img

সিলেটের আজীবন ত্যাগী সংগ্রামী জননেতা বিপ্লবী মফিজ আলী

প্রকাশিত :  ০৭:১৯, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:০৪, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫

সিলেটের আজীবন ত্যাগী সংগ্রামী জননেতা বিপ্লবী মফিজ আলী

সংগ্রাম দত্ত: সিলেট বিভাগের রাজনীতি, শ্রমিক আন্দোলন ও প্রগতিশীল সমাজচেতনার ইতিহাসে বিপ্লবী মফিজ আলী এক অনন্য নাম। তিনি একাধারে ভাষা সংগ্রামী, শ্রমিক নেতা, কৃষক নেতা, প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, লেখক ও সাংবাদিক। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছেন। তাঁর নির্লোভ জীবনযাপন, ত্যাগ, সংগ্রাম ও আদর্শ তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে করে তুলেছিল “বিপ্লবী মফিজ আলী”।

শিক্ষাজীবন ও প্রারম্ভিক ধাপ:

১৯২৭ সালের ১০ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার শ্রীসূর্য ধোপাটিলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মফিজ আলী। তাঁর পিতা আজফর আলী এবং মাতা নূরজাহান বিবি। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন প্রথম সন্তান। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে এক কন্যা ও দুই পুত্র সন্তানের জনক।

ছাত্রাবস্থাতেই ব্রিটিশবিরোধী চেতনা জাগ্রত হয় তাঁর মধ্যে। বিশেষ করে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তাঁকে রাজনৈতিকভাবে আরও সচেতন করে তোলে। প্রথম জীবনে কট্টর ইসলামপন্থী থাকলেও প্রগতিশীল রাজনৈতিক চেতনার সংস্পর্শে এসে তাঁর মধ্যে আমূল পরিবর্তন ঘটে।

তিনি এম.সি কলেজের ছাত্রনেতা হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৫৬ সালে ছাত্রদের ন্যায্য দাবিতে আয়োজিত এক সমাবেশে বক্তব্য রাখার কারণে সিলেটের এম.সি কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে বহিষ্কার করে। এর ফলে স্নাতক শেষ (চতুর্থ) বর্ষে পড়া অবস্থাতেই তাঁর শিক্ষা জীবন সমাপ্ত হয়।

রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ:

ভাষা আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে তিনি প্রথমে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ, পরে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন। ফেঞ্চুগঞ্জে ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম সম্মেলনের মাধ্যমে সিলেট জেলা কমিটিতে যুক্ত হয়ে ধীরে ধীরে ছাত্রনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

১৯৫৭ সালে মৌলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এ যোগ দেন তিনি। পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতি ও ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ শুরু করেন।

১৯৬০ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন।

শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনে অবদান:

শৈশব থেকেই কমলগঞ্জের শমসেরনগর চা শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, নির্যাতন-নিপীড়ন তাঁর চোখে পড়ে। শ্রমিকদের প্রতি মমত্ববোধ থেকেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে শ্রমিকদের মাঝে কাজ শুরু করেন।

১৯৬৪ সালের ৫ এপ্রিল তাঁর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান চা শ্রমিক সংঘ। এরপর চা শ্রমিকদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে শক্তিশালী আন্দোলন। তাঁর নামে মামলা হলে প্রায় ১০ হাজার চা শ্রমিক শমসেরনগর থেকে মৌলভীবাজার পর্যন্ত মিছিল করে মামলা প্রত্যাহারে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করে।

শ্রমিক আন্দোলনের পাশাপাশি তিনি ১৯৬৩ সালে শ্রীমঙ্গল উপজেলার সিন্দুরখানে বৃহত্তর সিলেটের ইতিহাসের স্মরণীয় বালিশিরা কৃষক আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানেও বৃহত্তর সিলেটে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৫৪,১৯৬০, ১৯৬৪, ১৯৬৫, ১৯৬৭, ১৯৬৯ ও ১৯৭২ সালে রাজনীতির কারণে জীবনে তিনি মোট ৭ বার কারাবরণ করেন এবং প্রায় ৬ বছর জেল খাটেন।

