img

ডাকসু নির্বাচন: গণতন্ত্রের আয়না ও তরুণ প্রজন্মের আস্থাহীনতা

প্রকাশিত :  ০৮:১০, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫

ডাকসু নির্বাচন: গণতন্ত্রের আয়না ও তরুণ প্রজন্মের আস্থাহীনতা

 ওবায়দুল কবীর খোকন

দীর্ঘ প্রায় তিন দশক পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হলো ডাকসু নির্বাচন। শিক্ষার্থীরা ভেবেছিল, এ নির্বাচন হবে গণতান্ত্রিক চর্চার পুনর্জাগরণ এবং তরুণ নেতৃত্ব তৈরির নতুন সূচনা। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটেছে, তা অনেকের মতে হতাশাজনক এবং বিতর্কিত। অনিয়ম, প্রশাসনিক প্রভাব, ভোটগ্রহণে বৈষম্য ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ নির্বাচনের মূল কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফলে এই নির্বাচন কেবল ক্যাম্পাসের সীমারেখায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবিতে রূপ নিয়েছে।

ইতিহাস থেকে বর্তমানের যাত্রা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্রসমাজ সবসময় ছিল অগ্রণী। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, গণআন্দোলন থেকে স্বৈরাচারবিরোধী লড়াই—প্রতিটি পর্বেই ডাকসু ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু দীর্ঘ বিরতির পর যখন ডাকসু নির্বাচন হলো, তখন সেটি আর আদর্শিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল না। বরং দেখা গেল, ক্ষমতার প্রভাব ও দলীয় নিয়ন্ত্রণের ছায়া।

বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিবর্তন কেবল ছাত্ররাজনীতির সীমাবদ্ধতা নয়; বরং এটি জাতীয় রাজনীতির বর্তমান চিত্রকেও প্রতিফলিত করে।

অনিয়মের অভিযোগ ও বিতর্ক

ডাকসু নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ বিভিন্ন সংগঠনের অভিযোগ ছিল, ভোটকেন্দ্রে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ঘটেছে। ভোটারদের ভোটাধিকার নিশ্চিত না করে ফলাফলকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হয়েছে। পক্ষপাতিত্বের কারণে অনেক প্রার্থী ন্যায্য প্রতিযোগিতার সুযোগ পাননি।

শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে—যে নির্বাচনকে তারা গণতান্ত্রিক অনুশীলনের মডেল হিসেবে দেখতে চেয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত অনিয়মের কারণে আস্থাহীনতার জন্ম দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় যখন স্বচ্ছ নির্বাচন সম্ভব নয়, তখন জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে জনগণের আস্থা কীভাবে ফেরানো যাবে—এ প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।

বিরোধী সংগঠনের দুর্বলতা

এ নির্বাচনে বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোর সীমাবদ্ধতা ছিল চোখে পড়ার মতো। দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন, মামলা ও গ্রেপ্তারের কারণে তারা সংগঠিতভাবে মাঠে শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি। এতে শিক্ষার্থীদের একাংশ বিকল্প নেতৃত্বের সম্ভাবনা দেখলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিরোধী শক্তি যদি তরুণদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে চায়, তবে তাদের শুধু আন্দোলনের রাজনীতি নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য স্পষ্ট ভিশন ও পরিকল্পনা দিতে হবে। তরুণরা এখন চাকরি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, গবেষণা ও সুশাসন নিয়ে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি খুঁজছে। এ জায়গায় দুর্বলতা থাকায় তাদের আস্থা অর্জন সম্ভব হয়নি।

তরুণ প্রজন্মের হতাশা

আজকের তরুণ প্রজন্ম রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হওয়ার কথা। কিন্তু ডাকসু নির্বাচনের অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে হতাশা ও আস্থাহীনতা সৃষ্টি করেছে। যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নেতৃত্ব গড়ে ওঠার কথা, সেটি যদি স্বচ্ছ না হয়, তবে আগামী দিনে তারা রাজনীতির প্রতি আগ্রহ হারাতে পারে।

শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ মনে করছে, রাজনৈতিক দলগুলো শুধু নিজেদের স্বার্থের জন্য ছাত্ররাজনীতি ব্যবহার করছে, কিন্তু তরুণদের প্রকৃত চাহিদা নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নেই। ফলে তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও হতাশা তৈরি হচ্ছে।

