপা যায় না।
বাংলাদেশ যদি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তার মানুষদের সত্যিকার অর্থে জাতীয় সম্পদ মনে করে, তাহলে ভবিষ্যতে তাঁদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়েও নতুন করে ভাবা অযৌক্তিক হবে না।

প্রশ্নটি তাই শুধু দ্বৈত নাগরিকের অধিকার নিয়ে নয়।
প্রশ্নটি আরও বড়-একুশ শতকের বাংলাদেশ তার প্রবাসীদের শুধু দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশি হিসেবে দেখবে, নাকি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের সক্রিয় অংশীদার হিসেবেও দেখতে প্রস্তুত হবে?

নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল: লেখক, আইনবিদ, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
img

বদলে যাওয়া সাংবাদিকতা: আশির দশকের সংবাদ সংগ্রহ থেকে আজকের বাস্তবতা

প্রকাশিত :  ১৫:৪৩, ২১ আগষ্ট ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: আশির দশকের শেষ দিক। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের এক-দুই বছর আগের সময়। তখন শহর তো বটেই, গ্রামাঞ্চল এমনকি আরও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে তা সংবাদপত্রে পাঠানো ছিল একেবারেই ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা। আজকের মতো হাতের মুঠোয় মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, কম্পিউটার কিংবা মুহূর্তে সংবাদ পাঠানোর প্রযুক্তি তখন ছিল না। একজন সাংবাদিককে সংবাদ সংগ্রহ থেকে প্রকাশ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপই নিজের হাতে সম্পন্ন করতে হতো।

গ্রাম, শহর কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে খবর সংগ্রহ করে ফিরে এসে নিউজপ্রিন্টের কাগজে হাতে লিখে সংবাদ তৈরি করা হতো। এরপর তা ডাকযোগে পাঠানো ছিল সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি। মাঝেমধ্যে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেও সংবাদ পাঠানো হতো। তবে তখন কুরিয়ার খরচও কম ছিল না—প্রায় ১০ টাকা। সেই সময়ের হিসাবে এটিও ছিল যথেষ্ট ব্যয়বহুল। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডাকযোগেই সংবাদ পাঠানো হতো।

তবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংবাদ দ্রুত পাঠানোর প্রয়োজন হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে যেত। তখন মৌলভীবাজার শহরে গিয়ে টেলিগ্রামের মাধ্যমে সংবাদ পাঠাতে হতো। শ্রীমঙ্গল শহরেও টেলিফোনে যোগাযোগের একটি ব্যবস্থা ছিল। পাবলিক টেলিফোন ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনের সময় লাইন পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। দিনের পর দিন চেষ্টা করেও সংযোগ মিলত না। হঠাৎ কখনো এক-দুবার লাইন পাওয়া গেলে সেটিই ছিল সৌভাগ্যের ব্যাপার।

ফলে একজন সাংবাদিকের কাছে একটি সংবাদ প্রকাশের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া মানেই কাজ শেষ হয়ে যাওয়া ছিল না। খবর সংগ্রহ করতে হতো মাঠে গিয়ে, ফিরে এসে সেটি লিখতে হতো হাতে, তারপর ডাকঘর কিংবা কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠাতে হতো। জরুরি সংবাদ হলে আবার ছুটতে হতো মৌলভীবাজারে টেলিগ্রাম করতে।

ইংরেজি পত্রিকায় কাজের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা ছিল। সংবাদ ইংরেজিতে লিখে হাতে তৈরি করে ডাকযোগে কিংবা কুরিয়ারে পাঠানো হতো। সংবাদ লেখার জন্য কম্পিউটার তো দূরের কথা, তখন সবার কাছে টাইপরাইটারও ছিল না। তাই হাতে লেখা সংবাদই ছিল সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান অবলম্বন।

আজকের প্রজন্মের কাছে বিষয়টি হয়তো অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু সেই সময় সাংবাদিকতা ছিল মূলত শ্রম, ধৈর্য, মেধা এবং দায়িত্ববোধের পেশা। সংবাদ প্রকাশের প্রতিটি ধাপেই সময় ও পরিশ্রম দিতে হতো। একটি সংবাদ পাঠাতে যেখানে আজ কয়েক সেকেন্ডই যথেষ্ট, তখন সেখানে লেগে যেত ঘণ্টা, কখনো এক দিন বা তারও বেশি।

সাংবাদিকের সংখ্যাও তখনকার সময়ে তুলনামূলকভাবে কম ছিল। কিন্তু সংখ্যায় কম হলেও তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, প্রতিভাবান এবং প্রকৃত জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ। তাঁরা সাংবাদিকতাকে শুধু একটি পেশা হিসেবে দেখতেন না; সংবাদকে সত্য, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরাকে দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচনা করতেন।

সেই সময়ের সাংবাদিকদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন বিভিন্ন বড় রাজনৈতিক দলের নেতাও। এমনকি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকা অবস্থায় দু-তিনজন জনপ্রতিনিধি হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন।

শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক নেতা রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ১৯৮৩ সালে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতা কমলেশ ভট্টাচার্য দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শ্রীমঙ্গল পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি শুধু রাজনীতিবিদই ছিলেন না, সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বিপুল রঞ্জন চৌধুরীও শ্রীমঙ্গল পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনিও সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিকতা করার সময় তাঁদের মধ্যে দলীয় পক্ষপাতিত্ব দেখা যেত না। তাঁরা ছিলেন নিরপেক্ষ, আদর্শনিষ্ঠ ও বস্তুনিষ্ঠ। সংবাদ পরিবেশনে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা ছিল সর্বজনীন। রাজনৈতিকভাবে তাঁরা বিভিন্ন দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সাংবাদিক হিসেবে তাঁদের ভূমিকা নিয়ে কখনো কেউ প্রশ্ন তোলেনি।

এমনকি রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও তাঁদের মধ্যে ছিল পারস্পরিক রাজনৈতিক শিষ্টাচার। সাংবাদিকতা ও রাজনীতিকে তাঁরা এক করে ফেলেননি। সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয়কে সংবাদ পরিবেশনের ওপর প্রভাব ফেলতে দেননি

শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাব গঠনের ক্ষেত্রেও এই সাংবাদিকদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শুরু থেকেই যাঁরা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন, তাঁদের নেতৃত্বে ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রেসক্লাবের খাজনা নিজেরাই পরিশোধ করেছেন। প্রেসক্লাবের খাজনা তাঁরা কখনো বকেয়া রাখেননি।

এরশাদ সাহেবের আমলে একবার একজন মন্ত্রী প্রেসক্লাবের নামে কিছু অর্থ বরাদ্দ করেছিলেন। তবে তৎকালীন সময়ের বিবেচনায় সেই অর্থের পরিমাণ ছিল যৎসামান্য। প্রেসক্লাব পরিচালনা কিংবা এর দায়-দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সেই সামান্য সরকারি সহায়তার ওপর তাঁরা নির্ভরশীল ছিলেন না। নিজেদের সামর্থ্য ও দায়িত্ববোধ থেকেই তাঁরা প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রেখেছিলেন।

সেই সময়ের সাংবাদিকতা ছিল প্রযুক্তিবিহীন, কিন্তু দায়িত্ববোধে সমৃদ্ধ। যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা ছিল, সংবাদ পাঠানো ছিল কষ্টসাধ্য, তথ্য সংগ্রহে ছিল নানা ঝুঁকি ও প্রতিবন্ধকতা। তবু সাংবাদিকেরা সংবাদ সংগ্রহ করতেন, যাচাই করতেন, হাতে লিখতেন এবং নানা কষ্ট করে তা পত্রিকা অফিসে পৌঁছে দিতেন।

আজ প্রযুক্তি সাংবাদিকতার কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে ছবি, ভিডিও, সংবাদ কিংবা সরাসরি সম্প্রচার পাঠানো সম্ভব। তথ্যের প্রবাহ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত। কিন্তু প্রযুক্তির এই বিপুল সুবিধার সঙ্গে সাংবাদিকতার মান, দায়িত্ববোধ ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নটিও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আর বর্তমান সময়ের সাংবাদিকতার নানা চিত্রের কথা শুনলে অনেক সময় সত্যিই গা শিউরে ওঠে। সংবাদপেশার প্রতি মানুষের যে আস্থা একসময় ছিল, নানা কারণে সেই আস্থায় এখন ভাটা পড়েছে। সাংবাদিকতার সঙ্গে যখন ব্যক্তিস্বার্থ, রাজনৈতিক পক্ষপাত, বাণিজ্যিক চাপ কিংবা নানা অনিয়মের অভিযোগ জড়িয়ে পড়ে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন সাংবাদিকের বিশ্বাসযোগ্যতা নয়—পুরো পেশাটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এ কারণেই আজ মানুষের একটি বড় অংশ সাংবাদিকতার প্রতি আগের মতো আস্থা রাখতে পারছে না। অথচ সাংবাদিকতার মূল শক্তি প্রযুক্তি নয়, সংবাদমাধ্যমের ভবন নয়, কিংবা বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ও নয়। এর মূল শক্তি হলো বিশ্বাস।

আশির দশকের সেই সাংবাদিকদের হাতে ছিল না আধুনিক প্রযুক্তি, ছিল না দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ। ছিল শুধু কলম, কাগজ, তথ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সত্য প্রকাশের অঙ্গীকার। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাঁরা যে আস্থা তৈরি করেছিলেন, সেটিই ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড় অর্জন।

সময়ের সঙ্গে সাংবাদিকতার প্রযুক্তি বদলেছে, সংবাদ পাঠানোর পদ্ধতি বদলেছে, সংবাদমাধ্যমের কাঠামো বদলেছে। কিন্তু সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তটি বদলায়নি—সত্য, নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং মানুষের আস্থা।

সেই জায়গাটিতেই হয়তো আজকের সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।


মতামত এর আরও খবর