বামপন্থী আন্দোলন ও সংগঠক জীবন:

১৯৬৭ সালে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভক্তির সময় মফিজ আলী ক্রুশ্চেভীয় সংশোধনবাদের বিরোধিতা করে কমরেড আবদুল হক ও মোহাম্মদ তোহার নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এম.এল)-এ যোগ দেন।

একই সময়ে ন্যাপ বিভক্ত হলে সিলেটে ভাসানী ন্যাপের নেতৃত্ব দেন তিনি। কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা জমিদার বাড়ির নবাব আলী ছবদরখান রাজা সাহেব ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা।

স্বাধীনতার পরও তিনি শ্রমিক-কৃষকের পক্ষে আন্দোলন চালিয়ে যান। ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোঃ ইলিয়াসের কাছে পরাজিত হন।

১৯৯৩ সালে তিনি যোগ দেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টে (এনডিএফ)। পরবর্তীতে তিনি মৌলভীবাজার জেলা শাখার সংগঠক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও জেলা সভাপতি হিসেবে চা, রাবার, হোটেল, রিকশা ও দর্জি শ্রমিকদের সংগঠিত করেন।

শিক্ষকতা, লেখালেখি ও সাংবাদিকতা:

রাজনীতির পাশাপাশি তিনি শিক্ষক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন এবং অসংখ্য রাজনৈতিক নিবন্ধ রচনা করেছেন।

তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ছিল— “পাকিস্তানে সাম্রাজ্যবাদী শোষণের নমুনা”। পাকিস্তান আমলে ডন, ইত্তেফাক, সংবাদ, জনতা, আজাদ, গণশক্তি প্রভৃতি পত্রিকায় লিখেছেন নিয়মিত। উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগুলোর মধ্যে রয়েছে— “রাষ্ট্রভাষা ও আঞ্চলিক স্বায়ত্ত্বশাসন”, “মেদিবসের ইতিহাস” এবং ছোটগল্প “একটি গামছা”।

নব্বইয়ের দশকে সাপ্তাহিক সেবা পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা প্রদান করা হয়।

শেষ জীবন ও মৃত্যু:

২০০৮ সালের ৩০ আগস্ট কুলাউড়ার এক কৃষক সভা থেকে তিনি ফেরার পথে ধোপাটিলার  নিজ গ্রামের বাড়ির সামনের সড়কে রহস্যজনকভাবে আহত ও পরে ষ্টোকে আক্রান্ত হন ।  অনেকের ধারণা, হেডলাইটবিহীন একটি বাসের ধাক্কায় তিনি আহত হয়েছিলেন। এরপর দীর্ঘ এক মাস ১০ দিন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ১০ অক্টোবর ২০০৮  তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর।

উপসংহার:

বিপ্লবী মফিজ আলী ছিলেন এক অকৃত্রিম শ্রমিক-কৃষক নেতা, যিনি সারাজীবন আপসকামী ও সংশোধনবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। তাঁর সংগ্রামী জীবন আমাদের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা।

আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর আদর্শ, শ্রমিক-কৃষকের মুক্তির সংগ্রাম এবং অসমাপ্ত কাজই আমাদের পথের দিশারী। রাজনীতিতে তাঁর আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম, শ্রমজীবী মানুষের জন্য বিপ্লব এবং ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের কাছে চির জাগ্রত হয়ে থাকবে।

সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে গণআন্দোলন গড়ে তুলে মফিজ আলীর অসমাপ্ত স্বপ্ন— জাতীয় গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠাই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি।

মতামত এর আরও খবর

img

ট্রাম্পের অনৈতিকতা এবং ইউরোপের মেরুদণ্ডহীনতা

প্রকাশিত :  ২০:২০, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৫:১৯, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

