img

‘টু বি অর নট টু বি’: বাংলাদেশের সন্ধিক্ষণ

প্রকাশিত :  ১০:২২, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫

বর্ষাকালীন বিদ্রোহের এক বছর পর—কোন পথে দেশ?

‘টু বি অর নট টু বি’: বাংলাদেশের সন্ধিক্ষণ

ইমরান চৌধুরী 

জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলনের পর ১৫ বছরের শাসনের পতন ঘটে; নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠিত হয়। এক বছর পর বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে দুই পথে: প্রতিষ্ঠানভিত্তিক গণতন্ত্র না কি জনতার আদালত; আইনের শাসন না কি গুজব-নির্ভর প্রতিশোধ; বহুত্ববাদী প্রজাতন্ত্র না কি সংকীর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ।

২০২৪–২৫ সালে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে—আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড ও ছাত্র সংগঠন নিষিদ্ধের মতো প্রয়াস—যেগুলোকে শাসকদল বলছে “রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়নের” দায়-জবাবদিহির পূর্বশর্ত। সমর্থকরা এটিকে শৃঙ্খলা ফেরানো বলেন; সমালোচকেরা দেখেন আইনের ব্যতিক্রমী শাসন। এ দ্বন্দ্বই পরবর্তী পথচলার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।

গণতন্ত্রের কসাটি: প্রতিষ্ঠান বনাম ইম্প্রোভাইজেশন

এই রূপান্তরের প্রাণ হলো দ্রুত কার্যকর প্রতিষ্ঠান—স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, কার্যকর পুলিশ-আদালত, স্বাধীন গণমাধ্যম। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যে রোডম্যাপ দিয়েছে—নিরাপত্তা খাত ও বিচারব্যবস্থার সংস্কার—এখনো অসম্পূর্ণ। সময়মতো অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আস্থার নোঙর হবে; বিলম্ব অনিশ্চয়তাকে স্বাভাবিক করে তোলে।

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন—রাজনীতির মাঠে জনতাবাদী ও ইসলামপন্থী ধারার প্রভাব বেড়েছে। দ্য ডিপ্লোম্যাট বলছে, সন্ত্রাসদমন ব্যবস্থার দুর্বলতা ও নিরাপত্তা সংস্থার ক্ষমতা কমানো এমন শূন্যতা সৃষ্টি করেছে যাতে জঙ্গি ও কট্টর গোষ্ঠী সুযোগ পেতে পারে। আল জাজিরা একই সাথে উচ্ছ্বাস, নিষেধাজ্ঞা ও ট্রাইব্যুনাল—এ তিন ধারার মিলনকেই বর্তমান বাস্তবতা হিসেবে দেখায়।

জনতার বিচার: ক্লান্ত প্রতিষ্ঠানের লক্ষণ

সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো “মব জাস্টিস”—ফেসবুক/টিকটকের গুজব থেকে উসকে ওঠা গণপিটুনি, “জনতার আদালত”, লাইভস্ট্রিমড শাস্তি। অক্সফোর্ড হিউম্যান রাইটস হাবে একে বলা হয়েছে জীবনাধিকার-লঙ্ঘন; একটি গবেষণা দেখায়, কীভাবে প্ল্যাটফর্ম-অ্যালগরিদম নৈতিক আতঙ্ককে সহিংসতায় রূপ দেয়। সংবাদমাধ্যমও একাধিক ঘটনায় জনতার হাতে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বর্ণনা দেয়। আদালত-পুলিশ যদি দৃশ্যমানভাবে কাজ না করে, জনতা করবে—এটি ইতিহাসের কঠিন শিক্ষা।

একই সঙ্গে সাংবাদিক-লেখকদের ওপর হামলার খবরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সিপিজে বলছে—কারাবন্দি/তদন্তাধীন সাংবাদিক এখনো আছেন; এই প্রেক্ষাপটে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হলো গণতন্ত্রের ফুসফুস। এইচআরডব্লিউ-এর মার্চ ২০২৫ বিবৃতিও বলেছে—রাষ্ট্র-বহির্ভূত সহিংসতা থেকেও নাগরিকদের রক্ষা করা সরকারের দায়।

