img

পুঁজিবাজারে বড় চমক কি সময়ের ব্যাপার মাত্র?

প্রকাশিত :  ১৬:৫২, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

পুঁজিবাজারে বড় চমক কি সময়ের ব্যাপার মাত্র?

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের এই সময়টি বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধের মেঘ কাটিয়ে বিশ্ব আজ এক নতুন স্থিতিশীলতার সুপ্রভাতের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার পারদ নিম্নমুখী হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যের উল্লেখযোগ্য পতন বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এক বিশেষ স্বস্তির বার্তা বয়ে এনেছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করতে একের পর এক তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজের আগমন এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহের শক্তিশালী অবস্থান আগামী রবিবারের পুঁজিবাজারে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বিশ্লেষণটি মূলত বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও দেশীয় সামষ্টিক অর্থনীতির নিরিখে আমাদের পুঁজিবাজারের সম্ভাব্য গতিপথকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিবর্তন ও তেলের মূল্যপ্রবণতা

বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত জ্বালানি তেলের বাজার গত কয়েক মাস ধরে যে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে এসে তা নাটকীয়ভাবে স্তিমিত হতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) দামে এখন নিম্নমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। সাম্প্রতিক লেনদেনগুলোতে দেখা গেছে, ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৯৭.৯৯ ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের সেশনের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ কম। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি ৯৫ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমার নিচেও অবস্থান করছে। জেপি মরগানের মতো বিশ্বখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বাভাস দিচ্ছে যে, ২০২৬ সাল জুড়ে তেলের গড় মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৬০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি চমৎকার সংকেত।

এই দরপতনের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত দুই সপ্তাহের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য একটি \'গেম চেঞ্জার\' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালী—যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী—পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন তেলের বাজারদর থেকে \'যুদ্ধ ঝুঁকি প্রিমিয়াম\' বা \'ওয়ার প্রিমিয়াম\' সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন, যার ফলশ্রুতিতে দামের এই স্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা: সংকট থেকে সম্ভাবনার দ্বারে

বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে আসার এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থাপনায়ও এক অভাবনীয় গতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতের দুশ্চিন্তা লাঘব করে একের পর এক জ্বালানি তেল ও এলএনজিবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর এবং মহেশখালী টার্মিনালে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এটি শুধুমাত্র কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং সরকারের সুপরিকল্পিত আমদানি কৌশলেরই অংশ।

৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মালয়েশিয়া থেকে আসা দুটি বৃহৎ মাদার ট্যাংকার \'সেন্ট্রাল স্টার\' এবং \'ইস্টার্ন কুইন্স\' চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছে। তারা মোট ৫১,০০০ মেট্রিক টন জ্বালানি (২৫,০০০ টন ফার্নেস অয়েল ও ২৬,০০০ টন অকটেন) বহন করে এনেছে। এছাড়া সিঙ্গাপুর থেকে আসা আরেকটি জাহাজ ২৭,০০০ টন ডিজেল খালাস করেছে। তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। ১৫ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়া থেকে ৬৪,৬৭৮ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে \'মারান গ্যাস হাইড্রা\' মহেশখালীতে পৌঁছেছে এবং ১৮ এপ্রিল অ্যাঙ্গোলা থেকে আরও ৬৯,০১৫ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে \'লোবিটো\' আসার কথা রয়েছে। মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৩টি জ্বালানিবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছেছে, যা দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য এক বিরাট স্বস্তি।

সামষ্টিক অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলো ২০২৬ সালের শুরুতেই ক্রমান্বয়ে উন্নতির শিখরে আরোহণ করছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা অর্থনীতির অন্তর্নিহিত শক্তিরই পরিচায়ক। ৭ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.৩৫ বিলিয়ন ডলারে। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (এসিইউ) ও অন্যান্য বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের পরেও রিজার্ভের এই অবস্থান অত্যন্ত সন্তোষজনক।

রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রেও চলতি বছর নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। মার্চ মাসে প্রবাসীরা রেকর্ড ৩.৭৭৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, যা একক মাস হিসেবে এ যাবতকালের সর্বোচ্চ। এপ্রিলের প্রথমার্ধেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ১ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে ১,৭৮৮ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২১.৫ শতাংশ বেশি। এই শক্তিশালী রিজার্ভ ও রেকর্ড রেমিট্যান্সের ফলে ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে ৩.৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। একইসাথে খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি (যা সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ১৪.২৪ শতাংশ) নাটকীয়ভাবে কমে ফেব্রুয়ারিতে ২.৩৯ শতাংশে নেমে আসায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বাজার স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

পুঁজিবাজারের গতিপ্রকৃতি ও রবিবারের পূর্বাভাস

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বিগত কয়েক সপ্তাহের সংশোধন প্রক্রিয়ার পর এখন একটি শক্তিশালী ঘুরে দাঁড়ানোর (রিবাউন্ড) উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ডিএসই সূচক ৫,৬০০ পয়েন্টের ঘর স্পর্শ করার পর মুনাফা শিকারিদের চাপে কিছুটা কমলেও গড় দৈনিক লেনদেন ১,০০০ কোটি টাকার ওপরে থাকা নির্দেশ করে যে বাজারে পর্যাপ্ত তারল্য ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ রয়েছে।

