img

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক দিগন্ত, নাকি অনিশ্চিত গন্তব্য?

প্রকাশিত :  ০৪:৪৭, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৫:০২, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক দিগন্ত, নাকি অনিশ্চিত গন্তব্য?

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কেবল একটি সাধারণ নির্বাচনের তারিখ হিসেবে নয়, বরং একটি নতুন প্রজাতন্ত্রের ভ্রূণ হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার যে মহাবিপ্লব দেড় দশকের জগদ্দল পাথরকে সরিয়ে দিয়েছিল, সেই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চূড়ান্ত পরীক্ষা এই নির্বাচন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছেন যে নির্বাচন নির্ধারিত দিনেই হবে; আর এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশ এখন এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘকাল ভোটাধিকার বঞ্চিত ১২ কোটি ৭৭ লাখ মানুষের সামনে এটি কেবল সংসদ নির্বাচন নয়, বরং গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের প্রশ্নও জড়িত।

জুলাই বিপ্লবের উত্তরাধিকার ও নির্বাচনের প্রেক্ষাপট

এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সেই রক্তরঞ্জিত দিনগুলোর দিকে। ছাত্র-জনতার যে অভ্যুত্থান শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছিল, সেই আন্দোলনের মূল সুর ছিল 'রাষ্ট্র সংস্কার'। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই দাবি উঠেছিল যে পুরনো ঘুণে ধরা ব্যবস্থার ভেতরে নির্বাচন দিলে তা পুনরায় ফ্যাসিবাদের পথ প্রশস্ত করতে পারে। ড. ইউনূসের সরকার তাই একটি 'জুলাই সনদ' বা রাষ্ট্র সংস্কারের রোডম্যাপ তৈরি করেছে, যা এই নির্বাচনের সাথেই ভোটারদের অনুমোদনের জন্য পেশ করা হচ্ছে। এই সনদে এমন কিছু মৌলিক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, যা বাংলাদেশের গত পঞ্চাশ বছরের সংসদীয় সংস্কৃতিতে অনুপস্থিত ছিল—যেমন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মেয়াদ সীমাবদ্ধ করা এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন।

নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫-এ এএমএম নাসির উদ্দীন যখন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন, তখন থেকেই দেশ নতুন উত্তেজনার আবর্তে প্রবেশ করে। এটি কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়, কারণ দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এই প্রক্রিয়ার বাইরে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনী মাঠের সমীকরণ এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে এবারের নির্বাচন মূলত একটি দ্বিমুখী লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে: একদিকে দীর্ঘদিনের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও নতুন প্রজন্মের ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’র (এনসিপি) অভাবনীয় জোট।

বিএনপির রূপান্তর ও তারেক রহমানের নেতৃত্ব

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই নির্বাচনকে তাদের সতেরো বছরের রাজনৈতিক সংগ্রামের চূড়ান্ত ফসল হিসেবে দেখছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২২ জানুয়ারি ২০২৬-এ সিলেটের মাটি থেকে যখন নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন, তখন তা তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের এক বিশাল মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরে তিনি যেভাবে জনমনে সাড়া ফেলেছেন, তা নির্দেশ করে যে বিএনপির জনপ্রিয়তা এখনো আকাশচুম্বী। তবে এবারের বিএনপি পুরনো ধাঁচের নয়; তারেক রহমান সচেতনভাবে দলকে একটি উদারপন্থী ও আধুনিক গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।

বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফার রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচি এবং ‘ভিশন-২০৩০’-এর মূল ভিত্তি হলো জনগণের সার্বভৌমত্ব। দলটির পক্ষ থেকে ‘গিভ অ্যাডভাইস টু তারেক রহমান’ বা ‘ম্যাচ মাই পলিসি’-র মতো আধুনিক ডিজিটাল প্রচারণা চালানো হচ্ছে, যার লক্ষ্য তরুণ ভোটারদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপি এবার কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়, বরং আওয়ামী লীগের ফেলে যাওয়া ‘উদারপন্থী ও সেকুলার’ রাজনীতির শূন্যস্থান পূরণ করতে চাইছে। তবে বিএনপির অভ্যন্তরে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ এবং চাঁদাবাজির যে অভিযোগ উঠছে, তা দলের ভাবমূর্তি কিছুটা ম্লান করছে। বিশেষ করে ৯২ জন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় মাঠপর্যায়ে অন্তর্কোন্দল ও সহিংসতার আশঙ্কা বেড়ে গেছে।

জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান ও এনসিপির তরুণ শক্তি

এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অভাবনীয় জনসমর্থন। একসময় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে কোণঠাসা হয়ে পড়া এই দলটি এখন নিজেদেরকে দুর্নীতিমুক্ত ও সুশৃঙ্খল বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করছে। আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)-এর জরিপ অনুযায়ী জামায়াত বর্তমানে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান অত্যন্ত কৌশলে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেছেন এবং তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি বা এনসিপির সাথে নির্বাচনী জোট গঠন করেছেন।

এই জোটের মূল শক্তি হলো ২০২৪ সালের আন্দোলনের মাঠ কাঁপানো ছাত্রনেতারা। নাহিদ ইসলাম বা সারজিস আলমের মতো তরুণরা যখন এনসিপির ব্যানারে জামায়াতের সাথে হাত মেলান, তখন তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করে। যদিও এই জোট নিয়ে নাগরিক সমাজের একাংশের মধ্যে সংশয় রয়েছে, বিশেষ করে জামায়াতের অতীত ভূমিকা নিয়ে। তবুও তরুণ ভোটাররা, যারা আওয়ামী লীগের শাসন ছাড়া অন্য কিছু দেখেনি, তারা এখন এই নতুন জোটের ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ বা দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের ডাককে গুরুত্বের সাথে দেখছে। জামায়াত এবার ২২৪টি আসনে প্রার্থী দিয়ে তাদের সাংগঠনিক সামর্থ্যের প্রমাণ দিচ্ছে এবং প্রবাসী ভোটের দিকেও বিশেষ নজর দিয়েছে।

জুলাই সনদ ও গণভোট: রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য

নির্বাচনের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটারদের হাতে দুটি ব্যালট পেপার থাকবে—একটি সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য, অন্যটি সাংবিধানিক গণভোটের জন্য। এই গণভোট মূলত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি তৈরি করবে। ড. ইউনূসের সরকার বিশ্বাস করে যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আমূল পরিবর্তন না করে কেবল নির্বাচন দিলে তা পুনরায় স্বৈরাচারের জন্ম দিতে পারে। জুলাই সনদের প্রধান প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি উচ্চকক্ষ গঠন, যেখানে বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকবে।

এই গণভোটের প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের লড়াই এখন রাজপথেও দৃশ্যমান। এনসিপি ও জামায়াত জোট ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জোরালো প্রচার চালাচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপি নীতিগতভাবে এই সংস্কারের সাথে একমত হলেও উচ্চকক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছে। তবে সামগ্রিকভাবে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ রক্ষায় বিএনপি এই প্রক্রিয়ার সাথে নিজেকে যুক্ত রেখেছে। বিশ্লেষকদের মতে, গণভোটের ফলাফল যদি ‘না’ হয়, তবে পরবর্তী সরকার এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না, যা বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।

অর্থনীতির সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির কষাঘাত

নির্বাচনী উত্তাপের আড়ালে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো অর্থনীতি। ২০২৫ সালের শেষভাগে মুদ্রাস্ফীতি ৮.৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে। চাল, ডাল, পেঁয়াজ ও তেলের ঊর্ধ্বমূল্য নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জানুয়ারি মাসে মুদ্রাস্ফীতি সামান্য কমার দাবি করেছে, তবুও বাজারের বাস্তবতা এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, বৈদেশিক ঋণের বোঝা এবং অবকাঠামো প্রকল্পের উচ্চ ব্যয় অর্থনীতিকে চাপের মুখে রেখেছে। নতুন যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বিজয়ী দলের প্রতি জনগণের মোহভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগবে না।

নির্বাচনী সহিংসতা ও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ

তফসিল ঘোষণার পর থেকেই দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। গত কয়েক সপ্তাহে অন্তত ১৬ জন রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে কেরানীগঞ্জ ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। দেশের অর্ধেকের বেশি ভোটকেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং নিরাপত্তা বজায় রাখতে নয় লাখ সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই সহিংসতার পেছনে লুণ্ঠিত অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার এবং পরাজিত শক্তির উস্কানিকেও দায়ী করা হচ্ছে।

ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক শক্তির ভূমিকা

বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দিল্লি, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে নতুন এক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ পনেরো বছর আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ সমর্থক থাকার পর ভারত এখন বাংলাদেশে তার প্রভাব পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট। বিএনপি ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত দিলেও দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর উত্থান নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।

অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই নির্বাচনকে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি ‘লিটমাস টেস্ট’ হিসেবে দেখছে। ওয়াশিংটন চাচ্ছে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন। তবে জামায়াতের ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার সম্ভাবনা মার্কিন প্রশাসনের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তরুণ ও নারী ভোটার: গেম চেঞ্জার কারা?

২০২৬ সালের নির্বাচনে মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ শতাংশই তরুণ প্রজন্ম (জেনারেশন জেড)। এই বিশাল ভোটার গোষ্ঠী কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাসী নয়। তারা চায় কর্মসংস্থান, বাকস্বাধীনতা ও আধুনিক জীবনযাত্রা। তবে নারীর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে দলগুলো এখনো পিছিয়ে। বিএনপি বা জামায়াত—কেউই কাঙ্ক্ষিত সংখ্যায় নারী প্রার্থী দিতে পারেনি, যা আধুনিক নারী ভোটারদের মধ্যে প্রশ্ন তুলেছে। অথচ ভোটারদের অর্ধেকই নারী।

একটি নতুন ভোরের প্রতীক্ষা

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ কেবল একটি ভোটের উৎসব নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্ধারণের ক্ষণ। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর স্থিতিশীলতা। তবে কেবল নির্বাচনের ফলাফলই শেষ কথা নয়। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিজয়ী ও বিজিত শক্তির মধ্যে সহাবস্থানের পরিবেশ বজায় রাখা না গেলে বাংলাদেশ পুনরায় সংঘাতের আবর্তে হারিয়ে যেতে পারে। ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট বাক্সে সেই স্বপ্নেরই প্রতিফলন ঘটুক, যেখানে আর কোনো স্বৈরাচারের পদধ্বনি শোনা যাবে না।

img

শিক্ষকেরও কি আনন্দ করার অধিকার নেই?

প্রকাশিত :  ১৩:৫৮, ২৬ জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৪:১০, ২৬ জুলাই ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা আমাদের সমাজ সম্পর্কে বেশ কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। প্রশ্নটি খুব সরল: একজন শিক্ষক কি শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি একজন মানুষও থাকতে পারবেন?

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পালের একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়েছিল। ভিডিওতে তাঁকে হালকা বাতাসে আঁচল উড়িয়ে, বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’–এর সঙ্গে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটতে দেখা যায়। কয়েক সেকেন্ডের সেই ভিডিওই হয়ে ওঠে সমালোচনা, কটাক্ষ ও সামাজিক বিচারের বিষয়।

কিন্তু সেই সমালোচনার প্রতিক্রিয়ায় যা ঘটেছে, তা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। গত দুই দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা একই গান ব্যবহার করে রিলস তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। কেউ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে, কেউ কর্মস্থলে, কেউ ব্যক্তিগত পরিবেশে ভিডিও করেছেন। তাঁদের বক্তব্য একটাই—একজন শিক্ষক বা একজন নারীকে তাঁর ব্যক্তিগত আনন্দ, পোশাক, হাসি, গান কিংবা স্বাভাবিক অভিব্যক্তির জন্য হেনস্তা করা হলে তার প্রতিবাদ হওয়া দরকার।

একটি রোমান্টিক গান এভাবে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠবে—সম্ভবত গানটির গীতিকার ও সুরকার আশরাফ বাবুও ১৯৮৭ সালের এক শ্রাবণে খুলনায় বসে গানটি লেখার সময় তা ভাবেননি। কিন্তু সময় কখনো কখনো শিল্পকে নতুন অর্থ দেয়। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি এই শ্রাবণে হয়ে উঠেছে সামাজিক বিচারপ্রবণতার বিরুদ্ধে এক ধরনের সম্মিলিত প্রতিবাদের প্রতীক।