বিচারব্যবস্থার ওপর চাপ: ২০২৪-এর শিক্ষা

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্রদের আল্টিমেটাম-পরবর্তী চাপের মুখে প্রধান বিচারপতি পদত্যাগে সম্মত হন এবং সরে দাঁড়ান। ব্যক্তিপ্রীতি-অপ্রীতি যাই থাক, ভিড়ের চাপে সাংবিধানিক পদাধিকারীকে সরানো বিপজ্জনক নজির। আদালত জবাবদিহির আওতায় থাকবে—কিন্তু আইনের মাধ্যমে, অবরোধের মাধ্যমে নয়।

এ শিক্ষা ২০২৫-এ আরও জরুরি—যখন দলগতভাবে রাজনৈতিক সত্ত্বাকে বিচারের আওতায় আনার মতো নজিরবিহীন ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি আইনি পদক্ষেপে ন্যায়বিচারের মানদণ্ড, আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার, এবং “সমষ্টিগত অপরাধ” ধারণা থেকে দূরে থাকা নিশ্চিত করতে হবে।

দুর্নীতির গুঞ্জন: অভিযোগ, প্রতিবাদ, আর প্রমাণের দায়

২০২৫-এর আগস্টে এক সাবেক আমলা আটজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন; মন্ত্রিপরিষদ সচিব প্রমাণ থাকলে আইনগতভাবে দিতে বলেন; শীর্ষ দৈনিকগুলো অভিযোগকে আপাতত “অপ্রমাণিত” বলেছে। দায়টি স্পষ্ট: বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ হলে স্বচ্ছ তদন্ত, হুইসলব্লোয়ার সুরক্ষা, সম্পদ ঘোষণার বাধ্যবাধকতা, ই-প্রকিউরমেন্ট, স্বাধীন দুর্নীতি দমন সংস্থা—এগুলোই আস্থা ফেরায়।

বহুত্ববাদের পরীক্ষা

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাই রূপান্তরের মেরুদণ্ড। ২০২৪-এর পর শত শত হামলার দলিল সামনে এসেছে; নারীর অধিকারের প্রস্তাবিত সংস্কারের বিরুদ্ধে কট্টরপন্থীদের বিরাট সমাবেশ হয়েছে। রাষ্ট্রের কর্তব্য—জনশৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের ভয়ভীতি প্রতিহত করা।

প্রবাসে রাজনীতি: বার্তা ও বিপদ

রাজনীতির ঢেউ দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও। সম্প্রতি লন্ডনে এক অন্তর্বর্তী উপদেষ্টার সফরকে ঘিরে প্রবল বিক্ষোভ, ভিডিও ভাইরাল। প্রবাসী অংশগ্রহণ গণতন্ত্রকে প্রাণ দেয়, তবে বিভাজন-গুজব আমদানিও ঘটাতে পারে। রাষ্ট্রনায়কের কাজ—সম্পর্ক রাখা, কিন্তু সংঘাত রপ্তানি না করা।

‘টু বি’—যে বাংলাদেশ হতে পারে

১. সময়াবদ্ধ, নিয়মভিত্তিক নির্বাচন।

২. রুল অব ল’ পুনর্গঠন।

৩. মব জাস্টিসে শূন্য সহনশীলতা।

৪. মতপ্রকাশের সুরক্ষা।

৫. বহুত্ববাদ রক্ষা।

৬. দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্বচ্ছতা।

‘নট টু বি’—যদি পথ হারাই

অন্য পথটি আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি: জরুরি ব্যবস্থা স্থায়ী হয়; ট্রাইব্যুনাল রাজনীতির মঞ্চে গড়ায়; গুজব সংবাদকে প্রতিস্থাপন করে; জনতা আদালতকে; সংখ্যালঘুরা ভীত; নারীর অধিকার থমকে যায়; সাংবাদিকরা আত্মনিয়ন্ত্রণে; প্রবাস রাজনীতি আরও শত্রুতা উসকে দেয়; উগ্রবাদীরা ফাঁক খুঁজে নেয়। তখন “বিপ্লব” গণতন্ত্রে উত্তরণের সেতু নয়—তার অজুহাত হয়ে ওঠে।


