img

এইডস নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এখনো পিছিয়ে দেশ

প্রকাশিত :  ০৬:৩২, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট: ০৮:২৫, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫

এইডস নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এখনো পিছিয়ে দেশ

এইডস নিয়ন্ত্রণে জাতিসংঘ ঘোষিত বৈশ্বিক ৯৫-৯৫-৯৫ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে আছে। প্রথম ধাপ অনুযায়ী, প্রাণঘাতী রোগ এইডসে আক্রান্ত মোট রোগীর ৯৫ শতাংশকে শনাক্ত করার কথা থাকলেও বাংলাদেশ সেখানে পৌঁছাতে পেরেছে মাত্র ৬৯ শতাংশে। দ্বিতীয় ধাপে শনাক্ত রোগীদের ৯৫ শতাংশকে চিকিৎসার আওতায় আনার লক্ষ্য থাকলেও দেশের অর্জন ৭১ শতাংশ। তৃতীয় ধাপে চিকিৎসাধীন রোগীদের ভাইরাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যমাত্রা ৯৫ শতাংশ হলেও অর্জন হয়েছে ৮৯ শতাংশ। সব মিলিয়ে তিনটি সূচকেই বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

প্রাণঘাতী রোগ এইডস নিয়ন্ত্রণে জাতিসংঘ ঘোষিত বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা ৯৫-৯৫-৯৫ শতাংশ অর্জনে এখনো অনেকটা পিছিয়ে বাংলাদেশ। এই লক্ষ্যমাত্রার প্রথম ৯৫ শতাংশ হলো এইডসে আক্রান্ত দেশের ৯৫ শতাংশ রোগীকে শনাক্ত করা, যেখানে বাংলাদেশের অর্জন ৬৯ শতাংশ। দ্বিতীয় ৯৫ শতাংশ হলো শনাক্ত হওয়া ৯৫ শতাংশ রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনা, যেখানে বাংলাদেশের অর্জন ৭১ শতাংশ। আর তৃতীয় ৯৫ শতাংশ হলো চিকিৎসাধীন রোগীদের ভাইরাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা, যেখানে বাংলাদেশের অর্জন ৮৯ শতাংশ। অর্থাৎ সব দিক থেকেই বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে বাংলাদেশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যথাসময়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এক প্রকার অসম্ভব হয়ে পড়বে। কারণ, এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির একটি অংশ আসে দ্য গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নে, বাকিটা অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে আগে সরকার বহন করত। কিন্তু বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়ে অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বাতিল করে দিয়েছে। ফলে গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নে সারা দেশের এইডস নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না। তা ছাড়া এই ডিসেম্বরের পর গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নও যথেষ্ট কমবে। এতে সব রোগী শনাক্ত ও রোগ নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে পড়বে। এমনকি এইডস সংক্রমণ বাড়তে শুরু করলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার প্রাক্তন পরিচালক ও কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি মূলত ইউএসএআইডির অর্থায়নে বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে পরিচালিত হতো। ইউএসএআইডির অর্থায়ন বন্ধ হওয়ায় এনজিওগুলো এই কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে এসেছে। প্রতিরোধ ও প্রতিকারমূলক কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এইডস বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমান সরকার ওপি বন্ধ করে দেওয়ায় এইডস নিয়ন্ত্রণের অর্থায়ন বন্ধ রেখেছে। প্রজেক্ট করার কথা বলে দেড় বছরেও তারা প্রজেক্ট করেনি। ফলে এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে ওষুধ ও অন্যান্য সরঞ্জামের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এতে রোগটি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জাতীয় এইডস/এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিগত যে কোনো সময়ের চেয়ে গত তিন বছর সর্বোচ্চ পরিমাণে নতুন কেস শনাক্ত হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরীক্ষা বাড়ানোর কারণে বেশিসংখ্যক নতুন কেস শনাক্ত করা যাচ্ছে। বিগত তিন বছরের নতুন কেস বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শনাক্ত হওয়া কেসগুলোর মধ্যে সমকামী/পুরুষ যৌনকর্মী ও হিজড়ার সংখ্যা বেড়েছে, যা ২০২২ সালে ছিল ২৪ শতাংশ (২৫৩ জন), ২০২৩ সালে ২৯ শতাংশ (৩৭০ জন) ও ২০২৪ সালে ৪২ শতাংশ (৬০৪ জন)। তাদের বয়স ২১ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে।

জানা গেছে, এই সময়ে দেশে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বিশেষত পুরুষ যৌনকর্মীর সংখ্যা বেড়েছে। ২০২০ সালে যেখানে এই জনগোষ্ঠীর অনুমিত সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১২ হাজার; ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৭ হাজারে। এই তথ্য দেশের ২৬ জেলা থেকে প্রাপ্ত। বাকি জেলাগুলো কর্মসূচির বাইরে থাকায় সেখানকার তথ্য পাওয়া যায়নি। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে হিজড়ারা। তাদের সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার ৬২৯ জন, যদিও চিকিৎসা ও নজরদারির আওতায় রয়েছে ৬ হাজার ৯৫৫ জন বা ৫৫ শতাংশ। শিরায় মাদকসেবীর সংখ্যা ৩৪ হাজার ৩৭০ জন, এর মধ্যে চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন ২৯ হাজার ৮৯৭ জন, যা আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর ৮৭ শতাংশ। এ ছাড়া নারী যৌনকর্মী রয়েছেন ১ লাখ ১৩ হাজার ২২৪ জন, তবে চিকিৎসার আওতায় আছেন মাত্র ২৩ শতাংশ বা ২৫ হাজার ৫৭৩ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর বলেন, বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা থেকে আমরা পিছিয়ে আছি। আমাদের লোকবল এবং লজিস্টিকসের ঘাটতি রয়েছে, এনজিওদের সাপোর্টও কমে আসছে। এমনকি এই ডিসেম্বরের পর থেকে গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নও কমবে। ফলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি: বাংলাদেশের তুলনায় মিয়ানমারে এইচআইভির সংক্রমণ বেশি। বাংলাদেশে যেখানে সংক্রমণের হার ০.০১ শতাংশের নিচে, সেখানে মিয়ানমারে তা ০.৮ শতাংশ। বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী অনেক রোগী আগেই সে দেশে শনাক্ত হয়েছিল। তবে বাংলাদেশে আসার পর নিজেদের চিকিৎসাসেবায় অন্তর্ভুক্ত করে। চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ১ হাজার ৩৪২ জন রোহিঙ্গার এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে, যাদের মধ্যে ৯৪২ জন চিকিৎসার আওতায় রয়েছেন।