শিক্ষিকা সামিয়া শিকদার লিখেছেন, ‘বিউটি রানী পাল ম্যাডামকে হেনস্তার চেষ্টা সফল হয়নি। আজ প্রতিটি সাহসী শিক্ষকই একেকজন বিউটি রানী পাল। আমরা মাথা নত করব না, সম্মান নিয়ে এগিয়ে যাব।’

কুমিল্লার শিক্ষিকা লায়লা নূর পিংকি লিখেছেন, ‘আজ কেনো মন উদাসী হয়ে’ গানের ভিডিও নিয়ে কটাক্ষের প্রসঙ্গ টেনে, শিক্ষকদের এই প্রতিবাদের ফলে মানুষ অন্তত কিছু সময়ের জন্য অন্য কিছু নিয়ে কথা বলছে। তাঁর ভাষায়, ডিজিটাল এই প্রতিবাদ দেখিয়ে দিয়েছে, অন্যায় হলে শিক্ষকেরাও ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানাতে পারেন।

পঞ্চগড়ের শিক্ষিকা ফেরদৌস লিখেছেন, ‘এরপর শাড়ি পরেই দিব শিক্ষকের সেই ভাইরাল নাচ!’ আর চট্টগ্রামের মতলব বাজারের শিক্ষিকা জয়ন্তী ভৌমিকের প্রশ্নটি আরও সরাসরি: ‘শিক্ষক যদি হাসেন, সমস্যা! সাজেন, সমস্যা! পরিপাটি থাকেন, সমস্যা! ভ্রমণে যান, সমস্যা! ছবি পোস্ট করেন, সমস্যা! তাহলে কি শিক্ষক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হওয়ার অধিকারটাও জমা দিতে হবে?’

এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজেদেরই খুঁজে নিতে হবে।

একজন শিক্ষক অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর কাছ থেকে দায়িত্বশীলতা, শালীনতা, পেশাগত সততা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত। কোনো শিক্ষক আইন ভঙ্গ করলে, শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করলে, প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা লঙ্ঘন করলে বা দায়িত্বে অবহেলা করলে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। শিক্ষকও আইনের ঊর্ধ্বে নন।

কিন্তু একটি ব্যক্তিগত ভিডিওতে কাউকে গান করতে, হাঁটতে, হাসতে বা আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা গেলেই তাঁর চরিত্র, সততা কিংবা পেশাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কি ন্যায়সংগত?

এখানেই মূল সমস্যাটি।

আমরা শিক্ষকদের কাছ থেকে এমন এক ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করি, যা অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছেও প্রত্যাশা করি না। শিক্ষক যেন সব সময় গম্ভীর থাকবেন, সব সময় সংযত থাকবেন, ব্যক্তিগত আনন্দ প্রকাশ করবেন না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করবেন না—এমন একটি অলিখিত সামাজিক বিধি যেন তৈরি হয়ে গেছে।

কিন্তু শিক্ষক কি কেবল শ্রেণিকক্ষের মানুষ?

বিদ্যালয়ের দরজা দিয়ে ঢোকার পর তিনি শিক্ষক—এটি সত্য। কিন্তু বিদ্যালয়ের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসার পর তিনি কি মানুষ নন?

একজন শিক্ষকেরও পরিবার আছে, বন্ধুত্ব আছে, পছন্দ-অপছন্দ আছে, সংস্কৃতিচর্চা আছে, আনন্দ আছে, ক্লান্তি আছে। তিনি গান শুনতে পারেন, ভ্রমণে যেতে পারেন, ছবি তুলতে পারেন, সাজতে পারেন, হাসতে পারেন। এসবের কোনোটিই তাঁকে কম দায়িত্বশীল শিক্ষক বানায় না।

বরং বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে শেখাতে হলে শুধু পাঠ্যবইয়ের তথ্য জানলেই হয় না। গান, অভিনয়, গল্প, আবৃত্তি, নৃত্য ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড শিশুর কল্পনাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক বোধ গড়ে তোলে।

আমরা যখন একজন শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গান গাইতে বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দেখি, তখন সেটিকে শিক্ষার অংশ হিসেবে স্বাগত জানাই। কিন্তু একই শিক্ষক বিদ্যালয়ের বাইরে নিজের ব্যক্তিগত পরিসরে একটি গান বা নাচের ভিডিও প্রকাশ করলে তাঁর চরিত্র বা পেশাগত মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করি।

এই দ্বৈত মানসিকতা কেন?