লেখক:  ইমরান আহমেদ চৌধুরী বি.ই.এম একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, ইতিহাসবিদ ও লেখক।
তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাসরত কমিউনিটি লিডার হিসেবে সমাজসেবামূলক কাজ করে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও প্রবাসী বাঙালিদের ইতিহাস সংরক্ষণে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য।




মতামত এর আরও খবর

img

স্বাধীনতার ২৫০ বছরে আমেরিকা

প্রকাশিত :  ০৮:২৮, ১৯ মে ২০২৬

পেছনে বিখ্যাত ইনডিপেনডেন্স হল।সামনে কালো জর্জ ওয়াশিংটনের মূর্তি।তাঁর সামনে লেখকসহ তার স্ত্র

আবদুল হামিদ মাহবুব

আমি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া শহরে অবস্থান করছি। ফিলাডেলফিয়া মানেই ইতিহাসের শহর। যুক্তরাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই শহরের নাম। আজও সেই ইতিহাস যেন জীবন্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শহরের পথে পথে। ২০২৬ সালে এসে সেই ইতিহাস আরও বেশি আলোচনায় এসেছে। কারণ এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ১৭৭৬ সালে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিল আমেরিকা।তার ঠিক আড়াইশ বছর পরে পুরো দেশ এখন উদযাপনে ব্যস্ত। আগামী ৪ জুলাই স্বাধীনতার সেই ঐতিহাসিক দিবস।১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই ব্রিটিশের কাছ থেকে আমেরিকা স্বাধীনতা লাভ করেছিল।

পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের শহর।ফিলাডেলফিয়া ছিল আমেরিকার প্রথম রাজধানী।স্বাধীনতার স্বপ্ন, সংগ্রাম আর নতুন রাষ্ট্র গঠনের অনেক বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এখানেই। এই শহরে হাঁটলে মনে হয় ইতিহাস যেন এখনো কথা বলে। কিন্তু আজকের ফিলাডেলফিয়া আধুনিক শহর। উঁচু দালান, ব্যস্ত রাস্তা, পর্যটকের ভিড় সবই আছে। তবু শহরের প্রাণে লুকিয়ে আছে স্বাধীনতার স্মৃতি। বিশেষ করে ইনডিপেনডেন্স ন্যাশনাল হিস্টোরিক্যাল পার্ক এলাকায় গেলে সেই অনুভূতি আরও গভীর হয়। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে বিখ্যাত ইনডিপেনডেন্স হল। লাল ইটের এই ভবনটি দেখতে খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু আমেরিকার ইতিহাসে এর গুরুত্ব অসাধারণ। এই ভবনের ভেতরেই ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র গৃহীত হয়েছিল। পরে এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান নিয়েও আলোচনা হয়।

হলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে জর্জ ওয়াশিংটনের মূর্তি। তিনি ছিলেন আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি। পরে তিনিই হন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট। তার নেতৃত্ব ছাড়া আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জন এত সহজ হতো না। আজ অনেক পর্যটক সেই মূর্তির সামনে ছবি তুলছিলেন।অনেকে শিশুদের নিয়ে ইতিহাস শিখতে এসেছেন।কেউ কেউ গাইডের কথা মন দিয়ে শুনছিলেন। চারদিকে ছিল উৎসবের আবহ। কারণ স্বাধীনতার ২৫০ বছর শুধু একটি সংখ্যা নয়। এটি একটি জাতির দীর্ঘ পথচলার স্মারক।

দুঃখের বিষয়, আমরা গত ১৪ মে ২০২৬ দেখার জন্য গেলে ইনডিপেনডেন্স হলের ভেতরের মিউজিয়ামটি বন্ধ ছিল। তাই ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি। তবু বাইরে দাঁড়িয়েই অনুভব করা যায় ইতিহাসের ভার।এই ভবনের প্রতিটি দেয়াল যেন স্বাধীনতার গল্প বলে।