আগামী রবিবার পুঁজিবাজার ইতিবাচক থাকার পেছনে তিনটি প্রধান প্রভাবক কাজ করবে বলে আমি মনে করি:

প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় তালিকাভুক্ত উৎপাদনশীল ও বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় কমে আসবে, যা সরাসরি তাদের কর্পোরেট মুনাফায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে সিমেন্ট, সিরামিক ও ওষুধ খাতের কোম্পানিগুলো এই জ্বালানি স্বস্তির বড় সুবিধাভোগী হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বিশ্বজুড়ে শান্তি আলোচনার অগ্রগতি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে \'রিস্ক-অন\' মেজাজ ফিরিয়ে এনেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারগুলোতে ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তৃতীয়ত, দেশের শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি বিনিয়োগকারীদের মনে এই বিশ্বাস জন্মাবে যে দেশের অর্থনীতি বড় কোনো ঝুঁকির মুখে নেই।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এপ্রিলের এই সময়টি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বিশেষ মাহেন্দ্রক্ষণ। একদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বস্তি, অন্যদিকে দেশীয় শক্তিশালী অর্থনৈতিক সূচক—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার জন্য প্রস্তুত। বিনিয়োগকারীদের ভয় কাটিয়ে যৌক্তিক ও তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাজারে অংশ নেওয়ার এখনই সময়। আশা করা যায়, আগামী রবিবারের লেনদেন বিনিয়োগকারীদের জন্য এক নতুন আশার আলো বয়ে আনবে এবং দেশের পুঁজিবাজার তার ইতিবাচক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে।

img

আবদুল হাই শিকদারের বই ও আমার বই

প্রকাশিত :  ১০:২৫, ১৮ জুলাই ২০২৬

আবদুল হামিদ মাহবুব

আমরা যারা লেখক, গবেষক কিংবা বইসংগ্রাহক, তাদের কাছে বই শুধু কাগজের মলাট নয়। বই আমাদের জীবনের অংশ। অনেক সময় মনে হয়, বই নাড়াচাড়া না করলে যেন বেঁচে থাকাই অসম্পূর্ণ। জানি, কেনা সব বই পড়া হবে না। তবু বই কিনি। প্রয়োজন নেই, তবু কিনি। গাঁটের টাকা খরচ করেও কিনি। বইয়ের দোকানে ঢুকলেই হাত বাড়িয়ে দিই। এ এক অদ্ভুত নেশা। একসময় সংগ্রহ শত ছাড়ায়। কারও হাজার। কারও হাজার হাজার।

তেমনই একজন কবি আবদুল হাই শিকদার। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে রয়েছে প্রায় ১০ হাজার বই। আনন্দের খবর, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন তাঁর এই সংগ্রহ সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নামে একটি বিশেষ কর্নার হবে। বইগুলো তালিকাভুক্ত হবে। ধীরে ধীরে ডিজিটাল আর্কাইভও তৈরি হবে। এই উদ্যোগ সত্যিই আশাব্যঞ্জক। এমন দৃষ্টান্ত আরও তৈরি হোক। আবদুল হাই শিকদার স্বনামধন্য মানুষ। রাজধানীতে থাকেন। তাই তাঁর সংগ্রহের একটি সুন্দর গন্তব্য তৈরি হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মতো মফস্বলের মানুষদের কথা কে ভাববে?

আমার নিজের কথাই বলি। বাসা বদল করেছি কয়েকবার। কয়েক দফা বন্যায় ঘরে পানি উঠেছে। সেই পানিতে কয়েক হাজার বই নষ্ট হয়েছে। তবুও এখনো আমার সংগ্রহে তিন থেকে চার হাজার বই আছে। কিছু বই রিডিং রুমে যত্ন করে সাজানো। অনেকগুলো আবার গাড়ির গ্যারেজে স্তূপ হয়ে পড়ে আছে। জায়গার অভাব। সময়ের অভাব। তবু বইগুলো ছেড়ে দিতে মন চায় না। আমি জানি, আমার মৃত্যুর পর এই বইগুলোর খবর কেউ নাও নিতে পারে।