একজন শিক্ষক যদি সংস্কৃতির মূল্য বোঝেন, সৃজনশীলতার চর্চা করেন এবং জীবনে আনন্দের জায়গা রাখেন, তাহলে তিনি শিক্ষার্থীদেরও আরও মানবিক, আত্মবিশ্বাসী ও মুক্তচিন্তার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন। একজন আনন্দহীন মানুষই যে ভালো শিক্ষক হবেন—এমন কোনো প্রমাণ নেই।

এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সামাজিক বিচার অনেক সময় আরও কঠোর হয়ে ওঠে।

একজন পুরুষ শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান করলে বা আনন্দের ভিডিও প্রকাশ করলে সেটিকে অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে দেখা হয়। কিন্তু একজন নারী শিক্ষক একই কাজ করলে তাঁর পোশাক, চুল, হাঁটা, হাসি কিংবা শরীরী ভাষা নিয়ে শুরু হয় নৈতিকতার আলোচনা।

নারীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সমাজের এই অতিরিক্ত আগ্রহ নতুন নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু সেই প্রবণতাকে আরও দ্রুত, আরও প্রকাশ্য এবং আরও নিষ্ঠুর করে তুলেছে।

একটি ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর শুরু হয় মন্তব্য, কটাক্ষ, চরিত্রহনন, এমনকি চাকরি হারানোর দাবি। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি পোস্ট কখনোই পুরো সমাজের মতামতকে প্রতিনিধিত্ব করে না।

কোনো সংবাদে যদি বলা হয়, ‘অভিভাবকদের ক্ষোভ’, ‘জনগণের দাবি’ বা ‘সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ’, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—সত্যিই কি সংশ্লিষ্ট অভিভাবকেরা অভিযোগ করেছেন? লিখিত কোনো অভিযোগ আছে কি? অভিযোগের প্রকৃতি কী? নাকি কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট ধীরে ধীরে ‘জনমত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে?

সমালোচনার অধিকার সবার আছে। কেউ মনে করতেই পারেন, কোনো নির্দিষ্ট আচরণ একজন শিক্ষকের পেশাগত ভূমিকার সঙ্গে মানানসই নয়। সেই মত প্রকাশের অধিকারও তাঁর আছে। কিন্তু মতের সঙ্গে ব্যক্তিগত অপমান, চরিত্রহনন বা ধর্মীয় বিদ্বেষ যুক্ত হলে তা আর সুস্থ সমালোচনা থাকে না।

বিউটি রাণী পাল হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন নারী। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে কোনো বৈষম্য বা বিদ্বেষ হয়েছে কি না, সেটি প্রমাণ ও তদন্তের বিষয়। প্রমাণ ছাড়া কাউকে ধর্মীয় বিদ্বেষের জন্য অভিযুক্ত করা যেমন অনুচিত, তেমনি কারও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তিনি সামাজিক বা পেশাগত চাপের মুখে পড়ছেন কি না, সেটিও উপেক্ষা করা যায় না।

একই সঙ্গে প্রতিবাদের ভাষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যারা একজন নারী শিক্ষককে অপমান করেছেন, তাঁদের সমালোচনা করতে গিয়ে যদি পাল্টা কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠীকে একইভাবে অপমান করা হয়, তাহলে সমস্যার সমাধান হয় না। এক ধরনের অসহিষ্ণুতার জবাব আরেক ধরনের অসহিষ্ণুতা দিয়ে দেওয়া যায় না।

প্রতিবাদ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রতিবাদ যেন আরেকটি নিপীড়নের ভাষা না হয়ে ওঠে।

‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানে শিক্ষিকাদের এই সম্মিলিত ভিডিও প্রকাশের ঘটনা তাই শুধু একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রবণতা নয়। এর মধ্যে এক ধরনের সামাজিক বার্তাও আছে। একজনকে হেনস্তা করার চেষ্টা যখন হাজারো মানুষকে একই প্রতীকের অধীনে দাঁড় করিয়ে দেয়, তখন সেটি নিছক বিনোদন থাকে না; তা প্রতিবাদের রূপ নেয়।

