img

সমুদ্রের নিচের ভূমিকম্পে বাংলাদেশে সুনামির ঝুঁকি কতটা?

প্রকাশিত :  ১০:২৩, ২৮ নভেম্বর ২০২৫

সমুদ্রের নিচের ভূমিকম্পে বাংলাদেশে সুনামির ঝুঁকি কতটা?

সম্প্রতি দেশে বেশ কয়েকবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মাঝে বুধবার (২৬ নভেম্বর) রাতে বঙ্গোপসাগরে চার মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) ৬ দশমিক ছয় মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে ইন্দোনেশিয়ায়। এর কারণে বড় কোনো সুনামির খবর পাওয়া যায়নি। তবে ইন্দোনেশিয়ায় অথবা আন্দামান নিকবোর দ্বীপের দিকে বড় ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশেও সুনামির ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

যেমন, ২০০৪ সালে ইন্দোনেশিয়ায় নয় দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্পে যেখানে দুই লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, সেই সুনামি আফ্রিকার দেশগুলো পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। সেই সুনামির ধাক্কা বাংলাদেশেও লেগেছিল এবং তাতে দুইজনের মৃত্যুর খবর জানা যায়।

ভূমিকম্প ও সুনামি

ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের সহকারী আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা বলছেন, ‘সাগরে যদি ভূমিকম্প ছয় দশমিক পাঁচ মাত্রার উপরে যায় তারপর সে সুনামি হবে কি না, সুনামি সার্ভিস প্রোভাইডাররা সেটা পর্যবেক্ষণ করেন। কোন জায়গায় কখন হিট করতে পারে, পানির উচ্চতা কতটা হতে পারে, সেটা তারা অ্যালার্ট করেন। এটা আমরা সবময়ই টেস্ট বেসিসে করে আসছি।’

তিনি বলছেন, ‘বাংলাদেশে বঙ্গোপসাগরে প্রায়শই ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়, তবে চার মাত্রা বা এর চেয়ে দুর্বল সেসব ভূমিকম্প থেকে বড় পর্যায়ে ক্ষতির শঙ্কা থাকে না।’

আবার অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভূমিতে বড় ভূমিকম্প হলেও উপকূলে সুনামির শঙ্কা থাকে। আমাদের পৃথিবীর ওপরের অংশ বা ভূপৃষ্ঠ বিভিন্ন প্লেটে ভাগ করা। এই প্লেটগুলো সবসময় নড়াচড়া করে। কোথাও প্লেট একে অপরকে ঠেলে দেয়, কোথাও পাশ কাটিয়ে যায়, আবার কোথাও নিচে ঢুকে যায়। এমন ক্ষেত্রে যেমন ভূমিকম্প হয়, তেমন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকেও ভূপৃষ্ঠে কম্পন সৃষ্টি হতে পারে। এটি মাটির ওপরে বা পানির নিচে যে কোনো জায়গায় হতে পারে।

২৩ কোটি থেকে ২৮ কোটি বছর আগেও পৃথিবীর সব মহাদেশ মিলে এ রকম একক ভূখণ্ড ছিল বলে তত্ত্ব রয়েছে। এটিকে বলা হয় প্যাঞ্জিয়া। টেকটনিক প্লেটের ক্রমাগত অবস্থান পরিবর্তন থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেক ভূখণ্ড হয়েছিল বলে জানা যায়। এর সপক্ষে অনেক ধরনের প্রমাণও রয়েছে। এর মাঝে একটি পানির নিচে থাকা দীর্ঘতম পর্বতমালা মিড আটলান্টিক রিজ যেভাবে পৃথিবীকে ভাগ করেছে। এর মাত্র ১০ শতাংশ মাটির ওপরে যা আইসল্যান্ডে পরিষ্কার দেখা যায়।

সুনামি তৈরি হয় কীভাবে

সুনামি অনেকটা বিশাল আকারের জলোচ্ছ্বাসের মতো। সাধারণত ভূমিকম্প হলেই সুনামি হয় না। সুনামির জন্য ভূমিকম্প খুব শক্তিশালী হতে হয়। এ ছাড়া মোটামুটি অগভীর সমুদ্রতলে এরকম কম্পন সৃষ্টি হওয়াটাও একটা ফ্যাক্টর হতে পারে। আর এমন কম্পন সমুদ্রের তলদেশকে ওপরে বা নিচে ঠেলে দিলে, বিশাল পরিমাণ পানি সরে গেলে সেটি সুনামি ঘটাতে পারে। এমন বিভিন্ন বিষয়ের সমন্বয় থেকে সুনামি হতে পারে।

বাংলাদেশে সুনামির ঝুঁকি কতটা?