আমার স্ত্রী লেখালেখি করেন। তাঁরও কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সংসারের বাস্তবতায় মাঝে মাঝে তাকেও দেখি আমার এলোমেলো বইয়ের স্তূপে বিরক্ত হতে। তখন মনে হয়, আমার কাছে যে সম্পদ, অন্যের কাছে তা হয়তো শুধু জায়গা দখল করে থাকা কাগজ। আমার একমাত্র ছেলে বই ভালোবাসে। কিন্তু তার আগ্রহ পদার্থবিজ্ঞানে। এখন সে বিদেশে। ভবিষ্যতে সেখানেই হয়তো স্থায়ী হবে। আমার পুত্রবধূও পদার্থবিজ্ঞানের মানুষ। তবে শেষবার বাসা বদলের সময় সে যে আন্তরিকতার সঙ্গে বইগুলো গুছিয়ে দিয়েছিল, তা আজও মনে আছে। শ্বশুরের বইয়ের প্রতি তার সেই মমতা আমাকে স্পর্শ করেছিল। তবু বাস্তবতা তো বাস্তবতাই। তারা হয়তো আর দেশে ফিরবে না। তখন এই হাজার হাজার বইয়ের কী হবে? এই প্রশ্ন আমাকে প্রায়ই তাড়া করে। ভয় হয়, একদিন হয়তো কেজি দরে বিক্রি হয়ে যাবে। যেমন হারিয়ে গেছে অনেক মূল্যবান ব্যক্তিগত গ্রন্থসংগ্রহ। যেমন অবহেলায় নষ্ট হয়েছে অসংখ্য দুর্লভ বই।

স্থানীয় লাইব্রেরিতে দেওয়ার কথাও ভেবেছি। কিন্তু দীর্ঘদিন সেই লাইব্রেরির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে জানি, সেখানে বই সংরক্ষণের পরিবেশ খুব ভালো নয়। যে বইগুলো আছে, সেগুলোরও যথাযথ যত্ন হয় না। পাঠকও খুব কম। একসময় লাইব্রেরিটি প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। আমরা কয়েকজন উদ্যোগ নিয়ে আবার চালু করেছি। কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো সংশয় কাটে না। তাই চাই, আমার বইগুলো এমন কোথাও যাক, যেখানে পাঠক আছে। গবেষণা হয়। বইয়ের মূল্য বোঝে এমন মানুষ আছে। যেখানে আগামী প্রজন্ম বইগুলো হাতে তুলে নেবে।

আমার নিজের লেখা প্রায় চল্লিশটি বইও রয়েছে। সব কপিই আমার কাছে নেই। যেগুলো আছে, দেশের বিভিন্ন লাইব্রেরি নিতে চাইলে আমি নিজের খরচে পৌঁছে দিতে প্রস্তুত। অন্তত কিছু পাঠক বইগুলো হাতে নেবে। পড়ুক বা না পড়ুক, বইগুলো বেঁচে থাকুক। লেখালেখি করে কী অর্জন করেছি, জানি না। তবে এটুকু জানি, লেখালেখির বাইরে আর কিছু শিখিনি। বই আর লেখাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

তাই আবদুল হাই শিকদারের বই সংরক্ষণের উদ্যোগের খবর পড়ে নিজের কথাগুলো লিখতে ইচ্ছে হলো। যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়, কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কোনো দায়িত্বশীল গ্রন্থাগার কিংবা কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিগত গ্রন্থসংগ্রহ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়, তবে আমাদের মতো আরও অনেকের আজীবনের সাধনার সম্পদও বেঁচে থাকবে।

ইউজিসি বলেছে, ব্যক্তিগত গ্রন্থসংগ্রহ শুধু সংরক্ষণ নয়, ডিজিটাল আর্কাইভও তৈরি করা হবে। এই চিন্তাকে আমি আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। আশা করি, এই উদ্যোগ শুধু একজনকে ঘিরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ব্যক্তিগত গ্রন্থভাণ্ডারও একদিন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণের সুযোগ পাবে।

শেষে আরেকটি কথা। কিছুদিন আগে জানলাম, শাহবাগের জাতীয় গ্রন্থাগারের বই সংরক্ষণের জন্য ভবন ভাড়া বাবদ কয়েক কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। নিশ্চয়ই এর বাস্তব কারণ রয়েছে। হয়তো নতুন ভবনের কাজ চলছে বলেই এমন ব্যবস্থা করতে হয়েছে। তবে সাধারণ একজন বইপ্রেমী হিসেবে মনে প্রশ্ন জাগে; দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় যদি স্থায়ী অবকাঠামো আরও আগে গড়ে তোলা যেত, তাহলে হয়তো এই বিপুল অর্থ অন্যভাবেও দেশের গ্রন্থাগার ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যয় করা সম্ভব হতো।

বই কেবল ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। বই একটি জাতির স্মৃতি। একটি সভ্যতার উত্তরাধিকার। তাই ব্যক্তিগত গ্রন্থসংগ্রহ রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বাড়ুক। যাতে কোনো লেখকের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আজীবনের সাধনাও কেজি দরে বিক্রি না হয়ে যায়। আবদুল হাই শিকদারের জন্য আন্তরিক শুভকামনা। তাঁর উদ্যোগ সফল হোক। আর সেই সঙ্গে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ব্যক্তিগত গ্রন্থভাণ্ডারও যেন একদিন নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পায়।


লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব  ও  যুগ্ম সাধারণ  সম্পাদক, মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল। মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪, ই-মেইল:  [email protected]