ড. জ্যাকি রেজওয়ানা আনোয়ার FRSA, MBBS, DTM&H, MS & PhD

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের ছাতার তলার পুঁজিবাদী ও ন‍্যাটোভুক্ত দেশগুলো নিয়ে পশ্চিমা ব্লক এবং বিপরীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের ছাতার তলার কমিউনিস্ট ও ওয়ারসোভুক্ত দেশগুলো নিয়ে পূর্ব ব্লকের মধ‍্যে শীতল যুদ্ধের কথা আমরা সবাই জানি। সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকাতে ১৯৫১ সালে ন‍্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা হিসেবে ‘গ্রীনল‍্যান্ড ডিফেন্স এ‍্যগ্রিমেন্ট’ হয় যেখানে গ্রীনল‍্যান্ড ডেনমার্কের স্বায়ত্বশসিত অংশ হলেও যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রীনল‍্যান্ডে ঘাঁটি নির্মাণ, মার্কিন সেনা মোতায়েন থেকে শুরু ক’রে বহু অধিকার দেওয়া হয়। এত সব অধিকার থাকার পরও গ্রীনল‍্যান্ড বিষয়ে ট্রাম্প যা চান তাকে সোজা বাংলায় বলা যায় ‘জোর দখল’।
এখন কথা হচ্ছে, ট্রাম্প তো চাইলে গ্রীনল্যান্ডকে দখল না ক’রে লীজ নিতে পারতেন। অন‍্য দেশের ভূখন্ডে লীজ নেওয়ার উদাহরণ তো বহু রয়েছে। বৃটিশরা যেমন লীজ নিয়েছিল হংকং যেটি ১৯৯৭ সালে চীনকে ফেরত দিয়েছে। তেমনি আবার যুক্তরাষ্ট্র কিউবার কাছ থেকে গুয়েন্তানমো বে লীজ নিয়েছিল বন্দীশালা স্থাপনের জন‍্যে। কিন্তু না, গ্রীনাল‍্যান্ডের ক্ষেত্রে লীজ নয়, ট্রাম্প চাইছেন সম্পূর্ণ দখল - এ যেন অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানাবার মতলব।
সময়ের সাথে সাথে গ্রীনল‍্যান্ড তথা আর্টিক অন্চল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে এই অন্চলে বরফ গলতে শুরু করেছে, ফলে সেখানে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্র বাড়বে বৈ কমবেনা। সেখানে প্রচুর তেল ও খনিজ সম্পদ রয়েছে। ট্রাম্প মিথ্যে দাবি করেছেন যে চীন ও রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ গ্রীনল্যান্ডের সব জায়গায় মোতায়েন রয়েছে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যে এটি দখল করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। যদিও নিরাপত্তার সব কাজ মালিকানা ছাড়াও করা সম্ভব তবু ট্রাম্প বলছেন তিনি গ্রীনল্যান্ডের মালিক হতে চান। ট্রাম্প আরো বলছেন তিনি গ্রীনল্যান্ডকে নিরাপদ করতে চান। কিন্তু সত্য হলো, তিনি সেখানকার খনিজ সম্পদ কবজা করতে চান এবং যুক্তরাষ্ট্রকে আয়তনে আরো বড় করতে চান।
যদিও ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের একটি মিত্র দেশ ও এবং গ্রীনল‍্যান্ডে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বিমানঘাঁটি রয়েছে তা সত্বেও তিনি ন‍্যাটোর চুক্তির প্রতি কোনো রকম তোয়াক্কা করছেননা। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, তিনি আন্তর্জাতিক আইনকানুন মানবেন না, তিনি যা করবেন তা তাঁর নিজস্ব নৈতিকতার উপর ভিত্তি করেই করবেন। যাকে জিন ক্যারলকে যৌন  নিপীড়নের জন্য দায়ী করা হয়েছে; যার বিরুদ্ধে শত শত ঠিকাদার মামলা করেছে পাওনা পরিশোধ না করার জন‍্যে; জেফরি এপস্টাইনের মত ব‍্যাক্তি যার প্রাক্তন বন্ধু; যিনি নারী সাংবাদিকদের চুপ করাতে চাইলে তাদের 'পিগি' (শুয়োরছানা) বলে ডাকেন; যিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে আনেন; যার অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি কোনো শ্রদ্ধা নেই - তাঁর নৈতিকতার উপর নির্ভর করব আমরা?
এদিকে আমরা দেখলাম, ভেনেজুয়েলা অভ্যুত্থানের কয়েক ঘণ্টা পরেই ট্রাম্পের নীতি নির্ধারণী প্রধান স্টিফেন মিলারের স্ত্রী কেটি মিলার একটি ছবি টুইট করেন। সেখানে দেখা যায় গ্রীনল্যান্ড মার্কিন পতাকার রঙে ঢাকা এবং তাতে ক্যাপশন ছিল - "শীঘ্রই আসছে"। ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের প্রকাশ্য অবৈধ অভ্যুত্থানের বিষয়ে ইউরোপীয় নেতারা সবাই বেশ নিশ্চুপ ছিলেন। তাঁরা কেবল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানিয়েছিলেন। যা ছিল স্পষ্টতই অবৈধ, তা নিয়ে তাঁরা টুঁ - শব্দটিও করতে পারেননি। এখন তো দেখা যাচ্ছে ইউরোপ নিজেই ট্রাম্পের পরবর্তী লক্ষ্য হতে যাচ্ছে।