এমনিতে প্রশান্ত মহাসাগর পৃথিবীতে ভূতাত্ত্বিকভাবে সবচেয়ে সক্রিয় অঞ্চল যেটাকে রিং অফ ফায়ার বলা হয়। এরম বিভিন্ন সক্রিয় অঞ্চল বা সাবডাকশন জোন থাকে। বড় সুনামি সৃষ্টিকারী সাবডাকশন জোনগুলো বাংলাদেশ থেকে বেশ দূরে। বাংলাদেশ দুইটা বড় টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থলে রয়েছে, যা চট্টগ্রাম-আরাকান থেকে আন্দামানের দিকে চলে গেছে। তবে বাংলাদেশে সুনামির ঝুঁকি নিয়ে অবশ্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে, বাংলাদেশের খুব কাছাকাছি, সাগরের নিচে খুব নিকটবর্তী সময়ে বড় ভূমিকম্প এবং তা থেকে সুনামির শঙ্কা নেই।

ফারজানা সুলতানা বলেন, ‘নরমালি ভূমিকম্প থেকে ওইরকম সুনামির ঝুঁকি নেই, কিন্তু আন্দামান নিকোবরে হলেও ওটা আমাদের জন্য একটা সোর্স অঞ্চল। আমরা টেস্ট বেসিসে সবসময় রেডি থাকি, এটা হলে যেন আমরা সঙ্গে সঙ্গেই সাবধানতা অবলম্বন করতে পারি।’

অতীতের নানা নথিপত্রের তথ্যানুযায়ী, এই অঞ্চলে ১৯৬২ সালে আরাকান কোস্টে প্রায় সাড়ে আট মাত্রার একটি ভূমিকম্প থেকে বড় সুনামি হয়েছিল।

বিবিসির এর আগের একটি প্রতিবেদনে ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলছিলেন, এই প্লেটে ভূমিকম্প হলে অবশ্যই বড় সুনামির আশঙ্কা রয়েছে। তবে এখানে খুব তাড়াতাড়ি এই বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সে সময়কার তথ্যে জানা যায়, তখন বড় ধরনের সুনামির তৈরি হয়েছি, যা উপকূল থেকে অনেকদূর পর্যন্ত ভেতরে এসে পৌঁছেছিল। যদিও তখন মানুষ কম ছিল বলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হয়তো তত বেশি হয়নি। তবে ঢাকায় নদীর পানি বেড়ে গিয়ে পাঁচশ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে জানা যায়।

সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘এরপর আর এই অঞ্চলে এত বড় ভূমিকম্প বা সুনামির তথ্য পাওয়া যায় না। আমাদের হিসাবে, একবার ভূমিকম্প হওয়ার পর ওই প্লেটে শক্তি সঞ্চয় হয়ে পরবর্তী ভূমিকম্প হতে আরও ৫০০-৯০০ বছর লেগে যায়। সেই হিসাবে এখানে ওই প্লেটে (আরাকান প্লেটে) ভূমিকম্প হতে আরও ২০০-২৫০ বছর বাকি আছে।’

ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ ‘ফানেল শেপ’ অবস্থায় রয়েছে অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে সমুদ্র দক্ষিণ দিকে প্রসারিত হয়ে গেছে।

সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেছিলেন, ‘আন্দামান বা ভারত মহাসাগরে যদি বড় সুনামি তৈরি হয়, ফানেল শেপ হওয়ার কারণে তার প্রভাব কিছুটা বাংলাদেশে এসেও লাগবে। যদিও সেটা হয়তো ইন্দোনেশিয়ার মতো অতটা ভয়ানক হবে না। ভূমিকম্প সম্পর্কে খুব আগেভাগে সতর্ক করা সম্ভব না হলেও যেহেতু ভূমিকম্পের পরে পানিতে সুনামির সৃষ্টি হয়, ফলে সুনামি সম্পর্কে আগেভাগে সতর্ক করা যায়।’