জাতীয় রাজনীতির প্রতিচ্ছবি

ডাকসু নির্বাচন আসলে জাতীয় রাজনীতিরই প্রতিচ্ছবি। যেমন জাতীয় নির্বাচনে অনিয়ম ও প্রভাবের অভিযোগ ওঠে, তেমনি ক্যাম্পাস নির্বাচনেও সেটি প্রতিফলিত হয়েছে। এতে বোঝা যায়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যদি স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হয়, তবে জাতীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে যায়।

করণীয় ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ডাকসু নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সময় এখনই। এ জন্য প্রয়োজন—

    * যোগ্য, ত্যাগী ও মেধাবী নেতৃত্বকে সামনে আনা।

    * ছাত্র-যুবসমাজের কাছে বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করা, এবং দলীয় অভ্যন্তরে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়।

    *  শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি খাতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দেওয়া।

    * অর্থ বা প্রভাব নয়, বরং সততা ও দক্ষতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব বাছাই করা।

    * আন্দোলনের পাশাপাশি বিকল্প শাসনব্যবস্থার রূপরেখা তৈরি করা।

    *  গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রশ্নে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে কার্যকর ভূমিকা রাখা।

এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা না হলে তরুণ প্রজন্মের আস্থা পুনর্গঠন সম্ভব নয়। আর আস্থা ছাড়া গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎও অন্ধকারময় হয়ে পড়বে।

সর্বশেষ

ডাকসু নির্বাচন অনেক আশা জাগিয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনিয়ম, প্রশাসনিক প্রভাব ও বিরোধী সংগঠনের দুর্বলতা শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে তরুণ প্রজন্মের আস্থা ক্ষুণ্ণ হওয়ার মাধ্যমে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নির্বাচন কেবল একটি ক্যাম্পাসভিত্তিক ঘটনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। তরুণ প্রজন্মকে আস্থায় ফিরিয়ে আনা এখন রাজনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ। তা না হলে ভবিষ্যতে নেতৃত্বের শূন্যতা আরও গভীর হবে, যা সমগ্র জাতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

লেখক : ওবায়দুল কবীর খোকন, আইনজীবী ও সাংবাদিক ।

মতামত এর আরও খবর

এনআইসি’র প্রতিবেদন

img

বড় যুদ্ধেও ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন সম্ভব হবে না

প্রকাশিত :  ০৫:৩১, ০৯ মার্চ ২০২৬

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের আক্রমণ করলেও দেশটির শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ও ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করা হয়তো সম্ভব হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের (এনআইসি) একটি গোপন প্রতিবেদনে সতর্ক করে এ কথা বলা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা, বিশেষ করে যখন ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালানোর ধুয়া তুলেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘যুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে।’ গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবগত এমন তিনটি সূত্র ওয়াশিংটন পোস্টকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে ‘পুরোপুরি সরিয়ে দিয়ে’ দেশটিতে নিজের পছন্দমতো শাসক বসানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। ট্রাম্প তাঁর এ পরিকল্পনায় সফল হতে পারবেন কিনা– এই গোয়েন্দা প্রতিবেদন তা নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর প্রায় এক সপ্তাহ আগে এ প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়।

প্রতিবেদনটি সম্পর্কে জানা আছে এমন কয়েকজন বলেন, ক্ষমতার সম্ভাব্য পরিবর্তন সম্পর্কে ওই প্রতিবেদনে কিছু ধারণা দেওয়া হয়েছে। ইরানের নেতাদের বিরুদ্ধে সীমিত আকারের অভিযান অথবা দেশটির নেতৃত্ব ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিস্তৃত হামলা– উভয় ক্ষেত্রেই একই পরিণতির কথা বলা হয়েছে। সেটা হলো, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করা হলে ইরানের ধর্মীয় ও সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আগে থেকে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে। ইরানের বিভক্ত বিরোধী দলগুলোর পক্ষে দেশের ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারার ‘সম্ভাবনা কম’।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল বা এনআইসি অভিজ্ঞ বিশ্লেষকদের নিয়ে গঠিত। ওয়াশিংটনের ১৮টি গোয়েন্দা সংস্থা থেকে পাওয়া সব তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা গোপন প্রতিবেদন তৈরি করে। ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করার অনুমতি দেওয়ার আগে এনআইসির এই প্রতিবেদন সম্পর্কে ট্রাম্পকে অবহিত করা হয়েছিল কিনা, হোয়াইট হাউস সে বিষয়ে কিছু বলেনি। ইরানের ওপর সামরিক অভিযান শুরুর পরই সংঘাত পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে, আর পশ্চিম দিকে ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধ ন্যাটো সদস্য দেশ তুরস্কের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।


মতামত এর আরও খবর