দ্য গ্লোবাল ফান্ডের বিশেষ অর্থায়নে গত জানুয়ারি থেকে রোহিঙ্গাদের ৩৪টি ক্যাম্পে সরকারি/বেসরকারি সংস্থার হাসপাতালে এইচআইভি শনাক্ত কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।

কারাগারেও এইচআইভি: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, ২০২২ সাল থেকে দেশের ১২টি কেন্দ্রীয়/জেলা কারাগার হাসপাতালে বন্দিদের মধ্যে এইচআইভি, সিফিলিস ও হেপাটাইটিস-সি পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবাও প্রদান করা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১২টি কারাগারে ৮ হাজার ৯৫১ জনের এইচআইভি পরীক্ষা করে ১৩ জন শনাক্ত হয় এবং এন্টি রেট্রোভাইরাল ড্রাগে অন্তুর্ভুক্ত করা হয়।


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর আরও খবর

টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন

img

আইআরজিসির হয়ে বিলিয়ন ডলারের শ্যাডো ব্যাংকিং চালাচ্ছে দুই ব্রিটিশ কোম্পানি

প্রকাশিত :  ০৯:৪৯, ০৮ মার্চ ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১০:০২, ০৮ মার্চ ২০২৬

ব্রিটেনের দুটি কোম্পানি ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) বৈশ্বিক ‘শ্যাডো ব্যাংকিং’ বা সমান্তরাল ব্যাংকিং কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

অভিযোগ উঠেছে, লন্ডনে নিবন্ধিত এই কোম্পানি দুটি মূলত একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জের ফ্রন্ট কোম্পানি হিসেবে কাজ করছে, যারা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট প্রায় ১০০ কোটি ডলারের লেনদেন সম্পন্ন করেছে।

তদন্তে দেখা গেছে, ‘জেডসেক্স এক্সচেঞ্জ লিমিটেড’ (Zedcex Exchange Ltd) এবং ‘জেডক্সিওন এক্সচেঞ্জ লিমিটেড’ (Zedxion Exchange Ltd) নামের এই প্রতিষ্ঠান দুটি লন্ডনের কভেন্ট গার্ডেন এলাকার একটি বিলাসবহুল ভবনের ঠিকানা ব্যবহার করে নিবন্ধিত। নথিপত্রে এদের ব্যবসা ‘আর্থিক ব্যবস্থাপনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে সেখানে কোনো ভৌত অস্তিত্ব নেই। 

মার্কিন অর্থ দপ্তরের বিদেশি সম্পদ নিয়ন্ত্রণকারী অফিস (OFAC) চলতি বছরের শুরুতেই কোম্পানি দুটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে জানিয়েছে, জেডসেক্স ৯ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন করেছে, যার বড় অংশই আইআরজিসি-র সঙ্গে সম্পৃক্ত।

এই কোম্পানি দুটি ইরানি ধনকুবের বাবাক জানজানির সঙ্গে যুক্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনে অর্থ সহায়তার দায়ে জানজানির ওপর আগেই ব্রিটিশ সরকারের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

ব্লকচেইন গোয়েন্দা সংস্থা টিআরএম ল্যাবস জানিয়েছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই প্রতিষ্ঠানগুলো আইআরজিসি নিয়ন্ত্রিত ওয়ালেট ও অফশোর মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে শত কোটি ডলারের লেনদেন সম্পন্ন করেছে। ওএফএসি-র মতে, কোম্পানিগুলো সরাসরি আইআরজিসি-কে আর্থিক, প্রযুক্তিগত ও বস্তুগত সহায়তা প্রদান করে আসছিল।

এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসার পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ওপর আইআরজিসি-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার চাপ বাড়ছে। যুক্তরাজ্যের শ্যাডো ন্যাশনাল সিকিউরিটি মিনিস্টার অ্যালিসিয়া কার্নস প্রধানমন্ত্রীকে অভিযুক্ত করে বলেছেন, ব্রিটিশ মাটি ও আইন ব্যবহার করে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক একটি সংগঠনকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। তিনি অবিলম্বে এই কোম্পানি দুটি এবং আইআরজিসি-র ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানিয়েছেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, সরকারের এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরোক্ষভাবে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নে সহায়তা করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৮ সালে সুইফট ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ইরান বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর থেকেই দেশটি ‘হাওলা’ পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে সমান্তরাল ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা বিশ্বজুড়ে তাদের সশস্ত্র প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন নিশ্চিত করছে।

যদিও কোম্পানি দুটির নিবন্ধিত ঠিকানার সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘বিএসকিউ গ্রুপ’ জানিয়েছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জানার পর তারা কোম্পানি দুটির সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছে এবং তাদের কালো তালিকাভুক্ত করেছে। তবে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর এই মুহূর্তে নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর আরও খবর