তবে বাংলাদেশের জন্য সমুদ্রে ভূমিকম্পের চেয়ে ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে যে ভূমিকম্পের যে ঝুঁকি রয়েছে, সেটিই এখন বেশি শঙ্কার জায়গা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সূত্র : বিবিসি


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর আরও খবর

img

পরীক্ষায় চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে ধরা পড়ার পর শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশিত :  ০৬:৪১, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পরীক্ষার হলে অন্য শিক্ষার্থীরা যখন প্রশ্নের উত্তর লিখতে ব্যস্ত, তখন এক শিক্ষার্থীর হাতে মোবাইল ফোন দেখতে পান পরিদর্শক। অভিযোগ, গোপনে ফোনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটজিপিটিতে প্রশ্ন আপলোড করে উত্তর খুঁজছিলেন তিনি। বিষয়টি ধরা পড়ার পর তাকে বিভাগীয় প্রধানের দপ্তরে নেওয়া হয়। সেখান থেকে হোস্টেল কক্ষে ফেরার কিছুক্ষণ পরই তার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগকে ঘিরে শুরু হওয়া ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় এক মর্মান্তিক ঘটনায়।

ভারতের মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) বোম্বের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাহিল ওয়াকোড়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় নিজ হোস্টেল কক্ষে আত্মহত্যা করেছেন। তিনি প্রতিষ্ঠানটির এনার্জি সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র ছিলেন। পোওয়াই ক্যাম্পাসে গত সাত মাসের মধ্যে এটি তৃতীয় আত্মহত্যার ঘটনা।

প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের দাবি, পরীক্ষা চলাকালে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করতে গিয়ে ধরা পড়ার পর ওই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো কোর্স শিক্ষক ও বিভাগীয় প্রধান তাকে ডেকে নিয়ে বোঝান এবং অভয় দেন যে এ ঘটনার কারণে তার শিক্ষাজীবন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। এই আলোচনার পর সাহিল হোস্টেলের রুমে ফিরে যান। পরে সন্ধ্যায় তাকে নিজ কক্ষে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করে আইআইটি বোম্বে জানিয়েছে, ‘একজন শিক্ষার্থীর এমন প্রয়াণে পুরো প্রতিষ্ঠান স্তব্ধ। শোকগ্রস্ত সহপাঠী, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে মানসিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে যথাযথ কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।’

এদিকে সাহিলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই উত্তাল হয়ে ওঠে পোওয়াই ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থীরা গভীর রাতে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রকৃত সত্য আড়াল করছে। তাদের দাবি, অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে সাহিলকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করার মৌখিক হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এই শাস্তির ফলে তাকে হোস্টেল ছেড়ে বাইরে থাকতে হতো এবং চার বছরের ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় লাগত। সম্ভাব্য এই শাস্তির মানসিক চাপ ও আতঙ্ক থেকেই সাহিল আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে সহপাঠীরা অভিযোগ তুললেও বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

প্রশাসনের কাছে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার দাবি জানিয়ে এক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী বলেন, ‘আজ ক্যাম্পাসে আরেকজন সহপাঠীর লাশ দেখতে হলো। এর দায় প্রশাসনকে নিতে হবে। চলতি বছরেই এ ধরনের চারটি ঘটনা ঘটল, যার দুটি গত দুই মাসের মধ্যে। একের পর এক কেন এমন ট্র্যাজেডি ঘটছে, তার কোনো সদুত্তর নেই।’

ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা দত্তাত্রয় নালওয়াড়ে জানান, ঘটনার সামগ্রিক তদন্ত চলছে। শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যে অচলাবস্থা নিরসনে আলোচনা চলছে এবং বিষয়টি সমাধানে পুলিশ নজরদারি রাখছে।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে আইআইটি বোম্বের এক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হোস্টেলে আত্মহত্যা করেন। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে নতুন সেমিস্টার শুরুর সময়েও ২০ বছর বয়সী আরেক বিটেক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছিল।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর আরও খবর