img

ফিলিস্তিন ইস্যুতে প্রধানতম মুসলিম দেশগুলোর ডকট্রিন কী?

প্রকাশিত :  ১৪:৫৮, ১১ নভেম্বর ২০২৫

ফিলিস্তিন ইস্যুতে প্রধানতম মুসলিম দেশগুলোর ডকট্রিন কী?
সাইফুল খান 

“রাষ্ট্রীয় ডকট্রিন” (State Doctrine) শব্দটি  তাত্ত্বিক। এটি একটি রাষ্ট্রের মৌলিক দর্শন ও নীতি কাঠামো। যার ওপর দাঁড়িয়ে সে তার অভ্যন্তরীণ শাসন, বৈদেশিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা নীতি পরিচালনা করে। অর্থাৎ এটি হচ্ছে সেই “চিন্তার কাঠামো” (Ideological Framework) যা রাষ্ট্রের সব নীতি ও সিদ্ধান্তকে পরিচালিত করে। আসুন দেখি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর ডকট্রিনে ফিলিস্তিনের জায়গা কোথায়। এই ডকট্রিন অনুযায়ী ফিলিস্তিন ইস্যুতে রাষ্ট্রগুলো সাধারনত তাদের আচরণ প্রকাশ করে থাকে। এই ডকট্রিন সম্পর্কে ধারনা থাকলে সহজেই অনুমান করা যাবে আগামী দিনগুলোতে কোন দেশ ফিলিস্তিন ইস্যুতে কেমন আচরন করবে।  

ইরান– “Resistance Doctrine 
মূলনীতি: ফিলিস্তিনের মুক্তি হলো ইসলামি উম্মাহর দায়িত্ব। ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব অস্বীকারযোগ্য।
মূল বৈশিষ্ট্য:এই ডকট্রিন ইমাম খোমেইনির সময় থেকে গঠিত।ইরান রাষ্ট্রীয়ভাবে “ইসরায়েল অবৈধ” ঘোষণা করেছে।হামাস, ইসলামিক জিহাদ, হিজবুল্লাহ প্রভৃতি সংগঠনকে সমর্থন করে।ফিলিস্তিন ইস্যু ইরানের বৈদেশিক নীতির “কেন্দ্রীয় উপাদান”।
এটি স্পষ্টভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষিত রেজিস্ট্যান্স ডকট্রিন।

সৌদি আরব– “Peace & Stability Doctrine”
মূলনীতি: আরব শান্তি উদ্যোগ (Arab Peace Initiative) এর ভিত্তিতে সমাধান হবে।
ইসরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করা না হলেও, সরাসরি সংঘাতে যাওয়া যাবেনা।
মূল বৈশিষ্ট্য: ২০০২ সালে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স আবদুল্লাহ “Arab Peace Plan” দেন। 
এতে বলা হয়, ইসরায়েল যদি ১৯৬৭ সীমারেখায় ফিরে আসে, তবে আরব দেশগুলো তাকে স্বীকৃতি দেবে।
রেজিস্ট্যান্স নয়, ডিপ্লোম্যাটিক সলিউশন সৌদি নীতির মূল লক্ষ্য।
বর্তমানে (বিশেষত MBS যুগে) সৌদি আরব ধীরে ধীরে ইসরায়েলকে স্বীকৃতির পথে যাচ্ছে।
তাই এটি “Resistance” নয়, বরং “Normalization Doctrine।”

মিশর– “Camp David Doctrine”
মূলনীতি: শান্তি ও স্থিতিশীলতাই অগ্রাধিকার; ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক অপরিবর্তনীয়।
মূল বৈশিষ্ট্য: ১৯৭৮ সালে “Camp David Accord” স্বাক্ষরের পর মিশর ইসরায়েলকে প্রথম স্বীকৃতি দেয়। তারা ফিলিস্তিনের বিষয়ে “দুই রাষ্ট্র সমাধান (Two-State Solution)” এর পক্ষে। হামাসকে সন্দেহের চোখে দেখে, কারণ এটি মুসলিম ব্রাদারহুড সম্পৃক্ত।
ফলে মিশরের ডকট্রিন হলো “Diplomatic Neutralization Doctrine।”

কাতার–“Selective Resistance Support Doctrine”
মূলনীতি: ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের নৈতিক ও মানবিক সমর্থন, কিন্তু কূটনৈতিক খোলামেলা নীতি বজায় রাখা।
মূল বৈশিষ্ট্য: হামাসের রাজনৈতিক দপ্তর দোহায় অবস্থিত।কাতার মানবিক সাহায্য দেয়, গাজায় পুনর্গঠন করে।কিন্তু একইসাথে আমেরিকা ও পশ্চিমা জোটের সাথেও সম্পর্ক রাখে।
তাই এটি “Hybrid Doctrine”  অর্থাৎ “রেজিস্ট্যান্স + ডিপ্লোম্যাটিক ব্যালেন্স।”

তুরস্ক–“Neo-Ottoman Moral Resistance Doctrine”
মূলনীতি: ফিলিস্তিন মুসলিম উম্মাহর অংশ;
ইসরায়েলের আগ্রাসন নৈতিকভাবে নিন্দনীয়। নিন্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। 
মূল বৈশিষ্ট্য: এরদোয়ানের সময় থেকে ফিলিস্তিন ইস্যু “ওসমানীয় নেতৃত্ব পুনরুদ্ধার”-এর প্রতীক হয়ে ওঠে।
তুরস্ক কূটনৈতিকভাবে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক রাখে, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে ফিলিস্তিনের পক্ষে উচ্চস্বরে কথা বলে।
গাজা অবরোধের সময় “Mavi Marmara” ঘটনার পর কূটনৈতিক টানাপোড়েন দেখা যায়।
এটি মূলত  “Moral Resistance Doctrine।”

সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) – “Abraham Accords Doctrine”
মূলনীতি: আরব উন্নয়ন ও ইসরায়েলি প্রযুক্তি সহযোগিতা। সংঘাত নয়, সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ।
মূল বৈশিষ্ট্য: ২০২০ সালে UAE ইসরায়েলের সাথে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে।
তারা বিশ্বাস করে, “ফিলিস্তিন ইস্যুর সমাধান অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সহযোগিতার মাধ্যমে।”
হামাস ও ইসলামিক জিহাদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব রাখে। এটি স্পষ্টভাবে “Normalization Doctrine”, রেজিস্ট্যান্সের বিপরীত।

জর্ডান – “Custodianship Doctrine”
মূলনীতি: জেরুজালেমের ইসলামি পবিত্র স্থানের “রক্ষকত্ব (Custodianship)” জর্ডানের অধিকার।
মূল বৈশিষ্ট্য: জর্ডান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছে (১৯৯৪ সালে) কিন্তু জেরুজালেম ও আল-আকসা ইস্যুতে ঐতিহাসিক ভূমিকা দাবি করে। “দুই রাষ্ট্র সমাধান”-এর পক্ষে।
এটি একধরনের “Protective Diplomacy Doctrine।”

সিরিয়া ও লেবানন – “Frontline Resistance Doctrine”
মূলনীতি:ফিলিস্তিন ইস্যু সামরিক প্রতিরোধের মাধ্যমে সমাধান হবে।
মূল বৈশিষ্ট্য: সিরিয়া রাষ্ট্রীয়ভাবে “রেজিস্ট্যান্স অক্ষ (Axis of Resistance)”–এর অংশ।
লেবাননের হিজবুল্লাহ এই ব্লকের সামরিক শাখা।
এই দুই রাষ্ট্র ইসরায়েলের অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ করে।
এটি “Hard Resistance Doctrine।”
(পাদটীকা- আহমেদ আল শারা ওরফে জোলানির আমলে এই ডকট্রিন আর কার্যকর নেই। Peace doctrine এর দিকে যাচ্ছে বর্তমান সিরিয়া।) 

পরিশেষ, 
ফিলিস্তিন প্রশ্নে রাষ্ট্রীয়ভাবে “রেজিস্ট্যান্স ডকট্রিন” শুধু ইরানও লেবাননের। সিরিয়ার বর্তমান সরকার সরে এসেছে।
বাকি দেশগুলো কূটনৈতিক সমাধান বা ইসরায়েল-স্বীকৃতি ভিত্তিক নীতি অনুসরণ করে।

লেখক-ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।

মতামত এর আরও খবর

এনআইসি’র প্রতিবেদন

img

বড় যুদ্ধেও ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন সম্ভব হবে না

প্রকাশিত :  ০৫:৩১, ০৯ মার্চ ২০২৬

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের আক্রমণ করলেও দেশটির শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ও ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করা হয়তো সম্ভব হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের (এনআইসি) একটি গোপন প্রতিবেদনে সতর্ক করে এ কথা বলা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা, বিশেষ করে যখন ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালানোর ধুয়া তুলেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘যুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে।’ গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবগত এমন তিনটি সূত্র ওয়াশিংটন পোস্টকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে ‘পুরোপুরি সরিয়ে দিয়ে’ দেশটিতে নিজের পছন্দমতো শাসক বসানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। ট্রাম্প তাঁর এ পরিকল্পনায় সফল হতে পারবেন কিনা– এই গোয়েন্দা প্রতিবেদন তা নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর প্রায় এক সপ্তাহ আগে এ প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়।

প্রতিবেদনটি সম্পর্কে জানা আছে এমন কয়েকজন বলেন, ক্ষমতার সম্ভাব্য পরিবর্তন সম্পর্কে ওই প্রতিবেদনে কিছু ধারণা দেওয়া হয়েছে। ইরানের নেতাদের বিরুদ্ধে সীমিত আকারের অভিযান অথবা দেশটির নেতৃত্ব ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিস্তৃত হামলা– উভয় ক্ষেত্রেই একই পরিণতির কথা বলা হয়েছে। সেটা হলো, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করা হলে ইরানের ধর্মীয় ও সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আগে থেকে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে। ইরানের বিভক্ত বিরোধী দলগুলোর পক্ষে দেশের ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারার ‘সম্ভাবনা কম’।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল বা এনআইসি অভিজ্ঞ বিশ্লেষকদের নিয়ে গঠিত। ওয়াশিংটনের ১৮টি গোয়েন্দা সংস্থা থেকে পাওয়া সব তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা গোপন প্রতিবেদন তৈরি করে। ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করার অনুমতি দেওয়ার আগে এনআইসির এই প্রতিবেদন সম্পর্কে ট্রাম্পকে অবহিত করা হয়েছিল কিনা, হোয়াইট হাউস সে বিষয়ে কিছু বলেনি। ইরানের ওপর সামরিক অভিযান শুরুর পরই সংঘাত পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে, আর পশ্চিম দিকে ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধ ন্যাটো সদস্য দেশ তুরস্কের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।


মতামত এর আরও খবর