"বৃটেন আসলে এখন একটি নামমাত্র সার্বভৌম দেশ। ফ্রান্স বা এমনকি দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায় বৃটেনের সার্বভৌমত্ব কম। আমরা আসলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি 'ভ্যাসাল স্টেট' (আজ্ঞাবহ রাষ্ট্র) হয়ে গেছি। আমাদের নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র নেই (যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল), আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অ্যামাজনের ক্লাউড সার্ভিস ব্যবহার করে, আমাদের পেমেন্ট সিস্টেম মার্কিন মালিকানাধীন। সেই সাথে কিয়ার স্টার্মার এমন একজন প্রধানমন্ত্রী যিনি এই ভঙ্গুর অবস্থারই প্রতিফলন। তাঁর নিজের কোনো মেরুদণ্ড বা নতুন কোনো ধারণা নেই।"
ব্রিটিশ সরকারের জন্যে বিষয়টি একটি বড় উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তারাও কোনো স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারছে না। ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী যেখানে সরাসরি প্রতিবাদ করছেন, সেখানে বৃটিশ সরকার বলছে তারা "রানিং কমেন্টারি" দেবে না। এটি বৃটিশ রাজনৈতিক শ্রেণির দেউলিয়াত্ব প্রকাশ করে। ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে অভিবাসন মন্ত্রী মাইক ট্যাপকে যখন স্কাই নিউজে প্রশ্ন করা হয় যে, ট্রাম্প যদি গ্রীনল্যান্ড দখল করেন তবে বৃটেন কি তার নিন্দা জানাবে? মাইক ট্যাপ সরাসরি কোনো উত্তর দিতে পারেননি। তিনি বারবার বলেছেন যে, "মিত্রদের সাথে আমাদের গোপন কূটনৈতিক আলোচনা চলছে" এবং "ন্যাটো আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা হবে”। সাংবাদিক যখন তাঁকে চেপে ধরেন যে তিনি অন্তত এটুকু বলতে পারেন কি না যে "ট্রাম্পের গ্রীনল্যান্ড দখল করা উচিত নয়", তখন তিনি প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে বলেন, "আমি কাল্পনিক বিষয় নিয়ে কোনো রানিং কমেন্টারি দেব না।"
প্রথমে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার ষ্টার্মার চুপ থাকলেও পরে বুঝতে পেরেছিলেন যে তাদের আগের অবস্থান (চুপ থাকা) টিকবে না। তাই স্টার্মার শেষ পর্যন্ত মুখ খুলেছেন। তিনি বলেছেন, "আমি ডেনিশ প্রধানমন্ত্রীর পাশে আছি এবং গ্রীনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি যা বলেছেন তা সঠিক।" তবে এটি কেবল একটি লোকদেখানো বিবৃতি বলে মনে হচ্ছে। যারা প্যালেস্টাইনে নিহত তিন ব্রিটিশ সেনার জন্যে দাঁড়াতে পারেনি, তারা গ্রীনল্যান্ডবাসীদের জন্যে কতটা দাঁড়াবে তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ থাকাটাই স্বাভাবিক।