সামনেই রয়েছে বিখ্যাত লিবার্টি বেল। এই ঘণ্টা আমেরিকার স্বাধীনতার অন্যতম প্রতীক। কথিত আছে, স্বাধীনতার ঘোষণা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এই ঘণ্টা বাজানো হয়েছিল। যদিও ইতিহাসবিদদের মধ্যে এ নিয়ে কিছু মতভেদ আছে, তবু লিবার্টি বেল স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবেই পরিচিত। ঘণ্টাটির গায়ে বড় একটি ফাটল আছে। তবু সেই ফাটল যেন ইতিহাসেরই একটি অংশ। মানুষ ঘণ্টাটি দেখতে ভিড় করছেন।অনেকে ছবি তুলছেন। অনেকে আবার শিশুদের সামনে দাঁড়িয়ে গল্প বলছেন। লিবার্টি বেল শুধু স্বাধীনতার প্রতীক নয়। এটি মানুষের অধিকার ও মুক্তিরও প্রতীক। দাসপ্রথা বিরোধী আন্দোলনেও এই ঘণ্টার নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। নারীর অধিকার আন্দোলনেও এর উল্লেখ ছিল। মানুষের স্বাধীনতা ও ন্যায়ের প্রশ্ন উঠলেই লিবার্টি বেল যেন নতুন অর্থ পায়।

সংরক্ষিত সেই ঐতিহাসিক লিবার্টি বেল ( ঘণ্টি)

ফিলাডেলফিয়ায় গেলে বোঝা যায়, আমেরিকা কীভাবে নিজেদের ইতিহাসকে সংরক্ষণ করেছে।

পুরনো ভবন, রাস্তা, স্মৃতিস্তম্ভ সবই যত্নে রাখা হয়েছে। ইতিহাস এখানে শুধু বইয়ের বিষয় নয় এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

আমেরিকার স্বাধীনতার গল্পও খুব সহজ ছিল না।এক সময় এই অঞ্চল ছিল ইউরোপীয় শক্তিগুলোর আগ্রহের কেন্দ্র। ব্রিটিশরা এখানে ১৩টি উপনিবেশ গড়ে তোলে। তার আগে এই ভূখণ্ডে বাস করতেন বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী।তাদের নিজস্ব সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবনধারা ছিল।প্রকৃতিনির্ভর সেই জীবন ছিল ভিন্ন রকম। পরে ইউরোপীয়রা এসে ধীরে ধীরে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবে আমেরিকা প্রায় ১৭০ বছর ছিল ব্রিটিশদের অধীনে। ১৬০৭ সালে ভার্জিনিয়ায় প্রথম স্থায়ী ব্রিটিশ বসতি স্থাপিত হয়। তারপর ধীরে ধীরে ব্রিটিশ প্রভাব বাড়তে থাকে।

শুরুতে উপনিবেশগুলোতে বসবাসকারী মানুষ ব্রিটিশদের বিরোধিতা করেননি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। ব্রিটিশ সরকার নানা কর আরোপ করতে শুরু করে। স্ট্যাম্প অ্যাক্ট, টি অ্যাক্টসহ বিভিন্ন আইনে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা বলতেন, প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কর নয়।১৭৭৩ সালের বোস্টন টি পার্টি ছিল বড় একটি ঘটনা। ব্রিটিশদের চায়ের ওপর করের প্রতিবাদে আন্দোলনকারীরা জাহাজের চা সমুদ্রে ফেলে দেন।এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

১৭৭৫ সালে শুরু হয় আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ।একদিকে ছিল ব্রিটিশ বাহিনী। অন্যদিকে ছিল উপনিবেশবাসীদের সেনারা। এই সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেন জর্জ ওয়াশিংটন। তবে শুধু তিনি নন, আরও অনেক নেতা স্বাধীনতার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। থমাস জেফারসন স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রের মূল খসড়া লেখেন।বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিন ছিলেন কূটনীতিক ও চিন্তাবিদ। জন অ্যাডামস স্বাধীনতার পক্ষে জোরালো ভূমিকা পালন করেন। স্যামুয়েল অ্যাডামস জনগণকে আন্দোলনে উৎসাহ দেন।

আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন পরবর্তীতে নতুন রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই স্বাধীনতার ঘোষণা গ্রহণ করা হয়। সেই ঘোষণায় বলা হয়, মানুষ জন্মগতভাবে সমান। তাদের স্বাধীনতা ও অধিকার রয়েছে। এই চিন্তাই পরবর্তীতে পুরো বিশ্বের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রভাব ফেলেছে।

স্বাধীনতার যুদ্ধ অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়নি।

আরও কয়েক বছর যুদ্ধ চলে। শেষ পর্যন্ত ১৭৮৩ সালে প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা স্বীকার করে। এখন ২০২৬ সালে এসে সেই স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে। সারা আমেরিকায় নানা আয়োজন চলছে। বিশেষ করে ফিলাডেলফিয়ায় উৎসবের আমেজ বেশি। কারণ এই শহরই স্বাধীনতার কেন্দ্র ছিল।

রাস্তার পাশে নানা ব্যানার দেখা যায়। ঐতিহাসিক স্থানে পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে। অনেক স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ইতিহাস জানতে আসছে।সংগীত, প্রদর্শনী, আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে বিভিন্ন জায়গায়।ফিলাডেলফিয়ায় ঘুরে আরেকটি বিষয় চোখে পড়ে। আমেরিকানরা তাদের জাতীয় ইতিহাস নিয়ে গর্ব করে। তারা নতুন প্রজন্মকে সেই ইতিহাস জানাতে চায়। এ কারণেই ঐতিহাসিক স্থানগুলো এত সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

লিবার্টি বেলের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, স্বাধীনতা কেবল একটি দেশের বিষয় নয়। এটি মানুষের মৌলিক আকাঙ্ক্ষা। মানুষ যুগে যুগে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছে। ন্যায়বিচার ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছে। ফিলাডেলফিয়ার পুরনো রাস্তায় হাঁটলে মনে হয়, ইতিহাস যেন জীবন্ত। এখানেই স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন অনেক মানুষ। এখানেই নতুন একটি রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল। সেখান থেকে দেখা হয়েছে আমেরিকার প্রথম দিককার ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্মৃতিও। অর্থনীতি ও রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসও এখানে জড়িয়ে আছে। নতুন দেশকে শক্তিশালী করতে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরি ছিল।

আমেরিকার প্রথম দিককার বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির স্মৃতিও নানা জায়গায় ছড়িয়ে আছে। সব মিলিয়ে ফিলাডেলফিয়া শুধু একটি শহর নয়। এটি যেন পুরো আমেরিকার জন্মকথা।

আজকের পৃথিবীতে স্বাধীনতার মূল্য আরও বেশি।যুদ্ধ, বৈষম্য ও সংকটের সময় মানুষ এখনো স্বাধীনতার কথাই ভাবে। এই কারণে আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০ বছর শুধু আমেরিকার জন্য নয়, বিশ্বের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত।

ফিলাডেলফিয়া ভ্রমণ তাই শুধু একটি দর্শন নয়।

এটি ইতিহাসের ভেতর দিয়ে হাঁটার মতো অভিজ্ঞতা। ইনডিপেনডেন্স হল, লিবার্টি বেল, পুরনো রাস্তা আর মানুষের ভিড়; সব মিলিয়ে মনে হয় ইতিহাস এখনো বেঁচে আছে। আড়াইশ বছর আগে যে স্বাধীনতার স্বপ্ন শুরু হয়েছিল, তার আলো আজও জ্বলছে। আর সেই আলোর অন্যতম সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক শহর ফিলাডেলফিয়া।


লেখক আবদুল হামিদ মাহবুব : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব।

মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪

ই-মেইল:  [email protected]

মতামত এর আরও খবর