তবে এই প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এখানেই যে, বহু শিক্ষক ও শিক্ষিকা নিজেদের স্বাভাবিক প্রকাশের জায়গাটি নতুন করে দাবি করেছেন।

লায়লা নূর পিংকির কথায়, ‘যেসব শিক্ষকেরা কোনো দিন লজ্জায় ভিডিও দিতেন না, তাদের প্রতিভাও বিকশিত করে দিলেন।’ কথাটির মধ্যে রসিকতা আছে, কিন্তু সামাজিক বাস্তবতাও আছে। আমরা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছি, যেখানে অনেক মানুষ স্বাভাবিকভাবে আনন্দ প্রকাশ করার আগেও ভাবেন—কেউ কি তাঁকে বিচার করবে?

এটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়।

একজন শিক্ষককে তাঁর পেশাগত কাজের জন্য মূল্যায়ন করা উচিত। তিনি শ্রেণিকক্ষে কেমন পড়ান, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন, দায়িত্ব কতটা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন, বিদ্যালয়ে তাঁর অবদান কী—এসব হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড।

একটি ভিডিও দিয়ে একজন মানুষের সমগ্র পরিচয় নির্ধারণ করা ন্যায়সংগত নয়।

আরও বড় কথা, শিক্ষকদের ব্যক্তিগত মুহূর্তকে সামাজিক নজরদারির বস্তুতে পরিণত করা হলে শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে পড়ে যায়। শিক্ষক সংকট, শিক্ষার মান, অবকাঠামোর ঘাটতি, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, নিরাপদ শিক্ষাপরিবেশ ও মানসিক স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা করার বদলে আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি—কে কী পোশাক পরলেন, কীভাবে হাঁটলেন, কোন গানের সঙ্গে ভিডিও করলেন।

এটি কেবল একজন শিক্ষক বা একটি ভিডিওর সমস্যা নয়। এটি আমাদের সামাজিক অগ্রাধিকারেরও প্রশ্ন।

আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের বাইরে নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রকাশ করতে ভয় পাবেন?

আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে নারীর হাসি, পোশাক, চুল, সাজসজ্জা কিংবা আনন্দের মুহূর্তও জনসমক্ষে নৈতিক বিচারের বিষয় হয়ে উঠবে?

যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।

একজন শিক্ষককে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে। কিন্তু দায়িত্বশীলতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা পরস্পরের বিরোধী নয়। পেশাগত দায়িত্বের জন্য একজন শিক্ষককে জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের জন্য তাঁকে সমাজের অনুমতি নিতে হবে—এমন কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারণা থাকতে পারে না।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন সবার আছে, তেমনি অন্যের মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্বও সবার।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই ভারসাম্য: স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু দায়িত্বও থাকবে; সমালোচনা থাকবে, কিন্তু অপমান নয়; মতভেদ থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ নয়।

বিউটি রাণী পালকে ঘিরে বিতর্কের শেষ কথা তাই কোনো পক্ষের জয় বা পরাজয় নয়। মূল প্রশ্নটি আরও বড়।

একজন শিক্ষক কি শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি একজন মানুষও থাকতে পারবেন?

উত্তরটি হওয়া উচিত—অবশ্যই।

শিক্ষকেরও হাসার অধিকার আছে। আনন্দ করার অধিকার আছে। গান শোনার অধিকার আছে। সংস্কৃতিচর্চার অধিকার আছে। নিজের ব্যক্তিগত পরিসরে বাঁচার অধিকার আছে।

একজন শিক্ষককে তাঁর কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও দিয়ে নয়, তাঁর দীর্ঘদিনের কাজ দিয়ে মূল্যায়ন করা হোক।

একজন নারীকে তাঁর পোশাক, হাসি, চুল বা আনন্দের মুহূর্তের জন্য সামাজিক বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আগে আমরা অন্তত একবার নিজেদের দিকে তাকাই।

কারণ শিক্ষকরা রোবট নন।

নারীরাও নন।

তাঁরা মানুষ।

আর একটি মানবিক সমাজের প্রথম শর্তই হলো—মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা।


মতামত এর আরও খবর