বৃটেন আসলে এখন একটি নামমাত্র সার্বভৌম দেশ। ফ্রান্স বা এমনকি দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায় বৃটেনের সার্বভৌমত্ব কম। আমরা আসলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি 'ভ্যাসাল স্টেট' (আজ্ঞাবহ রাষ্ট্র) হয়ে গেছি। আমাদের নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র নেই (যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল), আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অ্যামাজনের ক্লাউড সার্ভিস ব্যবহার করে, আমাদের পেমেন্ট সিস্টেম মার্কিন মালিকানাধীন। সেই সাথে কিয়ার স্টার্মার এমন একজন প্রধানমন্ত্রী যিনি এই ভঙ্গুর অবস্থারই প্রতিফলন। তাঁর নিজের কোনো মেরুদণ্ড বা নতুন কোনো ধারণা নেই।
গ্রীনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা এবং ইউক্রেন এই তিনটি ক্ষেত্রেই ইউরোপীয় নেতাদের এবং একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) দুর্বলতা ও বিভাজনও আশঙ্কাজনকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এই ভয়াবহ ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, 'ব্রেক্সিট'কে এখন আর কেবল একটি বোকামি বলে মনে হয় না। এটিকে এখন প্রায় আত্মঘাতী বলে মনে হয়। বাস্তব অর্থেই ইউরোপ এখন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া - এই তিনটি বড় শিকারী শক্তির মাঝখানে পড়ে গেছে।
ইউরোপের এখন কী করা উচিত? ইউরোপের প্রথম কাজ হওয়া উচিত একটি শক্তিশালী ডিজিটাল প্রাচীর (Firewall) তৈরি করা। চীন যা করেছে নিজেদের ড‍্যাটা এবং টেক কোম্পানিগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে। ইউরোপ যদি গুগল, মেটা বা অ্যামাজনের ওপর নির্ভরশীল না হতো, তবে আজ ইউরোপে ৫০০০ বিলিয়ন ডলারের অন্তত আধা ডজন কোম্পানি থাকত।
গত ৪০ বছর ধরে ইউরোপীয় নেতারা তাঁদের নিজস্ব শিল্প গড়ে তোলার পরিবর্তে নিওলিবারেলিজম বা বাজার অর্থনীতির ওপর অন্ধ বিশ্বাস রেখেছেন। তাঁরা ভেবেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র তাদের আজীবন রক্ষা করবে। কিন্তু হুয়াওয়ের সিইও যেমন বলেছিলেন, একটি দেশের যদি নিজস্ব ড‍্যাটা সুইচ না থাকে, তবে তার সেনাবাহিনী না থাকার মতোই অবস্থা। ইউরোপ আজ প্রযুক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দাসে পরিণত হয়েছে।
আমরা প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। আপনি যখন অ্যাপল পে বা ভিসা কার্ডে টাকা দিচ্ছেন, মেটা-র প্রোডাক্ট ব্যবহার করছেন বা আপনার ফ্ল্যাট যখন ব্ল্যাকস্টোনের মতো কোনো মার্কিন কোম্পানি কিনছে - তার মানে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো আমাদের হাতে নেই। এই পরনির্ভরশীলতা থেকে বের হতে না পারলে আমরা কোনোদিনই প্রকৃত স্বাধীন হতে পারব না। বর্তমান যুগে প্রকৃত স্বাধীনতার অর্থ নিজেদের ড‍্যাটার উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ থাকা। বৃটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের এ ব‍্যাপারে বড় ধরনের কোনো উদ‍্যোগ দৃশ‍্যমান না। ট্রাম্প যদি শেষ পর্যন্ত গ্রীনল্যান্ড দখল করেই নেন তখন হয়তো ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বৃটেনের ঘুম ভাঙবে।

লেখক ড. জ্যাকি রেজওয়ানা আনোয়ার FRSA, MBBS, DTM&H, MS  & PhD একজন চিকিৎসক, জনপ্রিয় সিনিয়র সংবাদ পাঠক, কলামিস্ট ও আন্তর্জাতিক স্পীকার।

মতামত এর আরও খবর