img

বাংলাদেশে সামরিক কর্মকর্তাদের বিচার: ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষণীয় পাঠ

প্রকাশিত :  ১৯:৪৪, ২৫ অক্টোবর ২০২৫

বাংলাদেশে সামরিক কর্মকর্তাদের বিচার: ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষণীয় পাঠ

কামরুল হাসান

বাংলাদেশে ১৫ জন সেনা কর্মকর্তা, যার মধ্যে ৫ জন জেনারেলও আছেন, গ্রেপ্তার এবং বিচারের মুখোমুখি হওয়া একটি ইতিহাসঘটিত ঘটনা। এটি শুধুই একটি সামরিক বা রাজনৈতিক বিষয় নয়; এটি মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি জবাবদিহিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

প্রথমত, এই ট্রায়াল প্রমাণ করে যে কোনো ব্যক্তি এমনকি সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি বা নির্যাতন করে, তাদের বিচার এড়ানো সম্ভব নয়। এটি অন্য সরকারি কর্মকর্তাদের এবং ভবিষ্যতের সেনা কর্মকর্তাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে।

দ্বিতীয়ত, এই ট্রায়াল বাংলাদেশের গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতা এবং মানবাধিকার রক্ষায় একটি মাইলফলক। এটি দেখায় যে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি ও আইনের শাসন শুধুমাত্র সাধারণ নাগরিকের জন্য নয়, বরং ক্ষমতাসীন ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

তৃতীয়ত, এই বিচারের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। মানুষ বুঝতে পারবে যে নির্যাতন, গুম এবং অব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত নয়। এটি রাজনৈতিক ও সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

অবশেষে, এই ট্রায়াল একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত: ক্ষমতার অপব্যবহার করলে কোনো ব্যক্তিরই অব্যাহতি নেই। এটি অন্যদের সতর্ক করবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ অসাধু কর্মকাণ্ডে লিপ্ত না হয়।

বাংলাদেশে এই বিচারের গুরুত্ব কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি শিক্ষণীয় বার্তা, যা আইনের শাসন, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকার রক্ষায় অন্যদের সচেতন করে। ভবিষ্যতে সমাজে সুশাসন ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় এই ট্রায়াল একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে।


কামরুল হাসান : প্রাবন্ধিক, রাজনৈতিক প্রতিবেদক, বিবিটি।

মতামত এর আরও খবর

img

বিভক্তির রাজনীতি নয়, এখন সময় এসেছে বাংলাদেশকে নিয়ে একসঙ্গে ভাবার

প্রকাশিত :  ১৩:৩৪, ২২ মে ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের রাজনীতি বহু বছর ধরেই যেন এক দীর্ঘ মেরুকরণের গল্প। এখানে মতের চেয়ে পরিচয় বড় হয়ে উঠেছে, যুক্তির চেয়ে উচ্চকণ্ঠের স্লোগান বেশি শোনা গেছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্টেছে ভাষা, বদলেছে প্রতিশ্রুতি, কিন্তু সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা একই থেকেছে—একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ।

এই দেশের মানুষ রাজনীতির কাছে খুব জটিল কিছু চায় না। তারা চায় এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে একজন তরুণ তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পাবে, একজন কৃষক ন্যায্য মূল্য পাবে, একজন মা তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন। মানুষ এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি চায়, যেখানে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করাই মূল লক্ষ্য নয়; বরং ভিন্নমতকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার মানসিকতা থাকবে।

সময়ের সঙ্গে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে। এখন মানুষ কেবল বক্তৃতা শোনে না, তারা আচরণও দেখে। নেতার ভাষা, সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি—এসবও আজ রাজনৈতিক মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সেই জায়গা থেকেই সাম্প্রতিক সময়ে অনেক মানুষের ভেতরে নতুন এক প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে তারেক রহমানকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং একটি তুলনামূলকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ভাষার প্রত্যাশাও কাজ করছে।

মানুষ আসলে এমন নেতৃত্ব খোঁজে, যা বিভক্তির দেয়ালকে আরও উঁচু না করে বরং সেতুবন্ধন তৈরি করতে চায়। কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার রাজনীতি প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে না দেখে তাকে গণতান্ত্রিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখতে শেখে। জাতীয় অগ্রগতি কখনো কোনো এক দলের একার অর্জন নয়; এটি সমষ্টিগত সহযোগিতা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধের ফল।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই—আমরা এখনও অনেক সময় দেশকে নয়, দলকে আগে ভাবি। রাজনৈতিক আনুগত্য এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে নাগরিক পরিচয় আড়ালে পড়ে যায়। অথচ রাষ্ট্র কোনো দলের সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্র মানে কোটি মানুষের শ্রম, স্বপ্ন, সংগ্রাম ও ভবিষ্যতের সম্মিলিত নাম। তাই মতভেদ থাকবে, সমালোচনাও থাকবে; কিন্তু সেই সমালোচনা যদি ধ্বংসের বদলে সংশোধনের পথ দেখায়, তবেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়।

বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। বিশ্ব অর্থনীতি বদলাচ্ছে, প্রযুক্তি নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে, তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক সংঘাতের পুরোনো ধারা ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন। এখন প্রয়োজন এমন এক জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানবসম্পদ, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে সমান গুরুত্ব দেবে।

তরুণদের কর্মসংস্থান, শিক্ষার আধুনিকায়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি এবং সহনশীল সমাজব্যবস্থা—এসব অর্জনের জন্য জাতীয় ঐক্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। কারণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রের অংশ হতে পারে, কিন্তু স্থায়ী বিভাজন কখনো উন্নয়নের ভিত্তি হতে পারে না।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যে জাতি সংকীর্ণতার দেয়াল ভেঙে বৃহত্তর স্বার্থে এক হতে পেরেছে, তারাই টেকসই অগ্রগতির পথে এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষ—তাদের পরিশ্রম, অভিযোজনক্ষমতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা।

এখন সময় এসেছে সেই শক্তিকে বিভক্তির রাজনীতিতে ক্ষয় না করে উন্নয়নের শক্তিতে রূপান্তর করার। কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস তাদেরই মনে রাখে, যারা মানুষকে ভাঙার নয়, এক করার কথা বলেছে; যারা ক্ষমতার নয়, দেশের ভবিষ্যতের কথা ভেবেছে।

মতামত এর আরও খবর